/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/28/legendary-musician-kc-dey-2025-11-28-03-16-14.jpg)
Legendary Musician KC Dey: প্রবাদপ্রতিম সংগীতজ্ঞ কৃষ্ণচন্দ্র দে।
Legendary Musician KC Dey: ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে যাঁরা মাইলফলক হয়ে রয়েছেন, তাঁদের অন্যতম কৃষ্ণচন্দ্র দে—যিনি সবার কাছে কেসি দে নামে পরিচিত। ১৮৯৩ সালের ২৪ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই সুরস্রষ্টার জীবন শুরু হয়েছিল অতি সাধারণ এক পরিবারে। শৈশবে তিনি ছিলেন স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত, কৌতূহলী এক শিশু। কিন্তু ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর সেই বিকেল তাঁর জীবনকে চিরদিনের মতো পালটে দেয়। চোখে অস্বাভাবিক জ্বালা, এরপর ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তির অবনতি এবং অবশেষে সম্পূর্ণ অন্ধত্ব—মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যায়।
চিকিৎসকরা যা জানিয়েছিলেন
কলকাতা মেডিকেল কলেজের বিখ্যাত চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন—এটি মারাত্মক চোখের জটিল রোগ, যার ফলাফল প্রায় নিশ্চিত দৃষ্টিহীনতা। যে বয়সে খেলাধুলা, আনন্দ ও সঙ্গীদের সঙ্গে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই কৃষ্ণচন্দ্র পড়েন গভীর অন্ধকারের মধ্যে। তাঁর মা রত্নমালা দেবীর মনের অবস্থা তখন বর্ণনার অতীত। তবুও তিনি কখনও ছেলের সামনে নিজের কষ্ট প্রকাশ করেননি। বরং প্রতিনিয়ত তাঁকে সাহস দিতেন, বলতেন—অন্ধত্ব মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি মন শক্ত থাকে। এই কথাগুলোই কৃষ্ণচন্দ্রের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন- ওয়্যাক্সিং-শেভিং বন্ধ করুন, এই ঘরোয়া পাউডারেই মুখের লোম দূর হবে সহজে
কৃষ্ণচন্দ্রের সংগীতপ্রতিভা খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ পেতে শুরু করে। বাড়িতে কীর্তনীয়া এলে তিনি চোখ না থাকলেও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তারপর অবিকল একই সুরে গানটি গেয়ে উঠতেন। তাঁর সুরগ্রহণ ক্ষমতা এতটাই নিখুঁত ছিল যে, অভিজ্ঞ গায়ক-বাদকরাও বিস্মিত হতেন। মা রত্নমালা দেবী বুঝে গেলেন—দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও তাঁর ছেলের অন্তরজ্যোতি নিভে যায়নি, বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন- ফুসফুসের ক্যানসারে দ্রুতহারে বাড়ছে, এই লক্ষণগুলো দেখলেই হোন সতর্ক!
এরপর তিনি ছেলেকে নিয়ে গেলেন জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত সুরবাহার বাদক হরেন্দ্রনাথ শীলের কাছে। এই মানুষটিই কৃষ্ণচন্দ্রের শিল্পীজীবনের প্রথম গুরু। চোখ না থাকলেও তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে শাস্ত্রীয় সংগীত শুনতেন, আর সেই সুর তাঁর মনে গেঁথে যেত। বাড়িতে ফিরে তিনি হুবহু সেই সুর তুলতেন—না কোনও ভুল, না কোনো বিচ্যুতি। এই ক্ষমতা তাঁকে দ্রুতই সংগীতজগতের পরিচিত মুখ করে তোলে।
আরও পড়ুন- ভিভ রিচার্ডসের মত বিরাট কোহলিও কেন মাঠে চুইংগাম চিবোন? জানুন গোপন রহস্য
ক্রমে তিনি কীর্তন, ধ্রুপদ, ঠুমরি, টপ্পা এবং চলচ্চিত্র সংগীতের পথে এগিয়ে যেতে থাকেন। ব্রিটিশ ভারতের প্রারম্ভিক চলচ্চিত্রে তাঁর গান ও সংগীত পরিচালনা ছিল যুগান্তকারী। তাঁর কণ্ঠে একধরনের অতল গভীরতা ছিল, যা শ্রোতাদের মনে অন্যরকম ছাপ ফেলত। তাঁর সুরে ছিল কীর্তনের পবিত্রতা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিখুঁততা, আর বাংলা গানের স্নিগ্ধতা। তিনি গেয়েছিলেন বহু বিখ্যাত গান, যার কিছু আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।
আরও পড়ুন- আলিপুরের পর কলকাতার দ্বিতীয় চিড়িয়াখানা, কীভাবে যাবেন?
কৃষ্ণচন্দ্র দে শুধু সৃষ্টিশীল শিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন মহান শিক্ষকও। তাঁর প্রিয় ভাইপো মান্না দে নিজেও বলেছেন—তিনি যদি কাকার সান্নিধ্য না পেতেন, তবে মান্না দে আজকের মান্না দে হয়ে উঠতে পারতেন না। কৃষ্ণচন্দ্র দের কঠোর শৃঙ্খলা, রিয়াজের ধারাবাহিকতা ও সুরের প্রতি নিষ্ঠা মান্না দে–কে তৈরি করেছিল সময়ের অন্যতম সেরা গায়ক হিসেবে।
চলচ্চিত্রে অভিনয়েও তিনি ছিলেন সমান সফল। দৃষ্টিহীন হয়েও অনায়াসে যে সংলাপ, অভিব্যক্তি ও গান ফুটিয়ে তুলতেন, তা তাঁকে সবার কাছে অনন্য করে তুলেছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতে এমন বহুমুখী প্রতিভা খুব কমই দেখা গেছে। ২৮ নভেম্বর ১৯৬২—এই দিনটি ছিল ভারতীয় সংগীতজগতের জন্য গভীর শোকের দিন। কৃষ্ণচন্দ্র দে চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক অমর সুরঐতিহ্য। তাঁর গানে, তাঁর সুরে, তাঁর শিক্ষায় আজও ভারতীয় সংগীতের পথচলা আলোকিত হয়। দৃষ্টিহীন হলেও তিনি দেখিয়ে গেছেন—দৃষ্টি নয়, সৃষ্টিই শিল্পীর আসল আলো।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us