বড় খবর


ছাপা বই বনাম পিডিএফ, বাংলার হাল ও হকিকৎ

বছর খানেক আগে এক প্রকাশক তাঁদের বইয়ের পিডিএফ বিতরণের জন্য একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবার হুমকি দিয়েছিলেন। এ বছর তাঁরাই ওই গোষ্ঠী সদস্যদের অতিরিক্ত ছাড়ের কথা ঘোষণা করেন বইমেলায়।

Bangla PDF
পিডিএফ গ্রুপকে বইমেলায় অতিরিক্ত ছাড় দিচ্ছে বেশ কিছু প্রকাশন সংস্থা (অলংকরণ- অভিজিত বিশ্বাস)

কলকাতা বইমেলা চলাকালীন একটা ঘটনা ঘটেছে, যা সম্ভবত অভূতপূর্ব। বাংলা ও ইংরেজি বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার তরফ থেকে একটি গোষ্ঠীকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এই গোষ্ঠীটি একটি ফেসবুক গ্রুপ, বা বলা ভাল দুটি ফেসবুক গ্রুপ। এই ফেসবুক গ্রুপ দুটি মূলত বাংলা ও ইংরেজি বইয়ের পিডিএফ আদানপ্রদান করে।

বছর দুয়েক আগে এই গোষ্ঠী দুটির প্রথমটি ফেসবুকে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এরকম গোষ্ঠী এই প্রথম, এমন নয়। এর আগেও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে এবং ফেসবুক পূর্ববর্তী সময়ে পিডিএফ চালাচালি ছিল। এর পরেও বহু গ্রুপ তৈরি হয়েছে।

অটিস্টিক কিশোর রুকুর বই, অপর ছায়াপথের ছবি-লেখা

কিন্তু এবারের যে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, তা হল এই গ্রুপগুলিকে মেনে নিতে শুরু করল বিভিন্ন প্রকাশন সংস্থা। এর আগে এই গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি উঠেছে প্রকাশনা সংস্থা থেকে। বিভিন্ন আলোচনায় পিডিএফ নিয়ে তাঁদের সমস্যার কথাও বলেছেন প্রকাশক এবং লেখকরা।

উল্টোদিকে এই ফেসবুক গ্রুপগুলির যুক্তি থেকেছে, বই তো পড়ার জন্যই। সে যে কোনও ফর্মেই হোক না কেন! বই দেওয়া নেওয়া কোনও অপরাধ হতে পারে না। আইনের কথা তুললে, নানারকমের আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে, যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির অবতারণা ঘটেছে, তবে মীমাংসা হয়নি।

পিডিএফ পক্ষের যুক্তি, কোনও বই কেনার আগে প’ড়ে নিলে সে বইয়ের মুদ্রিত সংস্করণ কমে যাবে এমন নয়। সংগ্রহযোগ্য বই হলে পাঠকরা তা কিনবেন, অন্যদিকে যদি সংগ্রহযোগ্য না হয়, তাহলে পাঠক খারাপ বই কিনে অর্থ নষ্ট করার হাত থেকে বেঁচে যাবেন। মলাট গ্রুপের অ্যাডমিন মিতু মিত্র জানালেন, তাঁরা একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই পিডিএফ বিতরণ করেন।

বইমেলায় ক্যা-এনআরসি-র বিরুদ্ধে ছোট ছোট প্রতিরোধ

“অন্তত তিন বছরের পুরনো বই না হলে আমরা পিডিএফ আমাদের গ্রুপে অ্যালাও করি না। সাধারণ লেখকদের বই তিন বছরের বেশি বাজারে কেউ পড়ে না। শরদিন্দু বা বিভূতিভূষণের মত লেখকদের কথা বলছি না। সাধারণ লেখকদের কথা বলছি। তবে কেউ যদি আপত্তি করেন, তাহলে তাঁর বইয়ের পিডিএফ আমরা তুলে নিই। তবে এতে সাধারণ লেখকদেরই বিক্রি কমে। কেন ভাবছেন এরকম! মিতু জানালেন, বাজারে এখন এত বিজ্ঞাপন, যে তা দেখে লোকে বই কিনে ঠকছে। সত্যিকারের পাঠকরা ভুগছেন। সে কারণে, পাঠকদের কথা ভেবেই পিডিএফ করা। পিডিএফ পড়ে পাঠকরা যদি মনে করেন, এ বইটা কেনা উচিত, তাহলে তিনি কিনবেন।”

কিন্তু আইনের কী হবে? মিতু মিত্রের কথায়, “আমরা তো একমাত্র এরকম গ্রুপ নই। অন্য অনেকেই রয়েছেন। আর এখনও কেউ আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন এমন নয়। যদি তেমন পরিস্থিতি আসে, তাহলে দেখা যাবে।”

তাঁর কথার অনেকটাই সমর্থন মিলল গুরুচণ্ডালীর পিনাকী মিত্রের কথায়। তিনি বললেন, “আমাদের একটা বই পিডিএফ আকারে বহুদিন আমরাই সাইটে রেখেছিলাম। সে বইটা ছাপা আকারেও ছিল। পিডিএফ থাকার কারণে বিক্রির ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে, এরকম নয়।” তাহলে কি প্রকাশক হিসেবে এ ব্যাপারটা সমর্থন করছেন তাঁরা?

“বইমেলার আগুনের কারণ একটি দায়িত্বজ্ঞান সিদ্ধান্ত”

পিনাকী বললেন, “আমরা নীতিগতভাবে বই সকলের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সম্ভব হলে বিলিয়েই দিতাম। কিন্তু যেহেতু এর সঙ্গে সার্ভাইভালের প্রশ্নও জড়িত, সে কারণে তেমনটা পেরে উঠছি না। আর এরকম নয়, যে এ ধরনের ফেসবুক গ্রুপগুলি বই কেনা থেকে বিরত রাখায় উৎসাহ দিচ্ছে। বরং, এখান থেকে বইয়ের প্রচার হচ্ছে। সে কারণে আমরা মলাট গ্রুপকে এবার বইমেলায় অতিরিক্ত ছাড়ের ব্যবস্থা করেছি।”

উৎসাহ দেওয়া তো দূর, কোনওভাবেই পিডিএফ সংস্কৃতিকে বরদাস্ত নয়। জানিয়ে দিলেন সপ্তর্ষি প্রকাশনের সৌরভ মুখোপাধ্যায়। “লেখকের মৃত্যুর ষাট বছর পর্যন্ত কপিরাইট বলবৎ থাকে। তার পর আর থাকে না। কিন্তু ৫৯ বছর ৩৬৪ দিন পর্যন্ত সে বইয়ের পিডিএফ বেআইনি। ষাট বছর পেরোলে যা খুশি করা হোক। কিন্তু তার আগে করলে, যাঁরা তা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আমরা এই পিডিএফ সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। এভাবে প্রকাশক ও লেখক উভয়কে বঞ্চিত করা হচ্ছে।”

মলাট নামের পিডিএফ গ্রুপকে বইমেলায় বিশেষ ছাড় দিয়েছে নামী প্রকাশন সংস্থা চক্রবর্তী চ্যাটার্জিও। সংস্থার পিনাকী মজুমদার পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের একজিকিউটিভ কমিটির সদস্যও বটে। তিনি বলছেন, “এই ছাড় দেওয়া আসলে একটা কৌশল। আমরা পিডিএফের বিরুদ্ধে। কিন্তু কেবলমাত্র বাইরে থেকে বিরোধিতা করলেই হবে না। ভিতরে থাকতে হবে। ছাপা বই পড়ায় উৎসাহ দিতে হবে। এই সব গ্রুপ গুলিতে অনেক পাঠক রয়েছেন। তাঁদের ছাপা বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতেই আমরা ছাড়ের বন্দোবস্ত করেছি।”

মলাটের তিন বছরের পুরনো বইয়ের দাবি মানতে চাইলেন না পিনাকী। বললেন, “ওঁরা মুখে তিন-চার বছরের পুরনো বইয়ের কথা বললেও আসলে এমনকী ৬ মাস বা এক বছরের পুরনো বইও ওঁরা দিয়ে থাকেন। এতে সমগ্র প্রকাশনা জগতের সমূহ ক্ষতি হয়।”

“ধরুন একজন প্রকাশক, যিনি পাঠ্যপুস্তকও করেন, আবার সাধারণ বইও করেন, তিনি পাঠ্যপুস্তকের দাম বাড়িয়ে এই পিডিএফ সংক্রান্ত ক্ষতিটা তুলে নেন। ফলে যিনি পিডিএফ নামালেন, তিনি জানলেনও না তাঁর সন্তানের বইয়ের দামে সে উশুল হয়নি। বিদেশের উদাহরণ দিলেন তিনি। বললেন, উন্নত দেশগুলিতে পিডিএফ ডাউনলোড করার সঙ্গে সঙ্গে ট্র্যাক করা যায় ব্যাপারটা। এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে মামলা করে। ফলে সেখানে ব্যাপারটা সেখানে বন্ধ হয়ে গেছে।”

বাংলা বইয়ের পিডিএফ সম্ভবত শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে। যেভাবে এক সময়ে এপার বাংলার বই বাংলাদেশে বেআইনিভাবে ছাপা ও বিক্রি চলত, ঠিক সেই পদ্ধতির অনুকরণেই। বই ছাপাইয়ের মত, পিডিএফ করা এবং ছড়িয়ে দেবার বিষয়টি যেহেতু আইনিভাবে সংকটজনক নয়, সে কারণে এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে পশ্চিমবঙ্গেও খুব বেশি দেরি হয়নি। ফেসবুকের মত সোশাল মিডিয়ার সুবাদে, এ প্রক্রিয়া জনপ্রিয়ও হয়েছে দ্রুত। তাকে সহজতর করেছে পোর্টালের প্রযুক্তি।

সৌরভ বলছিলেন, “আইন এখানে বলবৎ হয় না। পাইরেটেড বইয়ের ব্যাপারেও নয়, পিডিএফ ব্যাপারেও নয়। কিন্তু তাই বলে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না।”

জনপ্রিয় সাহিত্যিক দেবতোষ দাশ তাঁর থ্রিলার উপন্যাস বিন্দুবিসর্গ ধারাবাহিক ভাবে লিখতেন নিজের ব্লগে। পরে যখন বইটি বেরোয়, তখন ওই পোর্টাল থেকেই তাঁর লেখার পিডিএফ তৈরি হয়ে বিতরিত হতে থাকে। দেবতোষ  শেষ পর্যন্ত পুলিশের শরণ নিয়ে বিষয়টি আটকান।

বছর খানেক আগে এক প্রকাশক তাঁদের বইয়ের পিডিএফ বিতরণের জন্য একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবার হুমকি দিয়েছিলেন। এ বছর তাঁরাই ওই গোষ্ঠী সদস্যদের অতিরিক্ত ছাড়ের কথা ঘোষণা করেন বইমেলায়।

অভিযান পাবলিশার্সের মারুফ হোসেন জানালেন, তাঁরা পিডিএফ গ্রুপ হিসেবে কাউকে অতিরিক্ত ছাড় দেননি। “বইমেলা উপলক্ষে অভিযান পাবলিশার্সের কাছে বেশ কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ অতিরিক্ত ছাড়ের দাবি করেছিল, তাদের প্রত্যেককেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। এমনকি আইবিএমের মতো কোম্পানিকেও এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। আইবিএম কলকাতা তার প্রত্যেক এমপ্লয়িকে এই ছাড়ের ব্যাপারে ইমেইল করেছিল। একইভাবে এই ফেসবুক গ্রুপগুলো তাদের গ্রুপে এই ছাড়ের ব্যাপারে বারবার তাদের সদস্যদের জানিয়েছে।” কলকাতা বইমেলায় বই কিনতে আগ্রহী এমন যেকোনো সংস্থা তাঁদের কাছে আবেদন করলে বিষয়টি তাঁদের বিবেচনার মধ্যে থাকে বলে জানিয়েছেন মারুফ।

প্রায় সাড়ে ৬ বছর আগে তৈরি হয়েছিল বাংলা ভাষায় সোভিয়েত রাশিয়ার বইয়ের অনলাইন ব্লগ। নিজস্ব ব্লগের আগেও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে এ কাজ চলত। এর সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত সোমনাথ দাশগুপ্ত। তিনি বললেন, “এই ব্লগ থেকেই বই নামিয়ে নতুন করে ছাপা বই বের করেছে বেশ কিছু প্রকাশন সংস্থা। বইমেলাতেই সেগুলো পাওয়া যাবে।” সোমনাথের মতে, পিডিএফ থাকলেই যদি ছাপা বই না পড়ার সংস্কৃতি তৈরি হত, তাহলে এরকম হত না। সোমনাথের ক্ষোভ, যাঁরা তাঁদের সাইট থেকে বই নামিয়ে ছাপছেন, ব্যবসা করছেন, তাঁরা কেউ কৃতজ্ঞতা স্বীকারে একটা লাইনও লেখেন না। “হয়ত বিনা মূল্যে একটা বই দিতে হবে, সেই আশঙ্কায়।”

তৃতীয় পরিসর নামের একটি ছোট প্রকাশন সংস্থা তাদের সমস্ত প্রকাশিত বইয়েরই পিডিএফ তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেয়। যে কেউই সেটা পড়ে নিতে পারেন। তাঁদের ধারণা, পিডিএফ পড়ে আগ্রহীরা সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না, সেগুলির মুদ্রিত সংস্করণ কিনবেন।

সংস্থার তরফে সুদীপ্ত বললেন, “বাংলা বইয়ের যে সামগ্রিক দুরবস্থা, বিশেষ করে ডিসট্রিবিউশন সিস্টেমে যে দীর্ঘদিনের ঘুণ, তা সমস্যার। আমাজন এসেছে বটে, কিন্তু কমদামি বই, ধরা যাক দু আড়াইশো টাকা দামের বইতেও আমাজনের মাধ্যমে বিক্রি করলেও প্রকাশকের কাছে কিছু ফেরত আসে না। লিটল ম্যাগাজিন মহলে যে কম পাঠকে খুশি থাকার প্রবণতা, আমরা তার বাইরেও বেরোতে চেয়েছি। একই সঙ্গে ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতাও তো আছে। আমাদের প্রকাশনীর একটি বই, ছায়াশরীর, সেটা ৬০ হাজার ডাউনলোড হয়েছিল। একটা বাংলা বই ৬০ হাজার ডাউনলোড হওয়া তো কম কথা নয়।”

তবে এই প্রকাশনায় যুক্ত কেউই এখান থেকে গ্রাসাচ্ছাদিত হন না। তাঁদের অন্য পেশা রয়েছে। সে কারণেই কি এরকম সাহস দেখাতে পারেন তাঁরা?

ব্যাপারটা এরকম নয়, দাবি সুদীপ্তর। “মানুষের কাছে ভাল বই পৌঁছে দেবার মাধ্যমে লেখককে এবং এই সংস্থার সকলকে অর্থলাভের জায়গায় পৌঁছে দেওয়া যাবে, এ প্রত্যয় রয়েছে আমাদের।”

Web Title: Bangla printed book e book pdf market situation

Next Story
অটিস্টিক কিশোর রুকুর বই, অপর ছায়াপথের ছবি-লেখাAutistic Ruku Book
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com