নাট্য সমালোচনা: ‘একটি উত্তর আধুনিক সামাজিক পালা’; রোববার নয়, প্রয়োজন ভাববার

সব সত্যি ঘটনা, সত্যি চরিত্রের নামই নেওয়া হয়েছে মঞ্চে। নিরপেক্ষ ‘বুদ্ধিজীবী’-দের বিবেকবোধ যে রাজনৈতিক ভাসমানতার পরিচায়ক, তাও অতি স্পষ্টভাবেই উচ্চারিত হয়েছে এই নাটকে।

By: Madhumanti Chatterjee Kolkata  Updated: October 9, 2018, 11:39:50 PM

দুপুরে কচি পাঁঠার ঝোল দিয়ে ভাত সাঙ্গ করে আয়েশ করে বিছানায় গা এলানো, বিকেলে অ্যাকাডেমি চত্বরে নাটক, রাতে নামী রেস্তরাঁয় নৈশভোজ সেরে বাড়ি ফেরা। রবিবার যেমন হওয়া উচিত আর কী! কিন্তু এ নাটক দেখব বলে আরামটুকু ভুলতে হল প্রথমেই। সেপ্টেম্বরের প্যাচপ্যাচে গরমে শো টাইম সকাল ১১ টা। দ্বিতীয় ধাক্কা টিকিট কাউন্টারে। টিকিট আছে, নির্ধারিত মূল্য নেই। এ শহরে এমনটা অবশ্য প্রথম নয়। এর ফলে মঞ্চের এ পার-ওপারের ফারাকটা একটু মুছে যায় কি? এই অকালে, এবং আকালেও, দর্শকের ওপর ভরসা রাখার জন্য নাটক শুরুর আগেই শিরদাঁড়া টানটান করিয়ে দেয় ‘একটি উত্তর আধুনিক সামাজিক পালা’।

ঘণ্টা দুয়েকের আদ্যন্ত রাজনৈতিক একটি নাটক। মরিয়া হয়ে প্রাসঙ্গিকতা খোঁজার চেষ্টা করতে হবে না। নিতান্তই সময়ের চাহিদা থেকে এ নাটকের জন্ম। কতটা বৃহত্তর, কতটাই বা বিশ্বজনীন এর প্রেক্ষিত, তা নিয়ে পরে ভাবা যাবেখন। তার আগে দেখার এ রাজ্যের, এ শহরের, দৈনন্দিন যাপনে যত রাজনীতি- তার সবটুকু নিয়ে ‘থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক’-এর এই প্রযোজনা।

প্রতীকী নাম নয়, সব সত্যি ঘটনা, সত্যি চরিত্রের নামই নেওয়া হয়েছে মঞ্চে। ভনিতা নেই এতটুকু। শুধু নাম নয়, চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে একাধিক রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র নিয়ে আসা হয়েছে মঞ্চে। পক্ষ না নেওয়া ‘বুদ্ধিজীবী’-দের বিবেক বোধকে রাজনৈতিক ভাসমানতার পরিচায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই নাটকে।

তবে সংলাপের ক্ষেত্রে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। বেশি সরাসরি বলতে গিয়ে কোথাও কোথাও ধার নষ্ট হয়েছে সংলাপের। অবশ্য নির্দেশকের যুক্তি হতেই পারে, এই অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে শিল্পের চেয়ে সত্যের গুরুত্ব বেশি। মোট কথা, এ নাটক শান্তি বা স্বস্তিদায়ক নয়। ‘ফিল গুড’ তো একেবারেই নয়। আর সেখানেই নাটকের সার্থকতা। তবে মানুষের ওপর বিশ্বাস যদি রাখতেই হয়, নাটক শুরুর আগে নয়, নাটক শেষে দর্শক যাতে টিকিটের দাম নির্ধারণ করতে পারেন, অদূর ভবিষ্যতে সেরকম কোনো পদক্ষেপ আশা করা যেতেই পারে।


টিম ওয়ার্ক এ প্রযোজনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রধান চরিত্র বলতে কেউ নেই। নেই কোনো ‘নায়ক’। আছে সময়। নাটকের চরিত্রকে দিয়ে যে বলিয়ে নেয়, “ম্যায় সময় হুঁ, ম্যায় থি, ম্যায় হু অউর ম্যায় হি রহুঙ্গি”। ‘একটি উত্তর আধুনিক সামাজিক পালা’য় কোনো গল্প নেই। যা যা আছে, আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হতে পারে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা, সময়ের নিরিখে যা বিক্ষিপ্ত কিংবা ‘বিচ্ছিন্ন’ নয় একেবারেই। নাটকে কোনো তারকার সমাবেশ নেই। মঞ্চে এসছেন জনা তিরিশেক অভিনেতা, ১০০ মিনিটের লড়াইটা লড়েছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, নিষ্ঠার সঙ্গে, অহেতুক নিজেকে জাহির করার চেষ্টা নেই কারোরই।

আলো এবং সঙ্গীতও যেন এ নাটকের দুটি চরিত্র। এদেরকে চিত্রনাট্য থেকে আলদা করা দুঃসাধ্য। নাটকের মূল বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বাহুল্যবর্জিত সেট। নাটক নামের দলগত শিল্পে এঁরা বিশ্বাস রেখেছেন। বিশ্বাস রেখেছেন মঞ্চের ভাষায়। সে কারণেই টিকিটের কোথাও উল্লেখ নেই নির্দেশকের নামের। চরিত্র বদলে বদলে মঞ্চে উঠে এসেছে একই মুখ। সময়ের ব্যবধানে তো মুখগুলো সেই একই থাকে, বদলায় তো মুখোশ। আর আশ্চর্যের ব্যাপার, প্রেক্ষাগৃহের বাইরে বেরোলে আলাদা করে কোনো চরিত্র, কোনো মুখ মনে থাকবে না। মনে থেকে যাবে ওই পৌনে দুঘণ্টা সময়ে আপনার মনে জেগে ওঠা প্রশ্ন এবং দ্বন্দ্ব। রবিবারের বাকিটুকু কাটুক ভাবনায় শান দিয়ে।

Get all the Latest Bengali News and West Bengal News at Indian Express Bangla. You can also catch all the Latest News in Bangla by following us on Twitter and Facebook

Web Title:

Theatre review ekti uttor adhunik samajik pala

The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com.
Advertisement

ট্রেন্ডিং
নজরে পাহাড়
X