/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/23/netaji-subhas-chandra-bose-2026-01-23-08-07-35.jpg)
Netaji Subhas Chandra Bose: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সরস্বতী আরাধানা।
Netaji Subhas Chandra Bose Saraswati Puja: ২৩ শে জানুয়ারি ২০২৬—এই তারিখটি শুধু একটি জন্মদিন নয়, এটি এক অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণ। কারণ এই দিনেই একদিকে পালিত হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব সরস্বতী পুজো, অন্যদিকে জাতির ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন। কাকতালীয় নয়, বরং ইতিহাসের গভীর স্তরে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর মিলনবিন্দু, যেখানে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার চেতনা এক সুতোয় বাঁধা পড়ে যায়।
ইতিহাসের পাতা উল্টে গেলে দেখা যায়, ১৯২৩–২৪ সাল ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনের অন্যতম কঠিন সময়। ব্রিটিশ সরকারের চোখে তিনি তখন এক বিপজ্জনক রাজবন্দি। স্বাধীনতার দাবিতে আপসহীন অবস্থানের জন্য তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল মুর্শিদাবাদের বহরমপুর জেলে, ৭ নম্বর ঘরে। চারদিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, শারীরিক ও মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে এক নিঃসঙ্গ অন্ধকার অধ্যায়। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেও তাঁর বিশ্বাসে কোনো ফাটল ধরেনি।
আরও পড়ুন- বসন্ত পঞ্চমীতে এই কাজগুলি এড়িয়ে চলুন, দেবী সরস্বতীর কৃপা পেতে কী করবেন জানুন
বাঙালির ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধকে সুভাষচন্দ্র বসু আলাদা করে দেখেননি। তাঁর কাছে এগুলো ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই কারণেই জেলবন্দি অবস্থাতেও তিনি ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষের কাছে এক ব্যতিক্রমী আবেদন জানান—জেলের মধ্যেই তিনি সরস্বতী পুজো করতে চান। প্রথমে এই প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। শাসকদের চোখে এটি ছিল তুচ্ছ এক ধর্মীয় আচার মাত্র। কিন্তু সুভাষচন্দ্র ছিলেন অনমনীয়। তিনি বুঝিয়ে দেন, এই পুজো তাঁর কাছে নিছক আচার নয়, এটি আত্মার স্বাধীনতার প্রশ্ন।
আরও পড়ুন- সরস্বতী পুজোয় বান্ধবীকে নিয়ে কোথায় ঘুরতে যাবেন? একদিনেই সারুন রোম্যান্স আর আনন্দের প্ল্যান!
দীর্ঘ অনীহার পর শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁর দাবির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সীমিত সামগ্রী, সহবন্দিদের সহযোগিতা আর অটল বিশ্বাসকে সঙ্গী করে বহরমপুর জেলের চার দেওয়ালের মধ্যেই শুরু হয় সরস্বতীর আরাধনা। সেই পুজোয় ছিল না কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। অথচ তার তাৎপর্য ছিল গভীর। অস্ত্র বা স্লোগান নয়, জ্ঞান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক নীরব বিদ্রোহ।
আরও পড়ুন- কবে, কখন কীভাবে জন্ম হল জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর? বসন্ত পঞ্চমীতে জানুন বিস্তারিত
ঐতিহাসিক নথি বলছে, সেই সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করেই জেলে যাতায়াতের সুযোগ কিছুটা শিথিল হয়েছিল। পুজো দেখার অজুহাতে বহু মানুষ বহরমপুর জেলে এসে নেতাজির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন। জেলের দেওয়ালের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর চিন্তা, তাঁর আদর্শ, তাঁর স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। বন্দিত্বের মধ্যেও তিনি ছিলেন চিন্তার দিক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
ইতিহাসের বিতর্ক
কিছু ঐতিহাসিকের দাবি ছিল, বহরমপুর জেলে থাকাকালীন সুভাষচন্দ্র বসু দুর্গাপুজো করেছিলেন। কিন্তু সময়রেখা বিচার করলে সেই দাবি টেকে না। ৮ ডিসেম্বর ১৯২৪ তারিখে জেলের লেটার প্যাডে দাদা শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা এক চিঠিতে সুভাষচন্দ্র নিজেই উল্লেখ করেন যে তিনি ৩ ডিসেম্বর ১৯২৪ বহরমপুরে এসে পৌঁছেছেন। নথি অনুযায়ী, তিনি জেল ছাড়েন ২৫ জানুয়ারি ১৯২৫ সালে। এই সময়সীমার সঙ্গে দুর্গাপুজোর কোনো মিল নেই। তাই অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত—বহরমপুর জেলে বন্দি অবস্থায় তিনি সরস্বতী পুজোই করেছিলেন।
আরও পড়ুন- কানে 'শিস' বা বাঁশির শব্দ শুনলে সাবধান, দায়ী হতে পারে এই ৩টি কারণ
কারাগারের সেই পুজো ছিল আত্মসম্মান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতীক। জেলের মধ্যেও তিনি নিজের পড়াশোনার জন্য বই চেয়ে চিঠি লিখেছেন, সহবন্দিদের জন্য বই কেনার ব্যবস্থা করেছেন এবং তাঁদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলন করেছেন। শিক্ষা ও চেতনার শক্তিতেই যে জাতিকে জাগানো যায়, সেই বিশ্বাসেই তিনি অবিচল ছিলেন।
আরও পড়ুন- বাঙালি নারীশিক্ষায় বিপ্লবের সাক্ষী আজকের নিবেদিতা মিউজিয়াম
এই প্রেক্ষাপটে নেতাজির জীবন আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা মানে শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়—মানসিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিও বটে। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধা। আই.সি.এস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেও ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কাজ করতে অস্বীকার করেছিলেন তিনি। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বুঝেছিলেন, দেশের সেবা করতে হলে ত্যাগের পথেই হাঁটতে হবে। সরস্বতী পুজোর দিনে জেলের অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে সেই শিক্ষাই তিনি জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ তাই শুধু জন্মদিন নয়, এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—শিকল পরিয়েও একটি জাতির চেতনাকে বন্দি করা যায় না।


/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us