scorecardresearch

বড় খবর

যৌনবিশ্বে কীসের হাতছানি

কৈশোরে যা মজার খেলা থাকে, বড় হয়ে তা হিংস্র হয়ে ওঠে। আর এই হিংস্রতার প্রতিচ্ছবি ধরে পড়ে বিখ্যাত পর্নোগ্রাফি সাইটে কাঠুয়া কন্যার ধর্ষনের ভিডিও খোঁজার হিড়িকে। 

যৌনবিশ্বে কীসের হাতছানি
লুকোনো ক্যামেরায় তোলা ভিডিও মনের নিষিদ্ধকামের বিন্দুকে খুঁচিয়ে দেয়। (ছবি চিন্ময় মুখোপাধ্যায়)

দেবব্রত কর বিশ্বাস

দৃশ্য ১– ক্লাসে ফিসফাস শোনা যাচ্ছে। বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ক্লাসের ফার্স্ট বয়ও ফার্স্ট বেঞ্চ ছেড়ে লাস্ট বেঞ্চে এসে বসেছে। সবার মধ্যেই কমবেশি অস্থির ভাব, যেন আর তর সইছে না। এর মধ্যে একজন শক্ত করে ধরে রেখেছে বেঞ্চে রাখা ব্যাগটি, ছেড়ে দিলেই অন্য কেউ নিয়ে যাবে ছোঁ মেরে। এভাবে ক্লাস শেষ হয়। ঢং ঢং ঘণ্টা বাজে টিফিন পিরিয়ডের। ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ হয়, গোটা ক্লাস হুমড়ি খেয়ে পড়ে জাপটে ধরে রাখা সেই ব্যাগের দিকে। ব্যাগ খোলা হয়। বেরিয়ে আসে জ্যালজ্যালে ধূসর কাগজে ছাপা চটি বই, বহুব্যবহারের শতচিহ্ন তার গায়ে লেগে আছে। উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে ক্লাসরুমের হাওয়া।

দৃশ্য ২– ‘আজ দুপুরে বাবা-মা বাড়িতে থাকবে না’ কথাটা কীভাবে যেন ছড়িয়ে গেছে বন্ধুদের মধ্যে। মোবাইল ফোন থেকে একশো মাইল দূরে থাকা সময়ে কীভাবে যেন ছড়িয়ে পড়ত কথাটা। দুপুরে তড়িঘড়ি করে স্নান-খাওয়া সেরে মা’কে “আজ ম্যাচ আছে, আমি বেরোচ্ছি” বলে মিথ্যে বেরিয়ে পড়া বন্ধুর বাড়ির দিকে। জোগাড় করে আনা ভিসিআর-এ কালো ক্যাসেট ঢুকিয়ে অপেক্ষা করা, পর্দায় ফুটে উঠবে কখন চরম মুহূর্ত!

আরও পড়ুন: পৌরুষ! আর চাই না

দৃশ্য ৩– সদ্য মাল্টিমিডিয়া ফোন এসেছে হাতে। হঠাৎ বন্ধুর পাঠানো মেসেজ। সঙ্গে লেখা, “আমাদের পাড়ার হার্টথ্রব দিদির খাজানা”। এমএমএস! নিজেকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে ডুবে যাওয়া, উফ! স্বর্গ!

দৃশ্য ৪– পাড়ায় পাড়ায় সাইবার ক্যাফে। ইন্টারনেট নামক একটা সব পেয়েছির দুনিয়ার হাতছানি। বড়দের মতে, এসব অপ্রয়োজনীয়, অল্পবয়সীদের মতে ভীষণ দরকারি। সবচেয়ে বেশি ভিড় সেখানে, যেখানে কম্পিউটারগুলো কিউবিকলের মধ্যে রাখা। মধ্যে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ‘নোটস জোগাড় করার ঝোঁক’। দলে দলে সব সাইবার ক্যাফেমুখী। দশ টাকায় এক ঘণ্টা সার্ফিং। কিউবিকলের স্বর্গ, আর পর্দায় ফুটে ওঠা সেলিব্রিটিদের সুপার-ইম্পোজ করা ছবি। ‘ছবিগুলো ফেক’ জেনেও হাঁ করে তাকিয়ে থাকা দশ টাকায় এক ঘণ্টা!

আমাদের দেশের আপামর মানুষের মধ্যে মেয়েদের স্থান এখনও ভীষণভাবে অবদমিত।

 

আরও পড়ুন: কাঠুয়া কন্যা ও ফেসবুক প্রবণতা

এখন যারা যৌবনে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জীবনে উপরের দৃশ্যগুলো চেনা, খুব চেনা। সময় বদলেছে, দৃশ্যগুলোও বদলেছে। যা বদলায়নি সেটা হল ‘নিষিদ্ধ রসের দৃশ্যকাম’। বটতলার চটি বই, ভিসিআর, দেশিবাবা, এমএমএস পেরিয়ে এখন স্মার্টফোনের দুনিয়া। হাতের মুঠোয় বিশ্ব। যৌনবিশ্বও। এখন নতুন সংযোজন ঘটেছে এক ধরনের শর্ট ফিল্মের। যৌন উস্কানিমূলক শর্ট ফিল্ম। এখন প্রশ্ন হল, কী থাকে এই যৌনবিশ্বে? কেন এত অমোঘ আকর্ষণ এর প্রতি? এর কারণ একটাই- নিষিদ্ধ স্বাদ। যারা চটি বই পড়েছেন, যারা ভিসিআর, এমএমএস দেখে তৃপ্ত হয়েছেন তাদের তৃপ্তির একটাই পয়েন্ট থেকেছে- নিষিদ্ধ স্বাদ। বটতলার চটি বইগুলোতে কখনও স্বামী-স্ত্রীর যৌনমিলনের বর্ণনা থাকে না, থাকে পরিবারের অথবা পাশের বাড়ির অন্য কোনও সমবয়সী এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অসমবয়সী মানুষের সঙ্গে যৌনতার রগরগে বর্ণনা। ওই বই পড়তে পড়তে অবধারিত ভাবে পাঠকের চোখের সামনে ভেসে উঠবে তার নিজস্ব কোনও ফেটিশ। শুধু চটি বই নয়, যে কোনও ফর্মের পর্নোগ্রাফি, এমএমএস, লুকোনো ক্যামেরায় তোলা ভিডিও আসলে মানুষের মনের এই নিষিদ্ধকামের বিন্দুকে খুঁচিয়ে দেয়। উস্কানি দেয়। মানুষ হয়তো সামাজিকতার ভয়ে সেগুলো বাস্তবে রূপান্তরিত করে না, কিন্তু মৈথুনে তার সমাপ্তি ঘটায়। শুনে অবাক লাগছে তো? মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে? ভেবে দেখুন আমাদের মনে এই নিষিদ্ধ ফেটিশ লুকিয়ে নেই তো? পাড়ার কোনও মেয়ের এমএমএস হাতে এলে আমরা কি হুমড়ি খেয়ে তা দেখিনি? দেখার পরে হাত থেকে নোংরা ঝেড়ে ফেলার মতো করে আমরা হয়তো বলেছি “ছি ছি, নোংরা! এই ছিল মেয়েটার মনে?” ভেবে দেখিনি, আমাদের মনে কী আছে! এই যে রসিয়ে রসিয়ে তার এমএমএস দেখে নেওয়া, এটাও কি আমাদের কথা অনুযায়ী ‘নোংরা’ নয়? এটা হল অন্যের বেডরুমে উঁকি দেওয়ার মতো। সামাজিকভাবে যাকে পাওয়া কোনও ভাবেই সম্ভব নয়, যদি তার গোপনীয়তায় ঢুকে পড়ার ছাড়পত্র মেলে, আমরা সেটা চেটেপুটে উপভোগ করি। কবি বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন “শুধু তা-ই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত!” আমাদের সমাজে তার রূপান্তর ঘটে গিয়ে হয়েছে, শুধু তা-ই নিষিদ্ধ, যা ব্যক্তিগত। আর এই নিষিদ্ধ স্পেসে ঢুকে পড়ার ক্ষেত্রে মেয়েদের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে ছেলেরা। পর্নোগ্রাফি দেখার প্রবণতাও ছেলেদের মধ্যে বেশি। নীল ছবি দেখার নিরিখে আমাদের দেশ ভারত গোটা বিশ্বের মধ্যে একদম প্রথম সারিতে। এর কারণ কখনও খোঁজার চেষ্টা করেছি কি আমরা? আমাদের দেশের আপামর মানুষের মধ্যে মেয়েদের স্থান এখনও অদ্ভুতভাবে অবদমিত। ঋতু শুরু হওয়ার দিন থেকে তাদের শেখানো হয় তারা যেন ছেলেদের সংস্পর্শ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে। স্বয়ং সমাজ ছোট থেকেই নারী-পুরুষের মধ্যে একটা দূরত্ব রচনা করে রাখে। এই দূরত্বের কারণেই ‘নিষিদ্ধ’ কৌতূহল তৈরি হয় বেশি করে। ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেওয়া হয় নারীশরীর হল ভোগ করার বস্তু। কারণ পাওয়ার স্ট্র্যাকচারের শীর্ষবিন্দুতে পুরুষ সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে অবস্থান করে। এই ‘পাওয়ার’ অর্থাৎ ‘ক্ষমতা’ নিষিদ্ধ জিনিসকে কাছে পাওয়ার লোভকেও প্ররোচিত করে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন যেসব পর্নোগ্রাফিগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা হয় তার মধ্যে একটা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা থাকে অথবা ছলে-বলে-কৌশলে হাসিল করার ব্যাপার থাকে। আর এই ‘নিষিদ্ধকে কাছে পাওয়ার লোভ’ বড় হতে হতে পুরুষসুলভ ক্ষমতার দম্ভের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাউকে কাউকে বানিয়ে দেয় বায়োলজিক্যাল রেপিস্ট। কৈশোরে যা মজার খেলা থাকে, বড় হয়ে তা হিংস্র হয়ে ওঠে। আর এই হিংস্রতার প্রতিচ্ছবি ধরে পড়ে বিখ্যাত পর্নোগ্রাফি সাইটে কাঠুয়া কন্যার ধর্ষনের ভিডিও খোঁজার হিড়িকে। অবাক লাগলেও এই প্রবণতার জন্ম অনেক গভীরে।  

আরও পড়ুন: কুমারীধর্ষণের চরম শাস্তিতে সক্রিয় সরকারঃ একটি প্রতিক্রিয়া

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Opinion news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Porn watching habit and women objectification