scorecardresearch

বড় খবর

দশ গুণ বাড়ল ট্রাফিক জরিমানা, কেন ফাইন বাড়ানোর পথে হাঁটল রাজ্য?

কেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাফিক জরিমানা বাড়াল?

Kolkata Traffic
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাফিক জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেছে।

সুইটি কুমারি: সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাফিক জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেছে। মোটর ভেহিকলস আইনের সংশোধন করে সেই জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ দশ গুণ বেড়েছে। ২৪ জানুয়ারির নির্দেশিকা অনুযায়ী, গত বুধবার থেকেই রাজ্যজুড়ে এই নয়া ট্রাফিক বিধি কার্যকর হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে ধরপাকড়। শহর কলকাতার পাশাপাশি জেলাগুলিতেও ট্রাফিক বিধি ভঙ্গকারীদের মোটা টাকা জরিমানা করছে পুলিশ।

নতুন নির্দেশিকায়, জেব্রা ক্রসিং পার করলে, ট্রাফিক বিধির বিরুদ্ধে গাড়ি চালালে, বেপরোয়া গতি এবং নেশা করে গাড়ি চালালে, দূষণ নিয়ন্ত্রণের সার্টিফিকেট না থাকলে, আপৎকালীন পরিষেবার গাড়িকে যেতে বাধা দিলেও এখন থেকে জরিমানা করা হবে। আসুন জেনে নেওয়া যাক নয়া ট্রাফিক জরিমানা সম্পর্কে।

নয়া নির্দেশিকায় ট্রাফিক জরিমানা কী বলা হয়েছে

আগে যা নিয়ম ছিল তার চেয়ে বর্তমানে ধার্য জরিমানার অঙ্কে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। নয়া নিয়ম অনুযায়ী, হেলমেট ছাড়া রাস্তায় এবার বাইক নিয়ে বেরোলেই ১০০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। আগে হেলমেট ছাড়া বেরোলে ১০০ টাকা জরিমানা দিতে হতো। শুধু বাইকচালকই নন। আগে বিনা হেলমেটে বাইকচালকের পিছনে থাকা আরোহীকেও ১০০ টাকা জরিমানা দিতে হতো। এখন সেই জরিমানার অঙ্কও বেড়ে হয়েছে ১ হাজার টাকা।

বাইকের পাশাপাশি চার চাকার গাড়ির ক্ষেত্রেও এবার নয়া এই নিয়মে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। আগে গাড়িতে সিট বেল্ট না পরলে ১০০ টাকা জরিমানা করা হতো। তবে এবার থেকে সিট বেল্ট ছাড়া গাড়িতে বসলেই জরিমানা বাবদ দিতে হবে ৫০০ টাকা।

একইসঙ্গে বেপরোয়া গাড়িচালকদের ‘শায়েস্তা’ করতেও নয়া নিয়মে বড়সড় পদক্ষেপ করা হয়েছে। আগে বেপরোয়া গতির গাড়িগুলিকে পুলিশ ধরলেই ১০০ টাকা জরিমানা করতো। এবার থেকে সেই জরিমানার অঙ্ক বেড়ে হয়েছে ৫০০০ টাকা। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি বের করলেও এখন থেকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার জন্য তৈরি থাকুন। আগে এই জরিমানার অঙ্ক ছিল ১ হাজার টাকা।

যদি কেউ বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য তিন বছরের মধ্যে ফের নিয়ন লঙ্ঘন করেন তাহলে সেক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। পথ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি ভঙ্গ করলে, শব্দ বা বায়ুদূষণের নিয়ম ভাঙলেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। সেইসঙ্গে তিন মাসের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

আরও পড়ুন বিদেশি অর্থে বড় বাধা, এনজিও-রা অথৈ সাগরে, কী ভাবে?

রাজ্যজুড়ে সাইলেন্স জোনে কড়া হবে ট্রাফিক পুলিশ। হাসপাতাল, স্কুল বা শান্ত এলাকায় হর্ন বাজালেই হাজার টাকা জরিমানা হবে প্রথমবার। দ্বিতীয়বার একই ভুল করলে দুহাজার টাকা হবে সেই জরিমানার অঙ্ক। আপৎকালীন পরিষেবার গাড়িকে যেতে বাধা দিলে ট্রাফিক পুলিশ গাড়ির চালককে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মোটর ভেহিকলস ইনস্পেক্টর এবং পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর-সার্জেন্ট সমকক্ষ অফিসার জরিমানা করতে পারবেন।

কেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাফিক জরিমানা বাড়াল?

রাজ্য সরকারের বক্তব্য়, পথ দুর্ঘটনা কমাতেই এই সিদ্ধান্ত। পুলিশ চাইছে, চালক আরও সচেতন হোক। অন্তত এবার জরিমানা বাড়ার পর থেকে। যদিও গত কয়েক বছরে কলকাতা-সহ শহরতলিতে দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫৪৫ ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গের কেস নথিভুক্ত হয়েছে গত বছর। যেখানে ২০১৯ সালে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ ছিল। ৫০ লক্ষ ১৩ হাজার ৩৮৬ এবং ২০১৮ সালে এটা ছিল ৫৫ লক্ষ ৬৭ হাজার ২০০।

গত নভেম্বরে একটি প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন চিংড়িহাটা ক্রসিংয়ে পথ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। তিনি চিংড়িহাটার দুর্ঘটনা নিয়েই বলেছিলেন। কিন্তু পুলিশের কাছে স্পষ্ট বার্তা ছিল যে গোটা শহরেই দুর্ঘটনার প্রকোপ কমাতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেন, “মানুষের জীবন খুব দামি। আমি দেখেছি, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। যেটা হওয়ার নয়। আমরা একসঙ্গে বসে এর জন্য কিছু একটা করা দরকার।” তখন বিধাননগর এবং কলকাতা পুলিশকে নির্দেশ দেন তিনি।

কী ভাবে ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গকারীদের শাস্তি দেওয়া হবে?

ডিজিটাল প্রমাণ যেমন সিসিটিভি ফুটেজ, স্পিড ক্যামেরা, রেড লাইট ভায়োলেশন ডিটেক্টটর দিয়ে চিহ্নিত করা হবে অভিযুক্তদের। ট্রাফিক পুলিশ অভিযুক্তের গাড়ি এবং কাগজপত্র বাজেয়াপ্ত করবেন। নো পার্কিং জোনে গাড়ি রাখা দেখলে তাতে স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হবে। এসএমএস-এর মাধ্যমে নিয়ম ভঙ্গকারীদের সূচনা দেওয়া হবে। গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে। এছাড়াও কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের ওয়েবসাইটে নিয়ম ভঙ্গের যাবতীয় তথ্য মিলবে।

কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ট্রাফিক জরিমানা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ছিলেন?

গত ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় মোটর ভেহিকলস সংশোধনী আইন ২০টি রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী সমর্থন করলেও মুখ্যমন্ত্রী তখন সাফ জানিয়ে দেন, বাংলায় এই আইন বলবৎ হবে না। কারণ অতিরিক্ত জরিমানা পথচারীদের সমস্যায় ফেলবে। তৎকালীন সড়ক-পরিবহণ মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি সেই ঊর্ধ্বতর জরিমানা সমর্থন করে বলেন, “এটা কোনও রেভেনিউ স্কিম নয়। কিন্তু দুর্ঘটনায় যে দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে তা নিয়ে কি আপনি চিন্তিত নন?”

যদিও মমতা তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, আমি মোটর ভেহিকলস আইন এখনই বলবৎ করব না। কারণ আমার সরকারের আধিকারিকদের মতামত, এই আইনে মানুষ সমস্যায় পড়বেন।

তাহলে কি এই জরিমানা বৃদ্ধি বাংলাকে সাহায্য করবে?

বিশেষজ্ঞদের মত, এই বিরাট জরিমানা থেকে রাজ্যের ভালই আয় হবে। সেই টাকা বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে ব্যয় করতে পারবে সরকার। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্য সরকার প্রতি বছর ১২ হাজার কোটির বেশি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প যেমন কন্যাশ্রী, খাদ্যশ্রী, সবুজসাথী, স্বাস্থ্যসাথী-তে খরচ করে। গত বছর সরকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালু করেছে। তাতে প্রত্যেক পরিবারের মহিলাদের টাকা দেওয়া হবে মাসিক। ১.৬ কোটি মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা দিতে সরকারের বার্ষিক ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। তাও মমতাই বলছেন, সরকারের ঘরে টাকা নেই। কোভিড অতিমারিতে রাজ্যের ভাঁড়ার শূন্য। তাঁর কথায়, ‘নো আর্নিং, ওনলি বার্নিং!’

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Explained news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Explained why bengal has hiked traffic fines 10 fold and the new penalties