বড় খবর

এন আর সি: নো-ম্যানস-ল্যান্ডের দিকে পা বাড়িয়ে

পঞ্চাশ বা সত্তর লক্ষ মানুষ, শেষ পর্যন্ত যাদের নাম লিস্টে উঠবে না, তারা কী করবে এবং তাদের নিয়ে কী করা হবে? শেষ অবধি সুবিচারের আশায় সুপ্রিম কোর্ট অবধি ছোটার সঙ্গতি কজনের থাকে?

এবারের সময়সীমা ৩০ জুন, ২০১৯

(রাত পোহালেই নতুন তালিকা। অসমের মানুষ প্রহর গুনছেন শঙ্কায়। থাকতে পারবেন সেখানে, নাকি বিদেশি তকমা নিয়ে বিতাড়নের মুখে পড়বেন? এনআরসি নিয়ে লিখলেন অসমের কলকাতাপ্রবাসী নাগরিক পার্থ প্রতিম মৈত্র।)

ছোট্ট একটা রাজ্য মণিপুর। সব মিলিয়ে বোধহয় ১৯ লক্ষ লোকের বাস। নয় লক্ষ অ-মণিপুরী। তাদের হাত থেকে মণিপুরী কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে মণিপুর বিধানসভায় ( যেখানে বিজেপির সরকার) “মণিপুর পিপলস প্রোটেকশান বিল ২০১৮” পাশ হলো, যে বিলে বলা আছে মণিপুরে মৈতেই মণিপুরী, পঙ্গাল মুসলমান, সংবিধানে নথিভুক্ত জনজাতি এবং ১৯৫১ সালের আগে মণিপুরে বসবাসকারী সকল নাগরিক মণিপুরী হিসাবে বিবেচিত হবে।

বাকি অ-মণিপুরীদের শ্রেণিতে রাখা হয়েছে এবং তাদের এক মাসের মধ্যে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করাতে হবে। তবে তারা থাকার জন্য একটি পাস পাবে যা ছয় মাসের জন্য ভ্যালিড থাকবে। যাদের ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স আছে, তারা পাঁচ বছর পর্যন্ত একটি পাস এক্সটেন্ড করতে পারেন, যা প্রতিবছর রিনিউ করা হবে। যে কোনও বহিরাগতকে মণিপুরে ঢুকতে হলে পাসের প্রয়োজন হবে।

প্রশ্ন হলো ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরা হলো, অথচ প্রদেশটির জন্মই হয়েছে ১৯৭২ সালে। সেক্ষেত্রে প্রামাণ্য নথি কী হবে?

অসমীয়া পত্র পত্রিকাগুলি উল্লাসে ফেটে পড়ছে। বলছে এ বিলের টার্গেট হচ্ছে বাংলাদেশী হিন্দু-মুসলমান এবং তারাই বিলটির বিরোধিতা করছে। কাছাড় সংলগ্ন জিরিবামে অ-মণিপুরীদের ধর্ণায় লাঠি গুলি চালিয়েছে পুলিশ। আহত অনেক।

প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে। প্রতিটা সীমান্ত রাজ্য উৎসাহিত হচ্ছে শতবর্ষের সহাবস্থান ভেঙে ফেলতে। যেখানে বিজেপি ঢুকছে সেখানেই তাণ্ডব শুরু হয়ে যাচ্ছে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য শব্দবন্ধটি ডুবে যাচ্ছে হোমোজিনিটির অতলে।

এই বাতাবরণে আসামে প্রকাশিত হতে চলেছে “ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনশিপ” বা এনআরসি। না চূড়ান্ত তালিকা নয়। দ্বিতীয় খসড়া।

সব ইতিহাসের একটা পূর্ব ইতিহাস থাকে। এনআরসির আগেও আর একটা এনআর সি ছিল। ১৯৫১ সালে। কিন্তু আমি তার কথা বলছি না। বিদেশী চিহ্নিতকরণ ও বিতাড়ন আসামের রাজনীতির একটা রোগলক্ষণ দীর্ঘ সময় যাবৎ। এর আগে, মানে এনআরসি প্রক্রিয়ার আগে ছিল “ইললিগ্যাল মাইনরিটি (ডিটারমিনেশন বাই ট্রাইবুন্যাল) আইন”, যা পার্লামেন্টে পাশ হয় ১৯৮৩ সালে, ইন্দিরার সময়। ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ হিসাবে আইনটিকে বাতিল করে। অর্থাৎ দীর্ঘ ২২ বছর আইনটি বলবৎ ছিল বাংলাদেশী চিহ্নিতকরণ ও আসাম থেকে তাদের বহিষ্কারের জন্য।

ভারতবিখ্যাত অ্যাডভোকেট প্রশান্তভূষণ এই আইনটিকে বাতিল করার দায়ে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চকে যে ভাষায় এবং যুক্তিতে তুলোধোনা করেছেন তা প্রতিটি আইনের ছাত্রের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। তিনি লিখেছেন ৩০ বছরের সুপ্রিম কোর্টের জীবনে আমি এখনও পর্যন্ত আমি এই পর্যায়ের অনুদার, কর্তৃত্ববাদী, প্রকৃতপক্ষে মানসিকভাবে ফ্যাসিবাদী ও সাম্প্রদায়িক, সংবিধানের এই দুর্ধর্ষ ব্যাখ্যা, মৌলিক আইনী নীতির প্রতি এই ধরণের অজ্ঞানতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আর মানবাধিকার ও মৌলিক মানুষের মূল্যবোধের সংবেদনশীলতাহীন কোন বিচার এবং রায়ের সম্মুখীন হইনি। বল এখন সরকারের এবং এই দেশের মানুষের কোর্টে। তারা কি এই সংবিধানের এই কলঙ্ক সহ্য করে নেবে?

আইএমডিটি অ্যাক্ট নিয়ে আরও দু চারটি তথ্য এরকম যে, সরকারী তথ্য অনুযায়ী ২০ বছর এই আইন ক্রিয়াশীল থাকার পরেও ৮০% অভিযোগ স্ক্রিনিং কমিটি নিজেই বাতিল করে দিয়েছে। লোকসভায় কিরেন রিজেজু জানিয়েছেন ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১৯,৬৩২ জন ডি ভোটারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে যখন ভোটার তালিকায় ব্যাপক সংশোধন করা হয় তখন যাঁরা সঠিক প্রমানপত্র দাখিল করতে পারেন নি, তাদের নামের আগে ডি (ডাউটফুল) শব্দটি লিখে দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো ১৯৯৭ থেকে ২০১৭ মাত্র ১৯,৬৩২ জন চিহ্নিত ডি ভোটার?অথচ দাবী অনুযায়ী তিন ডি হচ্ছে ডিটেকশন, ডিলিশন ও ডিপোর্টেশান। ২০১৪ সালের সরকারী তথ্য অনুযায়ী রাজ্যে মোট ১৪৩২২৭ ডি-ভোটার রয়েছে। এই তথ্য সঠিক হলে, ৫০ লক্ষ বিদেশীর গল্পটা কে বা কারা ছড়াচ্ছে?

আরও পড়ুন, দেবেশ রায়ের নিরাজনীতি (পর্ব-৫)

বিলটি যখন বাতিলের দাবীতে সুপ্রিম কোর্টে যায় তখন বাদীপক্ষ আরও দুটি গলদ চিহ্নিত করেন। প্রথমত এই বিলে একজন নাগরিক মাত্র দশজন বিদেশীর নামে অভিযোগ জানাতে পারবে। দ্বিতীয়ত বার্ডেন অব প্রুফ অভিযুক্তের ওপর না হয়ে অভিযোগকারীর ওপর ন্যস্ত করা। অর্থাৎ এঁদের দাবী অনুযায়ী আপনিও খেয়াল খুশী মতো যতজন ইচ্ছে লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে দিতে পারেন, তাঁদেরই প্রমাণ করতে হবে যে তাঁরা আদতে বিদেশী নন। এইগুলি না থাকায় ইচ্ছেমতো লোককে বিদেশী চিহ্নিতকরণ করে ডিপোর্ট করা সম্ভব হচ্ছিল না। অতএব তৎকালীন এজেপি সরকার এবং তাদের সমর্থক বিজেপি সরকার নতুন গেমপ্ল্যান শুরু করলেন এবং তারই প্রথম ধাপ হলো সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে আইএমডিটি অ্যাক্ট বাতিল করানো। ও, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই মিস করে গেছি। আইএমডিটি অ্যাক্টের বিরুদ্ধে যিনি মামলাটি করেন তিনি তখন এজেপির এক এমপি। তাঁর নাম সর্বানন্দ সানোয়াল, যিনি এখন বিজেপির পক্ষে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।

আইএমডিটি অ্যাক্টের বদলে এবার এসেছে এন.আর.সি। আইএমডিটি অ্যাক্টের দুর্বলতা সংশোধন করে, তাকে বিদেশী বিতাড়নের সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে তৈরী করা হয়েছে। এবার একজন অভিযোগকারী যতজনের বিরুদ্ধে খুশী বিদেশী বলে অভিযোগ আনতে পারবে আর অভিযুক্তকে প্রমাণ করতে হবে যে সে বিদেশী নয়, নাগরিকত্বের প্রমাণ সব নথি জমা দিয়ে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অদ্ভূত যুক্তি যে একজন অভিযুক্ত সবচাইতে ভাল জানবে সে নাগরিক কিনা। প্রশান্ত ভূষণ এ বিষয়ে বলেছেন “সে তো একজন অপরাধীও সবচেয়ে ভাল জানে সে অপরাধী কি না। কিন্তু জুরিসপ্রুডেন্স অনুয়ায়ী যতক্ষণ তার অপরাধ প্রমাণ করা যাচ্ছে ততক্ষণ সে নির্দোষ।” আমার এত বছরের জীবনে কোনদিন সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চকে এরকম চাঁছাছোলা ভাষায় আক্রমণ করতে দেখিনি কাউকে। তবু সেই আইন বাতিল হয়ে এন.আর.সি চালু হয়ে গেছে সাড়ম্বরে। কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারের সঙ্গে সহযোগিতায় নেমেছে একজন অসমীয়া (সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জন গগৈ) আর একজন অনসমীয়া (এন.আর.সি প্রধান প্রতীক হাজেলা)। এত বছরে মাত্র ১৯,৬৩২ জনকে বিদেশী বলে চিহ্নিত করা গেলে এবং মাত্র দু হাজার সতের জনকে বহিষ্কার করলে তা গোটা আসাম আন্দোলনের ভিত্তিভূমিটাকেই ধ্বসিয়ে দেয়। তাই এনআরসি আনতেই হতো। আগামী ৩০ জুলাই যার পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশের দিন। আশংকা আর উৎকণ্ঠায় দিন গুণছেন আসামের নিম্নবর্গীয় মানুষ যারা মূল টার্গেট এবং সফ্ট টার্গেট।

 

আশঙ্কা আর উৎকণ্ঠায় দিন গুণছেন আসামের নিম্নবর্গীয় মানুষ। (এক্সপ্রেস ফাইল ফোটো)

আপার আসামে এনআরসির ফিল্ড ভেরিফিকেশনের সময় প্রতিটি নামের পাশে ওআই অর্থাৎ অরিজিনাল ইনহ্যাবিট্যান্টস অব আসাম লেখা হচ্ছে। কিন্তু লোয়ার আসাম অর্থাৎ বরাক উপত্যকা ইত্যাদির ক্ষেত্রে লেখা হচ্ছেনা। প্রশ্ন উঠতেই পারতো ওআই এর সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে দিল? এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য কী? কেননা তাদের তত্ত্বাবধানেই তো নবায়নের কাজ চলছে।

প্রশ্ন উঠতেই পারতো আপার আসাম ছাড়া আসামের সর্বত্র ভারতীয় নাগরিকেরা কি এনওআই? আসামে ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে কি দুই শ্রেণীর নাগরিক সৃষ্টি হচ্ছেনা? যতদূর জানি সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যসরকারের দাখিল করা এই ওআই এবং এনওআই তত্বের ভিত্তিতে এনআরসি তালিকা নির্মাণের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। তবু শোনা যাচ্ছে পেন্সিল মার্কিং এ ওআই এবং এনওআই চিহ্নিত হচ্ছে।

কিন্তু এটা জানা যাচ্ছে না যাদের নাম ওআই হিসাবে তালিকাভুক্ত মার্কড হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ফিল্ড ভেরিফিকেশনের সময় কোনও রিল্যাকসেশন ছিল কিনা যা আপার আসাম ছাড়া অন্যত্র প্রযোজ্য হয় নি? হাজেলা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে নাগরিকত্ব আইনে ওআই দের অর্থাৎ যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই তাদের ভেরিফিকেশনের কড়া পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় নি। প্রশ্ন হলো এই ওআই কারা, যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই? আইনে ওআই দের জন্য বিশেষ ছাড় দেবার কথা বলা আছে, বলেছেন প্রতীক হাজেলা। আইনটি কী? বিশেষ ছাড়গুলিই বা কী কী? এগুলো কোনওটারই উত্তর জানা যাচ্ছে না।

এও জানা যাচ্ছে না ন্যাশনাল রেজিস্টার ফর সিটিজেনস তৈরি আসাম থেকে শুরু হলো কেন? উদ্বাস্তু সমস্যা তো দেশের অন্যত্রও আছে। পশ্চিমবঙ্গে আছে, বিহারে আছে, পঞ্জাবে, তামিলনাড়ুতে আছে, ত্রিপুরা মহারাষ্ট্রে আছে…। দেশের অন্যত্রেও এটা চালু হবে কিনা বলা হচ্ছেনা কেন? ১৯৫১ সালের এনআরসি আসামবাসীর কোন কাজে লাগেনি। এবারে লাগবে? কত ধরনের নাগরিকত্ব চালু হবে ভারতে সেটা কি ঠিক হয়েছে? আমার মত মানুষ, যার বাড়ি আসামে কিন্তু অন্য প্রদেশে ভোটার লিস্টে নাম, আধার কার্ড, পাসপোর্ট ইত্যাদি রয়েছে, তাদের নাম এন.আর.সিতে না থাকলেও কি তারা ভারতীয় নাগরিক হিসাবে গণ্য হবে?

আরও পড়ুন, Assam NRC Situation: আসাম, এ সময়

তার চাইতেও বড় প্রশ্ন তথাকথিত পঞ্চাশ বা সত্তর লক্ষ মানুষ, শেষ পর্যন্ত যাদের নাম লিস্টে উঠবে না, তারা কী করবে এবং তাদের নিয়ে কী করা হবে? শেষ অবধি সুবিচারের আশায় সুপ্রিম কোর্ট অবধি ছোটার সঙ্গতি কজনের থাকে? আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ফেরত না নিলে তাদের কি নো-ম্যানস-ল্যাণ্ডে পুশব্যাক করা হবে? তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে, না অনাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে? তাদের কি কিছু মৌলিক অধিকার বঞ্চিত করে থাকতে দেওয়া হবে? সেগুলি কী কী? তাদের কি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হবে? ভারতীয় নাগরিকের হাতে খুন বা ধর্ষিতা হলে অনাগরিকদের ভারতীয় আদালতে পেনাল কোডে একই ধারায় বিচার পাবার অধিকার থাকবে?

প্রতীক হাজেলা জানিয়েছে ডি ভোটার এবং তাদের পরিবারের মানুষদের নাম যতক্ষণ না বিষয়টির নিষ্পত্তি হচ্ছে ততক্ষণ এনআরসি লিস্টে ঢোকানো হবে না। কিন্তু তাদের স্ট্যাটাস কী হবে? অবশ্যই এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই কারো।এনআরসি তে হিন্দু না মুসলিম কাদের নাম বেশী পরিমানে বাদ যাবে তার ওপর নির্ভর করবে আসামের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতি প্রকৃতি। ইতিমধ্যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৬ এনে হিন্দু বাঙালীর সঙ্গে সারা ভারতের হিন্দু ভোটারদের কাছে অবিসম্বাদী হিরো হয়ে ওঠার একটা দান বিজেপি খেলে রেখেছে। এনআরসি তে হিন্দু বাঙালীর (যারা নিঃসন্দেহে বিজেপির ভোটব্যাংক) নাম বেশী পরিমাণে ছাঁট গেলে নাগরিকত্ব বিল সেই ক্ষতে প্রলেপ দেবে। আর যদি মুসলিম নাম বেশী ছাঁটা যায় তবে আসামের মানুষ চাইছেনা বলে বিলটিকে শেল্ফে তুলে দিতে কতক্ষণ? গাওনা গাওয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু সেতো নাগরিকত্ব বিলের প্রসঙ্গ। আগামী কয়েকদিন শুধুই এনআরসি। হিসেবনিকেশ, চুলচেরা বিশ্লেষণ, এবং নানাবিধ সামাজিক, রাজনৈতিক সমীকরণ। আসামে এগুলি সবসময় জটিল, জটিলতর। মনে রাখতে হবে আসামে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্ররা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করে সাহিত্যসভা। তারা এনআরসি মেনে নিয়েছে, ফলে রাজনৈতিক দলগুলিও মানতে বাধ্য।

গোটা বিষয়টা আসলে খিলঞ্জীয়া (ভূমিপুত্র-কন্যা) এবং ওআই (অরিজিনাল ইনহ্যাবিট্যান্টস)দের সুরক্ষার জন্য। মণিপুরেও তাই। পার্শ্ববর্তী অন্য রাজ্যগুলিতেও ইনারলাইন পারমিটসহ বহিরাগতদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিল আসবে। সুকৌশলে বিদেশী বিতাড়ন আন্দোলনের মুখ ধীরে ধীরে বহিরাগত বিতাড়নের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়াটাই অভীপ্সা। শুধু একটা স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষা। আগে যেমন সুব্রত মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে ট্রাক আটকে দিলে, বা ফুটবলে বরদলৈ ট্রফির ফাইন্যালে গণ্ডগোল হলেই, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিদের জীবন দুর্বিষহ হতো, এবারেও একজন মমতা ব্যানার্জী থেকে তপোধীর ভট্টাচার্য কেউ কোন কথা বললেই রে রে করে তেড়ে আসা শুরু হয়ে গেছে। লক্ষ্য স্থির আছে, উপলক্ষ্য চাই।

আসামে এনআরসি নবায়ন শুরু হবার পিছনে অনেকগুলি কারণ। তার মধ্যে প্রধান যেগুলি প্রকটভাবে দৃশ্যমান তার দু একটা লেখা গেল তাও সংক্ষেপে। বাকী গুলি নিয়েও লেখা হতেই থাকবে কেননা এনআরসি সেই প্রক্রিয়া যার ক্ষত দেশভাগের মত আগামী একশো বছরেরও বেশী সময় ধরে ভারতবাসীকে তাড়ণা করবে। সারা দেশের সঙ্গে সারা আসাম তাকিয়ে আছে এনআরসি ফলের দিকে। সেই খিলঞ্জিয়া, আর বিদেশী চিহ্নিতকরণের দিন ফিরে আসছে। উল্লাস। আবার ফিরে এলো ডাইনী খোঁজার দিন। উল্লাস। বাংলাদেশ নেবেনা, ভারত রাখবে না। আবার নো-ম্যানস-ল্যাণ্ডে বিতাড়িত হবে পরিচয়পত্র-হীন, পরিচয়পত্র-হারানো মানুষ। দৃশ্যমান হবে ফ্লোটসাম মানুষের এক্সোডাস। উল্লাস। গুপ্ত গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসছে অন্ধকারের মুখ ও শরীর। জয় এন.আর.সি। জয় আই অহম।

Web Title: Assam nrc situation feature bengali

Next Story
দেবেশ রায়ের নিরাজনীতি (পর্ব-৫)
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com