বড় খবর

সংবাদ জগতের একাল-সেকাল

নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে এই প্রক্রিয়ায় বাংলার সংবাদপত্র পাঠক লম্বালম্বি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তখন পথে ঘাটে হাতে ধরা কাগজ দেখেই শনাক্ত করা যেত কে কোন পক্ষের সমর্থক কিংবা কে কী ধরনের খবরে কতটা আগ্রহ বোধ করে। অরুণ চক্রবর্তী।

এখনো বাংলায় স্বতন্ত্র্য অন লাইন খবরের কাগজ কিন্তু নেই বললেই চলে । এখনো আমরা অনলাইনে অধিকাংশ যা পাই, তা ছাপাই কাগজের অন লাইন এডিশন মাত্র, স্বতন্ত্র অনলাইন সংবাদপত্র নয়। ছবি চিন্ময় মুখোপাধ্যায়।

অরুণ চক্রবর্তী 

ষাট-সত্তরের দশকে বাংলা সাংবাদিকতায় সাংবাদিকদের চেয়ে লেখকদের চাহিদা ছিল বেশি। এর প্রধান কারণ, এর আগের সময়গুলোতে বাংলা সংবাদপত্রের ভাষা ও সংবাদ পরিবেশন। বলতে গেলে অর্ধ শতাব্দী ধরেই একই বহমানতায় বইছিল বাংলা সাংবাদিকতার শৈলী। চল্লিশের দশক থেকে বাংলা সাহিত্যে যে আধুনিকতা স্পষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বর্ণনে এবং মানুষের যাপনের বাস্তব অবস্থানকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে, তা সিনেমা, চিত্রশিল্প এবং গানে প্রভাব ফেললেও সাংবাদিকতায় তার রেশমাত্র দেখা যাচ্ছিল না। এর প্রধান কারণ, সম্ভবত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা ভিত্তিক রিপোর্টিংয়ের আকর্ষণ। চল্লিশ পঞ্চাশের বাংলা সাংবাদিকতা তাই শুধুমাত্র ঘটনাকে উপস্থাপন করার মধ্যেই সীমিত থাকত। ফলে, রিপোর্টিংয়ের  সময়ে ঘটনার অপ্রয়োজনীয় অংশ বলে কিছু গণ্য হত না। এক একটি সংবাদ কলামের পর কলাম ছাপিয়ে অন্য পৃষ্ঠাতেও ব্যপ্ত হত। ফলে ষাটের দশক থেকেই পাঠকদের অধিকাংশ সংবাদপত্রের খবরের একঘেঁয়েমি এড়াতে খবরের হেডলাইনের বেশি অন্য কিছুতে আগ্রহ বোধ করতেন না। এজন্যই বোধ হয়, রেডিও হয়ে উঠেছিল সংবাদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সঙ্গে বিনোদনের আকর্ষণ তো ছিলই।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষ ছিলেন মূলত সাংবাদিক, ২০ বছর বয়স থেকেই নানা কাগজে কাজ করছিলেন। বাংলা আর ইংরেজি দু ভাষাতেই। তবে ঔপন্যাসিক হিসেবেও সাড়া ফেলেছেন, একই ভাবে প্রবন্ধ নাটক ছোটগল্পেও সিদ্ধহস্ত তিনি। বিশেষ করে ১৯৫০ সালে ‘কিনু গোয়ালার গলি’ প্রকাশের পরে। অনেকে মনে করেন, সাংবাদিকতার কারণে তিনি সাহিত্যসৃষ্টিকে অবহেলা করেছেন। আমি এই বক্তব্যের সমর্থক নই, তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন বটে, তবু বলব, সন্তোষকুমার বাংলা সাংবাদিকতাকে এক ধাক্কায় অনেকখানি পথ এগিয়ে নিয়ে আধুনিকতায়  স্থাপন করেছিলেন একজন দুঁদে সাংবাদিক হিসেব। তবে তিনিই ছিলেন বাংলা সাংবাদিকতার বর্তমান দুর্দশার একমাত্র অনুঘটক।

১৯৫৮ সালে আনন্দবাজারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রফুল্লকুমার সরকারের মৃত্যুর পরে পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নিলেন পুত্র অশোককুমার সরকার। সন্তোষকুমার ঘোষ তখন দিল্লিতে, আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর ইংরেজি দৈনিক হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর। অশোকবাবু প্রথমেই যে কাজটি করলেন তা, তিনি সন্তোষবাবুকে আনন্দবাজার পত্রিকার  অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর করে কলকাতায় ফিরিয়ে আনলেন। কয়েকদিন পরেই তাঁকে জয়েন্ট এডিটর করে আনন্দবাজারকে ঢেলে সাজাবার দায়িত্ব দিলেন। শুরু হয়ে গেল বাংলা সংবাদপত্রের নতুন অধ্যায়।

অন লাইন খবরের কাগজ আবির্ভূত হল ব্যতিক্রম হিসেবে। গড়ে উঠল নিউজ পোর্টাল’, যেখানে বিনোদন নয়, বিশ্লেষণ নয়, শুধু খবরেরই প্রাধান্য। ছবি চিন্ময় মুখ্যার্জি

বদলে গেল শিরোনাম। বদলে গেল খবরের চয়ন, খবরের ভাষা, বিন্যাস। মুখ্য হয়ে উঠল পাঠককে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেবার তাগিদ, ফলে বাড়তে থাকে মূল ঘটনার পাশাপাশি অনুঘটনার সমান গুরুত্ব। সম্পাদকীয় পৃষ্ঠা হয়ে উঠল পাঠকের চিন্তনের ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’। দিনের কাগজে যুক্ত হল সাপ্তাহান্তিক খেলার পাতা, সিনেমার পাতা, বইয়ের পাতা ইত্যাদি। কাগজের সার্কুলেশন হু হু করে বেড়ে গেল। খবরের কাগজ শুধু খবরের জন্য আর রইল না, বিনোদনও তার অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠল।

আরও পড়ুন, উত্তর সত্য, সাংবাদিকতা এবং আমরা

এ কাজে যিনি যাঁদের ডেকে নিলেন, তাঁরা মূলত সাহিত্যের লেখক। নিজে সাহিত্যিক বলেই হয়ত, তিনি খবরের কাগজে সাংবাদিকদের অবশ্য প্রয়োজনীয় মনে করতেন না।  কাগজের ‘কাটতি’ আকাশ ছুঁতেই অন্যান্য কাগজও সাংবাদিকদের ছেড়ে লেখকদের জুড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একটা সময় দেখা গেল, ষাটের দশক পেরোবার আগেই বাংলা সাংবাদিকতায় লেখকরা খবরের কাগজের সব ক’টা টেবিল দখলে নিয়ে নিয়েছেন। ফলে, কাগজ পড়ার অভিজ্ঞতা পাঠকের কাছে অনেক বেশি তৃপ্তির হয়ে উঠল। আগে তাঁরা যা দেখতে পেতেন না, এখন তা দেখতে পান। আগে যা পড়ে নিজেরা ব্যখ্যা করতে পারতেন না, তা ব্যখ্যা করতে পারছেন। বিনোদনের পাতার ভাষায় মাঠের দুর্ধর্ষ প্রতিযোগিতা সহজতর হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৯৮০ পেরুতে না পেরুতেই বাংলা সংবাদ জগতের ছাপাই লাইনো থেকে চলে গেল আধুনিকতম অফসেট টেকনলজিতে।

 

আরও পড়ুন, জেন্ডারঃ কী বুঝি – বুঝি কি?

এখান থেকেই বাংলা সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশনের সহজ সরলতার আড়ালে বাংলা সাংবাদিকতা তার দৌড়ের ট্র্যাক বদলাতে থাকে। সন্তোষকুমার যে-পন্থায় জগদ্দল সংবাদপত্রে গতি দিয়েছিলেন, একইসঙ্গে মালিকের মুখে হাসি ও পাঠকের মুখে তৃপ্তির স্বাদ এনে দিয়েছিলেন, তাঁর সেই পন্থাই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের হাতে কয়েক দশকেই সবকিছু তছনছ করে দিল। ক্রমপরিবর্তনশীল সমাজ ও রাজনীতিও অবশ্য বাংলা সাংবাদিকতাকে এই সময়ে বিভ্রান্তি আর জটিলতার জালে কম জড়িয়ে নেয় নি। সংবাদপত্র আর পাঠকের সাযুজ্যে বিস্তর ফাটল ধরিয়ে সাংবাদপত্র এখন একাই একশ। পাঠক তাঁদের গ্রহীতা মাত্র। দোকানি আর ক্রেতার সম্পর্ক যেমন।

সত্তরের শুরু থেকেই বাঙালির প্রতিষ্ঠান বিরোধী সাংস্কৃতিক চেতনা বদলে বদলে যাচ্ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী রাজনৈতিক চেতনায়। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বিপক্ষে ভাগ হতে শুরু করল সামাজিক বিন্যাস। সংবাদপত্র এই বিভাজনকে তাদের পাঠক মহলেও নিজ নিজ স্বার্থে উসকে দিতে থাকল। তারা এক এক পক্ষের পাঠকের চাহিদাকে মাথা রেখে সংবাদচয়ন, তার বিন্যাস এবং বয়ানে ভাষার ব্যবহারে যত বেশি সংখ্যক পাঠক ধরে রাখার নানা কৌশলে নিজেদের সাজাতে লাগল।

 

আরও পড়ুন- রমনার বটমূল কেঁপে উঠেছিল বিস্ফোরণে

নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে এই প্রক্রিয়ায় বাংলার সংবাদপত্র পাঠক লম্বালম্বি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তখন পথে ঘাটে হাতে ধরা কাগজ দেখেই শনাক্ত করা যেত কে কোন পক্ষের সমর্থক কিংবা কে কী ধরনের খবরে কতটা আগ্রহ বোধ করে। অর্থাৎ, সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোন পাঠকেরই আর কোন মাথাব্যথা রইল না। কাগজগুলিও এভাবে বিভাজিত পাঠকদের ধরে রাখার তাগিদে পাঠকদের পক্ষপাতের চিন্তনকে মদত দিতে নিজেদের সাজাতে লাগল। সংবাদে উল্লিখিত ঘটনা হয়ে উঠল বিশ্লেষণাত্মক। ঘটনা নয়, ব্যক্তি-সাংবাদিক হয়ে উঠল কাগজ আর তার পাঠকের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার মাধ্যম। এভাবেই ক্রমশ সংবাদপত্রের প্রতি পাঠকের বিশ্বাসযোগ্যতা এক সময়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকল। কমতে থাকল খবরের কাগজের পাঠক সংখ্যা। কাগজগুলো তখন ঘটনার বাস্তবতাকে বিনোদনের বিন্যাসে সাজাতে বাধ্য হল। যেকোন খবর পাঠই হয়ে উঠল উপভোগ্য।

আরও পড়ুন- হত্যা হাহাকারে – অপরাধসাহিত্যে বিনির্মাণ ও আধুনিকতা

ইতিমধ্যে অন লাইন খবরের কাগজ আবির্ভূত হল ব্যতিক্রম হিসেবে। গড়ে উঠল নিউজ পোর্টাল’, যেখানে বিনোদন নয়, বিশ্লেষণ নয়, শুধু খবরেরই প্রাধান্য। যেহেতু প্রকাশমাত্র অন লাইন কাগজ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে, এজন্য সেসব খবরের যথার্থতা, সত্যতা ও সঠিকতার প্রতি সব কাগজকেই একটু বেশিই যত্নবান হতে হয়। পাঠকদের সুবিধা, একটি খবরের সত্যতা যাচাই করার জন্য একাধিক সূত্রকে কাছে পাওয়ার সুবিধা। এটা শুভ খবর, বাংলাতেও অন লাইন সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ শুরু হয়েছে।

তবে এখনো বাংলায় স্বতন্ত্র্য অন লাইন খবরের কাগজ কিন্তু নেই বললেই চলে । এখনো আমরা অনলাইনে অধিকাংশ যা পাই, তা ছাপাই কাগজের অন লাইন এডিশন মাত্র, স্বতন্ত্র অনলাইন সংবাদপত্র নয়। তবে বাংলায় সংবাদপত্রের এই অভাবটিও খুব দ্রুত পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে বলে মনে করি।

 

Web Title: Journalism post edit feature arun chakrabarty

Next Story
জেন্ডারঃ  কী বুঝি – বুঝি কি?GENDER KI - SUMITA 1
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com