‘প্রিয় সৌমিত্রদা আর নেই’, কান্নাধরা গলায় স্মৃতি রোমন্থন অপর্ণা-শর্মিলা ও সাবিত্রীর

'সৌমিত্র ছিলেন জীবন শিল্পী', বললেন নাট্যব্যাক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। শোকজ্ঞাপন অন্যান্য তারকাদেরও।

By: Updated: November 15, 2020, 02:47:38 PM

শেষ হল ৪১ দিনের লড়াই। হাসপাতালের বেডে টানা এতদিন ধরে প্রকৃত যোদ্ধার মতো লড়ে যাচ্ছিলেন খিদ্দা। তবে অনুরাগীদের এত প্রার্থনা, চিকিৎসকদের হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও আর ফিরে এলেন না ফেলুদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee)। বাঙালি হারালো তাঁর ‘আইকনিক হিরো’কে। ফিল্মি কেরিয়ারে মোট ৩০০টিরও বেশি ছবি করেছেন তিনি। আর বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির প্রতি তাঁর যে অবদান, তা বোধহয় এই সুবিশাল কর্মজগৎ থেকে আলাদা করে ৩-৪টি ছবির নামোল্লেখ করে বলা অসম্ভবপর। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না বিনোদন জগৎ। তাঁর সহ অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে গোটা অনুরাগীকূল, প্রত্যেকেই শোকে মূহ্যমান। কেউ প্রিয় অভিনেতাকে একটিবার শেষ দেখার জন্য ভীড় জমিয়েছেন বেলভিউ হাসপাতালের বাইরে, আবার শর্মিলা ঠাকুর, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেনের মতো অভিনেত্রীরা ফোন ধরে কান্নাজড়ানো গলায় ভাগ করে নিলেন তাঁদের স্মৃতি।

কিংবদন্তী প্রয়াণের সাথেই শেষ হয়ে গেল ‘ফেলুদা’র প্রথম অধ্যায়। সিনেমা, নাটক, থিয়েটার, আবৃত্তি সবক্ষেত্রে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলেন। ফোন ধরে কথা বলতে পারলেন না শর্মিলা ঠাকুর (Sharmila Tagore)। গলা বুজে আসছিল অভিনেত্রীর। “দুঃখের দিন কাছের মানুষকে হারালাম। ভেবেছিলাম লড়াইটা জিতে যাবেন। গৌতমের (ঘোষ) ‘আবার অরণ্য’-এর সব স্মৃতি ভীড় করে আসছে”, বলেই পরে কথা বলছি বলে ফোন রেখে দিলেন।

অপর্ণা সেন (Aparna Sen) বললেন, “আমি অভিভাবককে হারালাম। ওঁর মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। ১৪ বছর বয়সে ওঁর সঙ্গে আলাপ। মুখে দাদা ডাকলেও ওর প্রতি বিশাল একটা শ্রদ্ধা সবসময়েই ছিল। পরের দিকে সবসময়ে ঠাট্টা করে বলতেন, তুমি ডিরেক্টর হয়ে মুশকিল হল। আমাদের জুটিটা ভেঙে গেল। আমার ছবিতে নেওয়ার কথা বলেও হাসিঠাট্টা হত। মনে হল মাথার উপর থেকে ছাতা সরে গেল।”

ফোনে কথা বলতে গিয়ে গলা বুজে আসছিল প্রবীণ অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়েরও (Shabitri Chatterjee) । বললেন, “যাঁর সঙ্গে এতদিন কাজ করেছি, পারিবারিক বন্ধু ছিল, তাঁর মৃত্যুতে আমি কিছু বলতে পারছি না। উনি আমাদের বিরাট ক্ষতি করে গেলেন। উত্তমকুমার চলে যাওয়ার পর উনিই পূরণ করেছিলেন সেই ক্ষতি। আর আবার একটা শূন্যস্থান হয়ে গেল।”

সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই বাঙালি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে চিনেছে ফেলুদা হিসেবে। সত্যজিৎ-পরিচালিত ১৭-১৮টি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। বাঙালি সিনেদর্শকদের সম্ভবত মাণিক-সৌমিত্র জুটি সম্পর্কে আর আলাদা করে বলারহ প্রয়োজন পড়ে না। আজ তাঁর প্রয়াণের পর সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায় বললেন, “পরিবারের একজনকে হারালাম।”

সৃজিত বললেন, “ওঁকে নিয়ে আলাদা করে বলার মতো যোগ্যতা আমার নেই! উনি একজন ইনস্টিটিউশন। বিশাল একটা বটবৃক্ষের মতো। যাঁর প্রত্যেক শাখা থেকে ঝরে পরছে শিক্ষা, মেধা এবং অকল্পনীয় ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের হাত ধরে আমাদের শিক্ষা নেওয়া। ওঁর সঙ্গে আমি একটাই ছবি করেছি ‘হেমলক সোসাইটি’। ওইটুকু সময়ের মধ্যেই অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করেছি ওঁর কাছ থেকে।”

কান্না জড়ানো গলায় বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় বললেন, “আমার দাদা চলে গেল।” রঞ্জিত মল্লিক বললেন, “ওঁর সঙ্গে অনেকগুলো সিনেমা করেছিলাম। আশা করেছিলাম উনি ফিরে আসবেন। কিন্তু ফিরে এলেন না। আত্মার শান্তি কামনা করি।”

“যখন খুব কাছের মানুষ চলে যায়, মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়, ঠিক কী করবে, বলবে বুঝতে পারে না। আমারও ঠিক তেমনই অবস্থা। মনটা অনেকদিন ধরেই খারাপ ছিল। উনি অনেকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। যখনই উনি অসুস্থ হয়েছেন আমি প্রার্থনা করেছি, যাতে উনি দ্রুত সুস্থ হয়ে যান। এই লম্বা জীবনের পরিসরে উনি অনেকবারই অসুস্থ হয়েছেন, তবে আমাদের সকলকে হাসিয়ে ফিরে এসেছেন। আমাদের নিরাশ করেননি। তবে আজকে নিরাশ হলাম। ২৫-২৬ বছর আগে যখন অভিনয় করতে এসেছিলাম, তখন থেকেই সৌমিত্রকাকুর ভালোবাসা পেয়েছি। এত ভালোবাসা, আবেগ, শিক্ষা আর কারোর কাছে পেয়েছি কিনা জানি না। আমি ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত দেখেছি ওনাকে। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতেন, তখন ওনার আন্তরিক আশীর্বাদ অনুভব করতে পারতাম। যেখানে থেকো ভালো থেকো, এটাই বলব”, বললেন শোকাহত ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

গৌতম ঘোষ বললেন, “এতদিনের উৎকণ্ঠা কাটিয়ে চলে গেলেন। একেবারে রাজার মতো কাজ করছিলেন। কবিতা, নাটকে সবসময়েই তাঁর মস্তিষ্ক সক্রিয়। অথচ এত ডাউন টু আর্থ, গম্ভীর মানুষ দেখিনি। একজন অসাধারণ মানুষকে আমরা হারালাম। উনি এলেই মনে হতে আনন্দ নিয়ে এলেন। একগাল হেসে বলতেন, ‘বলো বাবু।’ কোনওদিন ভুল হত না সেটে। ওঁর সঙ্গে অনেকদিন কাটিয়ে বুঝেছি, এই মানুষটা হচ্ছে সহজ-সরল শিশুর মতো। ওঁর দর্শক শেষদিন অবধি ছিল।”

থিয়েটার-নাটকের মঞ্চেও যে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল, সেকথা উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জানালেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। বললেন, “শুধু সিনেমা নয়, নাটকের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যপ্তি ছিল বিশাল। সৌমিত্র ভাল করে জীবন উপভোগ করতে জানতেন। সিনেমা, কবিতা লেখা, খেলাধুলা, আড্ডা সবকিছুর খবর রাখতেন তিনি। সৌমিত্র ছিলেন জীবন শিল্পী।”

“পেশাদার অভিনেতা হব, এই ভাবনাটাই আসত না, যদি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ না হত। বাবাকে চিঠি লিখে উনিই প্রথম জানিয়েছিলেন। স্টার থিয়েটারে ওঁর হাত ধরেই ‘ঘটক বিদায়’ নাটক দিয়ে অভিনয় জীবনের শুরু করেছি”, বললেন হাসপাতালে উপস্থিত থাকা কৌশিক সেন।

Get all the Latest Bengali News and West Bengal News at Indian Express Bangla. You can also catch all the Entertainment News in Bangla by following us on Twitter and Facebook

Web Title:

Aparna sen sabitri chatterjee sharmila tagore opens up on soumitra chatterjees demise

The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com.
Advertisement

ট্রেন্ডিং
BIG NEWS
X