/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/30/radhakanta-nandi-2025-11-30-01-41-43.jpg)
Radhakanta Nandi: রাধাকান্ত নন্দী।
Tabla Legend: বাংলা সংগীতের ইতিহাসে যাঁরা তাল-লয়ের কৃষ্ণরেখা এঁকে গেছেন নিখুঁতভাবে, তাঁদের অন্যতম এক উজ্জ্বল নাম পণ্ডিত রাধাকান্ত নন্দী। তাঁর বাজনার অনুপম শুদ্ধতা, সংগতের অলৌকিক সংযম এবং তবলার স্বরের যে সহজাত দীপ্তি—এসব তাঁকে বাংলা আধুনিক গান থেকে শুরু করে নজরুলগীতি ও চলচ্চিত্রসংগীত পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই এক অবিচ্ছেদ্য শিল্পীসত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তবলা তাঁর হাতে শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না; যথার্থই তিনি বলতেন—'তবলা আমায় বাজায়, তাই তো আমি বাজি।' এই উপলব্ধিই তাঁকে করে তুলেছিল এক সত্যিকারের তালবাদ্যের সাধক।
১৯২৮ সালের ২৩ মে বরিশালের বানারীপাড়ায় জন্ম রাধাকান্ত নন্দীর, শৈশব থেকেই সংগীত ছিল নিত্যসঙ্গী। পিতা রোহিনীকান্ত নন্দী ছিলেন তবলিয়া ও লয়দার শিল্পী, আর পিতামহ কালীচরণ নন্দী ছিলেন কীর্তনীয়া। ফলে তাঁর ঘরেই ছিল তাল-লয়ের প্রথম বিদ্যালয়। ছোটবেলায় দাদুর সঙ্গে নগরকীর্তনে শ্রীখোল বাজানোই ছিল তাঁর সংগীতযাত্রার সূচনা। মাত্র ছয় বছর বয়সে শ্রীখোল বাজিয়ে পুরস্কার জেতা তাঁর সহজাত প্রতিভার ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু শ্রীখোলকে ছাপিয়ে তবলার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল অদম্য। বাবার কাছে হাতেখড়ি নিলেও কঠোর শাসন ও পড়াশোনার চাপের মাঝে তবলার প্রতি প্রগাঢ় প্রেম কখনই নষ্ট হয়নি।
আরও পড়ুন- ঘুম পাচ্ছে না? এটা থাকলেই আপনার গাঢ় ঘুম আসবে চটপট!
কথিত আছে, তবলা শেখার অগ্নিঝরা তাগিদে তিনি একসময় বাড়ি ছেড়ে চলে যান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যান্ডদলের সঙ্গে। পরে মাসহারা বাজিয়ে, জীবনযাত্রার নানা ঘাত-প্রতিঘাত সামলে ওস্তাদ আনখেলাল-এর তত্ত্বাবধানে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় তালবাদ্যের প্রকৃত পথচলা শুরু করেন। সেখানে তিনি শেখেন শুদ্ধতা, সংযম, এবং তালের প্রতিটি কোষ অনুভব করার ক্ষমতা—যা তাঁর বাজনায় সারাজীবন প্রতিফলিত হয়েছে।
আরও পড়ুন- খুব কম খরচে দেখান ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ হাসপাতালে, জেনে নিন কোন ডাক্তার কবে বসেন
সংগীর আসরে রাধাকান্ত নন্দী ছিলেন এক অনন্য সংগতিয়া। তাঁর তবলা ছিল নিখুঁত, স্বচ্ছ, সংযত কিন্তু বিস্ময়কর নৈপুণ্যে ভরপুর। তিনি সঙ্গত করেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীত মহারথীদের সঙ্গে। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, উস্তাদ আমির খাঁ, পণ্ডিত তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত মণিলাল নাগ বা পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়—এদের সংগতে তাঁর তবলা ছিল যেন শাস্ত্রীয় সুরের অনিবার্য সঙ্গী। এমনকী নেপথ্যসংগীতে তিনি বাজিয়েছেন উস্তাদ আলি আকবর খাঁ-র সঙ্গেও, যা তাঁর প্রতিভার বিস্তারকে আরও প্রমাণ করেছে।
আরও পড়ুন- প্রতিদিন ব্রেকফাস্ট বাদ দিচ্ছেন, জানেন শরীরের কী ভয়ংকর ক্ষতি করছেন?
কিন্তু তাঁর অবদান এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা আধুনিক গানের জগতে তিনি ছিলেন অন্যতম স্তম্ভ। মান্না দে তাঁকে স্নেহভরে বলতেন—'রাধুবাবুর মতো ওই সুর-তাল বাঁধবে কে? ও হল ন্যাচারাল জিনিয়াস।' মান্না দের বহু অমর গানের ভিত তাঁর তবলাবাদন। পাশাপাশি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়—এই সব কিংবদন্তির গানের অন্তরালে রাধাকান্ত নন্দীর তবলার লয়-বোধ ছাড়া আজকের শ্রোতারা অনেক গান কল্পনাই করতে পারবেন না।
আরও পড়ুন- জিমে মাত্র এই একটি ভুলের জন্যই আপনি ঠিকঠাক রেজাল্ট পাচ্ছেন না, কী বলছেন ফিটনেস কোচ?
চলচ্চিত্রের গান, আধুনিক সংগীত, রেকর্ডিং স্টুডিও—যেখানেই তাল-লয়ের প্রয়োজন হত, সেখানেই তিনি ছিলেন প্রথম পছন্দ। বলা হয়, খুব কম দিনই গেছে যেদিন তাঁর রেকর্ডিং ছিল না। তিনি তবলা-সহ ১০ ধরনের তালবাদ্যের স্বতন্ত্র রেকর্ডিং করেছিলেন, যা সেই সময়ে ছিল অত্যন্ত বিরল এবং প্রশংসিত। নিজের কণ্ঠস্বরও ছিল অনবদ্য, যা অনেকেই খুব কমই জানেন।
রাধাকান্ত নন্দীর শিল্পীসত্তার দৃঢ়তা বোঝাতে একটি জনপ্রিয় কাহিনি আজও সংগীতমহলে ঘুরে বেড়ায়। ‘সন্ন্যাসী রাজা’ চলচ্চিত্রের গানের সময় গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার প্রথমে লিখেছিলেন—'রাধাকান্ত তুমি দেখছি আসরটাকে করবে মাটি।' কিন্তু তিনি যেহেতু কখনই ‘উল্টোপাল্টা’ তবলা বাজাতেন না, এবং এটি তাঁর সম্মানের পরিপন্থী, তাই গীতিকার বাধ্য হন ‘রাধাকান্ত’ পরিবর্তে ‘শশীকান্ত’ লিখতে। শিল্পে আপসহীনতা কাকে বলে, রাধাকান্ত নন্দী তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
অল্পবয়সেই প্রয়াত
১৯৮৪ সালের ৩০ নভেম্বর, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণ বাংলা সংগীতজগৎকে গভীরভাবে শোকাহত করেছিল। তবুও তাঁর বাজনার ঐশ্বর্য, সংগতের শুদ্ধতা এবং তালবাদ্যের প্রতি নিবেদিত সাধনা আজও বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি ছিলেন এমন শিল্পী, যাঁর তবলা বাজানোর মুহূর্তে শ্রোতা বুঝতে পারতেন—এ কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি শিল্পীর আত্মার সঙ্গে একাত্ম হওয়া সুরধারা।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us