/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/17/kartick-pujo-2025-11-17-11-10-24.jpg)
Kartik Puja 2025: দেবসেনাপতি কার্তিকের নানারূপে আরাধনা চলছে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে।
Kartik Puja 2025: বাংলা সংস্কৃতিতে কার্তিক পূজো এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বহু ঘরে এখনও বিশ্বাস করা হয় যে ভগবান কার্তিক পুত্রপ্রদানকারী দেবতা। কিন্তু সত্যিই কি তিনি শুধুই সন্তান লাভের দেবতা? তাঁর পূর্ণ পরিচয় কি এতটাই সীমাবদ্ধ? পুরাণ, তন্ত্রগ্রন্থ ও আঞ্চলিক ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—কার্তিক মূলত শৌর্য, তেজ, কামকলার দক্ষতা, পুরুষ সৌন্দর্য, যুদ্ধবিদ্যা ও বিজয়ের দেবতা, যাঁর রূপ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে পূজিত হয়।
নানা পরিচয়ে উদ্ভাসিত কার্তিক
কার্তিক দেবতার পরিচয়ের মধ্যে রয়েছে বহু স্তর। দক্ষিণ ভারতে তিনি মুরুগন বা সুব্রহ্মণ্যস্বামী নামে পরব্রহ্মস্বরূপ। আবার বাংলায় তিনি অবিবাহিত এবং দেবী ষষ্ঠী—যিনি দুর্গার অংশ—কার্তিকের মাতৃরূপেই পূজিত। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতীয় পুরাণ অনুসারে তাঁর দুই পত্নী—দেবসেনা ও বল্লী। দেবসেনা-ই বাংলায় ষষ্ঠীর রূপ বলে মনে করা হয়। শুধু তাই নয়, মনে করা হয় যে কার্তিকের ছয়টি মাথা। এই ভিন্নধর্মী উপস্থাপনাগুলোই বোঝায়—কার্তিক এক্সক্লুসিভভাবে কোনও এক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নন। তিনি বহুস্তরীয় শক্তির আধার।
আরও পড়ুন- প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতার নানা অজানা দিক ফিরে দেখা
কার্তিকের জন্মগাথা পুরাণে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। মহাদেব ও পার্বতীর মিলনে তাঁর সৃষ্টি হলেও জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই অগ্নিদেব তাঁকে হরণ করেন। কিন্তু অগ্নিও তাঁর তেজ সহ্য করতে পারেননি। তাই শিশুটিকে অগ্নি নিক্ষেপ করেন গঙ্গায়। সেই থেকেই কার্তিক 'অগ্নিপুত্র' নামে পরিচিত। পরে গঙ্গা তাঁকে ছয়জন কৃতিকা বা নক্ষত্র মাতার হাতে তুলে দেন। ছয় মাতার দুধ পান করতে গিয়ে তাঁর ছয়টি মুখের উৎপত্তি হয়—এ কারণেই তিনি ষড়ানন।
আরও পড়ুন- শ্বাসযন্ত্রকে শক্তিশালী করতে নিয়মিত খান এই ৬ খাবার!
পার্বতী তাঁর নাম রাখেন স্কন্দ, অর্থাৎ যিনি অপ্রতিরোধ্য তেজে এগিয়ে যান। আবার মহাপরাক্রমী তারকাসুর বধের কারণে তিনি তারকান্তক নামে পরিচিত হন। দেবতাদের সেনাপতি–রূপে তাঁর প্রতিষ্ঠা যুদ্ধকলায়। যা তাঁর অসম্ভব দক্ষতাকে তুলে ধরেছে। ভারতীয় উপকথায় তাঁকে, 'শূরদের শিরোমণি' বলা হয়। কিন্তু তাঁর জীবনেও ছিল গভীর বেদনা। জন্মের মুহূর্তে হরণ, অগ্নির ত্যাগ, গঙ্গার পরিত্যাগ, আবার কৃতিকা মায়েদেরও ছাড়তে হয় অস্ত্রশিক্ষার জন্য। শৈশব থেকেই তাই তিনি এক অদম্য বীর, কিন্তু একইসঙ্গে একাকী যোদ্ধা।
আরও পড়ুন- এই সব মাছ খেয়ে কমান হৃদরোগ! সপ্তাহে মাত্র ২ বার খেলেই বিরাট উপকার
তারকাসুর বধের পর যখন দেবতারা তাঁকে আশীর্বাদ করছিলেন তখন শিব তাঁকে বর দেন—'তুমি জগতের সবকিছু ভোগ করবে'। তখন এই বর-প্রভাবেই দেবপত্নীরা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। দেবলোকের এই পরিস্থিতি তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলে এবং তিনি নীরবে উত্তরভারত ছেড়ে দক্ষিণে শ্বেতপর্বতে আশ্রয় নেন। সেখানেই তিনি মুরুগন রূপে অসুরদমন ও জ্ঞানদানের মাধ্যমে দেবত্বের নতুন মাত্রা লাভ করেন। একটি পুরাণকাহিনি অনুযায়ী, দক্ষিণে তিনি নাকি মহাদেবেরই দীক্ষাগুরু হয়েছিলেন।
আরও পড়ুন- কেনার দরকার নেই, এই সবজি দিয়েই ঘরে বানান দুর্দান্ত ফেসওয়াশ, মুখ হবে ঝলমলে!
এই কারণে দক্ষিণ ভারতে কার্তিক শুধুই সন্তানপ্রদানকারী বা কামকলার দেবতা নন—তিনি পরব্রহ্ম, তেজস্বী, যোদ্ধাদের দেবতা এবং জ্ঞানদাতা। কিন্তু বাংলায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে এক ধরনের হালকা মজা, ব্যঙ্গ, উপহাস তৈরি হয়েছে—'ক্যালানে কার্তিক' শব্দবন্ধ তারই উদাহরণ। লোকসংস্কৃতির অংশ হলেও এই ভাবমূর্তি তাঁর প্রকৃত মহিমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলার পতিতাপল্লীগুলোতে কার্তিক পূজোর প্রচলনও এসেছে তাঁর কামকলার প্রতীকরূপে পরিচিতি থেকে। তবে তাঁর পূজার মূল তত্ত্ব—শৌর্য, শক্তি, পবিত্রতা, যুদ্ধবিদ্যা, বিজয় এবং সৌন্দর্য। কার্তিক পূজোর সময়ও জ্যোতিষশাস্ত্রনির্ভর। সূর্য যখন তুলা থেকে বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ কার্তিক মাসের শেষ দিনে, পালিত হয় এই পূজো। ২০২৫ সালে সূর্যরাশি পরিবর্তন হয়েছে ১৬ নভেম্বর দুপুর ১:৩৮-এ। পঞ্জিকা অনুযায়ী, কার্তিক পূজোর শুভ সময়— ১৭ নভেম্বর বিকেল ৫:০৮ থেকে ৬:৪৮ এবং রাত ৮:১৫ থেকে ১০:১১।
এবার সূর্যের এই বিরল রাশি পরিবর্তন এবং কার্তিক তত্ত্বের গভীরতার কারণে ২০২৫-এর কার্তিক পূজোকে বিশেষ শুভ কালে বলে মনে করা হচ্ছে। বহু জ্যোতিষ, পঞ্জিকা প্রণেতা এবং পূজারি মনে করছেন—এই যোগ শতাধিক বছরে একবার আসে। এই বিরল সংযোগে কার্তিকের শক্তি, স্কন্দের তেজ, মুরুগনের জ্ঞান এবং বাংলার লোকবিশ্বাসের মঙ্গল একইসঙ্গে মিলিত হয়েছে। তাই এই কার্তিক পূজো এবার বিশেষ পূণ্যদায়ক বলেই বিশ্বাস।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us