/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/22/hemanga-biswas-2025-11-22-03-31-05.jpg)
Hemanga Biswas: হেমাঙ্গ বিশ্বাস।
Legendary Folksong Singer: গানের টানে বাড়ি ছেড়েছিলেন জমিদারবংশের ছেলে হেমাঙ্গ বিশ্বাস। জন্মেছিলেন ১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট জেলার মিরাশী গ্রামে। পরিবার ছিল অভিজাত, কিন্তু তার ভেতরে সঙ্গীতচর্চার বিশেষ পরিবেশ ছিল না। তবুও শৈশব থেকেই তাঁর মনে গানের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করত। সেই আকর্ষণ ধীরে ধীরে রূপ নেয় জনতার গান, মুক্তির গান, শ্রেণিসংগ্রামের গানে। বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসে যে কয়েকজন শিল্পী নতুন ধারা ও নতুন চেতনার জন্ম দিয়েছেন—হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁদের অন্যতম শ্রেষ্ঠই শুধু নন, পথিকৃৎ।
হবিগঞ্জ হাইস্কুলে পড়াশোনা শেষ করে শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হন তিনি। এ সময় দেশের রাজনীতিতে প্রবল আন্দোলন, বিক্ষোভ, স্বাধীনতার দাবিতে মানুষের রাস্তায় নামা তাঁর মনে জন্ম দিয়েছিল বিপ্লবী চেতনার। সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর সংগ্রামের হাতিয়ার—এ বিশ্বাস তাঁকে ক্রমশ মানুষের আরও কাছে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার আগে থেকেই রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার এবং প্রগতিশীল আদর্শের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৩২ সালে যুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টির কাজে। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাঁকে দু’বার কারাবরণ করতে হয়—একবার ১৯৩৫ সালে, আবার ১৯৪৮ সালে। কারাবাসের কঠোর পরিবেশে যক্ষায় আক্রান্ত হলেও, তাঁর মনোবল ভাঙেনি। বরং সংগ্রামের আগুন আরও তীব্র হয়ে ওঠে তাঁর ভেতরে।
আরও পড়ুন- মানুষের দুঃখ, কষ্ট, প্রার্থনা, এসব কি সত্যিই ভগবানের কাছে পৌঁছায়? কী বলছেন প্রেমানন্দ মহারাজ?
১৯৩৮–৩৯ সালে দেশজুড়ে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্বপ্নে যাত্রা শুরু করে ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ বা IPTA। বিনয় রায়, দেবব্রত বিশ্বাস, নিরঞ্জন সেনদের সঙ্গে এই সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-শিল্পী হিসেবে হেমাঙ্গ বিশ্বাস দ্রুত এগিয়ে আসেন। সুর ও গানের যে নতুন ভাষা IPTA নির্মাণ করেছিল—লোকগানের সুরে গণচেতনার মিলন—তার প্রধান স্রষ্টাদের একজন ছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন- শীতের কামড় থেকে কীভাবে নিরাপদে রাখবেন আদরের পোষ্যকে? জানুন ৫টি সিক্রেট টিপস
১৯৪২ সালে প্রথম কলকাতায় আগমন তাঁর জীবনের বড় পরিবর্তন। প্রগতিশীল শিল্পীদের ডাকেই তিনি কলকাতায় যান এবং শিগগিরই গণসংগীতের এক অনন্য মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর গান—'তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান', 'কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে'—তখন আসাম ও বাংলার শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল মানুষের ব্যথা, মানুষের রাগ, মানুষের মুক্তির সুর।
আরও পড়ুন- বাড়ির এই দিকে পূর্বপুরুষদের ছবি রাখবেন না, জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠবে
লোকসংগীত থেকে গণসংগীত—এই দুই ধারার মাঝে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক নতুন সেতু। বাংলা ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ঝুমুর, বাউল, জারি-সারি—গ্রামীণ বাংলার প্রকৃত স্বরকে তিনি রাজনৈতিক চেতনায় রাঙিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর সুরে নদী, খেত, মাঠ, শ্রমিকের ঘাম, মেহনতি মানুষের বেদনা—সবকিছুই পাওয়া গিয়েছে। তাঁর গান ছিল সংগ্রামের অস্ত্র, প্রতিবাদের ভাষা। 'বাঁচবো বাঁচবোরে আমরা, ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া নয়া বাংলা গড়বো'—এই উচ্চারণে যে আগুন ছিল, তা আজও আন্দোলনে গাওয়া হয় একই তীব্রতায়।
আরও পড়ুন- বাড়ির এই দিকে রাখুন হনুমানজির ছবি, একমাসেই 'ম্যাজিক' দেখুন
লোকগানের গভীর শেকড় সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল অসাধারণ। রাঢ় বঙ্গের ঝুমুর, বরেন্দ্র অঞ্চলের ভাওয়াইয়া, বাউল-ফকিরের সহজ-সরল সুর—এসব ধারাকে তিনি মিলিয়ে তৈরি করেছিলেন গণসংগীতের নিজস্ব রূপ। হাছন রাজা থেকে মুর্শিদী গানের সুর পর্যন্ত তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে নতুন প্রকাশ, নতুন শক্তি।
আরও পড়ুন- বাড়ির এই দিকে রাখুন হনুমানজির ছবি, একমাসেই 'ম্যাজিক' দেখুন
তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—'আমরা করবো জয়', 'তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা', 'উদয় পথের যাত্রী ওরে ছাত্রছাত্রী', 'তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান', 'হায় হায় ঘোর কলিকাল', 'বাঁচবো বাঁচবোরে আমরা', এবং প্রতিবাদের প্রতীকী লাইন—'ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না।' তাঁর রচিত বিখ্যাত চরণ—হবিগঞ্জের জালালী কইতর, সুনামগঞ্জের কুরা, সুরমা নদীর গাংচিল, আমি শুন্যে দিলাম উড়া—এ যেন তাঁর নিজের জীবনের ছবি। এক বুক স্বাধীনতা নিয়ে, গানের ডানায় ভর করে তিনি আজীবন উড়েছেন মানুষের পথে পথে।
শিল্পী, রাজনৈতিক যোদ্ধা
শিল্পী হিসেবে, রাজনৈতিক যোদ্ধা হিসেবে, গণসংগীতের প্রহরী হিসেবে, মানুষের অধিকারের কণ্ঠস্বর হিসেবে—হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন এক চলমান ইতিহাস। তাঁর জীবন শুধু সংগীত নয়, ছিল সংগ্রাম, ছিল পথচলা, ছিল মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। ১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর গান আজও শ্রমজীবী মানুষের রক্তে, প্রতিবাদী কণ্ঠে, মিছিলের ভিড়ে, পাহাড়-নদী-সমুদ্রে প্রতিধ্বনিত হয়। মানুষের মুক্তির গান যতদিন থাকবে, গণসংগীতের যোদ্ধা হেমাঙ্গ বিশ্বাস ততদিন বেঁচে থাকবেন।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us