/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/26/bengali-millionaire-merchant-2025-11-26-03-16-29.jpg)
Bengali Millionaire Merchant: ব্যবসায় ভারতকে পথ দেখিয়েছেন যে বাঙালি শিল্পপতি।
Bengali Millionaire Merchant: আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী নাম হল রামদুলাল সরকার। অষ্টাদশ শতকের বাংলায় বাণিজ্য তখন ছিল মূলত ইউরোপীয় শক্তিদের হাতে, তখন এক সাধারণ ঘরের বাঙালি যুবক নিজের সাহস, সততা ও দূরদর্শিতায় বাঙালির বাণিজ্যের ইতিহাসে তৈরি করেছিলেন এক নতুন অধ্যায়। তিনি শুধু বাংলার প্রথম কোটিপতি নৌ-বণিকই নন, বরং প্রথম ভারতীয় যিনি নিজের জাহাজ নিয়ে সাত সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন আমেরিকার উপকূলে। আজকের দিনে বাংলার নৌআধিপত্য বলতে যে গর্বের অনুভূতি জাগে, তার সূচনা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। তাঁর নামেই রয়েছে উত্তর কলকাতায় রামদুলাল সরকার স্ট্রিট।
শৈশবে রামদুলাল
শৈশবে রামদুলালের পারিবারিক পদবী ছিল ‘দে’, উপাধি ছিল ‘সরকার’। দারিদ্র্য এবং অস্থির শৈশব তাঁকে খুব অল্প বয়সেই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পিতামাতাকে হারিয়ে মামাতো দাদুর সঙ্গে কলকাতায় এসে তিনি আশ্রয় পান হাটখোলার দত্তবাড়িতে। মদনমোহন দত্তের আশ্রয়ে থেকে তিনি লেখাপড়া শেখেন এবং ধীরে ধীরে দক্ষ লিপিকরের পরিচয় তৈরি করেন। জীবনের প্রথম উপার্জন ছিল মাত্র পাঁচ টাকা, কিন্তু সেই সামান্য আয়ের মধ্যেও তিনি দায়িত্বশীলতা ও সততার পরিচয় দিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন- শরীর ঠিক রাখতে দুধ খাচ্ছেন? কারা এড়িয়ে চলবেন দুধ, জানুন বিস্তারিত
যে ঘটনা তাঁর ভাগ্য বদলে দেয় তা প্রায় অবিশ্বাস্য। নিলামে পাঠানো হলে তিনি দেরিতে পৌঁছনোর কারণে মূল পণ্য পাননি। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে ধরিয়ে দেয় এক জাহাজ। সেটি কিনে পরে এক ইংরেজ বণিকের কাছে তিনি কয়েকগুণ দামে বিক্রি করেন। পাওয়া বিপুল টাকা তিনি এক পয়সা কম না করে ফিরিয়ে দেন দত্তকে। এমন সততা দেখে দত্ত তাঁকে এক লক্ষ টাকার মূলধন দেন নিজের ব্যবসা শুরু করার জন্য। এখান থেকেই শুরু হয় রামদুলালের নৌ-বাণিজ্যের যাত্রা, যা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় নৌবাণিজ্যের ইতিহাসে স্থায়ী দাগ রেখে গিয়েছে।
আরও পড়ুন- গোলাবাড়ির মটন কষা রেসিপি, ঘরেই পান কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁর রান্নার স্বাদ
প্রথমে পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন হ্যানার সঙ্গে বাণিজ্যে সাফল্য পেলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় যখন আমেরিকান বণিকেরা বঙ্গোপসাগর হয়ে কলকাতায় আসা শুরু করে। ১৭৯৫ সাল থেকে তিনি হয়ে ওঠেন তাঁদের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মুৎসুদ্দি। ১৮০০ সাল পর্যন্ত আমেরিকার যে কোনও জাহাজ কলকাতায় এলে তার প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব পড়ত রামদুলালের ওপর। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতার প্রথম দিকের ক্লিয়ারিং ও ফরোয়ার্ডিং সংস্থা এবং নিজের চারটি জাহাজ নিয়ে নিয়মিত ব্যবসা চালাতেন—কমলা, বিমলা, ডেভিড ক্লার্ক এবং রামদুলাল। তাঁর জাহাজগুলো গঙ্গার মোহনা থেকে শুরু করে আটলান্টিক পেরিয়ে পৌঁছে যেত মার্কিন উপকূলে, যা সেই সময়ের হিসেবে এক অনন্য কীর্তি।
আরও পড়ুন- কতক্ষণ আছে বিবাহ পঞ্চমী, এই তিথিতে কোন নৈবেদ্য দিলে পুণ্য ও বৈবাহিক সুখ মেলে?
আমেরিকান বণিকদের কাছে তাঁর গুরুত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় একটি বিশেষ উপহারে। তাঁরা প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের একটি তেলচিত্র বিশেষভাবে আঁকিয়ে পাঠিয়েছিলেন রামদুলালকে। তিনি শুধু একজন দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন না, বরং ছিলেন সমাজসংস্কারক ও মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ একজন দাতা। তিনি হিন্দু কলেজের (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠায় অর্থসাহায্য করেন, মাদ্রাজের দুর্ভিক্ষে সাহায্য পাঠান, আয়ারল্যান্ডে ভয়াবহ বন্যায় ত্রাণ পাঠান, বেলগাছিয়ায় অতিথিশালা তৈরি করেন এবং বারাণসীতে ১৩টি শিবমন্দির নির্মাণে উদ্যোগ নেন। রক্ষণশীল সমাজের বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি নিজের বাড়ির দুর্গাপুজোয় পশুবলি বন্ধ করেছিলেন—যা তখনকার যুগে সত্যিই ছিল অভূতপূর্ব সাহস।
আরও পড়ুন- শীতে নাক-বন্ধ, কাশি-সর্দি? ঘরেই আছে মহৌষধ! এই ৫ দারুণ টোটকায় বাজিমাত!
প্রতিদিন তাঁর অতিথিশালায় অসংখ্য দুঃস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হত। সমাজের প্রতি তাঁর এই দায়িত্ববোধ তাঁকে শুধু একজন ব্যবসায়ী নয়, বরং মানবিকতার স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। ১৮২৫ সালে ৭৩ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তীতে তাঁর দুই পুত্র আশুতোষ এবং প্রমথনাথ, যাঁরা ছাতুবাবু এবং লাটুবাবু নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁর বিশাল ব্যবসা সামলাতে ব্যর্থ হন, কিন্তু তারপরও রামদুলাল সরকারের কৃতিত্ব আজও বাঙালি সমাজে অমর হয়ে আছে।
রামদুলাল সরকার ছিলেন এমন এক অগ্রদূত, যিনি বাঙালির বাণিজ্যিক মানসিকতাকে নতুন আলো দেখিয়েছিলেন। তাঁর জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে যে সততা, শ্রম, সাহস ও দূরদৃষ্টি মিলেই গড়ে ওঠে সত্যিকারের সাফল্য। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম আন্তর্জাতিক নৌ-বণিক, আধুনিক বাণিজ্যের পথিকৃৎ এবং সমাজসেবার অনন্য প্রতীক। তাঁর গল্প আজও অনুপ্রেরণা দেয়—কেননা তিনি যে কাজে হাত দিতেন, সেখানেই সোনা ফলত।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us