বড় খবর

কবিতা থেকে মিছিলে

শেষ যে পত্রিকার মুখ্য সম্পাদক ছিলেন অশোক মিত্র, তার নাম খুব যুৎসই ভাবেই ‘আরেক রকম’। সেই পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যের লেখায় উঠে এল তীক্ষ্নধী এক সাহিত্যচারী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রজ্ঞা ও বোধ।

ashok mitra logoed
সংকীর্ণ দলবাজীর আঙ্গিনায় তিনি কোনওদিন মুক্তচিন্তাকে বাঁধতে চান নি (ছবি- চিন্ময় মুখোপাধ্যায়)

শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য

ডক্টর অশোক মিত্র-র চলে যাবার দেড়  বছর আগে থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তাঁর সম্পাদিত ‘আরেক রকম’ পত্রিকাতে লেখালেখি ও পরে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে বহু কথোপকথন হয়েছে তাঁর সঙ্গে। এবং আশ্চর্যভাবে, কথাবার্তাগুলোর বেশির ভাগই সাহিত্য বিষয়ক, যদিও আরেক রকম ছিল মূলত সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক একটি পাক্ষিক।

ডক্টর মিত্র থাকতেন আলিপুর পার্ক রোডে। তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের যে ঘরটিতে আমরা বসতাম, অথবা সম্পাদকীয় মিটিং হত, সেটার মাটি থেকে ছাদ অবধি ছিল বইয়ে ঠাসা। সম্ভবত ব্রিটিশ কবি শেলী-র ভক্ত ছিলেন। চতুর্দিকে ছিল শেলী-র জীবনি, শেলীর উপর বিভিন্ন আলোচনা গ্রন্থ। মার্ক্স, এঙ্গেলস, ইকোনমিক এন্ড পলিটিকাল উইকলির আর্কাইভ ইত্যাদি তো ছিলই, স্বাভাবিকভাবেই। আর ছিল বিভিন্ন পত্র পত্রিকা। যেটা আশ্চর্য করেছিল, এই বয়েসে এসেও  ডক্টর মিত্র সজাগ নজর রাখতেন নতুন পত্র পত্রিকা, লিটল ম্যাগ ইত্যাদির উপর। কোথায় ইন্টারেস্টিং লেখা কী বেরল, সেগুলো নিয়ে খোঁজখবর রাখতেন নিয়মিত। কয়েকটা  ঘটনা দাগ কেটে গেছে।

কথা হচ্ছিল সমর সেনকে নিয়ে। অশোকবাবু সমর সেনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁর সম্পাদিত ফ্রন্টিয়ারে নিয়মিত লিখেছেন। কিন্তু সমর সেন ছিলেন নক্সালপন্থী, এবং অশোক মিত্র সিপিআই(এম) ঘেঁষা। এই বিষয়ে দুজনের মতবিরোধ ছিল তীব্র। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমর সেন অগাধ প্রশ্রয়ে লিখতে দিয়েছেন তাঁকে, এবং অশোক বাবুর শ্রদ্ধাও ছিল অটুট। তো, সমর সেন মারা যাবার পর অনুষ্টুপ পত্রিকা একটা ‘সমর সেন বিশেষ সংখ্যা’ বার করেছিল, যেখানে অশোক মিত্র-র একটা স্মৃতিচারণ ছিল। সেই নিয়ে কথা হচ্ছে। হঠাৎ করে ডক্টর মিত্র বলে উঠলেন, “তবে পত্রিকার পরিবর্ধিত সংস্করণে অনেক ভুল সংশোধন করে নেওয়া হয়েছিল”।

আমি অবাক, কারণ আমি জানতামই না যে ওটার পরে কোনও সংস্করণ বেরিয়েছিল। এবং অশোক বাবুও  তখন চোখে ভাল দেখেন না। উনি বললেন, “আপনি আমার ঘরের বাম দিকের টেবিলের কোণায় বইটাকে দেখতে পাবেন। নিয়ে আসুন, আমি আপনাকে পাতার সংখ্যা বলে দেব। কোথায় কোথায় সংশোধনী আছে”। গিয়ে দেখলাম, নতুন সংস্করণটি ২০১০ বা ‘১২ সালের।

আবার, একদিন ফোন করে বললেন, “একটা সিরিজ আপনাকে দিয়ে লেখাতে চাই। আমার বাড়ি আসুন”। যাবার পর বললেন, “লাতিন আমেরিকার বামপন্থার পরীক্ষা নিরীক্ষা গুলো নিয়ে আপনি লিখুন। এটা ধারাবাহিকভাবে লিখতে হবে”। বলাই বাহুল্য, তখনো অবধি খুব উৎসাহ পাচ্ছিলাম না, কারণ এই বিষয় নিয়ে বাংলা এবং ইংরেজিতে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু তারপরেই ডক্টর মিত্র বললেন, “দেখুন, এই বিষয় নিয়ে প্রচুর বই বাংলা ভাষাতেই  আছে। তাই আপনার লেখাকে আলাদা হতে হবে। আমি আপনার জন্য ২০১৬ সালের সোশাল সায়েন্টিস্টের একটি সংখ্যা এনে রেখেছি। সেখানে একটা প্রবন্ধ আছে, কীভাবে লাতিন আমেরিকার লেফট ব্লক নির্মাণ হবার পর ওখানকার তেলের অর্থনীতি, শ্রমদিবস, গড় আয় ইত্যাদিতে পরিবর্তন ঘটছিল। আপনি এই জায়গাটাকে ধরুন। এটাকে কেউ ধরেনি। আপনি ডেটা দিয়ে, পরিসংখ্যান দিয়ে, দরকার পড়লে টেবিল এঁকে অংক করে দেখান লাতিন আমেরিকার বামপন্থা কীভাবে সাফল্য অথবা ব্যর্থতার সূচক হয়ে উঠছে”। বলে বইটা এগিয়ে দিলেন। তখন বুঝলাম, মধ্যমেধার জার্গনবাজি আর পাণ্ডিত্যের অনুসন্ধিৎসার মধ্যে পার্থক্য ঠিক কী  জিনিস। তখন তাঁর বয়েস প্রায় নব্বই। কিন্তু তা সত্বেও ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ তাঁর নজর এড়াচ্ছে না। সেটাকেও তিনি ব্যবহার করবার কথা ভাবছেন। শুধুমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল নয়, এটা হল জায়ান্ট ইন্টেলেকচুয়ালের লক্ষণ।

আরও পড়ুন, ভেঙে পড়ল এক অভ্যস্ত সখ্যের সেতু

অর্থনীতিবিদ হলেও ডক্টর মিত্র-র প্রথম ও শেষ প্রেম ছিল কবিতা। এবং কবিতায় তিনি প্রচলিত রাজনীতির গণ্ডি মানেন নি। সঞ্জয় ভট্টাচার্য-র  পূর্বাশা পত্রিকাতে যেমন কবিতা লিখেছেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্তদের সঙ্গে সহায়তায় ‘পরিচয়’-এর কাজ সামলিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য ছিলেন ট্রটস্কিপন্থী এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্ত চল্লিশের দশক থেকেই সাম্যবাদ বিরোধী। কিন্তু ডক্টর মিত্র মনে করতেন, শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে পার্টির ফরমান সবসময়ে মানা চলে না, সেটা উচিতও নয়। এই বিষয়ে তাঁর ‘কবিতা থেকে মিছিলে’ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ই ছিল, ‘একটি ভাষাসমস্যা সম্পর্কে’। সেখানে তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে রুশ বিপ্লবের পর তথাকথিত প্রগতিশীল সাহিত্যের চাপে পড়ে ভাষার নন্দন-আনন্দ জিনিসটি হারিয়ে গিয়েছিল। মায়াকভস্কির কবিতার উচ্ছল গীতি  তরঙ্গ অথবা শলোখভের নান্দনিক বাঙ্ময়তা যে পরবর্তীকালে আর নিয়ম থাকেনি, বরং ব্যতিক্রমই হয়ে ছিল, সেটা তাঁর নজর এড়ায়নি।

আবার তাঁর পঠনের মধ্যে এক ধরণের একবগ্গা মতামতও লুকিয়ে থাকত, যেটাকে সময়বিশেষে  গ্রহণ করা কঠিন। জীবনানন্দ দাশের উপন্যাসগুলিকে তিনি মনে করতেন ‘কিস্যু হয়নি ওগুলো’। তাঁর মতে, জীবনানন্দ কবিতা লিখতে লিখতে হতাশ হয়ে গিয়ে উপন্যাসগুলো লিখতেন। আবার সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কাছে ‘ফেইলড হিরো’। সুভাষের জীবনের প্রথম পর্বের পদলালিত্য ঝংকারময় লিরিকাল কবিতাগুলি যতখানি ডক্টর মিত্র-র প্রিয় ছিল, পরবর্তীকালে বজবজ মহেশতলা অঞ্চলের শ্রমিকজীবন নিয়ে যখন সুভাষ গদ্যকবিতা লিখতে শুরু করলেন, অশোক বাবু সেগুলোকে ততখানিই অপছন্দ করলেন। তবে সম্ভবত এর পিছনে ব্যক্তি সুভাষের রাজনৈতিক মতবদলের একটা প্রভাব থাকতে পারে।

শুধু একদিন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মমতা-প্রীতি সম্পর্কে যখন অশোক বাবু একটু উষ্মার সঙ্গে মতামত প্রকাশ করছিলেন, আমি হালকা ভাবে বলেছিলাম “কিন্তু তা সত্ত্বেও উনি কোনও ব্যক্তিগত সুযোগসুবিধা নেন নি। খুবই দারিদ্র্যের মধ্যে শেষ জীবন কাটিয়েছেন”। অশোক বাবু সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নাড়লেন, “অবশ্যই। চরিত্রবান পুরুষ ছিলেন। ওনার ভুলগুলোও হিরোয়িক। সাধে কি আর বলি যে উনি ফেইলড হিরো? ফেইল করবার পরেও, হিরো তো বটে !’

আরও পড়ুন, // নিষ্প্রভ মে দিবস//

কিন্তু বাংলা কবিতা নিয়ে তাঁর পঠন, এতখানি অনুরাগের পরেও, কোথাও গিয়ে আটকে গিয়েছিল বলে মনে হত বারবার। অশোক মিত্র ছিলেন ডাই-হার্ড রোমান্টিক। তিনি চল্লিশ পঞ্চাশ ষাটের লিরিকাল কাব্যঘরানার নস্টালজিয়া থেকে তাই মুক্ত হতে পারেন নি সম্ভবত। নরেশ গুহ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অরুণ সরকার  অথবা বুদ্ধদেব বসু নিয়ে যতখানি উচ্ছ্বসিত ছিলেন, পরবর্তীকালের শক্তি বা সুনীল নিয়ে তাঁকে কিছু বলতে শুনি নি। সম্ভবত ছন্দের প্রতি তাঁর একটা ছেলেমানুষি আকর্ষণ ছিল। একবার অন্নদাশংকর রায়ের একটি কবিতা, প্রায় ছড়ার স্টাইলে লেখা, সেটা আমাকে বললেন পড়ে শোনাতে। পড়বার পর আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন , “কী অসাধারণ কবিতা না? আপনি এটা নিয়ে একটা লেখা লিখুন”। সংকোচের বশে বলতে পারিনি যে আধুনিক কবিতা এর পরেও অনেকটা রাস্তা এগিয়ে গিয়েছে।

কথা হত তাঁর ক্যালকাটা ডায়রি নিয়েও।এই লেখাগুচ্ছের মধ্যেই গান্ধীবাদী ভাবুক নির্মলকুমার বসুর প্রতিও নিখাদ শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি প্রবন্ধ ছিল। সেটা নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যে কংগ্রেসি জমানার ওই বিভীষিকার মধ্যে আপনি একজন গান্ধীবাদীর প্রয়াণে এরকম শোকজ্ঞাপন করছেন? এ তো নেহরুর মৃত্যুতে হীরেন মুখোপাধ্যায়ের ‘আ জেন্টল কলোসাস’ লেখার সামিল হয়ে গিয়েছিল। সেই জিজ্ঞাসার মধ্যে হালকা খোঁচা হয়ত ছিল। কিন্তু অশোক বাবু স্মিতহাস্যে বালকের প্রগলভতা উড়িয়ে দিলেন। উত্তর দেবার প্রয়োজনই বোধ করলেন না। আজ বুঝি, সংকীর্ণ দলবাজীর আঙ্গিনায় তিনি কোনওদিন মুক্তচিন্তাকে বাঁধতে চান নি। সেটা তাঁর নিজস্ব বিবেকের কাছে, যে বিবেক মনেপ্রাণে সাম্যবাদী, সেই সাম্যবাদের খাতিরেই সেই বেঁধে ফেলাটা হত এক প্রকার আত্মপ্রবঞ্চনা।

আরও পড়ুন, উত্তর সত্য, সাংবাদিকতা এবং আমরা

কী আশ্চর্য, তাঁর মৃত্যুটাও ঘটল মে দিবসের দিনেই! এটাকে সমাপতন  বলব কি না জানি না। কিন্তু ভাবতে ভাল লাগছে, তিনি ছিলেন হয়ত পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট। না, তাঁর শেষযাত্রায় রাষ্ট্রের পতাকা অর্ধনমিত থাকবে না। একুশখানা গান স্যালুট দেওয়া হবে না। কোনও মেট্রো স্টেশনের নামও সম্ভবত তাঁর নামে হবে না। ভাগ্যিস! বেঁচে থাকলে, এসব যাত্রাপালা যদি সত্যিই ঘটে যেত, তাঁর প্রিয় নায়ক ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের ভাষাতেই ডক্টর মিত্র হয়ত মুচকি হেসে বলতেন ‘সাব্লাইম ননসেন্স!’

Web Title: Ashok mitra remembered by his last magazine editorial board member

Next Story
ভেঙে পড়ল এক অভ্যস্ত সখ্যের সেতুashok mitra expires
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com