বড় খবর

এনপিআর ও এনআরসি আলাদা বটে, তবে…

মোট আটটি নতুন ধরনের তথ্য এবারের এনপিআরে সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ও উল্লেখযোগ্য হল বাবা মায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান।

NPR, NRC
প্রতীকী ছবি
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনপিআর)-এর জন্য ৩,৯০০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং প্রস্তাবিত এনআরসি নিয়ে দেশ জুড়ে প্রতিবাদের মধ্যে, এনপিআর বিষয়টিকে এনআরসি-র দিকে এক ধাপ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও কেন্দ্র এ দুটিকে এক সূত্রে বাঁধা বলে মানতে চায়নি। কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা এনপিআর লাগু করবে না।

এনপিআর কী?

এন পি আর দেশের বাসিন্দাদের সাধারণ তালিকা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বক্তব্য অনুসারে, দেশের সাধারণ নাগরিক হলেন তিনি, যিনি একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ৬ মাস ধরে রয়েছেন বা আগামী ৬ মাস ধরে থাকার পরিকল্পনা রয়েছেন। এনপিআর নাগরিকত্বের গণনা নয়, কারণ এখানে ৬ মাস ধরে কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় যিনি থাকছেন, তাঁকেও নথিভুক্ত করা হয়। সে কারণেই এনপিআর আর এনআরসি এক নয়। এনআরসি-তে কেবলমাত্র ভারতীয় নাগরিকদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং অনাগরিকদের বাদ দেওয়া হয়।

এনআরসি + সিএএ = নাগরিকত্ব হলে আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে?

কারও নাম এনপিআরভুক্ত হবে কী ভাবে?

এনপিআর তৈরি হচ্ছে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন ও ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব (নাগরিক পঞ্জিকরণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র বিষয়ক) আইনের আওতায়। প্রত্যেক সাধারণ নাগরিকের এনপিআর অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক। আসামে যেহেতু সদ্য এনআরসি প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, সে কারণে অগাস্ট মাসে ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দেওয়া নোটিফিকেশন অনুসারে আসামে এনপিআর হবে না।

২০২১ সালের জনগণনার জন্য ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দফতর থেকে যে জনগণনা চলছে তার প্রথম পর্যায়ে এনপিআর বাড়ির তালিকাভুক্তির সঙ্গেই প্রযুক্ত হবে। স্থানীয়, মহকুমা, জেলা, রাজ্য ও জাতীয় স্তরে এ কাজ চলবে। ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল দফতর ইতিমধ্যেই ১২২ গ্রাম ও ৪০টি ছোট বড় শহরে পাইলট প্রকল্প চালু করেছেন যার মাধ্যমে ৫২১৮টি ব্লকে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। ২০২০ সালের এপ্রিলের শুরুতে চূড়ান্ত গণনাকাজ শুরু হবে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ অবধি তা চলবে।

এনপিআর কি এনআরসি-র সঙ্গে যুক্ত?

নাগরিকত্ব আইন অনুসারে সরকার ভারতীয় নাগরিকদের জাতীয় পঞ্জী রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রত্যেক নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে পঞ্জীকরণ করানোর অধিকারী। জাতীয় স্তরে যদি এনআরসি হয়, তাহলে তা এনপিআর থেকেই বেরিয়ে আসবে। তার মানে এই নয় যে এনআরসি করার জন্য এনপিআরকেই মানা হবে। ২০১০ সালের আগের এনপিআরের পর এরকম কোনও রেজিস্টার তৈরি হয়নি। একবার বাসিন্দাদের তালিকা তৈরি হয়ে গেলে, জাতীয়স্তরের নাগরিকপঞ্জী তৈরির সময়ে ওই তালিকা থেকে নাগরিকদের চিহ্নিত করতে পারা যাবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এক বিবৃতিতে বলেছে, এনপিআর তথ্যের উপর নির্ভর করে সারা দেশে এনআরসি তৈরির কোনও প্রস্তাব নেই। সংবাদসংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন এ দুটি সংযুক্ত নয় এবং এনপিআর তথ্য এনআরসি-র জন্য কাজে লাগানো হবে না।

নয়া নাগরিকত্ব আইন কী?

এর আগে অমিত শাহ একাধিকবার বলেছিলেন সারা দেশে এনআরসি লাগু হবে এবং আসামে ফের এনআরসি হবে। এনপিআর ও এনআরসি-র সংযোগের কথা সরকার সংসদে বলেছে, এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের চূড়ান্ত রিপোর্টেও বলা হয়েছে। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী কিরেন রিজিজু রাজ্যসভায় সিপিআই সাংসদ টি এন সীমার এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে বলেন, সমস্ত বাসিন্দার নাগরিকত্বের মর্যাদা খতিয়ে দেখার জন্য এনআরআইসি তৈরির প্রথম ধাপ হল এনপিআর।

২০১৮-১৯ সালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বার্ষিক রিপোর্টেও বলা হয়েছে এনপিআর এনআরসির প্রথম ধাপ। পূর্বোল্লেখিত নাগরিকত্ব আইনের বিধি অনুসারে জাতীয় জনসংখ্যাপঞ্জি (এনপিআর) হল ভারতীয় নাগরিকদের জাতীয় পঞ্জি (এনআরআইসি) তৈরির প্রথম পর্যায়।

আর কী কারণে এনপিআর নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে?

একটা বিতর্ক গোপনীয়তা নিয়ে। এনপিআরে বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

এনপিআরে পরিচয়ের যে ডেটাবেস তৈরি হবে তাতে আধার, ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট এবং আরও বিভিন্ন পরিচয়পত্র রাখা হবে। অমিত শাহ বলেছেন এ সব তথ্য একসঙ্গে রাখা হবে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনারের দফতরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে গিয়ে অমিত শাহ বলেন, আমাদের এই সব কিছু আলাদা আলাদা বিষয়টা এবার শেষ করতে হবে।

আগের এনপিআর বিষয়ক ধারণা কোথা থেকে এসেছিল?

এ প্রকল্প নেওয়া হয় ইউপিএ আমলে। ২০০৯ সালে চিদাম্বরম যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন এ প্রস্তাব আসে। সে সময়ে আধার প্রকল্পের সঙ্গে এ প্রকল্পের সংঘাত বাধে। তখন মনে করা হয়েছিল সরকারি সুবিধা নাগরিকদের কাছে পৌঁছনর জন্য আধারই সেরা প্রকল্প। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তখন বলে এনপিআর বেশি জরুরি কারণ জনগণনার সময়ে বাড়ির প্রত্যেক বাসিন্দাদের তথ্য এনপিআরে নথিভুক্ত করা হয়। মন্ত্রক তখন আধার প্রকল্পও পিছনে সরিয়ে দেয়।

এনপিআর তথ্য প্রথম সংগৃহীত হয় ২০১০ সালে, ২০১১ সালের জনগণনায় বাড়ির তালিকা নথিভুক্তির সময়ে। ২০১৫ সালে বাড়ি বাড়ি সার্ভের মাধ্যমে সে তথ্য আপডেট করা হয়।

এনডিএ সরকার ২০১৬ সালে সরকারি সাহায্যদানের মূল উপায় হিসেবে বেছে নেয় এবং এনপিআর চলে যায় পিছনের সারিতে। গত ৩ অগাস্ট এক নোটিফিকেশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার জেনারেলের দফতর এনপিআর বিষয়টিকে ফের সামনে নিয়ে আসে। ২০১৫ সালের এনপিআপ আপডেট করার সময়ে অতিরিক্ত তথ্যগ্রহণ শুরু হয়। নতুন তথ্যের আপডেট করার কাজও সম্পূর্ণ।

কোন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়?

এনপিআর জনবিন্যাস ও বায়োমেট্রিক দু ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে, এবং বায়োমেট্রিক তথ্য আধারনির্ভর। ২০১০ সালের শেষ এনপিআরে ১৫ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, ২০২০ সালে সংগ্রহ করা হবে ২১টি তথ্য। আবার, ২০১০ সালের তিন ধরনের তথ্য (বাবার নাম, মায়ের নাম, স্বামী বা স্ত্রীর নাম) ২০২০ সালের এনপিআরে যুক্ত করা হবে। অর্থাৎ মোট আটটি নতুন ধরনের তথ্য এবারের এনপিআরে সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ও উল্লেখযোগ্য হল বাবা মায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান।

* আধার নম্বর (ঐচ্ছিক)

* মোবাইল নম্বর

* বাবা মায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান

* শেষ নিবাসস্থান

* পাসপোর্ট নম্বর (যদি ভারতীয় পাসপোর্ট থাকে)

* ভোটার আইডি কার্ড নম্বর

* প্যান

* ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র নথিভুক্তি আপডেট করানোর কাজ চলবে।

এরকম বিস্তারিত তথ্য যদি কারও কাছে না থাকে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সূত্র বলছে, এনপিআর নথিভুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক হলেও, প্যান, আধার, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ভোটার কার্ড নম্বর দেওয়া ঐচ্ছিক। মঙ্গলবার ক্যাবিনেট বৈঠকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভাড়েকর ঘোষণা করেছেন আমরা নাগরিকদের উপর আস্থা রাখছি। এমনকী অনলাইনে এনপিআর নথি আপডেট করার বন্দোবস্তও থাকছে।

এত তথ্য দিয়ে সরকার করবেটা কী?

গোপনীয়তা বিষয়ে উদ্বেগের দিক যেমন রয়েছে, অন্যদিকে সরকার দুটি বিষয়ে নজর দিয়ে এই অবস্থান নিয়েছে। একটা হল প্রতিটি দেশের একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ডেটাবেস থাকা উচিত যাতে সমস্ত নাগরিকদের জনবিন্যাসের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এনপিআরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, ভারতে বসবাসকারী প্রতিটি পরিবার ও ব্যক্তির একটি বিশ্বাসযোগ্য নথি প্রস্তুত করা। এ ছাড়া আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্নপ্রকল্পের সুবিধাভোগীদের উন্নত পরিষেবার লক্ষ্যে এই প্রকল্প বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভোটার আইডি ও প্যানের তথ্য সংগ্রহের কারণ হিসেবে লাল ফিতের ফাঁস সহজ করার লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে।

তবে আধিকারিকদের দাবি, এনপিআরের তথ্য গোপন রাখা হবে, কোনও তৃতীয় পক্ষকে এই তথ্য দেওয়া হবে না। তবে এত তথ্য সুরক্ষার জন্য কী ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।

পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা এ ব্যাপারে বেঁকে বসেছে কেন?

বিরোধী শাসিত এই রাজ্যগুলি রাজনৈতিক কারণে এর বিরোধিতায় নেমেছে। আইনি দিক থেকে দেখলে এনপিআর লাগু করার ব্যাপারে রাজ্যের না বলার অধিকার নেই। তবে রাজ্য থেকেই যেহেতু তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, এই বিরোধিতার ফলে সংঘর্ষ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

Get the latest Bengali news and Explained news here. You can also read all the Explained news by following us on Twitter, Facebook and Telegram.

Web Title: Citizenship amendment act national population register national register of citizens debate

The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com