Blind Football India: মেসির আলোয় ঝলমলে কলকাতা ফুটবল, অন্ধকারেই দৃষ্টিহীন সঙ্গীতারা

Blind Football: আমাদের অবস্থা দেখুন! আমাদের কেউ স্পন্সর পর্যন্ত করে না। প্র্যাকটিস করার জন্য আমরা জায়গা পর্যন্ত পায়না। সবার কাছে অনুরোধ করার পরে, কারো বাড়ির উঠোন, ছাদ, কিংবা ছোট্ট একটা কোনায় আমরা নিজেরা প্রশিক্ষণ করি।

Blind Football: আমাদের অবস্থা দেখুন! আমাদের কেউ স্পন্সর পর্যন্ত করে না। প্র্যাকটিস করার জন্য আমরা জায়গা পর্যন্ত পায়না। সবার কাছে অনুরোধ করার পরে, কারো বাড়ির উঠোন, ছাদ, কিংবা ছোট্ট একটা কোনায় আমরা নিজেরা প্রশিক্ষণ করি।

author-image
Shashi Ghosh
New Update
Indian Women Blind Footbal

পূর্ব মেদিনীপুর পাঁশকুড়া চিলকাগড় গ্রামের মেয়ে, সঙ্গীতা। এক্সপ্রেস ফটো-শশী ঘোষ

Indian Women Blind Football: কলকাতা এখন মেসিজ্বরে আক্রান্ত। দিন তিনেক পরেই কল্লোলিনী তিলোত্তমায় পা রাখবেন আর্জেন্টিনার এই তারকা ফুটবলার। শহরে উৎসবের আমেজ। মেসি অভ্যর্থনায় যাতে খামতি না থাকে তাই খরচ কার্পণ্য করছে না কলকাতা। সেজে উঠছে রাস্তাঘাট। বসানো হচ্ছে ৭০ফুটের মূর্তি। সব মিলিয়ে ঝাঁ চকচকে ব্যাপার স্যাপার। শীতের সময়েও শহরের উত্তাপ বাড়ছে। আর অন্যদিকে এই শহরেরই এক কোণায় প্র্যাকটিসের জন্য মাঠ খুঁজে বেড়াচ্ছেন দৃষ্টিহীন ভারতীয় মহিলা দলের অধিনায়ক। স্পন্সর তো দূরে থাক ম্যাচের আগে খাবার পর্যন্ত জোটেনা কপালে।

Advertisment

অনেক কষ্টে দক্ষিণ কলকাতার এক প্রান্তে মাঠ পাওয়া গিয়েছে। এক কোণে দাঁড়িয়ে তিন জন ছেলে এবং একটি মেয়ে। মেয়েটির গায়ে ভারতীয় ফুটবল দলের জার্সি, ট্র্যাক প্যান্ট। বাকি তিনজনের জামা কাপড় ছাপোষা সাদামাটা। মাঠে তখন জমিয়ে ক্রিকেট খেলছে পাড়ার ছেলেরা। আর এরা অপেক্ষায় ছিল ফাঁকা মাঠের। প্র্যাকটিসের জন্য। এরা প্রত্যেকই কোন না কোন সময়ে ভারতীয় দলের হয়ে খেলেছে (Indian Football)। এমন খেলোয়াড়রা প্র্যাকটিসের জন্য মাঠ খুঁজে বেড়াচ্ছে? হ্যাঁ! শুনতে বা পড়তে অদ্ভুত লাগলেও এটাই সত্যি। কলকাতা যখন মেসির জন্য টাকা উড়ছে। এই দৃষ্টিহীনদের সামান্য ফাঁকা জায়গাটুকু পর্যন্ত বরাদ্দ হচ্ছে না।

blind women football, sangeeta metya
ভারতের মহিলা প্রতিবন্ধী ফুটবল দলের অধিনায়ক সঙ্গীতা। এক্সপ্রেস ফটো-শশী ঘোষ

Curse of the sea: ঘোড়ামারা: যে দ্বীপের মৃত্যু ঘণ্টা বাজছে প্রতিদিন, একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে নদী!

মেয়েটি সম্প্রতি কিছুদিন আগেই জাপান থেকে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে। ভারতের মহিলা প্রতিবন্ধী ফুটবল দলের অধিনায়ক। নাম, সঙ্গীতা মেট্যা। বয়স ৩১ এর কোটায়। আর পাঁচজন সাধারণ খেলোয়াড়ের মতনই অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন খেলোয়াড়। তা সত্ত্বেও তার পরিচিতি কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। স্বাভাবিক মানুষের ভিড়ে ওদের গণ্য করা হয় না। ছোটবেলা থেকে ওদের বেড়ে উঠা আট-দশটি শিশুর মতো হয়নি। সমাজের কিছু মানুষও ওদের আলাদা চোখে দেখে। কারণ ওরা প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মালেও বিশ্ব ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সঙ্গীতা। 

blind football india, blind women football, sangeeta metya, দৃষ্টিহীন ফুটবলার, ভারতীয় মহিলা ফুটবল, সঙ্গীতা মেট্যা, blind football captain india, blind women football captain, bengal footballer, বাংলার ফুটবল তারকা,
অদম্য জেদ আর বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি পার করে সঙ্গীতা ফুটবল খেলতে শুরু করে। এক্সপ্রেস ফটো শশী ঘোষ

Old Doors and windows: পুরনো বাড়ির দরজা জানলার ঠাঁই হয় যে বাজারে

পূর্ব মেদিনীপুর পাঁশকুড়া চিলকাগড় গ্রামের মেয়ে। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মা বড় ভাই বৌদি এই নিয়ে তার সংসার। বাবা চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত। গ্রামের দরিদ্র পরিবার। বাড়ির কেউ আগে কখনো ফুটবল খেলেনি। জন্মের সময় থেকে সে আশি শতাংশ দেখতে পায় না। সঙ্গীতার কথায়, ‘ছোটবেলায় বাড়ির পাশে পাড়ার ছেলেরা ফুটবল খেলত। সেখান থেকেই আমার খেলার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। এক মেয়ে তার উপরে চোখে দেখতে পায় না বাড়ির কেউ আমাকে  উৎসাহ দিতে আসেনি। নিজের মধ্যেই চেপে রেখেছিলাম খেলার ইচ্ছেটা।’ 

blind football india, blind women football, sangeeta metya, দৃষ্টিহীন ফুটবলার, ভারতীয় মহিলা ফুটবল, সঙ্গীতা মেট্যা, blind football captain india, blind women football captain, bengal footballer, বাংলার ফুটবল তারকা, disabled sports india, প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়, blind sports india,
কোচ গৌতম দের সঙ্গে মাঠে প্র্যাকটিস করতে ব্যস্ত সঙ্গীতা। এক্সপ্রেস ফটো শশী ঘোষ

Baruipur News: রোজ অগণিত মানুষের বৈতরণী পারের গুরুদায়িত্ব তাঁরই কাঁধে, কর্তব্যে অবিচল টুম্পা

এরপর ২০১৭ সাল। গ্রামে পড়াশোনা শেষ করে রবীন্দ্রভারতীতে বাংলা নিয়ে পড়তে আসে সঙ্গীতা। এরপর ওখানেই জানতে পারে প্রতিবন্ধীরাও খেলতে পারেন। তাঁদেরও দল রয়েছে। প্রথমে নাম লেখায় ক্রিকেট দলে। এরপর প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। সুযোগ আসে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের হয়ে খেলার। ফুটবল খেলার ইচ্ছেটা তার মধ্যে কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল। ২০১৮ সালে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্লাইন্ড এর সম্পাদক গৌতম দের সঙ্গে আলাপ হয় সঙ্গীতার। তিনি ফুটবল খেলার প্রস্তাব দেন। আর বিন্দুমাত্র দেরি না করে রাজি হয়ে যায়। গৌতমবাবু নিজেও একজন দৃষ্টিহীন ফুটবলার।

blind football india, blind women football, sangeeta metya, দৃষ্টিহীন ফুটবলার, ভারতীয় মহিলা ফুটবল, সঙ্গীতা মেট্যা, blind football captain india, blind women football captain, bengal footballer, বাংলার ফুটবল তারকা, disabled sports india, প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়, blind sports india, blind football world championship, women blind football india
অসংখ্য সার্টিফিকেট, মেডেল তার ঝুলিতে রয়েছে। এক্সপ্রেস ফটো-শশী ঘোষ

Boatman Of Bengal: স্বরূপের ঘরদোর জুড়ে আজও ভেসে বেড়ায় ভুলে যাওয়া 'আদরের নৌকো'

তাঁর কথায়, “ সঙ্গীতা আমার কথা শোনা মাত্র রাজি হয়ে যায়। আমি ওকে কোচিং করাতে শুরু করি। সঙ্গীত ভীষণ প্রতিভাবান একজন ফুটবলার খুব তাড়াতাড়ি সে খেলা রপ্ত করে নেয়। আমি সে সময় দৃষ্টিহীন মহিলা ফুটবল দল তৈরি করছিলাম।” এরপর অদম্য জেদ আর বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি পার করে সঙ্গীতা ফুটবল খেলতে শুরু করে। ২০২২ সালে পুণেতে ভারতীয় মহিলা জাতীয় দলে ( Indian Women Football) খেলার সুযোগ আসে। ২০২৩ সালে সঙ্গীতা লন্ডনের বার্মিংহামে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে যান। পশ্চিমবঙ্গ থেকে একমাত্র মেয়ে ভারতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। (indian football team)

blind football india, blind women football, sangeeta metya, দৃষ্টিহীন ফুটবলার, ভারতীয় মহিলা ফুটবল, সঙ্গীতা মেট্যা, blind football captain india, blind women football captain, bengal footballer, বাংলার ফুটবল তারকা, disabled sports india, প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়, blind sports india, blind football world championship, women blind football india
প্র্যাকটিস করার জন্য মাঠটুকু পর্যন্ত বরাদ্দ থাকে না। এক্সপ্রেস ফটো শশী ঘোষ

এরপর ২০২৪, জাপানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলবার জন্য যায় টোকিও। স্ট্রাইকার এবং মাঝমাঠে তার খেলা সবার নজর কাড়ে। দেশে ফিরে সংবর্ধনা, অনেক মানুষের বাহবাও পেয়েছিলেন। অসংখ্য সার্টিফিকেট, মেডেল তার ঝুলিতে রয়েছে। কিন্তু এতসবের পরেও সঙ্গীতার জীবন সেই অন্ধকারেই পড়ে আছে। একটা চাকরিটুকু পর্যন্ত ভাগ্যে জুটলো না। ঈশ্বর যেন গোলপোস্টে কঠিন গোলকিপারের ভূমিকা পালন করছে। অভিযোগ, ফুটবল ফেডারেশন প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করে থাকে। খেলোয়াড়দের জন্য খাবারের ব্যবস্থা তো দূরে থাক, এক গ্লাস জলেরও ব্যবস্থা করে না! কোথাও খেলতে যাওয়ার আগে প্র্যাকটিস মাঠ কিংবা ট্রেনের টিকিটটুকু পর্যন্ত জোটে না। এটা কী করে হয়?

blind football india, blind women football, sangeeta metya, দৃষ্টিহীন ফুটবলার, ভারতীয় মহিলা ফুটবল, সঙ্গীতা মেট্যা, blind football captain india, blind women football captain, bengal footballer, বাংলার ফুটবল তারকা, disabled sports india, প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়, blind sports india, blind football world championship, women blind football india, indian disabled athlete,
ভারতীয় মহিলা ফুটবল দলের পাশাপাশি মহিলা ক্রিকেটেও খেলেছেন সঙ্গীতা। এক্সপ্রেস ফটো শশী ঘোষ

সঙ্গীতা বলেন,‘আমরা প্রতি নিয়ত লড়াই করে বেঁচে আছি। আজকে যারা মেইনস্ট্রিম খেলার সঙ্গে যুক্ত ভারতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছে তাদের দেখুন আর আমাদের অবস্থা দেখুন! আমাদের কেউ স্পন্সর পর্যন্ত করে না। প্র্যাকটিস করার জন্য আমরা জায়গা পর্যন্ত পায়না। সবার কাছে অনুরোধ করার পরে, কারো বাড়ির উঠোন, ছাদ, কিংবা ছোট্ট একটা কোনায় আমরা নিজেরা প্রশিক্ষণ করি। (Indian Women Football Team )ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে আসার পরে অনেক নেতা মন্ত্রী অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখনো একটা চাকরি পর্যন্ত কেউ দিল না। মুখ্যমন্ত্রীর সাথে অনেকবার যোগাযোগ করেছি। চাকরি পায়নি। সবাই কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করবার কথা বলেছে। আমার তো টাকার দরকার নেই, একটা চাকরি দিলেই হবে! নিজে পরিশ্রম করে উপার্জন করব।’

blind football india, blind women football, sangeeta metya, দৃষ্টিহীন ফুটবলার, ভারতীয় মহিলা ফুটবল, সঙ্গীতা মেট্যা, blind football captain india, blind women football captain, bengal footballer, বাংলার ফুটবল তারকা, disabled sports india, প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়, blind sports india, blind football world championship, women blind football india, indian disabled athlete,
সঙ্গীতার মত বাংলার আরও অনেক খেলোয়াড়রা রয়েছেন যারা ভীষণ প্রতিভাবান। এক্সপ্রেস ফটো শশী ঘোষ

এই কথাগুলো কোচ গৌতম দের পাশে বসে আক্ষেপে সুরে বলছিলেন সঙ্গীতা। গৌতম বাবুও নিজের ক্ষোভ উপড়ে দিলেন এই কথাগুলো শুনে, ‘আমাদের মধ্যে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা রয়েছে। আজকে দেখুন আমাদেরই বাংলার মেয়ে রিচা ঘোষ। আমাদের গর্ব। সরকার তাকে একটি চাকরি দিল। সঙ্গীতাকেও তো একটা চাকরি দিতে পারতো। অনেক চিঠি লিখেছি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে, লাভ কিছুই হয়নি। আমরা যে ফুটবল প্র্যাকটিস করব তার জন্য মাঠটুকু পর্যন্ত বরাদ্দ থাকে না। খাবারের কথাটা ছেড়েই দিন। নিজেদের পকেটে টাকা খরচা করে আমরা ম্যাচ খেলতে যাই। প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের প্রতি সকলেই উদাসীন।’

blind football india, blind women football, sangeeta metya, দৃষ্টিহীন ফুটবলার, ভারতীয় মহিলা ফুটবল, সঙ্গীতা মেট্যা, blind football captain india, blind women football captain, bengal footballer, বাংলার ফুটবল তারকা, disabled sports india, প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়, blind sports india, blind football world championship, women blind football india, indian disabled athlete,
‘আমার টাকার দরকার নেই, একটা চাকরি দিলেই হবে! নিজে পরিশ্রম করে উপার্জন করব।’ এক্সপ্রেস ফটো-শশী ঘোষ

সঙ্গীতার মত বাংলার আরও অনেক খেলোয়াড়রা রয়েছেন যারা ভীষণ প্রতিভাবান। কিন্তু সঠিক সুযোগ এবং পরিকাঠামোর অভাবে তারা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবন্ধকতা তাদের প্রধান শত্রু নয়। তাঁদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পরিস্থিতি, আমাদের দেশের ক্রীড়া জগতের দুর্বল পরিকাঠামো। সুদিন ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে। 

চলবে…

indian football team Indian Football Indian Women Football Team Bengal Footballer