scorecardresearch

ঠিক কীভাবে নাগরিকত্ব ‘সংশোধন’ করবে মোদী সরকার?

আসামে এনআরসি করতে খরচ হয়েছে ১,৬০০ কোটি টাকা। তা সত্ত্বেও আসাম সরকারের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীরা অবিবেচকের মতো দাবি করছেন যে রাজ্যে এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি হোক।

ঠিক কীভাবে নাগরিকত্ব ‘সংশোধন’ করবে মোদী সরকার?
অলঙ্করণ: অভিজিৎ বিশ্বাস

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ২০২৪ সালের মধ্যে সারা দেশে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (এনআরসি বা NRC) সম্পন্ন করা হবে, যাতে ভারত থেকে সমস্ত “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” বিতাড়িত হন। সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০১৯ প্রণয়ন করার ওপর যেভাবে জোর দিচ্ছে সরকার, তার পাশাপাশি এনআরসি সংক্রান্ত এই ঘোষণায় এক মরিয়া মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সত্যি কথাটা হলো, মোদী সরকারের ন্যূনতম ধারণা নেই যে আসামে এনআরসি থেকে বাদ পড়া ১৯ লক্ষ মানুষের ভাগ্যে কী আছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবার বাংলাদেশ সরকারকে আশ্বস্ত করেছেন যে ভারতের এই মিত্ররাষ্ট্রের ওপর এনআরসি’র কোনও প্রভাব পড়বে না। তাই যদি হয়, তবে এই ১৯ লক্ষ রাষ্ট্রহীন মানুষ যাবেন কোথায়? এঁদের জন্য আটক কেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টার বানানোর এবং চালু রাখার বিপুল খরচ কে বহন করবে? ইতিমধ্যেই আসামে এনআরসি করতে খরচ হয়েছে ১,৬০০ কোটি টাকা। তা সত্ত্বেও আসাম সরকারের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীরা অবিবেচকের মতো দাবি করছেন যে রাজ্যে এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি হোক, নতুন করে বেঁধে দেওয়া হোক সময়সীমা।

এনআরসি’র অযৌক্তিকতা

এই দাবি থেকেই প্রকাশ পাচ্ছে “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী”-বিরোধী অভিযানে এনআরসি’র মতো প্রক্রিয়ার অযৌক্তিকতা, বিশেষ করে ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে। অটলবিহারী বাজপেয়ীর জমানায় ২০০৩ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট অনুযায়ী, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সেইসব “বিদেশি যাঁরা ভারতে প্রবেশ করেছেন বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণের অন্যান্য নথি ছাড়া”। “অবৈধ অভিবাসী”র এই ত্রুটিপূর্ণ সংজ্ঞার অর্থ হলো, যে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু দেশভাগ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব বাংলা থেকে এদেশে প্রবেশ করেন, তাঁদের নির্মমভাবে ফৌজদারি অপরাধী বানিয়ে দেওয়া।

রণজিৎ রায়ের লেখা The Agony of West Bengal: A Study in Union State Relations বইয়ে উদ্ধৃত কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন মন্ত্রকের পরিসংখ্যান থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় চেকপোস্টে উদ্বাস্তু হিসেবে নাম লিখিয়েছিলেন ৫২ লক্ষেরও বেশি মানুষ। রাষ্ট্রসংঘকে দেওয়া ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে সীমান্ত পার করেন আরও প্রায় ১ কোটি মানুষ, যার উল্লেখ পাওয়া যায় The State of the World’s Refugees 2000: Fifty Years of Humanitarian Action বইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৭১-এর উদ্বাস্তুদের অধিকাংশই দেশে ফিরে যান, কিন্তু সকলে যান নি, এপারে রয়ে যান কয়েক হাজার। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগেরই স্থান হয় পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে তাঁরা শুধু আর্থ-সামাজিক মূলস্রোতের অঙ্গই হয়ে যান নি, রীতিমত রাষ্ট্র গড়ার কাজে অংশীদার হয়েছেন।

দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের উদ্বাস্তুদের মধ্যে ছিলেন নমঃশূদ্র এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের অনেকেই। এই বাঙালি উদ্বাস্তুদের সিংহভাগই হিন্দু, কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে এদেশে এসেছেন বেশ কিছু বাঙালি মুসলমানও, যেহেতু ১৯৭১-এর যুদ্ধের একটি নির্দিষ্ট চরিত্র ছিল। যুদ্ধ হয়েছিল ভাষার ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়।

এই উদ্বাস্তুদের কেউই কিন্তু ভারতে বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি নিয়ে ঢোকেন নি, ফলে পরিবর্তিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের চোখে তাঁরা “অবৈধ অভিবাসী” বা “illegal migrants”. এছাড়াও ২০০৩ সালের সংশোধনীর ফলে উদ্বাস্তু পরিবারে জন্মানো সন্তানরা জন্মসূত্রে কখনোই ভারতীয় হতে পারবেন না, যদি তাঁদের বাবা-মায়ের একজনও “অবৈধ অভিবাসী” ঘোষিত হন।

‘ডাউটফুল সিটিজেন’ কারা?

সেই ২০০৩ সালেরই পরিবর্তিত নাগরিকত্ব আইনে ১৪এ ধারা যোগ হওয়ার ফলে “ভারতের প্রত্যেক নাগরিককে” বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে, নথিবদ্ধ করতে হবে ভারতীয় নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় পঞ্জি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেনস (NRIC), এবং জারি করতে হবে ‘ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড’।

এই আইনের অধীনে গঠিত নাগরিকত্ব (নাগরিক পঞ্জিকরণ ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্রের জারিকরণ) বিধি, অর্থাৎ সিটিজেনশিপ (রেজিস্ট্রেশন অফ সিটিজেনস অ্যান্ড ইস্যু অফ ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ডস) রুলস, ২০০৩ একটি বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার বিধান দিয়েছে, যার দ্বারা প্রথমে গঠিত হবে ভারতের সব স্থায়ী বাসিন্দাদের ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (NPR), এবং এর পরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হবে ‘ডাউটফুল সিটিজেন’ বা সন্দেহজনক নাগরিকদের। ফলে NPR থেকে ‘ডাউটফুল সিটিজেন’দের বাদ দেওয়ার পর তৈরি হবে NRIC।

NPR প্রক্রিয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি হয়, এবং খোদ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়, ২০১০-১১ সালে, ইউপিএ সরকারের শাসনকালে। কিন্তু তার পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহজনক নাগরিকদের চিহ্নিতকরণ এবং বাতিল করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, ফলে তৈরি হয়নি NRIC-ও।

সন্দেহজনক নাগরিকদের চিহ্নিত করার কোনও যুক্তিসঙ্গত এবং স্বচ্ছ ভিত্তির উল্লেখ নেই ২০০৩-এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা নাগরিকত্ব বিধিতে। এই ধরনের অসঙ্গতি, এবং এই আইনে “অবৈধ অভিবাসী”র ত্রুটিপূর্ণ সংজ্ঞা, যা উদ্বাস্তু এবং অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে ফারাক করে না, এর ফলে যুক্তিবহির্ভূত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এনআরসি লাগু করার চেষ্টা হলে শুধু যে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে তাই নয়, বাতিল হবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভারতীয় নাগরিকত্ব, যার ফলে তাঁরা হয়ে পড়বেন রাষ্ট্রহীন।

এহেন প্রক্রিয়া এবার সারা দেশে চালু করতে বদ্ধপরিকর মোদী সরকার। এই প্রসঙ্গে লক্ষণীয় যে আসাম চুক্তি (Assam Accord) অনুসরণ করে আসামে যে ২৪ মার্চ, ১৯৭১-এর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া গিয়েছিল, দেশজোড়া NRIC-র ক্ষেত্রে কিন্তু তেমন কোনও সময়সীমার অস্তিত্ব নেই। অতএব ঠিক কোন কোন, এবং কোন সময়কার, নথি দেখালে নাগরিকত্বের যোগ্যতা অর্জন করা যাবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে বাধ্য।

সাংবিধানিক পরীক্ষায় ফেল

মোদী সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৯ প্রণয়ন করতে চাইছে ২০০৩ সালের সংশোধনীর নির্বুদ্ধিতা কিছুটা হলেও মেরামত করতে। কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৯ তো নিজেই সাংবিধানিক পরীক্ষায় ফেল। তার কারণ এটি ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ করে – বাংলাদেশ, পাকিস্তান, বা আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন এবং পার্সি ধর্মাবলম্বীরা নাগরিকত্ব পেতে পারবেন, কিন্তু মুসলিমরা পাবেন না। ভারতের সংবিধানের ১৪ থেকে ২৫ অনুচ্ছেদের সর্বতোভাবে বিরোধিতা করছে এই নীতি।

তাছাড়াও নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৬ প্রসঙ্গে যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে দেওয়া তাঁদের বয়ানে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আধিকারিকরা স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই আইন প্রণীত হলে তার সুবিধে উপভোগ করবেন মাত্র ৩১,৩১৩ জন অভিবাসী। উপরোক্ত পড়শি রাষ্ট্রগুলিতে ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার, এই ভিত্তিতে এঁদের ইতিমধ্যেই দীর্ঘমেয়াদী ভিসা জারি করেছে ভারত সরকার।

অতএব আসামে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন যেসব বাঙালি হিন্দু, তাঁরা যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৯-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাবেন, একথা সর্বৈব মিথ্যা। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু, যাঁরা অধিকাংশই বাঙালি হিন্দু, পূর্ব বাংলায় ধর্মীয় নির্যাতনের কোনোরকম প্রামাণ্য নথি দেখাতে পারবেন না, অতএব এই পথে নাগরিকত্ব পাবেন না তাঁরা। তাছাড়া, যেসব গোর্খা, বিহারী এবং তফসিলি উপজাতির মানুষ এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তাঁরা চাইলেও দাবি করতে পারবেন না যে তাঁরা বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, বা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছেন। সুতরাং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৯ যে শুধুমাত্র কোনও সমস্যার সমাধান করছে না তাই নয়, বরং এটি একটি অহিতকর চমক মাত্র, যা সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির ক্ষতিসাধন করছে।

এনআরসি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রেই রয়েছে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার বা ন্যাচারাল জাস্টিসের গুরুতর লঙ্ঘন। নাগরিকত্ব প্রমাণের বোঝা একটি গোটা জনসংখ্যার ওপর রাষ্ট্র কীভাবে চাপিয়ে দিতে পারে? এমন প্রক্রিয়া শুরু করাই কেন, যার ফলে অসংখ্য দরিদ্র, অসুরক্ষিত মানুষ – উদ্বাস্তু, অ-নথিভুক্ত শ্রমিক, বিবাহিতা মহিলা, বাস্তুচ্যুত মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত, দলিত, এবং আদিবাসী – অবধারিতভাবেই তালিকার বাইরে থাকবেন?

সমাধান একটাই, ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বাতিল করে ১৯৫৫ সালের মূল নাগরিকত্ব আইন পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে রয়েছে নাগরিকত্বের সর্বব্যাপী এবং ধর্মনিরপেক্ষ সংজ্ঞা। দেশের গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির সেই লক্ষ্যেই লড়াই করা উচিত।

(লেখক অর্থনীতিবিদ এবং আহ্বায়ক, নাগরিকপঞ্জি বিরোধী যুক্তমঞ্চ)

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Opinion news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Why important to restore secular notion of citizenship