বড় খবর

দিল্লি থেকে বলছি: মহারাষ্ট্র পরিস্থিতি ও কৌটিল্যের দুর্ভাগ্য

ক্ষমতার রাজনীতি ভারতে মতাদর্শকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিচ্ছে, একথা আমরা বারবার আলোচনা করি। আর এই আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অনেকসময় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা দিই।

Maharashtra Assembly, Supreme Court
এখন ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে মতাদর্শ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অপ্রাসঙ্গিক

বিশাল ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা মোট ২৯। এই রাজ্যগুলির মধ্যে মহারাষ্ট্র যার রাজধানী মুম্বাই হল দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। এই রাজ্যটা অসম বা ওড়িশা এমনকি পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও তুলনীয় নয়। মহারাষ্ট্র হল সেই রাজ্য যার মুম্বাই শহরে দেশের সমস্ত বিশিষ্ট শিল্পপতিরা থাকেন। মুম্বাই শহরেই ভারতের স্টক মার্কেট। তা এই শহরে রাজ্য সরকার গঠন নিয়ে যে নাটক হয়ে চলেছে, তা আমি আমার ৩৫ বছরের সাংবাদিক জীবনে কখনো দেখিনি। কারণ বিজেপি বিধানসভায় ১০৫ টা আসন পেয়ে এক নম্বরে দল হলেও এরা সরকার গড়তে পারছে না, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৫ জন বিধায়কের সমর্থন। শিবসেনা বিজেপির পুরোনো শরিক দল পেয়েছে ৫৬ টি আসন। কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল হওয়া সত্বেও শিবসেনা বিজেপিকে সমর্থন না জানিয়ে মারাঠা নেতা শরদ পাওয়ারের এনসিপি নামক দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করছে। আজ শনিবার ২৩ নভেম্বর, এই লেখা যখন লিখছি রাত সাড়ে নটা, তখনো সে রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। শুক্রবার রাতে এনসিপি–শিবসেনা–কংগ্রেস আলাপ-আলোচনা ও বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় যে শিবসেনার নেতা উদ্ধ্বব ঠাকরেই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। কংগ্রেস ও এনসিপি এই দুই দলের দুই উপমুখ্যমন্ত্রী হবেন। শরদ পাওয়ার সাংবাদিকদের সামনে বৈঠক শেষে জানিয়ে দেন যে উদ্ধ্বব মুখ্যমন্ত্রী হবেন। উদ্ধ্বব কিন্তু সেকথা নিজমুখে ঘোষণা করেননি। তিনি বলেছিলেন শনিবার দলের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি জানাবেন।

তারপর শনিবার সকালে মানে আজ ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই জানতে পারলাম সকালবেলা রাজ্যপাল বিজেপির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশকে ডেকে পৃথক একটি চেম্বারে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করিয়ে দিয়েছেন, আর এনসিপি নেতা শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারকে করে দেওয়া হয়েছে উপমুখ্যমন্ত্রী। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। পরে সূর্যের তেজ বাড়ল। দুপুরের দিকে জানা গেল, শুক্রবারই মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়ে আসেন এবং পরে রাত বারোটার সময় এনসিপি নেতা অজিত পাওয়ার রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে এমএলএদের স্বাক্ষর সম্বলিত চিঠি জমা দেন। ঘটনাচক্রে এনসিপির পরিষদীয় দলনেতা অজিত নিজেই। অতএব এনসিপির পরিষদীয় দলের মুখপাত্র তিনিই। কারো কিছু বলার ছিল না।

আরও পড়ুন, জ্যোতি বসু থেকে মমতা, রাজ্যপালদের লক্ষ্মণ রেখা

এই ঘটনায় শনিবার সারাদিন ধরে তুলকালাম চলেছে। শুক্রবার সারারাত ধরে শিবসেনার উদ্ধ্ববের সঙ্গে পাওয়ার আর সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস কে কে মন্ত্রী হবেন কে কি দফতর পাবেন তা নিয়ে ঝগড়া ঝগড়াঝাঁটি করছিলেন, স্বরাষ্ট্র, অর্থ,  নগর উন্নয়ন, রাজস্ব, এইসব মন্ত্রক কংগ্রেস–এনসিপি নিজেদের হাতে রাখতে মরিয়া ছিল, তখন অজিত পাওয়ার বিজেপি অমিত শাহের সঙ্গে বোঝাপড়া করে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যান। এদিকে তাঁরা রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের জন্য সময় চাননি কিন্তু শুক্রবার অজিত পাওয়ার ও দেবেন্দ্র এই দাবি জানিয়ে সময় চেয়ে নেন। এ হলো সাম দাম দণ্ড ভেদের রাজনীতি।

এখন মূল প্রশ্ন হল, এমএলএ দের সমর্থন নিয়ে অজিত পাওয়ার এবং শরদ পাওয়ারের লড়াই আজ সবার সামনে। কাকা ও ভাইপো লড়াই সুবিদিত। আবার পাওয়ার দুহিতা  সুপ্রিয়া সুলের সঙ্গে তাঁর কাকার বিবাদও সকলের জানা। শনিবার তিনিও হোয়াটসঅ্যাপে সকালবেলায় জানিয়ে দেন যে পরিবার ও দল আজ ভেঙে গেছে। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ভাবছেন এই পুরো ষড়যন্ত্রের রাজনীতির আলেখ্যর আসল রচয়িতা শরদ পাওয়ার নিজেই নয়তো! তা না হলে সনিয়ার সোনিয়ার সঙ্গে দেখা করেই তিনি পরদিন সংসদে দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন কেন? মহারাষ্ট্রের কৃষকদের সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘ওয়ান-অন-ওয়ান’ বৈঠক হল কেন? আবার অনেকে বলছেন, অজিত পাওয়ার উপমুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পর এখন তিনি কীভাবে পাওয়ারের সঙ্গে সন্ধি করবেন।

তবে একটা কথা এই গোটা রাজনীতিতে খুব স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এখন ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে মতাদর্শ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অপ্রাসঙ্গিক। ম্যাকিয়াভেলি আর চাণক্যর নাম নিয়ে এখন ক্ষমতার রাজনীতিই শেষ কথা। শিবসেনা ক্ষমতার কুর্সিতে বসার জন্য হিন্দুত্বকে পরিত্যাগ করতে পারে। যে এনসিপি কে মোদী নিজেই ভোটের সময় বলেছিলেন ‘ন্যাশনাল কোরাপ্ট পার্টি’ আর অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাকে জেলে পোরার কথা বলেন, আজ তার সঙ্গেই বিজেপি সরকার গড়ছে রাজ্যের স্থায়িত্বের নামে। কংগ্রেস ক্ষমতার জন্য বিজেপির মোকাবিলায় ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। আবার এনসিপি শিবসেনার মত কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলের নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে রাজি হন। ফলে আজ সব দলের কাছেই মতাদর্শ হল অপ্রাসঙ্গিক। তবে ক্ষমতার রাজনীতি করলেও সকলেই কিন্তু তা করছেন কৃষকদের স্বার্থে। রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে। এ হলো ভারতের গণতন্ত্রের জন্য বড় দুঃখের ঘটনা। এখন রাজ্যপাল যদি সরকার গঠনের জন্য ১০ দিন সময় নেন। তবে এমএলএ কেনাবেচার চেষ্টাও হবে। এখন বিজেপি বিরোধী দলগুলি অর্থাৎ শিবসেনা, কংগ্রেস, ও এনসিপি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ। রবিবার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে সোমবারে ফের শুনানির কথা। এমএলএ দের এনসিপি পাওহাইতে রেনেসাস হোটেলে বাসে করে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছে। শিবসেনা কংগ্রেস ও একইভাবে এমএলএ দের ওপর নজরদারি রেখেছে। কী অবস্থা! হায় গণতন্ত্রের লজ্জা! সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র আজ ভারতের গণতন্ত্র!

আরও পড়ুন, রাজনীতির ‘অবেদনে’ গণতন্ত্র অজ্ঞান

ক্ষমতার রাজনীতি ভারতে মতাদর্শকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিচ্ছে, একথা আমরা বারবার আলোচনা করি। আর এই আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অনেকসময় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা দিই। অনেকসময়ে আমরা ম্যাকিয়াভিলির সঙ্গে কৌটিল্য বা চাণিক্য তুলনা করতে গিয়ে এক করে দুজনকে দেখতে গিয়েও সম্ভবত ভুল করি। কৌটিল্য বহু উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে সমস্ত রাজা রিপুর অধীন। তাদের পক্ষে পরিচালনা সমাজের রাষ্ট্রের পক্ষে ধ্বংসাত্বক, পক্ষান্তরে ন্যায় এবং সত্য আশ্রিত রাজা সবসময় তার রাজ্যের জন্য সহযোগী ও সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। রাজাকে হতে হবে প্রকৃত প্রস্তাবে ঋষির মত। ত্যাগী সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় জগত বিশ্বাসে ভরপুর। পরার্থপর ও উপযুক্ত জ্ঞানশালী ব্যক্তিই রাজা হওয়ার যোগ্য। রাজা সবসময়ই তার প্রজাগণের কল্যাণকামী হবেন, অন্যের জন্য ভাবনাই তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

‘সহায় অসাধ্যং রাজত্ব চক্রং একং ন বর্ততে/কুবিতি সচিবাংশ তস্মাৎ তেষাং চ শৃনুযান মতং’— রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজার সহায়ক ব্যক্তি উপদেষ্টাগণ। যাদের মশ্যে লোভ, মোহ, ক্রোধ ইত্যাদি ফুটে উঠতে পারে তাদেরকে রাজবৃত্ত থেকে সরিয়ে ওঠে আর্থ ব্যবস্থার সুদক্ষ ও সুষম পরিচালনের উপায়। কৌটিল্যর বক্তব্য অনুসারে রাজার মধ্যে যে সব গুণগুলো জরুরি তা হল, সততা, নিষ্ঠা, উদ্যম, উৎসাহ, ত্যাগী, নির্ভীক, কার্যক্ষম, দরদী, কর্মী, জ্ঞানী, বিশ্বাসবান, চরিত্রবান, ও ভগবত বিশ্বাসী। এমন ব্যক্তির নেতৃত্বেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। কৌটিল্য বলছেন, ‘তস্মাৎ অরি ষড়বর্গ ত্যাগ যোগেন ইন্দ্রিয় কুবীর্তং’ (অঃশাঃ ১/৭/১)। এর অর্থ হল ষড়রিপুকে জয় করে প্রথমেই ইন্দ্রিয়ের স্বাধীনতা মুক্ত হবেন রাজা। যিনি হবেন পরিচালক, তাঁকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য প্রভৃতির সীমা অতিক্রম করবে। তবে তিনি সকলের হিত, সকলের সুখ সাধনে নিযুক্ত হবেন।

মহারাষ্ট্রে আমরা দান-সাম-দণ্ড- আর ভেদের কৌটিল্য নীতি বলতে গিয়ে রাজার এই গুণের কথা ভুলতে বসেছি।

দুর্ভাগ্য কৌটিল্যর। দুর্ভাগ্য গণতন্ত্রর।

 

Web Title: Maharashtra situation morality of indian polity misrespresentation of kautilya arthashatrea

Next Story
অরণ্যে বসতির নিয়মForest, Forest of India
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com