PM Modi Interview to Indian Express: দেশই আমার অগ্রাধিকার, সেটাই আমার দেশপ্রেম

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎকার: ষষ্ঠ দফার নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিন ১০ মে, হরিয়ানার রোহতকে প্রচারে যাওয়ার আগে ৭, লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কথা বললেন রবীশ তিওয়ারি ও রাজকমল ঝায়ের সঙ্গে। 

By: Raj Kamal Jha, Ravish Tiwari New Delhi  Updated: May 13, 2019, 11:02:06 AM

মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিসগড়ে আপনাদের পরাজয়ের তারিখ ছিল ১১ মে ২০১৮। সেটা আপনার ও দলের পক্ষে বড় ধাক্কা ছিল। আজ, ১০ মে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি ২০০-র বেশি সভা করে ফেলেছেন। কী শিখলেন আপনি?

মিডিয়া থেকে শুরু করে খান মার্কেট গ্যাং, সবাই আমাদের হারাতে চায় এবং তারা বলতে শুরু করেছে তিন রাজ্যে আমরা ৪০টা আসন পাব। গত ১৫ বছর ধরে মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিসগড়ে আমরা ক্ষমতায় আছি। দলের কর্মী ও অন্যদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেস সম্পূর্ণ নিজেদের ক্ষমতায় সরকার গড়তে পারে নি, না রাজস্থানে না মধ্যপ্রদেশে। মধ্যপ্রদেশে আমরা ওদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছি। কাজেই ভোটের ফল একদিক থেকে দলীয় কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জোগাবে। জনতা ভেবেছিল যে কংগ্রেস বোধহয় বদলে গিয়েছে, কিন্তু যে মুহূর্তে ওরা ক্ষমতায় ফিরেছে, ওদের পুরনো অভ্যাসও ফিরে এসেছে।

দুর্নীতির কথাটা হয়ত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের জন্য ঠিক নয়। এ সংবাদপত্র তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করে, ভোপালে গরিব শিশুদের খাওয়ার টাকা (যা পাচার করে দেওয়া হয়েছিল) – আমি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর খুব সিরিয়াসলি নিই, মোটের উপর এ সংবাদপত্র তদন্তমূলক সাংবাদিকতার দুনিয়ায় নাম করেছে। সে দিক থেকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এখনও অন্যদের থেকে এগিয়ে।

আপনাদের কাগজ পিছিয়ে থাকা মানুষদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনার ক্ষেত্রে সবার আগে থেকেছে। কিন্তু যে নিরবচ্ছিন্ন ফলো আপের জন্য আপনারা বিখ্যাত, রাজস্থানের আলওয়ারে ভয়ানক ধর্ষণের ক্ষেত্রে আপনারা তা করেন নি। আপনাদের কাগজ সর্বদা বাকস্বাধীনতা রক্ষায় অগ্রণী থেকেছে। কিন্তু ‘মোদী, মোদী’ ধ্বনি দেওয়ার জন্য যখন এক সাংসদকে গ্রেফতার করা হয়, তখন সে খবর আপনাদের কাগজের প্রথম পাতায় জায়গা পায় না। কৃষিঋণ মকুব, বেকারভাতা (প্রতিশ্রুতি ছিল)। কিন্তু কংগ্রেস সম্পদ আহরণে ব্যস্ত। ফলে দলীয় কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য আমাদের বিশেষ কিছু করতে হয় নি।

pm narendra modi indian express “রাহুল গান্ধী কেন কংগ্রেস সভাপতি? কেন নিশ্চিত করতে পারলেন না যে ওই পদে কোনও মুসলমান বসুক?” প্রশ্ন মোদীর।

প্রশ্নটা এ কারণে ছিল যে হারের পর অবস্থানের দ্রুত বদল ঘটেছে – গরীব মানুষদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা, প্রধানমন্ত্রী-কিসান, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের মানুষদের আয়কর ছাড় এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে পেনশন। এই পরাজয় লোকসভা ভোটে প্রভাব ফেলবে এমন একটা আতঙ্ক কাজ করছে বলে মনে হচ্ছিল।  

এর অন্য কারণ রয়েছে। আমাদের সরকার সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমের তরফ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা কেন আগেভাগে জানতে পারি না? এটাই আপনাদের সমস্যা। আমি ১১ ডিসেম্বরের পর এসব পদক্ষেপ নিয়ে ভাবি নি। আপনারা যদি জানার চেষ্টা করেন, দেখবেন এই ফাইলগুলির পিছনে দু’বছর সময় কাটানো হয়েছে।

আপনারা যখন মারাঠা, জাট, গুজ্জর এবং পতিদার আন্দোলনের দিকে তাকান – যদি এ ধরনের অশান্তি লেগেই থাকে, তাহলে দেশটা কোথায় যাবে! ফলে ১১ ডিসেম্বরের সঙ্গে এসব কিছুকে যুক্ত করে দেখানো সংবাদমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা।

আপনি এই তিনটে সম্প্রদায়ের মধ্যে অশান্তির উল্লেখ করলেন… 

কেবল এই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে দিয়ে বিষয়টি গেছে এমনটা ভাববেন না। একটা বড় সংখ্যক এনজিও বিদেশ থেকে সমর্থন পাচ্ছে এবং এ ধরনের অশান্তি তৈরির কাজে লেগে রয়েছে।

আপনি সর্বদাই প্রচারের মুডে থাকেন, গত পাঁচ বছর ধরে আপনি বিরোধীদের আক্রমণ করে আসছেন। তার মানে আপনিও বিরোধীদের টার্গেট। গণতন্ত্র মানে বোঝাপড়া, ট্রেজারি এবং বিরোধী বেঞ্চের মধ্যে আদান-প্রদান। আপনার এই সর্বক্ষণ প্রচারের মুডে থাকার ফলে এই পরিসরটা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে না?

ভালো প্রশ্ন। যাঁর বিজ্ঞান ভবন এবং ক্যাবিনেট রুম থেকে সরকার চালান, তাঁদের পক্ষে এটা আপত্তিকর। তাঁদের প্রশ্ন করা উচিত। যদি প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে না-ঘুরে বেড়ান তাহলে তিনি কী করে জানবেন যে কী ঘটছে! এই প্রধানমন্ত্রী যে ছুটি কাটাতে যান না এ কথাটার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। যদি আমি জল সম্পর্কিত কোনও অনুষ্ঠানে যাই, সেখানে আমি জল ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি না। যদি শক্তি সম্পর্কিত কোনও অনুষ্ঠানে যাই, সেখানে আমি তা নিয়েই কথা বলি। আমি উন্নয়ন ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি না।

নির্বাচনের সময় ছাড়া অন্য দল বা তার নেতাদের নিয়ে আমি প্রায় কথা বলিই না। যদি না সেদিন কোনও বিরোধী নেতা এমন কোনও মন্তব্য করে থাকেন, যার জবাব আমার দেওয়া উচিত। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনও আমার ভাষণ দেখলে এরকমই দেখা যাবে। এটাই আমার প্রতিশ্রুতি… এমনকি সংসদের ক্ষেত্রেও।

আমি আপনাদের দুটি ঘটনার কথা বলব। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস যদি সেগুলো যথাযথ পরিপ্রেক্ষিত সহ লেখে তাহলে ভাল হয়। আই এন এস বিরাটের প্রসঙ্গ এল কেন? এটা নতুন কোনও ইস্যু নয় যা সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। কেন এ প্রসঙ্গ উঠল? কংগ্রেস সভাপতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন যে সেনাবাহিনী মোদীর সম্পত্তি – সেটা আপনাদের সবার নজর এড়িয়ে গেছে – ফলে আমাকে মুখ খুলতে হলো, যা ব্যক্তিগত আক্রমণের মত শোনাল। রাজীব গান্ধী আমার ইস্যু নয়। আপনারা রাজীব গান্ধীকে হাইলাইট করতে পারেন, যদি আপনারা ওঁকে সাহায্য করতে চান। এটা আপনাদের ব্যাপার। এ খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসেও বেরিয়েছে যে অ্যাডমিরালরা তখন কিছু বলেন নি। কথায় বলে কথা শুরু করলে কোথায় শেষ হবে তার ঠিক নেই।

দ্বিতীয় ঘটনাটা ছিল, রাহুল গান্ধী বলেছিলেন উনি নরেন্দ্র মোদীর ইমেজ ভেঙে ফেলতে চান, যে খবর আমি পড়ি ঝাড়খণ্ডে। আমার ইমেজ ভাঙতে চাওয়া ওঁর সহজাত।

মোদীর ইমেজ দিল্লির খান মার্কেট গ্যাং বানায় নি, দিল্লির লুটেরারা বানায় নি। ইমেজ বানিয়েছে মোদীর ৪৫ বছরের তপস্যা। সে ভাল ইমেজ হোক কী খারাপ। আপনি একে ওপড়াতে পারবেন না। কিন্তু লুটেরা আর খান মার্কেট গ্যাং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মিস্টার ক্লিন ইমেজ বানিয়েছে। কী করে সেটা ধ্বংস হলো, আমার ইমেজের সেখানেই উত্তর আছে। আপনাদের কাজ হল তদন্ত করা, লোককে শিক্ষিত করা।

pm narendra modi indian express “সাইক্লোন যখন এল আমি মমতাজি এবং নবীনজিকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছি।”

শুধু কংগ্রেস নয়, মমতা ব্যানার্জি এবং চন্দ্রবাবু নাইডুর প্রচারও এত ব্যক্তিগত পর্যায়ে গেছে, কেউ ভাবতেই পারে যে এরা সবাই মিলে ভোটের পর জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারবে তো?

আমি সব ভোট একসঙ্গে করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করেছি। আমি বিরোধী দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে রাজি হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের দল ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে বিরোধীরা স্বীকার করেছেন যে আর কোনও প্রধানমন্ত্রী তাঁদের এত সময় দেন নি, কিন্তু সে কথা ওঁরা জনসমক্ষে বলেন না। যখন সংসদ চলে, প্রতিদিন আমি বিভিন্ন দলের ৪০-৪৫ জন সাংসদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। গণতন্ত্রে ডায়ালগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইক্লোন যখন এল আমি মমতাজি এবং নবীনজিকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছি। আমার একটা নির্বাচনী কর্মসূচি আমি পিছিয়ে দিয়ে বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের সঙ্গে বৈঠক করি। সাইক্লোন যখন ১০০০ কিলোমিটার দূরে ছিল তখন থেকে আমি প্রতি দু ঘণ্টা অন্তর সব খবর নিচ্ছিলাম। কেরালায় ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল যখন কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল তখন এক মন্দিরে বাজি বিস্ফোরণে ১৮ জন মারা যান। আমি সেখানে বড় বড় ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। এটাই সত্যি যে আমাকে রং চড়িয়ে ভাল দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।

বিরোধী কোনও নেতার সঙ্গে আপনার হাসিমুখের ছবি আমরা সচরাচর দেখতে পাই না…

আমি তেমনটা পারি না। তা ছাড়া আমি মোটামুটি মজার মানুষ… আমার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বহু হালকা মুহূর্ত থাকে। কিন্তু এসবকে রাজনৈতিক রং দেওয়া হয়।

কিন্তু ইমেজের শক্তি আপনার চেয়ে বেশি কোনও নেতা জানেন না। 

আমি যখন কাজ করি, আমি সম্পূর্ণ ফোকাসড থাকি, পুরো কাজটার মধ্যে থাকি। যখন আমি ফাঁকা থাকি, তখন আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ফ্রি রাখি।

নরেন্দ্র মোদীর ইমেজ হলো, সব সময়ে সব কিছু কন্ট্রোলে রাখতে চান। প্রশ্ন হল – আপনি কি ভিন্ন মত সহ্য করতে পারেন? কখনও এরকম হয়েছে, যে কোনও মন্ত্রিসভার বৈঠক বা দলীয় বৈঠকে আপনার মত গৃহীত হয় নি?

গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ের উদাহরণ দিতে পারি। আট থেকে নয় জন বিধায়ককে নিয়ে আমি একটা দল তৈরি করেছিলাম, একজন মন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। প্রতি মঙ্গলবার আমার বিধায়ক দিবস হত, যেদিন বিধায়ক-প্রাক্তন বিধায়ক-সাংসদ-প্রাক্তন সাংসদরা আমি সহ সরকারের লোকজনের সঙ্গে কোনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই দেখা করতে আসতেন। মন্ত্রিসভার বৈঠক হত প্রতি বুধবার। মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে ৪৫ মিনিটের জিরো আওয়ার থাকত যেখানে মঙ্গলবারের ফিডব্যাক নিয়ে মন্ত্রীরা কথা বলতেন, আমি বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে খোলাখুলি নিজেদের মতামত দিতেন।

প্রথম ১৫ মিনিটে আমাকে এ প্রসঙ্গে বলা হত… আমি বলতাম কোথা থেকে ফিডব্যাক এসেছে সেটা আমাকে না জানাতে, যাতে আমি না পক্ষপাতী হয়ে পড়ি… ভিন্নমতের জায়গাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার জন্য আমার মন্ত্রী এবং সিএজি-র সঙ্গে ওয়ার্কশপও করেছিলাম। এর ফলে আমার টিম শিক্ষিত হয়েছিল, নিজেদের সংশোধন করেছিল। এটা গণতন্ত্র নয়?

একই রকম ছিল বিধানসভার প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রশ্নোত্তর পর্বের সময়ে বিরোধীরা সরকারের সমালোচনা করতেন এবং সরকারের সদস্যরা তাঁদের ভুল প্রমাণের চেষ্টা করতেন। মিডিয়ার কাছে ব্যাপারটা ছিল আধিকারিকরা মজা করছেন। বিধানসভার কাজই হল আমলাতন্ত্রের উপর চাপ সৃষ্টি করা। তার বদলে, ওরা এ ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির জায়গা বানিয়েছে যেন পরদিন তা কাগজে বেরোয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে বিধানসভা এর জন্য নয়…

একইভাবে সংসদের ক্ষেত্রেও আপনাদের দেখতে হবে, মন্ত্রিসভার বৈঠকের জন্য মনমোহন সিং সরকারের আমলে কত সময় ব্যয় করা হত। গড়ে ২০ মিনিট। আমার মন্ত্রিসভার বৈঠক হয় গড়ে তিন ঘণ্টা ধরে। এত সময় ধরে কী হয় বলে আপনারা মনে করেন? বৈঠকের পর মন্ত্রিসভার অনেক প্রস্তাব থাকে। তার মধ্যে কিছু যায় অস্থায়ী মন্ত্রিগোষ্ঠীর কাছে। এ ছাড়া আমি মন্ত্রিপরিষদের সকলের সঙ্গে বৈঠক করি, যেখানে সবাইকে বক্তব্য রাখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে প্রেজেন্টেশনও দেওয়া হয়, কিন্তু সেসব সংবাদমাধ্যমের জন্য নয়।

pm narendra modi indian express এল কে আডবাণী, রাজনাথ সিং, মুরলী মনোহর যোশীর সঙ্গে মোদী। ছবি: নীরজ প্রিয়দর্শী

কিন্তু খবর হিসেবে আমরা কী পাই?

সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমি অগণতান্ত্রিক নই। দিল্লিতে তিন ঘন্টা ধরে আড়াইশো মানুষের প্রত্যেকের সঙ্গে দেখা করেছি, বিভিন্ন বিষয়ে অবাধ আলোচনার জন্য। আমার বিশ্বাস, সরকারের এবং মিডিয়ার চিন্তাধারা স্বচ্ছ হওয়া উচিত। খবর ছাপা হলো কিনা, সেটা গণতন্ত্রের একমাত্র চিন্তার বিষয় হতে পারে না।

২৮২ টি আসন থাকা সত্ত্বেও কী করতে পারে নি আপনার সরকার?

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে মোদীর নিরপেক্ষ সমালোচনা করাতে (হাসি)।

আমরা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহকেও এই প্রশ্ন করেছিলাম। অটল বিহারী বাজপেয়ীর এত আসন ছিল না, নানাবিধ চাপ বজায় রাখা শরিক দল এবং বিক্ষুব্ধ সংঘকে পাশে নিয়ে চলতে হয়েছে। আপনি এই তিনটি ব্যাপারেই নিশ্চিন্ত। বাজপেয়ীর উত্তরাধিকার ছিল সোনালি চতুর্ভুজ, বিলগ্নিকরণ, বিদ্যুৎ সংস্কার, পোখরান…কুড়ি বছর পরে মনে থাকবে। আপনার উত্তরাধিকার কী?

আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিলে তা অবিচার হবে…আমি যাই বলি। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা যে কোনো সরকারের সঙ্গে একটি দুটি বিষয়কে যোগ করি, সামগ্রিক ভাবে দেখি না। এর ফলে সব সরকারের কাছে ওই একটি দুটি বিষয় নিয়ে কাজ করার প্রলোভন তৈরি হয়, যাতে লোকে মনে রাখে। আমি দেশকে অনেকগুলি স্তম্ভের উপর দাঁড় করাতে চাই। যদি কেউ বলে পরিচ্ছন্নতা আমার উত্তরাধিকার, আমি বলব আমি ব্যাপক হারে শৌচালয় তৈরি করিয়েছি, যদি কেউ স্বাস্থ্য পরিষেবার কথা বলে, আমি আয়ুষ্মান ভারতের কথা বলব।

অটলজির সরকার যেমন করেছিল, আমরাও ঠিক তেমনি অর্থনীতিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিয়েছি, বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বাড়তে থাকা বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে ভারত অন্যতম। আমাদের সরকারও পরিকাঠামো উন্নয়নে অনেক কাজ করেছে, যা আমাদের সবচেয়ে কড়া সমালোচকও স্বীকার করবেন। গ্রামের রাস্তা হোক বা হাইওয়ে, আমরা যা উত্তরাধিকার সূত্রে পাই, তার দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি গতিতে তৈরি করেছি। বস্তুত, ভারত আজ পৃথিবীর দ্রুততম হাইওয়ে তৈরি করা দেশ।

অটলজির সরকারকে প্রতিরক্ষা কেলেংকারির মিথ্যা অভিযোগ এনে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করে বিরোধীপক্ষ। বর্তমানে আমাদের বিরুদ্ধে কেলেংকারির মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। কিন্তু আবারও একবার সত্য আমাদের পক্ষে।

কংগ্রেস এবং তাদের বন্ধুবান্ধব ‘ডেটা-বিহীন পরিবেশ’ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে বেকারি এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে। পরে দেখা যায়, অটলজির একবারের সরকার ইউপিএ-র দুবারের সরকারের চেয়ে বহুগুণ বেশি কর্মসংস্থান করেছে। সেই একই ‘ডেটা-বিহীন পরিবেশ’ এখন আমাদের সরকারের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আমার সরকারকে একটি দুটি ইস্যুতেই সীমিত রাখতে চাইলে তা মোদীর প্রতি চূড়ান্ত অবিচার হবে। ওরা (কংগ্রেস) ওদের সমগ্র সরকার সম্পর্কে এমজিএনরেগা (MGNREGA) ছাড়া আর কিছু বলতে পারে নি। আমি কোনো একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। আমি ১৩ বছর ধরে গুজরাটে ছিলাম, আপনি কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন না। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখবেন অনেক কিছু হয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি সরকারের কর্মপ্রক্রিয়ার একটা মডেল তৈরি করার।

pm narendra modi indian express ‘যদি কেউ বলে পরিচ্ছন্নতা আমার উত্তরাধিকার, আমি বলব আমি ব্যাপক হারে শৌচালয় তৈরি করিয়েছি।’

গুজরাট মডেল নিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় আলোচনা হয়েছিল। ইউপিএ সরকারের জমানায় আমরা দেখেছি অধিকার ভিত্তিক মডেল – তথ্যের অধিকার, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, শিক্ষা, খাদ্য ইত্যাদি। এই মুহুর্তে দিল্লিতে কোনো স্পষ্ট মডেল নেই। একদিকে আপনি মুদ্রাকে তুলে ধরছেন, অর্থাৎ স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে ঋণ। অন্যদিকে, পিএম-কিসান এর আওতায় দান।

আমি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বিজ্ঞাপন দিই। আমার কোনো লাভ হয় না, কিন্তু সেটা কি দান? খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন কিন্তু দানের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়। ১১ ডিসেম্বরের পর ডিএভিপি রেট বাড়ানো হয়। সেটা কি দান? কিন্তু আমি (গরীবদের জন্য) বাড়ি তৈরি করাচ্ছি, তা কি দান? তার মানে আমি দান কথাটার অর্থ বুঝি না।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অনেক কাজ করতে হবে। কিন্তু গ্রাহক না থাকলে পরিকাঠামো তৈরি করবে কে? এখন যখন আমরা স্বাস্থ্য পরিষেবার ভিত হিসেবে একটা পরিকাঠামো তৈরি করেছি, তাকে ক্ষমতায়ণ বলবেন, নাকি দান? আমি কখনোই খাদ্যের অধিকারকে দান বলব না। শিক্ষার অধিকারকে দান বলব না। কিন্তু আমি বলেছিলাম এগুলো নির্বাচনী গিমিক। একবার দেখে নিন ২৫ মে, ২০১৪, মানে মোদী ক্ষমতায় আসার এক দিন আগে, খাদ্যের অধিকার কোন জায়গায় ছিল। সেটা আলোচনা করা উচিত।

আপনার ‘মিনিমাম গভর্নমেন্ট, ম্যাক্সিমাম গভরনেন্স’ এর নির্বাচনী স্লোগানের প্রেক্ষিতেই এই প্রশ্ন। ওই স্লোগানে ইঙ্গিত ছিল যে আপনি মার্কেট ফোর্স বা বাজারের চালিকাশক্তিকে আরও জায়গা দেবেন, কিন্তু…

এর দুটো ভাগ আছে। লোকে বলে চারধামে গেলে মোক্ষ লাভ হয়, কিন্তু সরকারি ফাইল ৩২ টা জায়গা থেকে পাশ করালেও তাদের গতি হয় না। আমাকে এটা বদলাতেই হতো। শুনলে অবাক হবেন, এখন স্রেফ চার বা ছয় জায়গা হয়েই আমার কাছে ফাইল পৌঁছে যায়। এর আগে ক্যাবিনেট নোট আসতে ছ’মাস লাগত, এখন ১৫ দিন লাগে। মিটিং এর ‘মিনিটস’ আমার কাছে সই করার জন্য আসতে ছ’মাস লাগত। কী অদ্ভুত কথা! এখন নিয়ম হয়ে গেছে যে মিটিংয়ের ১৫ দিনের মধ্যে ‘মিনিটস’ অনুমোদিত হবে। এই হলো গভরনেন্স। এতে সময় এবং শ্রম বাঁচে।

বিলগ্নিকরণের কথা বললে, সরকারের ব্যবসায় থাকার কোনও অধিকারই নেই। বিলগ্নিকরণ এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে আমাদের মাথায় রাখতে হয়, আমরা যা বেচতে চাই তার কোনও গ্রাহক আছে কিনা। আমরা একটা ধারণা তৈরি করি। কিন্তু এই সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশি বিলগ্নিকরণ হয়েছে।

কিন্তু আপনারা তো একহাতে বেচে আরেক হাতে কিনেছেন। ওএনজিসি (অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন) এইচপিসিএল (হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড) কিনল, পিএফসি (পাওয়ার ফিনান্স কর্পোরেশন) আরইসি (রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন কর্পোরেশন) নিয়ে নিলো…

এরকম উদাহরণ দিতেই পারেন। কিন্তু আরেকটা উদাহরণ ধরুন – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক সময়ের কর্তাব্যক্তি একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন দেশে আর্থিক সংস্কারের উপায় হিসেবে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের একত্র হওয়া নিয়ে। আমি এসবিআই-এর সঙ্গে পাঁচটি ব্যাঙ্ককে এক করে দিয়েছি। তিনটি আরও ব্যাঙ্ক একত্র হয়েছে। এখন তিনি কোথায়? ইউনিয়নের উপস্থিতিতে বিভিন্ন ব্যাঙ্ককে এক করে দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়। আমরা স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র সঙ্গে পাঁচটি ব্যাঙ্ক এক করেছি। কাজ এখনও চলছে। এসব তো রাতারাতি হয় না। গত ৭০ বছরে যা হয় নি, তা একজন লোক পাঁচ বছরে করছে। এটাকে কি আপনারা হিসেবের মধ্যে রাখবেন না?

pm narendra modi indian express ‘কংগ্রেস এবং তাদের বন্ধুবান্ধব ‘ডেটা-বিহীন পরিবেশ’ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে বেকারি এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে।’

বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত ঠিক কী ধরনের সিদ্ধান্ত ছিল? আপনি ক্রমাগত তার লক্ষ্য সরাতে থেকেছেন।

লক্ষ্য সরানোর কোনও প্রশ্নই নেই। প্রথম দিন থেকেই কি আমরা বলি নি যে বিমুদ্রাকরণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, কালো টাকা চিহ্নিত করে তা নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া? কালো টাকার বিরুদ্ধে আমাদের পদক্ষেপের কারণে কি আমরা ১.৩০ লক্ষ কোটি টাকা ট্যাক্সের আওতায় আনি নি? ৩.৩৮ লক্ষ ভুয়ো কোম্পানিকে কি চিহ্নিত করে কি তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয় নি? তাদের ডিরেক্টরদের বাতিল করা হয় নি? এছাড়াও, আমি যেমন বলতেই থাকি, এখন বাজারে প্রতিটি টাকার সঙ্গে নামের ট্যাগ জুড়ে গেছে, যা আগে কখনও ছিল না।

বিমুদ্রিকরণের ফলে বৈধতা আনার প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করা, কর এড়ানো বন্ধ করা এবং ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেছে। ২০১৩-১৪ সালের তুলনায় ২০১৭-১৮ তে ৮০ শতাংশ বেড়েছে ‘ট্যাক্স বেস’। ৩.৮ কোটি থেকে বেড়ে ৬.৮ কোটি করদাতা। ডিজিটাল পেমেন্টে বৃদ্ধি তো চারদিকে দেখাই যাচ্ছে, পরিসংখ্যান দেখুন বা সাধারণ জীবন।

দেউলিয়া অবস্থা বা ‘bankruptcy code’ এবং জিএসটি, সম্পদ বণ্টনে সংস্কার, এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর পর কী?

একটা যোগসূত্র দেখবেন জিএসটি, আইবিসি (ইন্সল্ভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপ্টসি কোড) এবং সম্পদ বন্টন সংস্কারের মধ্যে: নিয়মবর্হিভূত প্রক্রিয়া থেকে নিয়ম ভিত্তিক প্রক্রিয়ার দিকে এসেছি আমরা, যার ফলে সবাই একই স্তরে থাকতে পারে। আমরা এনেছি আরও বেশি স্বচ্ছতা, করদাতাদের জন্য প্রযুক্তি, জিএসটি দিয়ে ‘ইন্সপেক্টর রাজ’-এর পথ বন্ধ করা। জিএসটি সাধারণ মানুষের জন্য করের হারও কমিয়ে দিয়েছে। আইবিসি-র মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেছে যে ব্যাঙ্কে রাখা মানুষের কষ্টার্জিত টাকার দায়িত্ব যেন কেউ এড়িয়ে যেতে না পারে। আর এর পর কী, তার উত্তরে আপনাকে আশ্বস্ত করি, আরও সংস্কার, বিস্তৃত সংস্কার, সুদূরপ্রসারী সংস্কার।

আপনার আমলে মুদ্রাস্ফীতির হার আগাগোড়া কম থেকেছে, কিন্তু কৃষকরা অখুশি। গ্রাহক এবং প্রস্তুতকারকের মধ্যে এই যে টানাপোড়েন, এর নিষ্পত্তি কীভাবে করবেন?

মুদ্রাস্ফীতির হার দেশের গরীবদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক, নাহলে তাঁদের ওপর লুকানো ট্যাক্সের বোঝা চাপবে, যা তাঁদের উপার্জন খেয়ে নেবে। একইসঙ্গে কৃষি উপার্জন বাড়ানোও জরুরি। প্রচলিত চিন্তাধারা বলে, দুটো জিনিস একসঙ্গে হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আমরা একটু অন্যভাবে ভাবছে, যাতে উৎপাদক এবং গ্রাহক উভয়েই খুশি থাকেন। প্রথমত, মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বাড়ানোর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ কৃষি উপার্জন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রশ্ন হলো, এমএসপি বাড়ানো যথেষ্ট কিনা। একেবারেই না। এমএসপি কাগজে কলমেই থেকে যাবে যদি না কৃষি উৎপাদন কেনার সময় তার প্রয়োগ হয়। এক্ষেত্রে কিছু ডেটা দিই, যা আমি প্রায়শই দিয়ে থাকি, এবং আমার খুব ইচ্ছে যে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে আরও আলোচনা করুন।

২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪, এই পাঁচ বছরের মধ্যে ইউপিএ’র অধীনে এমএসপি দিয়ে কেনা হয় স্রেফ আট লক্ষ মেট্রিক টন (এমটি) ডাল এবং অয়েলসীড। এনডিএ’র আওতায় ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৮-১৯’র মধ্যে ৯৪ লক্ষ এমটি ডাল এবং অয়েলসীড কেনা হয় এমএসপি দিয়ে, অর্থাৎ প্রায় ১৫ গুণ বেশি। এত বিরাট ব্যবধানের ফলে আরও অনেক বেশি উৎপাদন কেনা গেছে এমএসপি দিয়ে, অথচ মুদ্রাস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। এছাড়াও রয়েছে e-NAM এর মতো উদ্যোগ, যা কৃষকদের হাতে আরও অর্থ এনে দেবে। তাঁদের উপকারের আরও একটি উপায় হলো ডিরেক্ট ইনকাম সাপোর্ট বা সরাসরি উপার্জন সহায়ক। একদিকে যেমন তাঁরা উপার্জনের সাহায্য পাচ্ছেন, অন্যদিকে ছোট এবং প্রান্তিক কৃষকদের পকেট থেকে বেরোনো ‘ইনপুট কস্ট’-এর হার কমবে। আমরা আমাদের ইস্তেহারে ঘোষণা করেছি প্রতিটি কৃষককে এই প্রকল্পের আওতায় আনার কথা।

pm narendra modi indian express বারাণসীতে মদনমোহন মালভিয়ার মূর্তিতে মালা দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। ছবি: রীতেশ শুক্লা

আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কি ডেমোগ্রাফিক ডিসপেয়ার (হতাশায়) পরিণত হতে চলেছে?

এই নির্বাচনে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশ কী ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের দিকে এগোতে চায়, না ডেমোগ্রাফিক ডিসপেয়ারের দিকে? এখানে দুটো আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। একটির ফোকাস ভারতের প্রতিটি পরিবারে প্রতিটি যুবসমাজের প্রতিনিধির বিকাশের জন্য সুযোগ তৈরি করার ওপর। অন্য দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবারের যুব সদস্যদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে ব্যস্ত। এই দুইয়ের মধ্যে কোনটির থেকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আসবে বলে মনে হয়? ভারতের যুবসমাজের যে হারে প্রয়োজন, সেই হারে তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করার নক্সা কে বানিয়েছে? ৫ ট্রিলিয়ন ডলার (৩৫ লক্ষ কোটি) অর্থনীতি সমৃদ্ধ ভারতের কথা আমরাই প্রথম ভেবেছি, পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ১০০ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা, কৃষি-গ্রামীণ ক্ষেত্রে ২৫ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা, কার্যকরী বিমানবন্দরের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কথা, হাইওয়ের দৈর্ঘ্যও দ্বিগুণ করার কথা, এবং নতুন ভারত গড়ার কথা।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধে নেওয়ার অর্থ, আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন এবং উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠা। বলুন তো, এই কাজের পরিকল্পনা কে করেছে? সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ (ইজ ইফ ডুয়িং বিজনেস) রয়েছে এমন দেশের তালিকায় প্রথম পঞ্চাশে ভারতকে নিয়ে যাওয়ার কথাও আমরা বলেছি। এও বলেছি যে ভারতে ২০২৪-এর মধ্যে ৫০,০০০ স্টার্ট-আপ গড়ে তোলার সুবিধে করে দেব আমরা, এবং আমাদের যুবসমাজের যে সব প্রতিনিধি কর্মক্ষেত্রে চাকরির সৃষ্টি করবেন, তাঁদের ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বন্ধক-বিহীন ঋণের ব্যবস্থাও করব আমরা বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।

আজকের প্রজন্ম অতীতের বোঝা মাথায় নিয়ে চলে না। ভবিষ্যতকেও ভয় পায় না, কারণ ভবিষ্যৎ তারাই গড়তে চায়। বড় স্বপ্ন দেখে, কাজেই বড় পরিষেবা দিতে পারবে, এমন লোক চায়। একই পরিবারের একের পর এক প্রজন্ম ৬০ বছর ধরে সেই এক বস্তাপচা, ক্লান্ত কথা বলে চলেছে, এটা যুবসমাজ চায় না। আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা ভাবাই, বিরোধীরা বিভাজন এবং হতাশার কথা বলে।

সামাজিক বিষয়ে আসা যাক। আপনি জাতীয়তাবাদকে নির্বাচনী ইস্যু বানাবেন, সেটা আপনার অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে জাতীয়তাবাদের ধরন নিয়ে। দেশের সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে কাশ্মীর বা পাকিস্তানের প্রিজমের মধ্যে দিয়ে জাতীয়তাবাদকে দেখলে তাঁদের জাতীয়তাবাদ নিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন সন্দেহ থেকে যায়। এই নির্বাচন কভার করতে গিয়ে আমাদের সহকর্মীরা বিভিন্ন গ্রামে মানুষকে বলতে শুনেছেন, তাঁরা আপনার বিদেশনীতি পছন্দ করেন, কারণ এতে তাঁদের ‘ইজ্জত’ বেড়েছে। এরকম আর কোনও লোকসভা প্রচারে শুনি নি। সেটা জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক দিক হতে পারে। কিন্তু যে জাতীয়তাবাদ সমালোচনা শুনলেই প্রশ্ন তোলে…যেমন বহু অর্থনীতিবিদ বিমুদ্রাকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কিন্তু আপনি বলেন, স্রেফ দুই ধরনের মানুষ বিমুদ্রাকরণের বিপক্ষে – যাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত, বা যাঁরা কংগ্রেসের কাছ থেকে ‘সুপারি’ (বরাত) পেয়েছেন। প্রশ্ন তুললেই যদি জাতীয়তাবাদ টেনে আনেন…

পণ্ডিত নেহরু সর্দার সরোবর বাঁধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আমি সম্প্রতি বাঁধটির উদ্বোধন করি। প্রকল্পটির আনুমানিক মূল্য ছিল ৬,০০০ কোটি টাকা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খরচ গিয়ে দাঁড়ায় এক লক্ষ কোটির বেশি। আমি যদি বলি দেশদ্রোহীরা দেশকে শেষ করে দিয়েছে, আপনার অসুবিধে কোথায়? সরকারের কাছে বিদেশী অর্থ প্রকাশ করার আইন আছে, আমার তৈরি আইন নয়, একটি পরিবারের তৈরি আইন। আমি তো স্রেফ হিসেব চেয়েছি। অটোম্যাটিক্যালি ২০,০০০ (এনজিও) বন্ধ হয়ে গেল। আমি বলব দেশদ্রোহিতা। আপনার খারাপ লাগছে কেন মশাই? এই হচ্ছে প্রেক্ষিত। অর্থনৈতিক কারণে বিমুদ্রাকরণের সমালোচনার আমি বিরোধী নই। আপনি এখনও আমার ২০ বছরের পুরোনো ভাষণ খুঁজে পাবেন, যখন আমি মুখ্যমন্ত্রীও ছিলাম না, বিজেপির যুব শাখার একটি অনুষ্ঠানে – যে ভারত মাতা কী জয় বলার কোনও অর্থই নেই যদি সেই ভারত মাতার ওপরেই গিয়ে পান-গুটখা ফেলে আসেন। এই আমার জাতীয়তাবাদ, আমার দেশপ্রেম। আপনাদের মাথায় পাকিস্তান ছাড়া কিছু নেই।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তো তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করে, তো এটা লিখেছিল কি, যে জম্মু কাশ্মীরে রাজ্যপালের শাসন লাগু হওয়ার পর ১০০ শতাংশ বিদ্যুতিকরণ হয়েছে? এটা কি খবর নয়? জম্মু কাশ্মীরে নির্বাচনের সময় একটাও হিংসার ঘটনা ঘটে নি। ওদিকে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়েই হিংসায় মৃত্যু হয় ১০০ জনের বেশি মানুষের। একটা নির্বাচনও হতে পারে না ওখানে হিংসা ছাড়া। জম্মু কাশ্মীরে আমার দেশভক্তি দেখতে পান না? উত্তর পূর্বাঞ্চলে যে এত বিদ্রোহ নিয়ে সমস্যা, সেই অঞ্চলও শান্তিপূর্ণ। আমরা কি সেখানে জাতীয়তাবাদের চেতনা এনে দিই নি? তাঁদের মূলস্রোতে নিয়ে এসেছি।

pm narendra modi indian express অমিত শাহর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী। ছবি: নীরজ প্রিয়দর্শী

দুর্নীতিপরায়ণদের তো আইন শাস্তি দেবেই, কিন্তু সেটা কি দেশদ্রোহিতা?

আমরা ‘সরকারি সম্পত্তি’ সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি করে ফেলেছি…এই মানসিকতা পাল্টানো দরকার, যে এটা আসলে ‘আমাদের সম্পত্তি’। এই হলো আমার দেশভক্তির ধরন। যেমন ধরুন, আপনারা দেখে থাকবেন কীভাবে মানুষ সরকারি বাসের সিট নষ্ট করে। একে কি জাতীয়তাবাদ বলা যায়? কেন করি আমরা এরকম? বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো স্কুটারটাকে চারবার সাফ করছি, কিন্তু সরকারি বাস বা অন্য সম্পত্তি নষ্ট করছি। এটা কোন ধরনের জাতীয়তাবাদ? এটা দেশের সম্পত্তি, অর্থাৎ কিনা আমাদের সম্পত্তি, এই চেতনা জাগ্রত হওয়া উচিত কি না? এটাই আমার দেশভক্তি।

আমরা আপনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছি, আমরা হয়তো এই সংজ্ঞা শুনে বিপন্ন বোধ করব না। কিন্তু বহু মুসলিম পরিবারে এই ধারণা জন্মেছে যে তাঁদের জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা দিতে হবে। নির্বাচন কভার করতে গিয়ে আমরা বহুবার শুনেছি, তাঁরা নিজেদের দেশের অংশীদার হিসেবে দেখছেন না।

এই ধারণা ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি থেকে উৎপন্ন। ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহৃত, কিন্তু মূলস্রোতের অংশ নন। কেন তাঁরা (প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে) আব্দুল কালামকে নিজের মনে করেন না? এই প্রশ্ন তাঁদের করা উচিত। কেন সানিয়া মির্জা তাঁদের কেউ নন? কেন আব্দুল হামিদ (১৯৬৫’র যুদ্ধের নায়ক) তাঁদের আপন নন? আমাদের কি কাজ নয় তাঁদের শিক্ষিত করা? এই যে নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ বলা সব এমপি/এমএলএ, কোনও মুসলমানের হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন কি?

রাহুল গান্ধী হলেন কংগ্রেসের সভাপতি। কোনও মুসলমান পেতে পারেন না এই পদ? কেন উনি এটা নিশ্চিত করলেন না? দলিত/আদিবাসীদের কথা যদি বলেন, আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, ধরুন লায়ন্স ক্লাবের প্রধান কেন কোনও দলিত/আদিবাসী/মুসলমান হতে পারেন না? সবই রাজনীতিতেই হতে হবে? সাংবাদিকতায় কেন মুসলিমরা উচ্চপদে নেই? কেন এই অবস্থা করে রেখেছেন? আমরা কি এর জন্য দায়ী? আমরা তো সবে এলাম।

আমরা আব্দুল কালামের জন্য দ্বিতীয় মেয়াদ চেয়েছিলাম। কী খামতি ছিল আব্দুল কালামের মধ্যে? আমাদের মনে হয়েছিল সর্বসম্মতিক্রমে ওঁর আর একবার রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত। কিন্তু তা হয় নি।

ইন্টারনেটে আপনার দলের বা আদর্শের বেশ কিছু স্বনিয়োজিত সমর্থক পাওয়া যায় বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য।

একটা ঘটনা বলুন তো, যেখানে আমাদের সরকার প্রতিষ্ঠানগত ভাবে কোনও সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য প্রকাশ করেছে। আমার মুখ্যমন্ত্রিত্বের ১৩ বছর এবং প্রধানমন্ত্রিত্বের পাঁচ বছর যদি দেখেন, কোনও প্রতিষ্ঠানগত বৈষম্যের উদাহরণ পাবেন না, যাতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরকম উদাহরণ পাবেন যে অন্যান্য দলের নেতৃত্ব বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজনমূলক সম্পদ বণ্টন নিয়ে খোলাখুলি বলছেন বা কাজেও করে দেখাচ্ছেন। নিজেদের উঁচু বেদী থেকে ঘোষণা করছেন যে দেশের সম্পদের ওপর অগ্রাধিকার রয়েছে স্রেফ কিছু নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের। খান মার্কেটের সর্বসম্মতি অনুযায়ী বিদ্বেষমূলক মন্তব্য কে করতে পারে বা পারে না, তার সংজ্ঞা রয়েছে। খান মার্কেট যদি অনুমোদন করে, আপনি যা খুশি বলে হাততালি কুড়োতে পারেন। কিন্তু খান মার্কেট যদি আপনাকে পছন্দ না করে, তাহলে আপনি যা বলবেন তাই ‘হেট স্পিচ’। আজকে হেফাজতে থাকাকালীন নিজের অত্যাচারের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলে (বা স্রেফ ‘আমি টেররিস্ট নই’) বললেই তা বিদ্বেষমূলক হয়ে যায়। কিন্তু কেউ হিন্দুদের সন্ত্রাসবাদী বললে তা বিদ্বেষের পরিচয় নয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কাছে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া একজন সন্ত্রাসবাদী সম্পর্কে শিরোনামে লেখা যায় ‘তারপর ওকে ফাঁসি দিল ওরা’। কিন্তু সেটা তো বাকস্বাধীনতা, তাই না?

অ-বিজেপি ভোটারকে কী চোখে দেখেন আপনি?

গণতন্ত্রের অধীনে সব ভোটার সবসময় আপনার সঙ্গে একমত হবেন না। আমরা যখন নির্বাচিত হয়েছিলাম, আমি বলেছিলাম যে এই সরকার আমাদের যাঁরা ভোট দিয়েছেন তাঁদের, যাঁরা দেন নি, তাঁদেরও। যে কোনও অ-বিজেপি ভোটারের মধ্যে এমন একজনকে দেখি, যাঁর আশা আকাঙ্ক্ষা আমাদের বুঝতে হবে, এবং পূরণ করতে হবে। প্রত্যেক অ-বিজেপি ভোটারের মধ্যে আমি আরও দ্রুত এবং আরও বেশি কাজ করার কারণ দেখি।

আপনাদের একাধিক নেতা বলে থাকেন যে দেশের জনতা বিজেপি/নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে রায় দিয়েছে, ভুল ধরার তোমরা কে? কিন্তু গণতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে জুডিশিয়ারি বা মিডিয়ার মতো অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানেরও প্রয়োজন আছে। কোথাও যেন এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের তরফে প্রশ্ন উঠলে একটা অস্বস্তি রয়েছে।

অস্বস্তিকর প্রশ্ন অবশ্যই করা উচিত। আমার মতে সমালোচনা হওয়া উচিত, অভিযোগ নয়। যেমন আমাদের (সরকারকে) গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রশ্ন করা উচিত, তেমনি অন্যদেরও প্রশ্ন করা উচিত, তাই না? এখানেই আমার আপত্তি। ১০ বছর ধরে রিমোট কন্ট্রোল সরকার চলেছিল। যাঁদের হাতে রিমোট ছিল, তাঁদের সঙ্গে কটা প্রেস কনফারেন্স করেছিলেন আপনারা? একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি করা হলো যা প্রধানমন্ত্রীকেও খণ্ডন করতে পারে। তখন গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন? আমাকে যে ধরনের প্রশ্ন করছেন? আমি তো আমার ক্যাবিনেট কীভাবে চলে তা নিয়েও উত্তর দিয়েছি। ক্যাবিনেটের একটি সিদ্ধান্ত ছিঁড়ে ফেলা হয় (অপর পক্ষ দ্বারা)। আমাকে গণতন্ত্র শেখাবেন? ওদের কাছে কখনও জানতে চেয়েছেন? একথা বললে আপনি বলবেন আমি রেগে যাচ্ছি। একদমই তা নয়।

আমি (আপনাদের) প্রশ্নের ভদ্রভাবে উত্তর দিয়েছি। কিন্তু আপনাদেরও কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আলওয়ারে একটি দলিত মেয়ে ধর্ষিতা হয়, কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের শিরোনামে ৬ মে (রাজস্থানে নির্বাচনের শেষ দিন) পর্যন্ত সেই খবর আসে না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। ৬ মে পর্যন্ত খবর হয় নি কারণ ভোট চলছিল। শুনতে ভাল না লাগলেও শুনতে পারবেন? আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন, কিন্তু আমরা পাল্টা প্রশ্ন করলেই তা আপত্তিকর হয়ে যায়।

আপনারাই বলুন, ‘চোর’ গত এক বছর ধরে একটি গণতান্ত্রিক শব্দ, কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত আপনাদের কাছে অবমাননাকর শব্দ। এ আপনাদের কেমন অভিধান? আমি প্রকাশ্যে স্রেফ এটুকুই বলেছি যে রাজীব গান্ধী ওই ভাবমূর্তি নিয়েই মারা গিয়েছিলেন। আর এদিকে একজনকে ক্রমাগত চোর-চোর-চোর-চোর বলা হচ্ছে, তাতে আপনাদের কিছু যায় আসে না।

একজন চোখের জলে ভেসে নিজের অত্যাচারের কাহিনী বলেন, তাঁর সঙ্গে করা দুর্ব্যবহারের কথা, তাঁকে উলঙ্গ করার কথা, তাকে আপনারা ‘হেট স্পিচ’ বলেন। কিন্তু একটি গোটা সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসবাদী বলা, হিন্দু সন্ত্রাসবাদী, ‘হেট স্পিচ’ নয়? এই যে দুরকমের দাঁড়িপাল্লা, আমার ঝগড়া এর সঙ্গে।

এখন আর আমাদের মিডিয়ার ভয় দেখাতে পারবেন না। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সংবাদপত্র ছিল এক ধরনের সত্যাগ্রহ। যাঁরা সংবাদপত্র চালাতেন, তাঁদের নানারকম বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হতো। সেই লড়াইটাই মিডিয়ার উত্তরাধিকার। আগে যখন আমি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খুলতাম, প্রতিবেদক রভীশ না রাহুল না অন্য কেউ, সেটা আমার কাছে বড় কথা ছিল না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পড়ছি, এটাই বড় কথা ছিল। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া আসায় আমি এখন রভীশের ৫০টা টুইট দেখে একটা ধারণা করে নিতে পারি। আজকে আপনাদের মুখোশ খুলে গেছে।

‘একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে নক্সালপন্থা দারিদ্রের কারণে জন্ম নিয়েছে।’

আপনাদের ব্যক্তিগত মতামত আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় দৃশ্যমান। লোকে এখন তার বিশ্লেষণ করেন…এই ব্যক্তিগত মতামত তো মিডিয়ার নিরপেক্ষ মতামত নয়। আজ যদি আপনাদের মর্যাদাহানি হয়ে থাকে, এই কারণেই হয়েছে।

নিজেদের সুনাম বজায় রাখতে সংযম অভ্যাস করতে হবে আপনাদের সবাইকেই। আগে যখন কোনও সেমিনারে কোনও সম্পাদক কিছু বলতেন, তা অন্যভাবে নেওয়া হতো না। আজ আর সেই পরিস্থিতি নেই। এখানে বিশ্বাসযোগ্যতা খর্ব হয়েছে মিডিয়ার নয়, কিন্তু মিডিয়াতে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের। আমাদের কিছু বলে লাভ নেই। আমি কি কোনোভাবে আপনাদের প্রশ্নে কাটছাঁট করেছি?

কিন্তু আপনারা আমার এই ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন যে এই লোকটা সেন্সর করবে। কেউ জাতিবাদী হোক, আপনাদের সমস্যা নেই। কিন্তু মোদী যদি বলে আমরা এবছর ২৫০-র মধ্যে ৫০টা ঘরই বানাতে পারব, একদিক থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে এগোব, তাহলে আপনাদের সমস্যা হয় কেন? কেউ মন্দিরে যান না মসজিদে, তা নিয়ে ভেদাভেদ করবেন না। এটাই কি গণতন্ত্র নয়? আমি সৌদি আরবের রাজার কাছে কী চেয়েছিলাম? দুটো জিনিস: এক, ৮৫০ ভারতীয়কে রমজানের সময় রাজকীয় ক্ষমার মাধ্যমে মুক্তি দিন। সেই প্রস্তাব গৃহীত হয়, কিন্তু আমি তাতে কোনোরকম তকমা সাঁটি নি। দুই, আমি বোঝালাম যে আমাদের দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে, আরও বেশি মানুষ হজে যেতে চান। উনি আমায় বললেন, কোনও দেশেরই কোটা বাড়ানো হচ্ছে না, কারণ ম্যানেজ করা মুশকিল। আমি বললাম আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলির অন্যতম, আপনি আমাদের সঙ্গে এরকম করতে পারেন না। আমি বন্ধু হিসেবেই ফোন করেছিলাম। এভাবেই কথা বলেছিলাম। শুনে অবাক হবেন, উনি কোটা বাড়িয়ে দুই লক্ষ করে দিয়েছেন।

কার জন্য করি এসব? প্রেসে প্রচার করি না, কারণ আমি এই ধর্মনিরপেক্ষতা মানি না…

ভারতের রাজনীতিতে রেকর্ড রয়েছে বিদ্রোহীদের অংশীদার হয়ে ওঠার। প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাই হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে আপনি কাশ্মীরকে কীভাবে দেখেন?

আপনারা দেখেছেন কতটা শান্তিপূর্ণভাবে উপত্যকায় পঞ্চায়েত ভোট হয়েছে। আমরা এতে উৎসাহিত, এবং এই ভোট সাধারণ কাশ্মীরির গণতন্ত্রে আস্থার প্রমাণ। আমরা কেন্দ্র থেকে নিশ্চিত করেছি যেন উন্নয়নের টাকা পঞ্চায়েতের কাছে পউঞ্ছয়…আগেই হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হতে পারে নি কারণ উপত্যকায় গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরে রেখছিল মুফতি এবং আবদুল্লা বংশ। এই দুই পরিবার মিলে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাশ্মীরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করেছে। একবার এদের খপ্পর থেকে বেরোতে পারলে কাশ্মীরের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা দ্রুত পূর্ণ হবে। আমরা উত্তর পূর্বাঞ্চলে করে দেখিয়েছি, এখন এই অঞ্চলেও শান্তি এবং সমৃদ্ধির নতুন যুগ শুরু হচ্ছে।

নক্সাল/মাওবাদী সমস্যা নিয়ে আপনার কী অভিমত? স্রেফ আইন-শৃঙ্খলা নাকি আইন-শৃঙ্খলা এবং বিকাশ?

একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে নক্সালপন্থা দারিদ্রের কারণে জন্ম নিয়েছে। বাস্তবে, এই আদর্শের ধ্বজাধারীরা অত্যন্ত উচ্চবর্গীয়, বড় গাড়িতে ঘোরেন, পিএইচডি ডিগ্রি আছে, বড় ইউনিভার্সিটিতে পড়ান। নক্সালপন্থা বলুন বা চরম বামপন্থা, দুটোই উন্নয়নকে ধ্বংস করে, কারণ উন্নয়ন তাদের আদর্শের পথে বড় বাধা।

আমরা দুভাবে নক্সালদের আক্রমণ করেছি। একদিকে, হিংসার প্রতি আমাদের বিন্দুমাত্র সহনশীলতা নেই। ১২০টি জেলার মধ্যে ৪০টির বেশি আপাতত চরম বামপন্থা মুক্ত। আমাদের প্রথম তিন বছর, মানে ২০১৪-১৭’র মধ্যেই আন্দাজ ৩,৪০০ মাওবাদী আত্মসমর্পণ করে, যা কিনা রেকর্ড সংখ্যা। অন্যদিকে আমরা নক্সাল-পীড়িত এলাকায় সম্পদ বরাদ্দ করছি। এটা আমাদের মিশন। হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা, হাজার হাজার মোবাইল টাওয়ার, আধুনিক হাসপাতাল এবং স্কুল, আইটিআই, দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ব্যাঙ্কের শাখা, পোস্ট অফিস বরাদ্দ করা হয়েছে এইসব এলাকায়।

সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে নয়া দিল্লি বিমানবন্দরে নরেন্দ্র মোদী।

পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কি শেষ তলানিতে এসে ঠেকছে? নওয়াজ শরিফ ২০১৪-য় আপনার শপথগ্রহণে এসেছিলেন। আপনিও উড়ে গিয়েছিলেন শরিফের পারিবারিক বিবাহ অনুষ্ঠানে। সেখান থেকে পুলওয়ামা… বালাকোট… এগোনোর রাস্তা কোথায়?

এগোনোর রাস্তা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পদক্ষেপের উপর নির্ভর করছে।

ভারত-চিন সম্পর্কে আসি। ডোকলাম থেকে মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি হিসেবে ঘোষণা… দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আপনার অবদান?

আজহারের ‘নিষিদ্ধকরণ’-এর বিষয়টি শুধু চিন-কেন্দ্রিক বিষয় হিসাবে দেখা ঠিক নয়, এটা বিশ্বের সার্বিক ঐকমত্যের ফলে ঘটেছে। বিশ্বের যে দেশগুলি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে উদ্বিগ্ন, চিন তাদের অন্যতম। ভারত-চিন সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধার। এই শতককে যখন সারা দুনিয়া ‘এশিয়ার শতক’ বলে অভিহিত করছে, সেটা ভারত এবং চিনের উত্থানের কথা মাথায় রেখেই করছে, এই দুই দেশের শক্তির কথা মাথায় রেখেই করছে। সুতরাং আমরা দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছি অগ্রগতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে। কিছু বিষয়ে মতভেদ যদি থেকেও থাকে, অনেক বিষয়ে যে আমরা সহমতও, সেটা দুই দেশই বোঝে।

একটা বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক লেখালেখি করেছেন। যাঁদের মতে, ১৯৮৯-এ বার্লিন ওয়ালের পতনের পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটা উদারীকরণের পরিবেশ এসেছিল, যেটা বদলে যায় ২০০৮-এ বিশ্বে অর্থনৈতিক সংকটের সময়, বিশ্বায়নের উল্টো পথে হাঁটা শুরু হয়। এবং সেই পথ ধরেই উত্থান হয় নরেন্দ্র মোদী, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, রেসেপ এর্ডোগান-এর মতো শক্তিশালী নেতাদের। যাঁদের নাম করলাম, সবাইকেই চেনেন আপনি। এই প্রবণতা নিয়ে আপনার ভাবনা?

আমার ব্যাপারটা আলাদা। আমি এই পদে আসার আগে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা আমার কাজে লেগেছে। দ্বিতীয়ত, আমি গুজরাটের লোক। গুজরাটিরা চিরকালই বিশ্বায়নে বিশ্বাসী। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে বিভিন্ন কারণে আমাকে বিশ্বের ৪৫ টি দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। একটা ঘটনার কথা বলি। ডেল্টা এয়ারওয়েজ-এর একটা ৫০০ ডলারের টিকিট থাকত, যেটা প্লেনে চড়ার দিন থেকে আপনি ৩০ দিন ব্যবহার করতে পারবেন। সেই টিকিট আমি যেভাবে ব্যবহার করেছি, অন্য কেউ করেছে কিনা সন্দেহ।

এমনভাবে ট্র্যাভেল প্ল্যান করতাম, যাতে রাতে প্লেনে উঠে ছয় ঘন্টা ঘুমিয়ে নিতে পারি। হোটেলের খরচটা বেঁচে যেত এতে। সকালে এয়ারপোর্টেই স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিতাম। আমার একটা ‘কলিং কার্ড’ ছিল, যেটা থেকে ফোন করে দিতাম তাঁদের, যাঁদের আমাকে নিতে আসার কথা। এইভাবেই আমি আমেরিকার ২৩ টা প্রদেশে ঘুরেছি। এটাই আমার জীবন। আর এটা বলছি এই কারণে, আমাদের দেশে বিদেশনীতি সবসময়ই একটা ‘অ্যাকাডেমিক’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্ধারিত হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রীরাও সেই পথেই চালিত হয়েছেন। আমি এই মনোভঙ্গির শরিক নই, আমার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।

আমার অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কিন্তু মানুষের সঙ্গে যোগ আছে। দেশই আমার অগ্রাধিকার এবং সেটাই আমার কাছে দেশপ্রেম। আমার নিজস্ব ভঙ্গিতেই আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করি এবং এই সম্পর্কটা একে অন্যকে বুঝতে সাহায্য করে। বন্ধুত্বের সম্পর্কের প্রতিফলন সংশ্লিষ্ট দেশের বিদেশ নীতিতেও পড়ে। ওঁদের মনে থাকে, মোদী লোকটা কেমন এবং সে কী বলেছিল।

জি-২০-র শীর্ষবৈঠকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল যেটা আপনারা খেয়াল করেন নি। বিশ্বের নজর কেড়েছিল দুটো আলাদা জরুরি বৈঠক। একটায় ছিল ‘ JAI’ (জাপান, আমেরিকা, ভারত), অন্যটায় RIC (রাশিয়া, ভারত, চিন)। দুটোতেই ভারত ছিল। এখানেই ভারতের গুরুত্ব। বিশ্বের দরবারে ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব এবং সার্বিক গুরুত্ব নিয়ে আমরা কখনও মাথাই ঘামাই নি। আমি চেষ্টা করেছি ভারতীয় দূতাবাসগুলির প্রভাবের ব্যাপ্তি বাড়াতে। প্রতিটি প্রবাসী ভারতীয়ের বাড়িই এখন ‘রাষ্ট্রদূতের’ বাড়ি।

Get all the Latest Bengali News and Election 2020 News in Bengali at Indian Express Bangla. You can also catch all the latest General Election 2019 Schedule by following us on Twitter and Facebook

Web Title:

Pm narendra modi interview to indian express lok sabha election 2019

The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com.
Advertisement

ট্রেন্ডিং
করোনা আপডেট
X