/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/20/kali-bandyopadhyay-1-2025-11-20-01-31-23.jpg)
Kali Bandyopadhyay: কালী বন্দ্যোপাধ্যায়।
Kali Bandyopadhyay Legacy: বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এমন কিছু নাম আছে যাঁদের উপস্থিতি শুধু অভিনয়ের পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সময়কে অতিক্রম করে তাঁরা হয়ে উঠেছেন এক অনন্য ইতিহাস। আজ তাঁদেরই একজন, কিংবদন্তি অভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে বাংলা চলচ্চিত্র, নাট্যমঞ্চ এবং সমাজজীবনের এক বিশাল অধ্যায়কে ছুঁয়ে দেখা।
ছোট থেকেই কঠোর সংগ্রাম
২০ নভেম্বর ১৯২১ সালে কলকাতার কালীঘাটে জন্ম নেওয়া এই অসামান্য শিল্পী খুব ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু সেই কঠিন পথই তাঁকে গড়ে তুলেছিল এক গভীর পর্যবেক্ষণশীল, সত্যনিষ্ঠ ও মানবসংবেদনশীল শিল্পীতে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল তাঁর চরিত্রে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা। তিনি যে চরিত্রই করতেন, সেটিকে নিজের শরীর, স্বর, আবেগ ও অভিজ্ঞতায় এমনভাবে রূপ দিতেন যে পরিচালক, সহ–অভিনেতা এবং দর্শক সকলেই সেই চরিত্রের ভেতরে তাঁর মধ্যে এক বাস্তব মানুষকে দেখতে পেতেন। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিংহ, অজয় কর—বাংলার সব শ্রেষ্ঠ নির্মাতাদের সঙ্গে তাঁর কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রতিটি পরিচালকের কাছেই তিনি ছিলেন ভরসার মুখ।
আরও পড়ুন- শীতকালে শরীর গরম রাখবে এই দেশি খাবার, একবার বানালেই চলবে গোটা মাস!
১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া ডাকহরকরা তাঁর অভিনয়জীবনে এক ঐতিহাসিক বাঁক তৈরি করে। এই ছবিটি শুধু জাতীয় পুরস্কারই পায়নি, বরং প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে মস্কো টিভিতে প্রদর্শিত হয়েছিল। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় ছিল নিখুঁত বাস্তবতার এক অসাধারণ উদাহরণ। পাশাপাশি পরশপাথর, অযান্ত্রিক, নীল আকাশের নীচে, তিন কন্যা, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, লৌহকপাট, ক্ষুধা—প্রতিটি ছবিতেই তিনি দেখিয়েছেন চরিত্রাভিনয়ের নতুন দিশা।
আরও পড়ুন- শীতে পান করলেই দূর হয় সর্দি-কাশি, ঘরে সহজে বানানো যায়, এই স্যুপ কাজ করে আয়ুর্বেদিক ওষুধের মত!
তবে এমন সাফল্যের আড়ালে ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। শুরুর দিকে ‘বরযাত্রী’, ‘রিকশাওয়ালা’, ‘টনসিল’-এর মতো ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয় করেও তিনি নিয়মিত কাজ পাচ্ছিলেন না। জীবনের এমন এক কঠিন সময় এসেছিল যখন তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন এবং আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। ঠিক সেই সময়েই তাঁর পাশে দাঁড়ান নির্মাতা সরোজ দে, যাঁর হাত ধরেই আসে তাঁর স্বপ্নময় সাফল্য।
আরও পড়ুন- এটা এমন এক প্রাণী, যার বিষের প্রতিষেধক আজও তৈরি করতে পারেনি বিজ্ঞান!
কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের বিতর্কিত একটি অধ্যায় ছিল মৃণাল সেনের এক নিষিদ্ধ ছবিতে চৈনিক চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি। সে সময় তিনি চায়না টাউনে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের রোষের শিকার হন। তাঁকে পুলিশি চর ভেবে গণধোলাইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল লোকজন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের পুরনো ছবির অ্যালবাম দেখিয়ে এবং এক প্রবীণ চিনেম্যানের সাহায্যে সেই বিপদ থেকে রক্ষা পান। এই ঘটনা তাঁর জীবনকে যেমন বিপদে ফেলেছিল, তেমনই তুলে ধরেছিল তাঁর চরিত্রাভিনয়ের প্রতি একাগ্রতা ও সাহসকে।
আরও পড়ুন- শোবার ঘরে ভুলেও এই জিনিসগুলো রাখবেন না, ছড়াবে অশান্তি!
গণনাট্য সঙ্ঘের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি সমাজমনস্ক, প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে যেমন মানুষের শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে, তেমনি সমালোচনা ও বিতর্কও ডেকে এনেছে। ১৯৮৯ সালের তিয়েনানমেন স্কোয়ারে গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় তাঁর মন্তব্য বহু আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরল, সহজ ও শিশুসুলভ।
শুটিং স্পটে যখন সবাই আড্ডায় ব্যস্ত, তখন তিনি এক কোণে হ্যারিকেনের আলোয় বই পড়তেন—এটাই ছিল তাঁর নেশা।
তাঁর জনপ্রিয়তা এমন একসময় পৌঁছে গিয়েছিল যখন তিনি উত্তমকুমারের থেকেও বেশি পারিশ্রমিক পেতেন। যদিও পরে সময় বদলায়, কাজ কমে যায়, আর্থিক অভাব দেখা দেয়—তবু তিনি কখনও শিল্পসাধনার পথ থেকে সরে আসেননি। বাণিজ্যিক ছবিতেও তিনি নিজের স্বকীয় অভিনয়শৈলী বজায় রেখেছিলেন। এক কথায় কালী বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না—তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক শিল্পচিত্ত, যাঁর চরিত্রাভিনয় আজও অভিনেতাদের কাছে পাঠ্যবই। আর তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের কাছে প্রেরণা।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us