বড় খবর


আরও আরও আরও যাক প্রাণ?

ছয় মাসের মধ্যে ঘটে যাওয়া দুই অকালমৃত্যু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রাজ্যের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য তৈরি হওয়া ‘স্পেশ্যাল’ স্কুলগুলিকে। প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামো নিয়ে।

specially abled student death sambuddha ghosh

ঘটনা এক: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮। মৃত শিশুর বয়স পাঁচ। নাম, অর্কাভ সাহা। বারাসতের উদ্দীপন অ্যাকাডেমির ছাত্র। স্কুলের পাঁচিলের বাইরে একটি ডোবায় অকালমৃত্যু জলে ডুবে। তদন্ত শুরু হয়েছিল। চলছে।

ঘটনা দুই: ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯। মৃত শিশুর বয়স চার। নাম, সম্বুদ্ধ ঘোষ। আলিপুরের কম্যান্ড হাসপাতাল চত্বরে সেনা অফিসারদের স্ত্রী-দের পরিচালনাধীন একটি স্কুলে জলভর্তি চৌবাচ্চায় ডুবে পৃথিবীর মায়া কাটানো। তদন্ত শুরু হয়েছে। চলছে।

দুটি ঘটনাতে মিল? অর্কাভ এবং সম্বুদ্ধ, দু’জনেই ছিল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। সংশ্লিষ্ট দুটি স্কুলই পরিভাষায় ‘স্পেশ্যাল স্কুল’, যা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্যই গঠিত নির্দিষ্টভাবে। দুই শিশুর মৃত্যুতেই তাদের হতভাগ্য মা-বাবা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছেন স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিরুদ্ধে। তদন্ত? ওই যে প্রথমে লিখেছি, শুরু হয়েছিল বারাসতের ঘটনায়। হয়েছে আলিপুরের ঘটনাতেও।

আরও পড়ুন: শিক্ষায় রাজনীতি, না রাজনীতিতে শিক্ষা?

তদন্ত চলুক। পুলিশি তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই না। প্রশ্ন কিন্তু হাজারবার তুলতে চাই তদন্তের পরিণতি নিয়ে। বারাসতের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট স্কুলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন ফের চালু হয়েছে কিনা জানি না। এবং বিশ্বাস করুন, জানতে চাইও না। শুধু জানতে চাই না-পাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একটি শিশু কীভাবে স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষক-শিক্ষিকা-কর্মীদের নজর এড়িয়ে স্কুলের চৌহদ্দির বাইরে ডোবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল? কোন যুক্তিতে ক্ষমা করা যায় এই গাফিলতি, যখন জানাই আছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নজরে রাখতে হয় অষ্টপ্রহর, কী স্কুলে, কী বাড়িতে? কেউ গ্রেফতার হয়েছেন? শাস্তি হয়েছে কারও? উত্তর মেলে নি।

অর্কাভর স্মৃতিতে তার মৃত্যুর পর মিছিল

উত্তর মিলবে আলিপুরের স্কুলে সম্বুদ্ধের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায়? চার বছরের সম্বুদ্ধের মৃত্যু হয় ‘হাইড্রোথেরাপি’-র জন্য নির্দিষ্ট জলাধারে ডুবে। যে ঘরে ওই জলাধার, শীতকালে তা নিয়মানুযায়ী তালাবন্ধ থাকার কথা। তাহলে ঘরটা খোলা থাকল কী করে? কে খুলল? আর যদি খোলাও থাকে, সম্বুদ্ধ সবার নজর এড়িয়ে ওই ঘরে ঢুকে পড়তে পারল কী করে? বাচ্চাদের গতিবিধির উপর যাঁদের খেয়াল রাখার কথা, তাঁরা তখন কী করছিলেন? যা-ই করে থাকুন, অন্তত কর্তব্যপালন তো করছিলেন না। করলে সম্বুদ্ধকে এভাবে অতীত হয়ে যেতে হয়, মা-বাবাকে অনন্ত শোক-সুনামিতে ভাসিয়ে? শাস্তি হবে না গাফিলতির, শাস্তি হবে না এই সীমাহীন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার? উত্তর এখনও মেলেনি। আশা, মিলবে।

আরও পড়ুন: খোকা ৪২০-এর বদান্যতা ফুরোবে কবে?

ছয় মাসের মধ্যে ঘটে যাওয়া দুই অকালমৃত্যু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রাজ্যের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য তৈরি হওয়া ‘স্পেশ্যাল’ স্কুলগুলিকে। প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামো নিয়ে। ‘বিশেষ’ ব্যবস্থা না থাকলে কিসের ‘বিশেষ’ স্কুল? মাসের শেষে অভিভাবকদের থেকে কোন লজ্জায় মোটা টাকা গুনে নেওয়া? অবোধ শিশুর প্রাণ চলে যায় যে পরিকাঠামোয়, সে পরিকাঠামোর থাকাই বা কী, না-থাকাই বা কী ?

অনুভূতি অসাড় হয়ে আসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই শিশুদের অভিভাবকদের কথা ভেবে। যাঁদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে সন্তানের ভবিষ্যতের উদ্বেগ-আশঙ্কা-উৎকণ্ঠা সঙ্গী করে। কী-ই বা করতে পারেন ওঁরা? সন্তান মূলস্রোতের শিক্ষাব্যবস্থায় মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়নি, সাধ্যমতো বাড়তি অর্থব্যয়ে ‘স্পেশ্যাল স্কুলে’ ভর্তি করা ছাড়া উপায় কী আর? আর এই নিরুপায় অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়েই শহর-মফস্বলে গজিয়ে উঠেছে হরেক কিসিমের বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যাদের অধিকাংশের না আছে সরকারি অনুমোদন, না আছে উপযুক্ত পরিকাঠামো, না আছে শিক্ষক-কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।

এবং এখানে, ঠিক এইখানেই সরকারের সদর্থক ভূমিকা প্রত্যাশিত। প্রত্যাশিত এই স্কুলগুলির উপর নজরদারি। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন, নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো কি আছে আদৌ? খাতায়-কলমে ‘ডিসেবিলিটিজ কমিশন’ আছে একটা। কিন্তু অপ্রতুল কর্মীসংখ্যায় তাঁদের নজরদারির সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। ফলে যেভাবে খুশি, যেমন খুশি চলছে এই ‘স্পেশ্যাল স্কুল’গুলির সিংহভাগ। যার বলি কখনও হচ্ছে অর্কাভ সাহা, কখনও সম্বুদ্ধ ঘোষ। আর অভিশপ্ত জীবন বরাদ্দ থাকছে সন্তান-হারানো মা-বাবার জন্য।

আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য, এই দুই ছাড়া দেশ এগোবে না, বললেন অমর্ত্য সেন

সরকারের কাছে আর্তি বলুন বা অনুরোধ, সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। একদমই নেই। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা তাদের নিজেদের লড়াইটা নিজেরাই প্রাণপণ লড়ছে। অভিভাবকরাও লড়ছেন প্রতিনিয়ত। তাঁদের সহানুভূতি নয়, সম-অনুভূতির প্রয়োজন। ‘সিম্প্যাথি’ নয়, চাই ‘এম্প্যাথি’। সদিচ্ছা থাকলে সরকার কি করতে পারে না আর একটু সম-অনুভূতির প্রদর্শন? যার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত ‘ডিসেবিলিটিজ কমিশন’-কে আরও কার্যকরী করা, লোকবলে, ক্ষমতাবলে। এবং যার দ্বিতীয় ধাপ হওয়া উচিত গাফিলতির কঠোর শাস্তিবিধান।

আইনি পরিভাষায় বলা হয়, “The real deterrence against crime is not the quantum of punishment, but the surety of the same.” শাস্তির মেয়াদ নয়, শাস্তির নিশ্চয়তাই অপরাধ-নিয়ন্ত্রণের আসল প্রতিষেধক। তাই শাস্তি চাই তাদের, যারা অর্কাভ-সম্বুদ্ধের মৃত্যুর জন্য দায়ী, চাই শাস্তির নিশ্চয়তা। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী, এটা কি খুব বেশি চাওয়া? সরকার একটু উদ্যোগী হলেই তো নিশ্চিত কমবে গাফিলতির প্রবণতা, কমবে প্রাণ নিয়ে ছেলেখেলা। তাই শাস্তি চাই।

শাস্তি চাই, কারণ, আর অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে লিখতে চাই না… ঘটনা তিন, বা ঘটনা চার।

Web Title: How special schools function disability two student deaths

Next Story
নির্বাচনে এবার জাতীয় নিরাপত্তা, না কৃষি সমস্যা?general elections 2019
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com