বড় খবর

চালকের আসনে মেয়ে, গেটে দাঁড়িয়ে বাবার হাঁক “আস্তে লেডিস আছে”

কল্পনাকে দেখলে প্রতিবেশীরা হাঁক দেয়, “কীরে ড্রাইভার, কই চললি”। প্রশ্ন শুনে কল্পনা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।

নোয়াপাড়া থেকে ধর্মতলা, রোজকার এই রুটেই ৩৪সি নিয়ে ছুটে বেড়ায় অষ্টাদশী কল্পনা মন্ডল। বিন্দু মাত্র ভয় নেই তাঁর চোখে মুখে। কল্পনার নরম হাতে বশ মেনেছে বাসের স্টিয়ারিং ও শক্ত গিয়ার। রোগা ছিপছিপে চেহারার মেয়েটির মনে রয়েছে অসীম সাহস। কল্পনার বাস চালানো দেখে তাজ্জব হয়ে যায় বাসের নিত্য যাত্রীরা। তাদের দৃষ্টিতে স্পষ্ট, কস্মিন কালেও ভাবেননি এমনটা হতে পারে।

প্রায় আট মাস হয়ে গিয়েছে বাস চালাচ্ছে কল্পনা। এখন অনেকটাই সাব্যস্ত। মাস খানেক আগে ফেসবুকে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বালি ব্রিজ ধরে ফাঁকা রাস্তায় জোরে বাস চালাচ্ছে একটি মেয়ে। নাম জানা নেই। কিন্তু একটি মেয়ের এমন বেনজির কৃতিত্ব মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে পড়ে সোশাল মিডিয়ায়। অগত্যা বহিঃপ্রকাশ হয় তাঁর পরিচয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলাকে কল্পনা হেসে বলেন, ” বন্ধুরা হঠাৎ ফোন করে বলে, ‘কী রে তোকে ফেসবুকে দেখলাম তো’, আমি অবাক হয়ে যাই, ভিডিও দেখে বুঝতে পারি একদিন বিয়ে বাড়িতে ভাড়ায় বাস নিয়ে গিয়েছিলাম সেখানেই একজন ভিডিওটি তোলে। সেটি ফেসবুকে আপলোড করেছে”।

নোয়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের কাছেই বাড়ি কল্পনা মন্ডলের। বাবা ছিলেন ৩৪সি বাসের চালক। ছোট থেকেই কল্পনা যে কোনও গাড়ি চালাতে ভালবাসে। সেই ভালবাসাকেই যে পেশা করে নিতে হবে তা কল্পনাই করতে পারেননি মা মঙ্গলা মন্ডল। কেরিয়ার গড়ার হিসেবে কেন বাস চালানোকেই বেছে নিলেন? কল্পনা বলেন, “বাস চালাব এমন কোনো ভাবনা চিন্তা ছিল না। এক দুর্ঘটনায় বাবার পায়ে লাগে। এরপর বাবার পক্ষে বাস চালানো সম্ভব হয়না। চিকিৎসা করানোর জন্য অনেক টাকা জোগাড় করতে হবে। অগত্যা, বাস চালানোর শখকে রুটিরোজগারের পথ করে নিলাম”।

বাবা মাকে কতটা পাশে পেয়েছেন? “গাড়ি চালানোর পিছনে বাবা আমার সব। ছোট থেকে বাবা আমায় হাতে ধরে বাস চালানো শিখিয়েছে। ছোট বেলায় যখন আবদার করতাম, বাবা কোলে বসিয়ে আমায় স্টিয়ারিং ধরতে বলতেন। কিন্তু কোনোদিন একা ছেড়ে দেননি। এখন বাবা আমার মাকে বলেন, ‘দেখেছ, মেয়ে হয়ে ছেলের মতো কাজ করে আমাদের কল্পনা’। আমার বাবা আমায় নিয়ে খুব গর্বিত”। বাস চালাতে গিয়ে কোনো কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে? “এমনিতে আমাদের বাস স্ট্যান্ডের লোকেরা খুবই ভালো। কিন্তু আমার বাবা সবসময় আমাকে শিখিয়েছেন, কে কী বলল তাতে কান দিবি না। নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যা। কেউ তো আমাদের আর খেতে দিতে আসবে না”।

কল্পনাকে দেখলে প্রতিবেশীরা হাঁক দেয়, “কীরে ড্রাইভার, কই চললি”। প্রশ্ন শুনে কল্পনা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। কল্পনার মা বলেন, “আমার মেয়ে খুব ডানপিটে। ও শুধু বাস চালাতে পারে এমনটা নয়। কল্পনা বাইক, তিন চাকার টেম্পো গাড়ি, চার চাকার গাড়িও চালাতে পারে। ওর ছোট থেকে গাড়ি চালানোর প্রতি খুব আগ্রহ। সেই আগ্রহ আর সাহসের জেরেই ও এগিয়ে গিয়েছে। আমাদের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল নয়। তাই পথ চলাটাও খুব কঠিন। যেদিন আমরা টেম্পো গাড়িতে মাল নিয়ে কালনা বা দূর দূরান্ত যাই, কল্পনাই চালিয়ে নিয়ে যায়। আমি পাশে বসে থাকি। ও নিজেই মাল নামায়, মাল তোলে। একদিন টায়ার পাংচার হয়ে গিয়েছিল। কল্পনা নিজেই, চাকা খুলে চাকা লাগিয়ে নিল। মাঝে মাঝে বাবাকে বাসের চাকা লাগাতেও সাহায্য করে”। শিখলে কীভাবে? কল্পনা জানায় “দেখে দেখেই শিখেছি। আর বাবা তো আছেনই। রাস্তায় অসুবিধা হলে কী করব আর। নিজেই করেনি”।

কল্পনার বাবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলাকে জানিয়েছেন, আমার ছেলে নেই বলে কোনো দুঃখ নেই। অনেকে অনেক কথা বলে, কিন্তু আমি আমার মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। আমি চাই আমার মেয়ে পুলিশের গাড়ি চালাবে। কল্পনাও সেই ইচ্ছের কথা প্রকাশ করে। কিন্তু এরই মাঝে কল্পনা জানায় আমার ট্রেন চালানোর ইচ্ছাও আছে।

দুপুর গড়াতেই মায়ের সঙ্গে স্ট্যান্ডে চলে আসে কল্পনা। বাসে পেছনের আসনে থাকেন বাবা। গাড়ি চালানোর সঠিক পরামর্শও দিতে দেখা যায়। আর কেবিনে একেবারে সামনের দিকে বসে থাকেন মা। বাবা গেটে দাঁড়িয়ে মেয়েকে হাঁক দেন “আস্তে লেডিস আছে”। বাসে উঠে যারা কেবিনে গিয়ে বসেন তারা অবাক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন কল্পনার দিকে। যাত্রী শ্যামলি বিশ্বাস টবিন রোড থেকে উঠে, সিটে বসার আগেই চালকের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যান। তারপর বলে ওঠেন, “মেয়েরা দূর্গার আরেক রূপ, মেয়েরাই পারে সমস্ত কঠিন দায়িত্ব সামলাতে, ওকে দেখে ষাট বছর বয়সে আমার মন জুড়িয়ে গেল”। কল্পনাতীত কল্পনাকে ক্যামেরাবন্দি করলেন বাসের বাকি যাত্রীরা। কিন্তু, রাস্তা থেকে কল্পনার তীক্ষ্ণ নজর এক বিন্দু সরল না।

Web Title: Womens day 2020 34c bus driver kalpana mandal

Next Story
করোনার বিড়ম্বনা, ফিট সার্টিফিকেট ছাড়া হাজিরায় নিষেধাজ্ঞা কলকাতার কিছু সংস্থার!
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com