/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/19/salil-chowdhury-1-2025-11-19-08-16-51.jpg)
Salil Chowdhury: সলিল চৌধুরী।
Salil Chowdhury: সংগীত মানেই আলো, আর সেই আলোর এক অবিনশ্বর পথযাত্রী হলেন সলিল চৌধুরী। তাঁর সুরে যেমন প্রতিবাদের আগুন ছিল, তেমনই ছিল গভীর মায়া, মানুষের প্রতি অগাধ প্রেম, জীবনযুদ্ধের গল্প আর সময়ের স্পর্শে বিকশিত এক সামাজিক চেতনা। আধুনিক বাংলা গানের নতুন ধারার একজন প্রধান স্রষ্টা হিসেবে তিনি শুধু একজন সুরকার নন। তিনি এক যুগের প্রতীক, এক আন্দোলনের মুখ, এক সৃজনশীল বিপ্লবের নির্মাতা।
সলিল চৌধুরীর জন্ম ১৯ নভেম্বর ১৯২২ সালে। শৈশব কেটেছে আসামের চা-বাগানের পরিবেশে, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের সংগ্রাম তাঁকে খুব ছোটবেলাতেই জীবন সম্পর্কে গভীর অনুভূতি দিয়েছিল। তাঁর বাবা ছিলেন ডাক্তার, কিন্তু পাশাপাশি সংগীত ও নাটকের প্রতি গভীর অনুরাগী। বাবার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীত শোনা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার ফলে ছোটবেলা থেকেই সলিল চৌধুরীর ভিতরে সৃষ্টিশীলতা অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছিল।
কলকাতায় সলিল চৌধুরী
কলকাতায় পড়াশোনা করতে এসে তিনি শুধু সংগীতেই ডুবে যাননি, পাশাপাশি তাঁর চিন্তায় জন্ম নিয়েছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনা। তখনই তিনি যুক্ত হন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর গান লেখা, সুর করা এবং মানুষের জীবনের গল্প গানে গানে তুলে ধরা। তাঁর সৃষ্টি ছিল জনমানুষের হৃদয়ের ভাষা—যেখানে কৃষকের কান্না, শ্রমিকের রক্তঘাম, ছাত্রদের স্বপ্ন, মজুরের প্রতিবাদ সব একসঙ্গে মিশে গড়ে তুলেছিল এক নতুন সংগীতধারা।
আরও পড়ুন- বিশ্বের ৬টি ঐতিহাসিক রেলওয়ে স্টেশন, এগুলো আজ পুরোপুরি হোটেল
বিশেষ করে পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় তাঁর গণসংগীত (Music) সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও বেদনার কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল। 'তোমার বুকে খুনের চিহ্ন খুঁজি এই আঁধারের রাতে', 'পৌষালি বাতাসে পাকা ধানের বাসে', 'আয় বৃষ্টি ঝেঁপে ধান দেব মেপে'—এসব গান শুধু সুর নয়, সময়ের দলিল। তাঁর গান মানুষকে একত্র করেছে, লড়াইয়ের সাহস দিয়েছে শিল্পকে দিয়েছে নতুন দিশা।
আরও পড়ুন- সেনাবাহিনী নেই, বিশ্বের এই ৫ দেশ কীভাবে কাটায় চরম শান্তিতে?
তাঁর আধুনিক বাংলা গান, 'গাঁয়ের বধূ' বাংলা সংগীতের নতুন যুগের সূচনা করেছিল। মাত্র বিশ বছর বয়সে তিনি যে সুরের গভীরতা ও নির্মাণশৈলী দেখিয়েছিলেন, তা আজও বিস্ময় সৃষ্টি করে। প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত শিল্পী তাঁর গান গেয়েছেন—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অনেকেই।
আরও পড়ুন- মুখের ঘা সহজে সারছে না? হালকাভাবে নেবেন না কিন্তু! এটা এই মারণ রোগও হতে পারে
চলচ্চিত্রেও তিনি ছিলেন জাদুকর। বাংলা ও হিন্দি উভয় চলচ্চিত্রেই তিনি রেখে গেছেন অনন্য ছাপ। ১৯৫৩ সালে 'দো বিঘা জমিন'–এর মাধ্যমে হিন্দি ছবিতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে মালয়ালাম, মারাঠি, তামিল, তেলেগু, ওড়িয়া, কন্নড়-সহ বহু ভাষার ছবিতে কাজ করে তিনি প্রমাণ করেন—সংগীতের ভাষা একটাই, আর তা হৃদয়ের ভাষা।
আরও পড়ুন- আপনার কিডনি কি নষ্টের পথে? এই কায়দায় জানুন সহজেই! বাঁচতে কী করবেন, জেনে নিন বিস্তারিত
তিনি শুধু সংগীত পরিচালকই নন—ছিলেন কবি, গীতিকার, গল্পকার, সংগঠক এবং একাধারে বহু বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী এক শিল্পী। তাঁর ছোটগল্প থেকে তৈরি 'রিকশাওয়ালা' ভিত্তিক চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জিতে নেয়। তাঁর কাজের পরিধি যেমন ছিল বিস্তৃত, তেমনই ছিল গভীর।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সৃজনশীলতা তাঁর কাছে নদীর স্রোতের মত। যখন যে পথ দিয়ে তা প্রবাহিত হতে চাইত, তিনি সেটাকেই অনুসরণ করতেন। তাই কখনও তিনি কবিতা লিখেছেন, কখনও গল্প, কখনও সিনেমার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড সংগীত দিয়েছেন। আবার কখনও তৈরি করেছেন দ্রোহী গণসংগীত বা হৃদয় ভেজানো আধুনিক প্রেমের গান।
'ও আলোর পথযাত্রী'- তাঁর সৃষ্টি হিসেবে আজও মানুষের মনে আলো জ্বালায়। এই গান শুধু সুর নয়—এ যেন এক চিরন্তন আহ্বান, জীবনের প্রতি, ভালোবাসার প্রতি, সংগ্রামের প্রতি। সলিল চৌধুরী ছিলেন সত্যিকারের এক সৃজন–বিস্ময়। তাঁর সৃষ্টিতে যেমন বেদনা আছে, তেমনই আছে আনন্দ; যেমন আছে প্রতিবাদ, তেমনই আছে সাম্যের স্বপ্ন। তাঁর মত শিল্পী শতাব্দীতে একজন জন্মান। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এমন সুর–প্রাসাদ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়াবে অনবরত। এই সুর–জাদুকরের জন্মদিনে তাঁর সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা জানাই। বাংলা সংগীত তাঁকে কখনও ভুলবে না।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us