scorecardresearch

বড় খবর

Explained:কার্জন গেটে ‘রাজা-রানি’ কেন, উঠেছে প্রশ্ন, লর্ড কার্জন-কথা জানেন কি?

এই গেটটি তৈরি করেছিলেন মহারাজা বিজয় চাঁদই, ১৯০৩ সালে, বড়লাট কার্জনের বর্ধমান সফর উপলক্ষে।

Explained:কার্জন গেটে ‘রাজা-রানি’ কেন, উঠেছে প্রশ্ন, লর্ড কার্জন-কথা জানেন কি?
কার্জন গেটে ‘রাজা-রানি’ কেন, উঠেছে প্রশ্ন, লর্ড কার্জন-কথা জানেন কি

এ রাজ্যে লর্ড কার্জন গেটে বিতর্কের ঘনঘটা প্রবেশ করেছে। বর্ধমানের ১১৯ বছরের পুরনো কার্জন গেটের কথা বলছি। এই গেটের সামনেই বর্ধমানের মহারাজা বিজয় চাঁদ মহতাব এবং তাঁর স্ত্রী রাধারানির মূর্তি বসিয়েছে তৃণমূল পরিচালিত বর্ধমান পুরসভা, তা নিয়েই বিসংবাদ। রাজনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ থেকে হেরিটেজ-বেত্তারা প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ, এই স্ট্যাচু-দ্বয়ের ফলে কার্জন গেটের নীচের অংশ অল্প হলেও ঢাকা পড়ছে। এই গেটটি তৈরি করেছিলেন মহারাজা বিজয় চাঁদই, ১৯০৩ সালে, বড়লাট কার্জনের বর্ধমান সফর উপলক্ষে।
ভারতের ভাইসরয়দের মধ্যে সম্ভবত কার্জনই সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্র। কার্জন সে-ই চরিত্র, যিনি ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারিগর। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এই বঙ্গভঙ্গের অপরিসীম গুরুত্বও রয়েছে। এবং বড়লাটদের মধ্যে কার্জনই বোধ হয় সর্বোত্তম সাম্রাজ্যবাদী। মনে করতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতে শাসন ধরে রাখাটা সবচেয়ে জরুরি। একবার বলেওছিলেন, ‘অন্য সব অঞ্চল যদি হারিয়ে ফেলি আমরা, তা হলেও পরাস্ত হব না। কিন্তু যদি হাত থেকে ভারত চলে যায়, আমাদের সূর্য তবে অস্তে যাবে।’

লর্ড কার্জন কে?

জন্ম ১৮৫৯ সালে। জর্জ নাথানিয়েল কার্জন। ব্রিটিশ কনজারভেটিভ রাজনীতিক। ইটন এবং অক্সফোর্ডে পড়াশুনো করেছেন। আন্ডার সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া এই পদে ছিলেন ১৮৯১ থেকে ১৮৯২, ফরেন অ্যাফেয়ার্সের দায়িত্বে ছিলেন ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৮। তার পর ১৮৯৯ সালে তিনি ভারতের ভাইসরয় হন। প্রশাসনের কার্যক্ষমতাকে উঁচু লয়ে বাঁধতে কার্জন কোমর বাঁধেন। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিক সুমিত সরকার তাঁর মডার্ন ইন্ডিয়া (১৮৮৫-১৮৪৭)-এ লিখেছেন বিস্তারে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কার্জন উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স তৈরি করেন। তিব্বতে ব্রিটিশ অভিযান চালান। একটি পৃথক পুলিশ সার্ভিসের জন্ম দেন। স্মৃতি সৌধগুলি নিয়ে গবেষণায় ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র গঠন করেন। সুমিত সরকার লিখেছেন, কার্জন তাঁর কেরিয়ারের শুরুতে উপনিবেশিক শাসনের ক্ষেত্রে কিছু পিঠচাপড়ানি পেয়েছিলেন। ভারতীয়দের উপর ফ্যাসিস্ট হামলায় জড়িত ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। ১৮৯৯ সালে রেঙ্গুনে এক মহিলাকে ধর্ষণে গোরা সৈন্যদের দণ্ড দিয়েছিলেন। এমন আরও কিছু ঘটনা রয়েছে, যা কার্জনের ভারতীয়দের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করছে।

কিন্তু কেন তাঁকে কাঠগড়ায় তোলা হয়?
কার্জনকে কাঠগড়ায় তোলার কোটি কারণ রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ ছিল তাঁর রক্তকণিকার কোণে কোণে। তিনি সেই মতো একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা তাঁকে প্রবল অপ্রিয় করে তুলেছিল। যেমন, ১৮৯৯ সালে ক্যালকাটা মিউনিসিপাল সংশোধনী আইন পাশ করেন, এর মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়। ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি আইন পাশ করেন ১৯০৪ সালে, এই আইনের মাধ্যমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ইন্ডিয়ার অফিসিয়াল সিক্রেটস আইনেও সংশোধনী পাশ করা হয় ওই বছর। এর ফলে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়।


কার্জন মনে করতেন কংগ্রেস ভারতীয়দের সমর্থন হারিয়ে ফেলেছে। ১৯০০ সালে ঘোষণা করেন, কংগ্রেস পতনোন্মুখ। কিন্তু ১৯০৫ সালে তাঁর বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত জাতীয়তাবাদে জোয়ার এনে দিল। কংগ্রেসে নতুন প্রাণ এবং প্রণোদনা সঞ্চারিত হল।
কেন বঙ্গভঙ্গ?
বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। যা ছিল সুবিশাল, বহু বস্তৃত। বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার, ছত্তীশগড়ের একাংশ, ওড়িশা এবং অসম ছিল তাতে। ফলে ব্রিটিশ এখানে প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাতে মাঝে মধ্যেই বিড়ম্বনায় পড়ছিল। ১৮৬৬ সালে এই ওড়িশায় এক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের ভারত সচিব স্যার স্ট্যাফোর্ড হেনরি নথকোর্ট এই দুর্ভিক্ষের কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করলেন। এই কমিটি মাথা ঘামিয়ে প্রেসিডেন্সির বিরাটত্বকে কাঠগড়ায় তুলল এবং দুর্ভিক্ষের একটি কারণ হিসেবে তাকে চিহ্নিত করল। বাংলা প্রেসিডেন্সিকে ভাগ করার সুপারিশও করা হল তখনই।


কাট টু ১৯০৩। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর এন্ড্রু ফ্রেজার বঙ্গভঙ্গের নয়া খসড়া করলেন। কার্জন তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন। বলা হয়ে থাকে, ফ্রেজারই বঙ্গবঙ্গে প্রধান পুরোহিত ছিলেন।
১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। কার্জন পূর্ববঙ্গ পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকায় নবাব স্যর সলিমুল্লাহর (যিনি পরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা করেন) আতিথেয়তা নিলে নবাব পূর্ববঙ্গ ও আসামের মুসলমানদের সমস্যাগুলি তুলে ধরেন তাঁর কাছে। একটি পৃথক প্রদেশের দাবিও নাকি জানান। ফ্রেজারের পরিকল্পনা ও সলিমুল্লাহের দাবির সুর আলাদা কিছু নয়, ফলে বড়লাট কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেবেন বলে স্থির করে ফেলেন।


পাশাপাশি, কলকাতা ছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তরঙ্গিত, কেন্দ্রস্থল। ফলে ভাগ করেও তার সুর ভাঙতে চাইছিল ব্রিটিশ শাসক। বিশেষ করে হিন্দু মুসলমানে বিভাজনের অস্ত্রটা তাদের সবচেয়ে গ্রাহ্য বলে মনে হয়েছিল এ পথে। ১৯০৪ সালে স্বরাষ্ট্রসচিব এইচ এইচ রিসলে একটি নোটে লিখেওছিলেন, সংগঠিত বেঙ্গল হল শক্তি, বঙ্গ বিভাগ হলে তাকে নানা দিক থেকে বেঁধে রাখা যাবে। রিসলে ছিলেন জনবিন্যাস বিশেষজ্ঞও।


১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়।
লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা কী ছিল? বাংলা প্রদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ (দার্জিলিং বাদ দিয়ে) ও আসাম নিয়ে ‘পূর্ববাংলা ও আসাম’ প্রদেশের উৎপত্তি। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছিল। রাজধানী হয় ঢাকায়। আয়তন ১,০৬,৫০৪ বর্গমাইল, লোকসংখ্যা ৩ কোটি ১০ লক্ষ এবং এর দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমান। নবগঠিত প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হলেন স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার। বাকি অংশ, মূলত পশ্চিম অঞ্চল, রইল বেঙ্গল হিসেবে, জনসংখ্যা কমে হল ৫ কোটি ৫০ লক্ষের মতো।


কী হল বঙ্গভঙ্গের জেরে
এই পরিকল্পনার সলতে পাকানো থেকেই এর বিরুদ্ধে গণ-ক্ষোভ তৈরি হতে থাকে। ১৯০৫ এই পরিকল্পনার প্রয়োগ হলে সেই ক্ষোভ যেন বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ে। বড়লাট কার্জনও বুঝতে পারেন কত ধানে কত চাল। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ‘স্বদেশী’ আন্দোলন শুরু হয় ১৯০৫ সালের অগস্টে। নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্ররা। ব্রিটিশ বয়কটে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ এই আন্দোলন। ব্রিটিশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত বয়কট করা হয়। ব্রিটেন থেকে আমদানিকৃত জামাকাপড়ে দেখানো হয় রেড সিগনাল। সে সব আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার যেন মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হতে থাকে। খাদি-গ্রামোদ্যোগকে দেশীয় বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হতে থাকে। ধনী ভারতীয়রা এই প্রকল্পে বিনিয়োগও করেন। গান্ধিজির চরকা-আন্দোলন এই স্বদেশী মন্ত্রেই দানা বাঁধে। ১৮৮২ সালে আনন্দমঠ উপন্যাসে বন্দে মাতরম গান লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। স্বদেশী আন্দোলনে যেন এই গান (১৮৯৬ সালে এই গানটি জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) নয়া মর্যাদার স্ফূলিঙ্গ হয়ে ওঠে। বন্দে মাতরম এক স্লোগানও হয়ে যায়।
এখানে বলতে হবে, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথেরও বিরাট ভূমিকা। বঙ্গভঙ্গ আইন কার্যকরের আগে রবীন্দ্রনাথ এক সভায় বললেন, ওই আইন কার্যকর হলে সেদিন কোনও বাড়িতে রান্নাবান্না হবে না। বাঙালি অরন্ধন পালন করবে। বাঙালি ঐক্যের লক্ষ্যে দেশ জুড়ে হবে রাখিবন্ধন উৎসব। রবীন্দ্রনাথ রাখি-সঙ্গীতও লিখলেন। ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল…’।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের তরঙ্গ তৈরি হল তুমুল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করে দিল ব্রিটিশ সরকার, বাধ্য হয়ে। কার্জনের প্রকল্প জন-আন্দোনলের চাপে পরিত্যক্ত হল। যদিও বিভাজনের যে রাজনীতি কার্জনের নেতৃত্বে পোঁতা হয় বাংলার মাটিতে, তা বিষবৃক্ষই হল। দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে বাংলাটা ভাগই করে দিয়ে গেল ব্রিটিশরা, পরাজয়ের অপমান সুদে আলসে উসুল করতে কোনও কসুর করেনি তারা।

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Explained news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Who was lord curzon the viceroy of india who partitioned bengal in 1905