শেষ হয়েও হয় না শহরের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের গল্প

কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের দাবি, ভারতে মাত্র ২৯৬ জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বর্তমানে জীবিত রয়েছেন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ এই পরিসংখ্যানের সত্যতা অস্বীকার করেছে।

kolkata bow barracks
আলো ঝলমলে বো ব্যারাকস। ছবি: নেহা বাঙ্কা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
মধ্য কলকাতার বো ব্যারাকস পাড়া। শহরের অধিকাংশ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানই বাস করেন যেখানে। বড়দিনের মরসুমে এখানে জোরকদমে চলছে মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। এই পাড়ার আজীবন বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেলা গোবিন্দরাজ, যিনি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজের একজন মাথাও বটে, তদারকি করছেন কাজের। বলা বাহুল্য, বড়দিন যেভাবে বো ব্যারাকসে উদযাপিত হয়, শহরের আর কোথাও হয় না।

কর্মব্যস্ত এক দুপুরে নিজের দু’কামরার ফ্ল্যাটে দুদণ্ড হাঁফ ছাড়তে বসে পরিশ্রান্ত অ্যাঞ্জেলা বলেন, “কলকাতার শেষ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পাড়া বলতে এটাই।” এখানে ন’দিন ধরে চলে বড়দিনের উৎসব, যার উদ্যোগ আয়োজন যে চাট্টিখানি কাজ নয়, তা সহজেই অনুমেয়। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে এই নিয়েই রয়েছেন তিনি, বলেন অ্যাঞ্জেলা, মোবাইল অবিরত বেজে চলেছে মিনিটে মিনিটে। এমনই অবস্থা, যে আমাদের সঙ্গে কথা বলার আগে স্নানটুকু পর্যন্ত সারতে পারেন নি।

kolkata bow barracks
বড়দিনের আগে চলছে পুরোদমে রাস্তা সারাই। ছবি: নেহা বাঙ্কা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

অথচ দু’বছর আগে পর্যন্তও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ছিল বো ব্যারাকসের। শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে এই এলাকায় লাল ইটের তৈরি বাড়ির সমাহার। কলকাতার ব্রিটিশ, এবং তারপর মার্কিন সৈন্যবাহিনীর বসবাসের উদ্দেশ্যে নির্মিত এইসব শতাব্দী-প্রাচীন বাড়ি বা ব্যারাক ভেঙে আধুনিক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল সরকারের। প্রায় দুই দশক ধরে চলে সরকার বনাম স্থানীয়দের টানাপোড়েন, যার পর অবশেষে আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে বাধ্য হয় সরকার।

শুধু তাই নয়, বো ব্যারাকসে বড়দিন উদযাপনের অভিনবত্ব বুঝতে পেরে বরং এই উৎসবে বিনিয়োগ করছে সরকার, উৎসবের দৃশ্যমানতা এবং আয়তন বাড়াতে এই উদ্যোগে সামিল করছে স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও কিছু বিশিষ্ট অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নাগরিককে।

গত সপ্তাহে সংসদে পাস হয়ে যায় সংবিধান (১২৬ তম সংশোধনী) বিল, যার ফলে লোকসভা এবং নির্দিষ্ট কিছু বিধানসভায় আর মনোনীত হতে পারবেন না অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা। মনে করা হয়, এঁরাই ভারতের একমাত্র জনগোষ্ঠী, যাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজি। কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের দাবি, ভারতে মাত্র ২৯৬ জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বর্তমানে জীবিত রয়েছেন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ এই পরিসংখ্যানের সত্যতা অস্বীকার করেছে, এবং মন্ত্রীর দাবির বিরুদ্ধে দীর্ঘ বিবৃতি জারি করেছেন সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা কমেছে ঠিকই, কিন্তু অতটাও নয় যতটা প্রসাদ দাবি করছেন, এ বিষয়ে সহমত কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ও।

মেরামতির কাজ তদারকি করছেন অ্যাঞ্জেলা গোবিন্দরাজ (লাল শাল গায়ে)। ছবি: নেহা বাঙ্কা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

বিধায়ক তথা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের সদস্য শেন ক্যালভার্ট ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানান, এর একটা কারণ হলো যে সরকারিভাবে ভারতের ১৩টি রাজ্যে বসবাসকারী অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের বর্তমান জনসংখ্যা নিয়ে কোনও যথাযথ সমীক্ষা হয়নি।

বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের ইতিহাস নথিভুক্ত করে চলেছেন ৭৫ বছর বয়সী মেল্ভিন ব্রাউন। ক্রিসমাস ইভ, অর্থাৎ বড়দিনের আগের সন্ধ্যা এলিয়ট রোডে ব্রিটিশ আমলের একটি বাড়ির দোতলায় তাঁর নিজের ফ্ল্যাটে নিভৃতে কাটান মেল্ভিন। এই এলাকায় মুষ্টিমেয় কে ক’জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অবশিষ্ট রয়েছেন, মেল্ভিন তাঁদেরই একজন।

“বো ব্যারাকসে এখন দুই থেকে পাঁচজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বাস করেন,” বলেন মেল্ভিন। গত এক দশকে দক্ষিণ কলকাতার পিকনিক গার্ডেন হয়ে উঠেছে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের নতুন ঠিকানা। এর আগে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পাড়া বলতে বোঝাত মূলত এলিয়ট রোড, পার্ক স্ট্রিট, এবং রিপন স্ট্রিট অঞ্চল। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় পুরোনো ব্রিটিশ আমলের বিশাল বিশাল বাড়িতে থাকতেন তাঁরা। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ পাড়ি দেন বিদেশে, বাকিরা গিয়ে ওঠেন পিকনিক গার্ডেন এবং বেহালায়।

রেঞ্জার্স ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে শেন ক্যালভার্ট। ছবি: নেহা বাঙ্কা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

মেল্ভিন বলেন, নতুন পাড়ায় উঠে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো প্রোমোটার অথবা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আসা মোটা টাকার টোপ, এবং শহরের অন্য কোনও এলাকায় ছিমছাম, আধুনিক ফ্ল্যাটে থাকার বাসনা। মেল্ভিনের কথায়, “আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগে ১৫ লক্ষ টাকা মানে যে কোনও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারের কাছে সোনার খনি।” অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজে মুখে মুখে ছড়াতে শুরু করে এই খনির খবর, এবং দলে দলে নতুন পাড়ার দিকে রওনা দেন পুরোনো পাড়ার বাসিন্দারা। বর্তমানে তাই মধ্য কলকাতায় বসবাস করছেন মাত্র কয়েক ঘর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।

মূলত ব্রিটিশ রাজের কার্যকলাপের ফলেই গড়ে ওঠে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ, যেখানে বাবা ইউরোপীয়, মা ভারতীয়। দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে হানাহানির সুযোগ নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা সেখানকার রাজাদের প্রস্তাব দিতেন অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধ পরিচালনা শেখানোর। এবং সেইসব রাজাদের অনুমতিক্রমেই রাজ্যে হাজির হতো ব্রিটেন থেকে জাহাজে করে এদেশে আসা সৈন্যদল, আপাতদৃষ্টিতে যাদের কাজ ছিল স্থানীয় সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এসবই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনেক আগের কথা। মেল্ভিন বলেন, “এইসব ব্রিটিশ সৈন্যদের বলা হতো ‘ইয়েলো বয়েজ’, কারণ তাদের গলায় থাকত হলুদ স্কার্ফ। কখনও কখনও ‘টমি সোলজার’ নামেও ডাকা হতো।”

এইসব ‘টমি’ (ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিকদের চলতি কথায় যা বলা হতো) সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, দক্ষিণ ভারত সমেত। স্থানীয় মহিলাদের বিয়ে করে ঘর-সংসারও পাতে, এবং তাদের সন্তানরাই হয়ে যায় দেশের প্রথম অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।

“ব্রিটিশরা অত্যন্ত ধূর্ত ছিল,” বলেন মেল্ভিন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিকারিকরা রানী ভিক্টোরিয়াকে বোঝান, ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের মধ্যে বিয়েশাদী হলে তা পরবর্তীকালে ব্রিটিশদেরই সুবিধে করে দেবে। মেল্ভিনের ব্যাখ্যা, “তারা রানীকে বোঝায় যে এই ধরনের বিয়ের ফলে যে সব অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সন্তান জন্মাবে, তারাই ভবিষ্যতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সব কাজ সামলাবে, এবং ভারতীয়দের দিকটাও ব্রিটিশদের চেয়ে ভালো বুঝবে কারণ তাদের মায়েরা ভারতীয়।”

সুপ্রাচীন রেঞ্জার্স ক্লাবের প্রবেশপথ। ছবি: নেহা বাঙ্কা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উৎসাহে উন্নতি করতে শুরু করেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা, এবং সফল হন বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে, বা চা উৎপাদনে। দেশের রেল ব্যবস্থার স্থাপনা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রেও অন্যতম অবদান অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদেরই। কিন্তু তাঁদের এই উল্কাগতিতে উত্থানে খুশি হতে পারেন নি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সকলেই। অনেকেরই মত ছিল, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে কোম্পানির আধিকারিকরা তাঁদের ওপরে।

বিধায়ক শেন ক্যালভার্টের আদি বাসস্থান খড়গপুরের রেল কলোনি, যেখানে আজও থাকেন তাঁর বাবা-মা। তাঁর বক্তব্য, “বরাবরই রেল কলোনির সঙ্গে যোগ রয়েছে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের।” আজও বাংলায় আদ্রা এবং আসানসোলের মতো রেল কলোনিতে বাস করেন বেশ কিছু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। “রেলটা তো চালাতেনই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা,” বলেন ক্যালভার্ট। “অনেকেই রেলে যোগ দেন কারণ তাঁদের বাবা-মা হয়তো রেলে কাজ করতেন। রেল ছাড়া আর কিছু জানতেন না তাঁরা। স্বাধীনতার পর দেশের যে কোনও জায়গায় দেখুন, মাদ্রাস, হায়দরাবাদ, মুম্বই, ব্যাঙ্গালোর, রেল সামলাতেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা।”

মেল্ভিন বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মহিলাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে বো ব্যারাকস। যদিও শুধুমাত্র সৈন্যদের ছাউনি হিসেবেই সৃষ্টি হয়েছিল বো ব্যারাকস, স্থানীয় ভারতীয় এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান তরুণীদের সঙ্গে অনেকটাই সময় কাটাতেন সৈনিকরা, যার ফলে ব্যারাকে বাড়তে শুরু করে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারের সংখ্যা। সৈন্যদের এক বা দুই কামরার ঘর পরিণত হতে থাকে আরও বড় বাড়িতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে থেকেই, এবং যুদ্ধ চলাকালীন তো বটেই, এই মিশ্রণের মধ্যে যোগ হয় মার্কিন এবং অন্যান্য মিত্রশক্তির সৈন্যবাহিনী।

দেশভাগের রক্তাক্ত অধ্যায় এবং স্বাধীনতার সময় অনিশ্চয়তার আবহে ক্রমশ উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠতে থাকেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা। যাঁদের আর্থিক ক্ষমতা ছিল, তাঁরা কাতারে কাতারে পাড়ি দেন ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, ক্যানাডা, বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। অবশিষ্ট মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা দ্বিধাগ্রস্তভাবেই চেষ্টা করেন সদ্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার। “ওঁদের মনে ভয় ছিল যে ভারতীয়রা ওঁদের দেখবেন ব্রিটিশদের প্রতিনিধি হিসেবে,” বলেন মেল্ভিন।

এলিয়ট রোডে নিজের বাড়িতে মেল্ভিন ব্রাউন। ছবি: নেহা বাঙ্কা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

কিন্তু মেল্ভিন এও বলেন যে এই আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়, কারণ বরাবরই এই দেশের সামাজিক বুননের অংশ থেকেছেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা। ইংরেজিতে তাঁদের ব্যুৎপত্তির ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে বড় বড় সংস্থায় ভালো চাকরি পেতে থাকেন তাঁরা। স্টেনোগ্রাফার, টাইপিস্ট, টেলিফোন অপারেটরের চাকরি নতুন ভারতে তাঁদের এনে দেয় আর্থ-সামাজিক স্থায়িত্ব।

বো ব্যারাকসের একপ্রান্তে বাস করেন ৭২ বছর বয়সী গ্লেন মায়ার্স, আজ চার দশক ধরে। “আমাদের মধ্যে অনেকেই বিদেশ চলে যায়,” বলেন মায়ার্স, যিনি নিজের শহরে, এবং সমাজে, বদলাতে দেখেছেন অনেক কিছুই। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম কিছুমাত্র সুযোগ পেলেও কলকাতা ছেড়ে রওনা দিচ্ছে ভারতের অন্যান্য শহরে, অথবা সটান বিদেশে।

অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের এক বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন ৮৫ বছর বয়সী ডালসি অলিভার। আত্মীয়-পরিজন সকলেই বিদেশে, নিজে বিয়ে করেন নি। “আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন, কাজেই আমরা থাকতাম উত্তরদিকে, কাঁচড়াপাড়ায়।” ১২৩ বছরের ক্যালকাটা রেঞ্জার্স ক্লাবের বাগানে বসে ডালসি দেখেন, শারীরিকভাবে তাঁর চেয়ে সক্ষম সদস্যরা সোৎসাহে নাচছেন ‘Rockin’ Around the Christmas Tree’-র মতো পুরোনো গানের তালে, লাইভ সঙ্গীত পরিবেশনায় গায়ক ক্রিস্টোফার লোবো।

ময়দানে অবস্থিত ক্যালকাটা রেঞ্জার্স ক্লাব কেবলমাত্র অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্যই তৈরি হওয়া মুষ্টিমেয় ক্লাবগুলির একটি। বড়দিনের সপ্তাহখানেক আগে সেখানে লাঞ্চ এবং নাচগানের জন্য আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বৃদ্ধাশ্রমের কিছু আবাসিক।

ডালসি বলতে থাকেন, “তখন সবাই রেলে বা টেলিগ্রাফ বিভাগে চাকরি করত। নাচের অনুষ্ঠান হতো প্রচুর, এবং কলকাতা থেকে ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে কাঁচড়াপাড়ায় আসত অনেকেই। আমেরিকান সৈন্যরা থাকত, অনেক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারও থাকত।” পড়াশোনা শেষ করে সেক্রেটারির চাকরি পেয়ে যান ডালসি, এবং অবসর নেওয়া পর্যন্ত কলকাতাতেই কর্মরত থাকেন।

পেপার ওয়াটার (তেঁতুলজলের সঙ্গে মেশানো জিরে, রসুন, এবং অন্যান্য মশলা, ভাত অথবা কাটলেটের সঙ্গে খাওয়ার জন্য), ঝাল ফ্রেজি, ভিন্দালু বা মালিগাটনি-র মতো চিরাচরিত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান খাবার খেয়ে বড় হয়েছেন ডালসি। ইদানীং শহরের প্রায় কোনও রেস্তোরাঁতেই আর পাওয়া যায় না এসব খাবার, শুধুমাত্র এমন কিছু পরিবারে আজও এগুলি রাঁধা হয়, যেখানে সদস্য সংখ্যা বেশি, কারণ এসব পদের যোগান দিতেও প্রয়োজন হয় অনেকের সাহায্যের। এছাড়াও রয়েছে ‘রোজ কুকি’, বড়দিনের সময় তৈরি বিশেষ ধরনের বিস্কুট, যার মধ্যে রয়েছে ময়দা, ডিম, এবং দুধ, অনেকটা দক্ষিণ ভারতের ‘আচ্চু মুড়ুক্কু’ ধাঁচের।

ফুলের মতো দেখতে রোজ কুকিজ। ছবি সৌজন্যে: শেন ক্যাল্ভার্ট

“সারা দুনিয়ার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা এখনও কলকাতায় আসে ক্রিসমাসের সময়। এখানে প্রাণ আছে। বড়দিনের সময় আরও প্রাণবন্ত হয়ে যায় কলকাতা। পৃথিবীর কোথাও এরকমভাবে ক্রিসমাস সেলিব্রেট করা হয় না,” মন দিয়ে নাচ দেখতে দেখতে বলেন ডালসি।

যদিও ক্লাব বা বাড়ি ছাড়া তেমনভাবে এখন আর কোথাও পালিত হয় না বড়দিন। শহরের অনেক বয়স্ক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের অতীতের স্বর্ণযুগের গল্প বলা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

Get the latest Bengali news and Feature news here. You can also read all the Feature news by following us on Twitter, Facebook and Telegram.

Web Title: Christmas kolkata bow barracks anglo indian community

Next Story
উত্তর সত্য, সাংবাদিকতা এবং আমরা
Show comments