scorecardresearch

বড় খবর

চার আনা নিয়ে নববর্ষে ক্লাবে ঢুকতেন ধীরেন দে! বারপুজোর রেওয়াজে স্মৃতিমেদুর ময়দান

বারপুজো ময়দানি ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বারপুজোতেই ফুটবল মরশুম শুরু হতে একসময়। সেই ট্র্যাডিশন এখন অনেকটাই অস্তাচলে।

east bengal bar puja
বারপুজোর ঐতিহ্য এখনও অম্লান ময়দানে (ইস্টবেঙ্গল মিডিয়া)

ধীরেন দে সেদিন আসতেন ধোপদুরস্ত শ্বেতশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবি পরে। পাট করা পাঞ্জাবি ভাঙতেন সেদিনই। ক্লাবে প্রত্যেক ফুটবলারদের হাতে তুলে দিতেন ২৫ পয়সা। কারোর ভাগ্যে হয়ত জুটে যেত রুপোর কয়েন।

সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায় আবার এই দিনে প্রবল উত্তেজিত থাকতেন মরশুমের শুরুতে সমর্থকদের সঙ্গে আলাপ করার জন্য।

মানস ভট্টাচার্য নববর্ষে বারপুজোর পরে অনুশীলনে গোল করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন সবসময়।

ইস্টবেঙ্গলে তো একবার বিখ্যাত এক ফুটবলার অধিনায়ক হওয়ার পরে কেঁদেই ফেলেন সর্বসমক্ষে।

নববর্ষ মানেই বারপুজো। আর বারপুজো মানেই ময়দানি ফুটবলের অমোঘ নস্ট্যালজিয়া। সেই নস্ট্যালজিয়া থেকে বেরোতে পারেনি কেউ আজও। নববর্ষের সকাল মানেই ময়দানি ফুটবলে ছোট, বড়, মেজ ফুটবল ক্লাবে সমবেতভাবে বারপুজো। সত্তর, আশি এমনকি নিদেনপক্ষে নব্বইয়ের দশকের সেই জাঁক অবশ্য এখন আর নেই। নমো নমো করেই বার পুজো সারা হয় ময়দানি ক্লাবগুলিতে।

তবু সেই দিন না থাকলেও, অমোঘ আকর্ষণের টানে এখনও বারপুজোয় ক্লাব কর্তা থেকে প্রাক্তন ফুটবলাররা ভিড় জমান ক্লাবে। মাঠের এক বছরের পুরোনো বার তুলে নতুন কাঠের অথবা লোহার বার বসানোর আগে রীতিমত পুরোহিত সহকারে পুজো করে তবেই মাঠেই জায়গা পায় সেই বার!

সব বদলে গেলেও এই নিয়মের ব্রাত্যয় ঘটেনি আজও। বাংলা ফুটবল সংগঠকদের কাছে বারপুজো মানে ফুটবল মরশুমের নববর্ষ, পরম্পরা রক্ষা করার তাগিদ। কোনও কোনও ক্লাবে এদিন নতুন মরশুমের অধিনায়ক ঘোষণা করা হয়, কোথাও জার্সির নতুন ডিজাইন লঞ্চ করা হয় সর্বসমক্ষে। প্রায় সমস্ত ক্লাবেই দুপুরে অথবা রাতে ভুরিভোজের ব্যবস্থা থাকে।

মোহনবাগান ক্লাবে বারপুজোয় হাজির দেবাশিষ দত্ত, কুনাল ঘোষ সহ শীর্ষকর্তারা (মোহনবাগান মিডিয়া)

নববর্ষে বাংলা ফুটবলে আত্মপ্রকাশ ঘটছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাব। সেই ক্লাবের দায়িত্বে রয়েছেন মানস ভট্টাচার্য, কৃষ্ণেন্দু রায়রা। ডায়মন্ড হারবার ক্লাব আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করল নববর্ষেই। নববর্ষের আগে থেকেই ট্রায়াল চলছিল। স্কোয়াড ঘোষণা থেকে নতুন মরশুমের ট্রেনিং চালু হল নববর্ষেই। সবই বারপুজোকে সাক্ষী রেখে।

গৌতম সরকার এখনও বারপুজোর কথা উঠলেই নস্ট্যালজিয়ায় ভাসতে থাকেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা-কে বলছিলেন, “বারপুজো মানেই দারুণ স্মৃতি। সেসব দিন আর কোথায়! ধীরেন দে এই দিনে সকলকে স্মারক হিসাবে ২৫ পয়সা নগদ উপহার দিতেন। আমি সেই সমস্ত পয়সা যত্ন সহকারে এখনও রেখে দিয়েছি। ওঁর মত ক্লাব কর্তা আর আসবে না।” ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানে খেলে যাওয়া দাপুটে কিংবদন্তি এবার নববর্ষে থাকছেন না দুই প্রধানে। বরং থাকবেন খিদিরপুরের বারপুজোয়।

আরও পড়ুন: মোহনবাগান নামের আগে ATK, ক্লাবের আবেগে আঘাত! সহ-সভাপতি হয়েই সোচ্চার কুনাল

বারপুজো আর ধীরেন দে- জোড়া শব্দবন্ধনী শুনে আজও স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েন মানস ভট্টাচার্য। ঝাঁপি উপুড় করে বলতে থাকেন, “বারপুজোর দিনে ধীরেন বাবু আসতেন ধবধবে সাদা পোশাকে। নববর্ষে তাঁর পকেট বোঝাই থাকত চার আনা, আট আনায়। সকলকেই উনি পয়সা দিতেন বছরের প্ৰথম দিনে। কাছের ফুটবলারদের জন্য বরাদ্দ থাকত রুপোর কয়েন। যদিও আমি কখনও তা পাইনি।”

সেই সঙ্গে তিনি আরও অনর্গল, “বারপুজো করার অর্থ হল, গোটা সিজনে যাতে বার আমাদের সঙ্গ দেয়। গোল যেন বারে লেগে প্রতিহত না হয়, সেই বিশ্বাস থেকেই ফুটবলাররা বারপুজো নিয়ম নিষ্ঠভাবে পালন করতেন। আমি সবসময় বারপুজোর পরে অনুশীলনে গোল করার চেষ্টা করতাম। যাতে সারা বছর গোল করতে পারি।”

জৌলুস ফিকে হলেও এখনও ঐতিহ্যে অম্লান বারপুজো (ইস্টবেঙ্গল মিডিয়া)

ময়দানের তারকা ফুটবলার সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে মোহনবাগানের ক্লাব প্রশাসনে। তিনি বর্তমানের জৌলুসহীন বারপুজোকে সময়ের দাবি বলেই ধরে নিয়েছেন। স্মৃতি হাঁকড়ে তিনি বলছিলেন, “আমাদের সময়ে বারপুজো মানেই ছিল এলাহি ব্যাপার। নতুন স্কোয়াড সেই সময়েই প্ৰথমবার অনুশীলনে নামত মাঠে। বিদেশি তো বটেই দেশি ফুটবলারদের এক ঝলক দেখতে মাঠ লোকে লোকারণ্য থাকত। সবাই প্রিয় তারকাদের যেমন একঝলক চাক্ষুস করতে চাইতেন, তেমন অনুশীলন শেষে অটোগ্রাফের হিড়িক উঠত। তখন তো মোবাইল ফোনের জমান ছিল না।”

সেই জৌলুস এখন অনেকটাই ফিকে। মাঝমাঠের প্রাক্তন ফুটবলার সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য পুরো ঘটনার জন্য ফুটবল মরশুমের পিছিয়ে যাওয়াকেই দাবি করছেন। তাঁর যুক্তি, “এখন ফুটবল মরশুম তো আরও পরের দিকে শুরু হয়। নববর্ষ থেকে ফুটবল মরশুম- এই ধারণাটাই তো নেই আগের মত। আমাদের আমলে ফুটবলাররা প্ৰথমবার দর্শকদের সামনে আসতেন এই নববর্ষে। অল্প সময়ের জন্য ট্রেনিং করেই বারপুজোয় বসতে হত। আর তা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে সমর্থকরা আসতেন।”

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের ক্লাবের সঙ্গে গাঁটছড়া! ঐতিহাসিক সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে মহামেডান

যদিও তা মানতে রাজি নন মানস ভট্টাচার্য। ডায়মন্ড হারবার ক্লাবের আত্মপ্রকাশের ঠিক আগের দিন বিখ্যাত ফুটবলার বলছিলেন, “এখন ইস্টবেঙ্গল কিংবা মোহনবাগানে বাঙালি ফুটবলারের সংখ্যা হাতে গোনা। সমর্থকরা কাদের দেখতে আসবে মাঠে? আমাদের জমানায় বাঙালি ফুটবলারদের ঘিরেই তুঙ্গে থাকত উত্তেজনা।”

ইস্টবেঙ্গল মাঠে বারপুজো (ইস্টবেঙ্গল মিডিয়া)

বারপুজোর জাঁকে অবশ্য খুব বেশি পিছিয়ে নেই এরিয়ানও। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের মতই রংচংয়ে বারপুজো করে লাল-হলুদের মাঠতুতো পড়শি। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সমর পাল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলছিলেন, “বারপুজো আমাদের কাছে অনেকটা গেট টুগেদারের মত। ক্লাবের সকলে নববর্ষে মাঠে আসেন। একসঙ্গে সময় কাটান। এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে!”

নববর্ষ, বারপুজো শুনলেই স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েন ময়দানে একডজনের বেশি ক্লাবে কোচিং, টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের পদ সামলানো রঘু নন্দী। তিনি নববর্ষের সকালে বলছিলেন, “বারপুজোর সঙ্গে অনেক মুহূর্ত জড়িয়ে আছে। এই সময়ে ময়দানে সকলের সঙ্গেই দেখা হয়ে যায়। দারুণ লাগে। তবে অতীতে এই নিয়ে উন্মাদনা অনেক বেশি থাকত। এখন ময়দানে কর্পোরেট সংস্কৃতির আমদানি এই ক্রেজ অনেকটা ফিকে করে দিয়েছে। তবে বারপুজো থাকবেই।”

নস্ট্যালজিয়া, বাঙালিয়ানার বারপুজো অতীতের গৌরব নিয়ে স্বমহিমায় প্রত্যাবর্তন করুক, এমনটাই প্রার্থনা ময়দানের। নববর্ষে।

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Sports news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Kolkata football bar pujo on poila boishak tradition east bengal mohun bagan