বড় খবর

ওরা কাজ করে: পুজোয় শরীর বিগড়োলে চিন্তা নেই, ওঁরা পাশে আছেন

“বাড়িতে থাকলে যেভাবে আনন্দ করি, এখানে এলে সেসব মনে হয় না। জেনেশুনেই তো এই পেশা বেছেছি। ফলে এটা তো মেনে নিতেই হবে। হাসপাতালে এলে আর কিছু মনে হয় না।”

kolkata medical, কলকাতা মেডিক্য়াল

ঢাকের আওয়াজ নেই। রংবেরঙের আলো নেই। ধূপধুনোর গন্ধ নেই… আছে শুধু ওষুধের গন্ধ। বেডে শুয়ে রয়েছেন রোগীরা। যাঁদের এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ ছাড়া করছেন না ওঁরা। কারও গলায় স্টেথোস্কোপ, কারও পরনে অ্যাপ্রন, কেউবা আবার ইউনিফর্ম পরে প্রতিমুহূর্তে রোগীদের শুশ্রুষা করে চলেছেন। একে অন্যের দিকে তাকানোর পর্যন্ত ফুরসত নেই। ওঁদের জীবনে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী বলে কিছু নেই। সবদিনই যেন একরকম। তবুও মানুষের সেবা সামলে যতটুকু সময় মেলে, তাতেই হয়ে যায় ঠাকুর দেখা।

পুজো কেমন কাটছে? প্রশ্ন শুনেই এসএসকেএম হাসপাতালের কার্ডিও মেডিসিন বিভাগের এক কর্মী হেসে বললেন, “দুঃখে কাটছে। সারাদিন তো কাজই করছি।” ওই কর্মীরই পাশে বসে এক রোগীকে ডিসচার্জ করতে করতে নার্স নিরুপমা তিওয়ারি বললেন, “পুজোর সময় কাজ করতে কান্না পায়। কিন্তু কাজ তো করতেই হবে। পুজো বলে তো আর মানুষ অসুস্থ হবেন না তা নয়।” পুজোয় ছুটি পান‍? ঠাকুর দেখা হয়? উত্তরে নিরুপমা বললেন, “দুদিনের ছুটি পাই। রোটেশন করে হয়। বাকি দিনগুলো কাজ করতে হয়। বিভিন্ন শিফটে কাজ হয় আমাদের। ধরুন যেদিন মর্নিং শিফট, সেদিন হয়তো সকাল সকাল কাজ করে ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে ঠাকুর দেখতে গেলাম। এভাবেই কেটে যায়।”

আরও পড়ুন: আমার দুর্গা: সুবাসিনী মিস্ত্রী

হাসপাতালের ওই বিভাগেরই আরেক নার্স ব্রততী শর্মা বললেন, “এখানে এলে পুজোর কথা ভুলে যাই। তবে হ্যাঁ, হাসপাতালে আসার পথে যখন রাস্তায় সবাইকে দেখি ঠাকুর দেখতে যাচ্ছেন, তখন একটু মন কেমন করে। দুদিন ছুটি পাই, ওই দিনগুলোতে একদম নো-টেনশন।” ওই বিভাগের এক সিস্টার বললেন, “বাড়িতে থাকলে যেভাবে আনন্দ করি, এখানে এলে সেসব মনে হয় না। জেনেশুনেই তো এই পেশা বেছেছি। ফলে এটা তো মেনে নিতেই হবে। হাসপাতালে এলে আর কিছু মনে হয় না। যেদিন ছুটি পাই, পরিজনদের সঙ্গে সময় কাটাই। তাছাড়া সহকর্মীদের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে শিফট নিয়ে নিই, যাতে মর্নিং বা ইভনিং শিফট করে বেরিয়ে কয়েকটা ঠাকুর দেখতে পারি।”

পুজোর ছুটির কথা জিজ্ঞেস করতেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পেডিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগের এক রেসিডেন্ট চিকিৎসক বললেন, “আমরা বরাবরই অন্যের কথা ভাবি। নিজেদের সম্পর্কে খুব কম ভাবি। আমরা সবাই রোগীদের কথা প্রথম ভাবি। ঈদ হোক কী পুজো কী ক্রিসমাস, সবতেই রোগীদের প্রায়োরিটি আগে।” ওই চিকিৎসক আরও বললেন, “যখন চারদিকে এত ভিড় দেখি, তখন একটু মন খারাপ করে।” এ প্রসঙ্গে এসএসকেএমের আরেক চিকিৎসক বললেন, “আমাদের কোনও অপশন নেই। ইচ্ছে তো করে ঠাকুর দেখতে। কিন্তু কিছু করার নেই।” এসএসকেএমের লিভার রিসার্চ ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক সীমন্তী দত্ত কাজ করতে করতে বললেন, “ঠাকুর দেখা, কাজ, দুটোই হয়। পরিবারকে তো সময় দিতেই হয়। তবে কাজটাও করতে হয়।” ঈদে ছুটি পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পুজোয় এবার ছুটি পাননি কলকাতা মেডিক্যালের আরেক চিকিৎসক। তিনি বললেন, “ঈদে ছুটি নিয়েছিলাম। তবে পুজোয় কাজ করছি।”

আরও পড়ুন: আমার পুজো: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়

এসএসকেম হাসপাতালের নার্সদের মতোই পুজোর আনন্দ গায়ে মেখে কর্তব্যে অবিচল কলকাতা মেডিক্যালের নার্সরাও। পুজোর আনন্দ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনজন নার্স একসঙ্গে জানালেন, “দুদিন করে ছুটি পাই। তবে বাকি দিনগুলো এখানে রোগীদের সঙ্গে সময় কাটাই। আমরা মানসিক ভাবে তৈরি হয়েই এই পেশায় এসেছি। ভালও লাগে রোগীদের সঙ্গে থাকতে।”

শুধু চিকিৎসক বা নার্সই নন, হাসপাতালের কর্মীদের পুজোও কাটে হাসপাতাল চত্বরেই। উমাশংকর বৈদ্য নামে এসএসকেএম হাসপাতালের এক নিরাপত্তাকর্মী যেমন বললেন, “শিফটিং ডিউটি থাকে। শিফটের সময় দেখে ঠাকুর দেখতে যাই। পুজোয় কাজ করতে মন খারাপ তো হয়ই। কিন্তু কাজ তো করতেই হবে।” এসএসকেএম হাসপাতালের এক আয়া, নাম মিনা কুরেশি। তিনি বললেন, “পুজোয় তো কাজ করি, ছুটি নিই না। কাজ করলে টাকা পাই। আমি একা সংসার চালাই। তাই ছুটি নিই না।”

পুজোয় ছুটি নেন না কলকাতা মেডিক্যালের তিন কর্মী লক্ষ্মী মল্লিক, রিনা মল্লিক, দেবন্তী দেবীও। পুজোর সন্ধ্যেয় কাজ বোধহয় কিছুটা কম ছিল, কিংবা কিছুক্ষণ ফুরসত পেয়েছিলেন। তাই তিনজনে বসে আড্ডা মারছিলেন। পুজোর কথা বলতেই বললেন, “কাজ তো করতে হয়। কাজ করলে টাকা পাব। তাই ছুটি নিই না। ভাল লাগে কাজ করতে।”

kolkata medical, কলকাতা মেডিক্য়াল
ষষ্ঠীর সন্ধ্যেয় রোগীর পরিজনদের ভিড়। ছবি: সৌরদীপ সামন্ত

আরও পড়ুন: আমার দুর্গা: দ্য উইনার্স

পুজোয় নাইট ডিউটি! একে তো ছুটি নেই তারপর আবার নাইট শিফট! যে কেউ আঁতকে উঠবেন। কিন্তু নাইট শিফট করেও কীভাবে প্যান্ডেল হপিং করেন তিনি, সেই কাহিনীই শুনিয়েছেন বি সি রায় শিশু হাসপাতালের স্টাফ নার্স অনন্যা দাস। তিনি বললেন, “কিছুটা মন তো খারাপ করেই, এটা তো খুব স্বাভাবিক। তবে নাইট শিফট করে সকালে বাড়ি ফেরার পথে বন্ধুদের সঙ্গে ১০টা প্যান্ডেলে ঘুরছি, তখন বেশ মজা লাগে। তাছাড়া নাইট শিফটে হাসপাতালে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতেও ভাল লাগে।”

উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের হাউস সার্জেন সৌর্য্যদীপ সরকার বললেন, “আমরাও চাই পুজোয় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে। কিন্তু পুজোর সময় যখন আপনারা ঠাকুর দেখছেন, তখন হয়তো আমরা অপারেশন থিয়েটারে, বা রোগী দেখছি। এজন্য কোনও নালিশ বা ক্ষোভ নেই। আমরা সবসময় আপনাদের পাশে আছি।”

পুজোয় যখন গোটা শহর উৎসবের মুডে রয়েছে, সেখানে এসএসকেএম হাসপাতাল চত্বরে উৎসবের ছিঁটেফোঁটা রেশও ধরা পড়ল না। কাতারে কাতারে রোগীর পরিজনদের ভিড়, স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে চিকিৎসকদের ব্যস্ততা, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রোগীদের পাশে সিস্টাররা। শুধু এসএসকেএমই নয়, কলকাতা মেডিক্যালেও একই ছবি। শুধু কলকাতা কেন, রাজ্যের সব হাসপাতালে গেলে বোধহয় একই ছবি চোখে পড়বে। কারণ ওঁদের ছুটি নেই, ওঁরা কাজ করে চলেছেন।

Web Title: Durga puja 2018 kolkata doctors hospitals sskm kolkata medical

Next Story
Delhi Durga Puja 2018: দিল্লিওয়ালা দুর্গাপুজো- ষষ্ঠী
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com