/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/21/ruma-guhathakurta-2025-11-21-08-01-57.jpg)
Ruma Guhathakurta: কিশোর কুমারের সঙ্গে রুমা গুহঠাকুরতা।
Ruma Guhathakurta: রুমা গুহঠাকুরতা—বাংলা সংগীতজগতের এক উজ্জ্বল নাম, যাঁকে শুধু এক জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবেই নয়, বরং ভারতের সমবেত সংগীত আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হিসেবেও স্মরণ করা হয়। তাঁর জন্ম ২১ নভেম্বর ১৯৩৪ সালে। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি শিল্প–সংস্কৃতির আবহে বড় হয়েছেন। তাঁর মা সতী ঘোষ ছিলেন এক প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী, তাই ঘরেই ছিল সুর–তাল–লয়ের প্রথম শিক্ষা। পরবর্তীকালে তাঁকে পাঠানো হয় আলমোড়ায় উদয় শংকর অ্যাকাডেমিতে, যেখানে তিনি নৃত্যশিল্পে দক্ষতা অর্জন করেন। শৈশবেই তিনি অভিনয়–জগতে পা রাখেন। ‘জোয়ার ভাটা’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর অভিনয় ছিল উল্লেখযোগ্য, আর সেই ছবিটিই ছিল কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমারের প্রথম ছবি।
গণসংগীতের পথিকৃৎ
এরপর বম্বের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন আইপিটিএ–র সঙ্গে যুক্ত হন রুমা গুহঠাকুরতা। সেখান থেকেই তাঁর গণসংগীতের যাত্রা শুরু। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সময় রুমা গুহঠাকুরতার কণ্ঠে গণসংগীত পেয়েছিল নতুন শক্তি। সলিল চৌধুরীর সুরে ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’ গানটি যখন তাঁর গলায় উঠত, তখন মাঠ-ময়দান কাঁপত, মানুষ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠত। সলিল চৌধুরী ছিলেন ভারতের সমবেত সংগীতের মূল পুরোধা। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নেয় ক্যালকাটা ইউথ কয়্যার। রুমা দেবী এই দলে যুক্ত হন অতি অল্প বয়সে এবং দ্রুতই হয়ে ওঠেন দলের প্রধান শক্তি।
আরও পড়ুন- এই ঘরোয়া সামান্য জিনিসেই চুল করুন মজবুত আর ঘন!
পরে সলিল চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে পড়লে তিনি পুরো দলের দায়িত্ব দিয়ে যান রুমা গুহঠাকুরতার হাতে। এরপরই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে ক্যালকাটা ইউথ কয়্যার বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। লাল পাড় সাদা শাড়ি পরিহিতা নারীরা এবং পাঞ্জাবি-পাজামা পরা পুরুষরা যখন একসঙ্গে গান করতেন, তখন বাঙালির ঘরে ঘরে তৈরি হত এক অনন্য আবহ। সেই সময়কার বহু জনপ্রিয় কোরাস গান—যেমন বিস্তীর্ণ দুপাড়ে, ধনধান্য পুষ্পভরা, বলো বলো বলো সবে, আজ যত যুদ্ধবাজ—আজও মানুষের অন্তরে গভীর ছাপ রেখে গেছে।
আরও পড়ুন- নাক দিয়ে রক্ত পড়া সবসময় সাধারণ ব্যাপার নয়! কোন লক্ষণে বুঝবেন তা জরুরি অবস্থা
রুমা গুহঠাকুরতার মঞ্চাভিনয় ছিল অত্যন্ত দীপ্তিময়। তাঁর কপালে থাকা লাল বড় টিপ, লাল পাড় সাদা শাড়ি এবং গান পরিচালনার সময় তাঁর নির্দেশ দেওয়ার বিশেষ ভঙ্গি—এগুলি আজও অনুরাগীদের মনে ভেসে ওঠে। দূরদর্শনের সেই সময়ে তাঁর পরিচালনায় ক্যালকাটা যুব সমবেত দলের পরিবেশনা ছিল বাঙালির টেলিভিশনের অন্যতম আকর্ষণ। যারা তাঁর লাইভ পরিবেশনা দেখেছেন, তাঁরা বলেন—মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছিল যেন বিদ্যুৎ প্রবাহের মতো, যে শক্তি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত।
আরও পড়ুন- বিশ্বের সেরা ৫ খাবারের তালিকায় বাটার চিকেন! বাড়িতেই স্বাস্থ্যকর রেসিপি বানানোর গোপন ট্রিক ফাঁস
তাঁর শিল্পজীবনে বহু ঐতিহাসিক মুহূর্ত রয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা যখন কলকাতায় আসেন, তখন ইডেনে ‘স্বাগত ম্যান্ডেলা’ নামে একটি বিশেষ পরিবেশনার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। মাত্র এক রাতেই তিনি সেই গানের সুর–পরিকল্পনা এবং পরিবেশনার প্রস্তুতি শেষ করেছিলেন। এই পরিবেশনা কলকাতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। আবার এক অ্যালবামের উদ্বোধন করেছিলেন দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। সলিল চৌধুরী, সত্যজিৎ রায় এবং রুমা গুহঠাকুরতার যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা ক্যালকাটা ইউথ কয়্যার আজও এক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতীক।'
আরও পড়ুন- এই ৬টি ফলে থাকে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক, জানলে অবাক হবেন!
রুমা গুহঠাকুরতা শুধু সংগীতেই নয়, অভিনয় জগতেও ছিলেন সফল। তিনি অভিনয় করেছেন 'গঙ্গা', 'পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট', 'আশিতে আসিও না', 'ক্ষণিকের অতিথি'—এর মতো ছবিতে। নায়িকা হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন ছিল, তেমনই পরবর্তীতে মা–এর ভূমিকাতেও তিনি হয়ে ওঠেন অত্যন্ত প্রিয় মুখ। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন একটি সুশৃঙ্খল পরিবার রক্ষা করার প্রতীক। তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে অনেকে কথা বললেও, তিনি দুই পরিবারেই যে সম্মান, মমতা এবং সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে রেখে গেছেন, তা সত্যিই বিরল উদাহরণ।
কিন্তু সমাজ বারবার তাঁকে শুধু এক পরিচয়ে বেঁধে রাখত—কিশোর কুমারের স্ত্রী। যদিও বাস্তবে তিনি নিজ গুণে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর শিল্প, তাঁর সংগঠনক্ষমতা, তাঁর সুরনির্দেশনা এবং পরিচালনার দক্ষতা তাঁকে ভারতের সমবেত সংগীতের ইতিহাসে একমাত্র মহিলা পথিকৃৎ করে তুলেছে। তিনি ছিলেন সত্যিই—ভারতের সমবেত সংগীতের প্রথম মহিলা পতাকাবাহক।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us