/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/25/narayan-debnath-2025-11-25-03-36-45.jpg)
Narayan Debnath: নারায়ণ দেবনাথ।
Comics Legend Narayan-Debnath: বাংলা কমিকসের যাত্রা বলতে যে নামটি প্রথমেই মনে আসে, তিনি নিঃসন্দেহে কমিকস কিংবদন্তি (Comics Legend) নারায়ণ দেবনাথ। ১৩ নভেম্বর ১৯২৫ সালে হাওড়ার শ্রীরামপুরে জন্ম নেওয়া এই অনন্য প্রতিভাবান শিল্পীই Bengali Comics–কে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার গ্রাফিক স্টোরিটেলিং জগতে অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জন্মদিন এলেই স্মৃতিতে ভেসে ওঠে একটি রঙিন পৃথিবী—হাঁদা-ভোঁদার দুষ্টুমি, নন্টে-ফন্টের হাস্যকৌতুক, আর অদম্য শক্তির অধিকারী বাঁটুল দি গ্রেট। বাংলা শিশু-কিশোরদের বিনোদনের ইতিহাসে এ চরিত্রগুলো শুধু পাতা নয়, সময়কেও ছাপিয়ে টিকে থাকা সাংস্কৃতিক সম্পদ।
গয়নার দোকানে বসে শিল্পীজীবনের শুরু
নারায়ণ দেবনাথের শিল্পীজীবন শুরু হয় পরিবারের গয়নার দোকানে বসে নকশা আঁকার মধ্য দিয়ে। ছোটবেলা থেকেই চোখে ছিল কারুকার্যের সূক্ষ্মতা আর চিত্রকল্পের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। পরবর্তীতে আর্ট স্কুলে ভর্তি হলেও তাঁর প্রকৃত শিক্ষালয় ছিল নিজের কল্পনার অবাধ বিস্তৃতি। তাঁর প্রতিটি চরিত্র শুধুই আঁকা ছবি নয়, বরং বাঙালি সমাজের ভিতরকার হাসি, রসিকতা, ধূর্ততা, বুদ্ধিমত্তা আর মানবিকতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ঠিক এই কারণেই তাঁর সৃষ্টিগুলো কখনোই পুরোনো হয় না; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একই আবেগে ফিরে পড়ে ছোটরা।
আরও পড়ুন- ভারতের সবচেয়ে মূল্যবান ১০ ব্র্যান্ড, নতুন তালিকায় বিরাট চমক!
১৯৬২ সালে জন্ম নেয় হাঁদা-ভোঁদা—বাংলা কমিকসের ইতিহাসে এটি একটি বিপ্লবী সূচনা। দুই অদ্ভুতুড়ে চরিত্রের অগাধ অযৌক্তিক কাণ্ডকারখানার মধ্যেও লুকিয়ে ছিল তীক্ষ্ণ রসবোধ ও চটুল সামাজিক ব্যঙ্গ। পাঠকের হাসির জগৎকে এই সিরিজেই প্রথম ঝলক দেখিয়েছিলেন এই কার্টুন স্রষ্টা। এরপর আসে ১৯৬৫ সালের সেই ঐতিহাসিক দিন—কলেজ স্ট্রিট থেকে ট্রামে ফেরার পথে হঠাৎ মাথায় আসে এক চরিত্রের ধারণা। সরু পা, বিশাল বুক আর অদ্ভুত শক্তির অধিকারী সেই চরিত্রের নাম—‘বাঁটুল দি গ্রেট’। বাংলা সুপারহিরোর ধারণায় এ ছিল এক অনন্য মাইলস্টোন। তখনকার সময়ে বাংলা শিশুসাহিত্যে সুপারহিরোর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। আর সেই শূন্যতা পূরণ করেন বাঁটুল। পরবর্তীতে বাঁটুল হয়ে ওঠে বাংলা কমিকস সংস্কৃতির এক চিরকালীন ‘আইকন’।
আরও পড়ুন- পরেশনাথের জৈন মন্দির! শান্তি, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব ঠিকানা
১৯৬৯ সালে জন্ম নেয় নন্টে-ফন্টে। হোস্টেল জীবনের হাস্যরস, দৌড়ঝাঁপ, দুষ্টুমি আর সুপারিনটেনডেন্ট এবং কেল্টুদার অদ্ভুত কাণ্ড-কারখানা যেন বাঙালি কিশোরজীবনের অভিজ্ঞতাই কার্টুনের রূপে উঠে এসেছে। এই আইকনিক চরিত্রগুলোর (Iconic Characters) মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, বাঙালির হাস্যরসের জগৎ অত্যন্ত ব্যাপক, আর কমিকস সেই হাসির সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। শুধু প্রধান সিরিজই নয়, ‘বাহাদুর বহরাম’, ‘ড্যানটান’, ‘কাটুল মিয়া’—এমন আরও বহু কাজ তিনি সৃষ্টি করেছেন, যেগুলো বাংলা গ্রাফিক সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর প্রতিটি কাজেই ছিল প্রখর পর্যবেক্ষণশক্তি, নিখুঁত রেখাচিত্র, বাঙালির সাধারণ জীবনের মাটির গন্ধ। তাই শুধু একজন কমিকস শিল্পী নন, ছিলেন গ্রাফিক স্টোরি টেলিং (Graphic Storytelling)–এর পুরোধা।
আরও পড়ুন- দাঁত বা মাড়ির সমস্যায় ভুগছেন, জানেন অবহেলায় কী হতে পারে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, তিনি প্রাপ্য সম্মান জীবনের পরবর্তী পর্যায়েই পেয়েছেন—বঙ্গবিভূষণ, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং জীবনের শেষ অধ্যায়ে পদ্মশ্রী। সেই স্বীকৃতি তাঁর সৃষ্টির বিশালতার তুলনায় হয়তো অনেকটাই দেরিতে এসেছে, কিন্তু তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত স্বভাবের, প্রচারের আলোয় আসতে কখনো চাননি। তাঁর সবথেকে বড় পরিচয় তাঁর সৃষ্টি—যা আজও বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরও পড়ুন- আটা মেখে ফ্রিজে রেখে দিচ্ছেন, জানেন আপনার কী হতে পারে?
নারায়ণ দেবনাথ নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট জগৎ এখনও জীবন্ত, শ্বাস নেয়, কথা বলে। হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে, বাঁটুল দি গ্রেট—এসব শুধু চরিত্র নয়; বাঙালির শৈশব, হাসির স্মৃতি, আবেগ আর সময়ের সাথী। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে বাংলা কমিকসের গৌরবকে স্মরণ করা। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান অমলিন থাকবে।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us