যে কোনও ম্যাচের দিন মোহনবাগান মাঠে যাওয়ার অর্থ, খুব কাছ থেকে ভালোবাসাকে দেখা। একটু হেঁটে গেলে ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতেও অভিজ্ঞতাটা মোটামুটি একই। বাঙালি যে জন্মসূত্রেই মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গল, একথা বাংলার পাঠককে বলা হাস্যকর, তবে বাইরের লোক হয়তো এখনও অতটা বোঝেন না। আরও একটা কথা অনেকেই বোঝেন না। তা হলো কলকাতার ময়দানে সমর্থকদের অংশীদারির গুরুত্ব।
এই মুহূর্তে মোহনবাগানিরা যে সবাই মিষ্টি সুরে খুশির গান গাইছেন, এমনটা নয় মোটেই। কথাবার্তায় ঝাঁঝের পরিমাণ যথেষ্ট। "প্রথমে ভেবেছিলাম... শা__ ক্লাবটাকে বেচে দিল," বলছেন সমর্থক কিংশুক ঘোষ। অবশ্য ময়দানে ম্যাচ চলাকালীন যে ভাষায় কথা হয়, তার তুলনায় কিংশুকের ভাষা নিতান্তই নিরামিষ। তবে তিনি যা বলছেন, তাতে সায় রয়েছে অনেকেরই, কারণ বক্তব্যের বিষয়বস্তু হলো এটিকে ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে মোহনবাগানের একত্রিকরণ, যার ফলে ক্লাবের ৮০ শতাংশ মালিকানা আপাততএটিকে-র মালিক আরপি-সঞ্জীব গোয়েঙ্কা গ্রুপের হাতে।
১৯৯৮ সালে যখন একটি আলাদা কোম্পানি স্থাপন করে মোহনবাগান এবং ইউবি গ্রুপ আধাআধি পার্টনারশিপে দল চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিবাদ এসে হাজির হয় একেবারে ক্লাবের তাঁবুর দোরগোড়ায়। শান্তি বজায় রাখতে নিযুক্ত হন একজন বিশেষ আধিকারিক। এবার কার্যত হস্তান্তর হয়ে গেল ক্লাব, অথচ দেখা নেই প্রতিবাদী সমর্থকদের। বরং ইতিবাচক দিক খুঁজতে ব্যস্ত তাঁদের অধিকাংশই। সময় বদলেছে।
কিন্তু পুরোপুরি বদলেছে কি? কিংশুক জোর দিয়ে বলেন, "প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি কীভাবে দুই ক্লাব এক হবে। পরে ধীরে ধীরে মনে হয়েছে, এর ফলে হয়তো পুরো সেট-আপের উন্নতিই হবে। তবে জেনে রাখুন, গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আজও 'জয় মোহনবাগান' বলব, 'জয় এটিকে মোহনবাগান বা মোহনবাগান এটিকে', বা যাই হোক, বলব না।
বাগান সমর্থকদের কথা শুনলে আরও মনে হয়, এই একত্রিকরণের ফলে ক্লাব কর্তৃপক্ষের লজ্জা নিবারণের কাপড়টুকুও আর অবশিষ্ট নেই। "ইস্ট-মোহন, কোনও ক্লাবের কর্তারাই ক্লাবের ব্র্যান্ডের সদ্ব্যবহার করতে পারেন নি। নাহলে এই অবস্থা হতো না। দেখুন, আই-লীগ এখন একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর টুর্নামেন্ট। কিন্তু একথা মানতে বড্ড বেশি সময় নিয়েছেন ক্লাব কর্তারা। অনেক দেরিতে বুঝেছেন যে আই-লীগ খেলা ক্লাবে বড় স্পনসররা আসবে না, সে যতই ঐতিহ্যবাহী হোক। শেষমেশ নিজেদের ভাগের অংশ বেচে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না," বলেন গবেষক অমিত ঘোষ, যাঁর আরেকটি বড় পরিচয়, তিনি ম্যারিনার্স ফ্যান ক্লাবের সদস্য।
কথাটা খুব ভুল বলেন নি অমিত। এক বছর আগেও ইস্ট-মোহনের কর্তারা ব্যস্ত ছিলেন আই-লীগ ক্লাবগুলির যৌথ প্রতিরোধ ঠেকিয়ে আইএসএল-এর বিরুদ্ধে তাঁদের 'লড়াই' নিয়ে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) দ্বারস্থ হতে। ক্লাব কর্তাদের সিংহভাগই দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রগতির পথ আটকে, যার ফলে নিরন্তর পিছিয়ে পড়ছিল দুটি ক্লাবই।
সুতরাং সমর্থকরা যে মোটের ওপর খুশি, এবং পেশাদারী ভাবে ক্লাব চালানোর ব্যাপারে নয়া কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থাবান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাপার এই যে বাগান ফের একবার শীর্ষস্তরে খেলবে। ফের একবার জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের দিকে তাকাতে পারবে। যেমন এটিকে'র মিডফিল্ডার প্রণয় হালদার ইতিমধ্যেই বলেছেন, কলকাতা ডার্বি কতটা মিস করছিলেন তিনি, এবং মোহনবাগানে আরও একবার খেলতে পেরে কতটা আনন্দিত।
"রূঢ় সত্যিটা হলো, আমরা এখনও আই-লীগ খেললে আইএসএল-এর কাছে আবারও নংদাম্বা নাওরেম বা ইয়োসেবা বেইতিয়ার মতো প্লেয়ারদের হারাতাম। আই-লীগের প্রত্যেকটা ভালো প্লেয়ার আইএসএল-এ চলে যাচ্ছে, এবং তার যথেষ্ট কারণ আছে। বলছে তো বাগান মেম্বারদের জন্য টিকিটের দামে ছাড় দেবে, সুতরাং আশা করব সমর্থকদের সাধ্যের বাইরে চলে যাবে না দাম," বলছেন আরও এক বাগান নিবেদিত প্রাণ, ময়ূখ চ্যাটার্জি।
তবে সব সন্দেহের অবসান হয়নি এখনও, এবং ক্লাবের সম্ভাব্য মর্যাদাহানির ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন সমর্থকরা। "এটিকে-ই তো সবচেয়ে বেশি জিতল। দুবার আইএসএল জিতলেও কলকাতায় ওদের কেউ কেয়ার করত না। আমাদের ক্লাব, আমাদের মতো সমর্থকরা, ওদেরকে পপুলার করে দেবে।" এই কটাক্ষও নিশানায় লাগার কথা। এছাড়াও নতুন কর্তৃপক্ষের প্রতি একটি হুঁশিয়ারি রয়েছে বাগান সমর্থকদের, "আমাদের ক্লাবের ঐতিহ্যকে ডিঙিয়ে এটিকে ব্র্যান্ডের প্রচার করার মতো বোকামো করবেন না।"
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুঙ্গে। ইস্টার্ন ফ্রন্টে সেনাবাহিনীর সঙ্গে মোতায়েন হলেন ব্রিটেনের কিংবদন্তী ক্রিকেটার ডেনিস কম্পটন, যিনি ফুটবলটাও খুব ভালো খেলতেন, জানেন অনেকেই। কম্পটন প্রথমে চলে গেলেন মধ্য ভারতে, হোলকারের হয়ে রঞ্জি ট্রফি ম্যাচ খেলতে। তারপরেই তাঁর শখ হলো, কলকাতায় মোহনবাগানের হয়ে ফুটবল খেলবেন। কম্পটন কতটা ভালো ফুটবল খেলতেন, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ - আজও আর্সেনাল ক্লাবের ওয়েবসাইটে গেলে দেখবেন, ১৯৩২ সালে অ্যামেচার হিসেবে ক্লাবে যোগ দেয় ১৪ বছরের এক কিশোর, নাম তার ডেনিস কম্পটন।
প্রাক-স্বাধীন ভারতবর্ষে মোহনবাগান ছিল দেশভক্তির প্রতীক। ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে ১৯১১ সালে আইএফএ শিল্ড ফাইনালে হারানোর পর কিংবদন্তী হয়ে যায় সবুজ-মেরুন। ওই অমর একাদশের স্থান হয় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাশে। কিন্তু কম্পটন তো নিছকই আরেকজন বিদেশি খেলোয়াড় ছিলেন না। এহেন 'গ্রেট ম্যানের' প্রস্তাব ঠিক কীভাবে গ্রহণ করা উচিত, তা নিয়ে বৈঠকে বসে যান বাগান কর্তারা। কিন্তু ততদিনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের সূচনা করেছেন মহাত্মা গান্ধী। সুতরাং দুঃখিতচিত্তে কম্পটনকে ফিরিয়ে দেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চিমা ওকোরির আগে আর কোনও বিদেশি খেলেন নি মোহনবাগানের হয়ে।
Could Mohun Bagan club's members have done more to prevent the merger with ATK #SundaySpecial https://t.co/3KQ6WKbppe pic.twitter.com/jIVjdxctzd
— Express Sports (@IExpressSports) January 26, 2020
এই মহান ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখেই অত্যন্ত সাবধানী ভাষায় তাঁর প্রেস বিবৃতি জারি করেন সঞ্জীব গোয়েঙ্কা। "২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী আরপিএসজি গ্রুপ নত মস্তকে এবং সম্মানের সঙ্গে মোহনবাগানকে আরপিএসজি পরিবারে স্বাগত জানাচ্ছে, জোড় হাতে, বাহু প্রসারিত করে।" এই মিষ্টি কথার নেপথ্যে যা আছে, তা একটি 'কর্পোরেট টেকওভার', সোজা কথায় দখল নেওয়া। গত ১৩০ বছর ধরে সমর্থক/সদস্য ভিত্তিক ক্লাব হিসেবে পরিচিত মোহনবাগান। এই মালিকানা হস্তান্তরের ফলে সেই প্রথার অবসান ঘটল।
ভারতীয় ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ভাস্কর গাঙ্গুলির বক্তব্য, "আজকের ফুটবলে 'কর্পোরেট টেকওভার' ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়। লিভারপুল বা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো বিশাল বিশাল ক্লাবেরও মালিকানা আমেরিকানদের হাতে। কিন্তু বাগানের ক্ষেত্রে একটা বিবাদ হতে পারে। নতুন মালিকের নিজস্ব টিম রয়েছে, যা বাগানের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে সব ঠিক আছে, কিন্তু দু-তিন বছর পর কী হবে কে জানে। বাগানের বিনিময়ে যদি এটিকে টিমের প্রচার করার চেষ্টা হয়, এবং সেখানে এটিকে-র সমর্থনে ৮-২ বোর্ড গঠিত হয়, তখন বহুমতেরই জয় হবে। এতদিন পর্যন্ত বাগানের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত ক্লাবকর্তারা। এখন আর তা হবে না। নতুন নিয়মে বাগানের প্রতিনিধিদের একপাশে সরে যেতে হতে পারে।"
ক্লাবের আধিকারিকরা যে আধুনিকীকরণ হতে দেন নি, এ ব্যাপারে সহমত হলেও ভাস্কর দোষ দিচ্ছেন এআইএফএফ-কেও। "ফেডারেশন দায়ী। নিজেদেরকে আইএমজি-রিলায়েন্সের মুখের গ্রাস বানিয়ে ফেলল, পুরোনো ক্লাব, পুরোনো টুর্নামেন্টগুলোর ক্ষতি করে। জেসিটি, ডেম্পো, সালগাওকারের মতো ক্লাব বন্ধ হয়ে গেল, এআইএফএফ কিচ্ছু করল না। রোভার্স কাপ বা ডুরান্ড কাপের মতো টুর্নামেন্ট অচল হয়ে গেল, ওরা কানা সেজে বসে রইল। জগমোহন ডালমিয়ার দেখানো রাস্তায় চললে আইএমজি-রিলায়েন্সের দরকারই হতো না। ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে খেলাটাকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারত, যেমন ডালমিয়া করেন ক্রিকেটের ক্ষেত্রে। আইএসএল-ই হয়ে গেল মূলস্রোত, কাজেই বাগানকে যেতেই হতো। ইস্টবেঙ্গলও যাবে শিগগিরিই, টিকে থাকতে হলে। বছরে ১৫ কোটি টাকা ফ্র্যাঞ্চাইজ ফি যেখানে বেসিক খরচা, সেখানে তো টেকওভার অবধারিত ছিল।"
এআইএফএফ-এর সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট সুব্রত দত্ত অবশ্য অন্য সুর গাইছেন। "প্রথম কথা হলো, আইএমজি-রিলায়েন্স, এখন যাকে এফএসডিএল (FSDL) বলা হয়, ভারতীয় ফুটবলে বিপুল পরিমাণ অর্থলগ্নি করছে। শুধু যে আইএসএল চালাচ্ছে তাই নয়, এআইএফএফ-কে যে টাকাটা দিচ্ছে, তা দিয়েই আমাদের সমস্ত টুর্নামেন্ট এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আয়োজন হয়, যার মধ্যে আই-লীগও রয়েছে। তো ওরা কি অপরাধ করছে? ভারতীয় ফুটবলের বিকাশে ওদের অবদান নেই?"
এফএসডিএল-এর খরচের একটা খতিয়ানও দেন সুব্রতবাবু - এআইএফএফ-কে বছরে আন্দাজ ৫০ কোটি টাকা, এবং আইএসএল-এর আয়োজন করা, যা আন্দাজ ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা। "মনে রাখতে হবে, আইএসএল-এ দশটা ক্লাব আছে। প্রতি সিজনে যদি এক একটা ক্লাবের বাজেট হয় ৪০ কোটি টাকা, তাহলে সব মিলিয়ে প্রতি সিজনে খরচ হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকা। সুতরাং এফএসডিএল ভারতীয় ফুটবলকে ৫০০ কোটি টাকার ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে দিয়েছে। ভারতের বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিং কিন্তু ১০৮, কাজেই এফএসডিএল ভালো করেই জানে যে স্রেফ খরচাটা তুলতেই কতটা পরিশ্রম করতে হবে।"
বাগান আধিকারিক দেবাশীষ দত্ত কিছুটা আশঙ্কা নিরসনের চেষ্টা করেন। "যখন ১৯৯৮ সালে ইউবি গ্রুপের সঙ্গে শেয়ার হোল্ডিং পার্টনারশিপ হয়, তখন থেকেই ক্লাবের ফুটবল টিম চালিয়ে এসেছে একটা কোম্পানি। তখন ছিল ইউনাইটেড মোহনবাগান প্রাইভেট লিমিটেড। ইউবি গ্রুপ বেরিয়ে যাওয়ার পর হলো মোহনবাগান ফুটবল ক্লাব (ইন্ডিয়া) প্রাইভেট লিমিটেড। ক্লাব থেকেই কোম্পানির ডিরেক্টররা মনোনীত হন। দুই ক্লাব এক হওয়ার ফলে মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাবের প্রশাসনিক কাঠামো পালটাবে না, কারণ ক্লাব এবং দল চালায় দুটি আলাদা আলাদা সংগঠন। বস্তুত, এর ফলে আমাদের নিজেদের ঢেলে সাজাতে সুবিধে হবে, যাতে আমরা আগামী প্রজন্মের ফুটবল চাহিদা মেটাতে পারি। এবং এভাবেই আমরা এশিয়ার প্রথম দশটা ক্লাবের একটা হব।"
প্রতি মাসের ১৫ তারিখ এলেই ধুকপুকুনি শুরু হতো সঞ্জয় সেনের। তখন বাগানের কোচ ছিলেন সঞ্জয়বাবু, এবং মাইনের দিন টিমের মুখোমুখি হতে হতো তাঁকেই। "শেষমেশ প্রত্যেক প্লেয়ারই তার পাওনা টাকা পেত, কিন্তু অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছিল মাইনে, আমার পক্ষে ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না," বলেন সঞ্জয়বাবু, যিনি ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বাগানের হেড কোচ থাকার পর এটিকে-র যুব শাখায় যোগ দেন।
"আইএসএল-এ এসে চোখ খুলে যায় আমার। বাগানে থাকতে আমি সবসময় বলতাম ভিডিও অ্যানালিস্ট দরকার, অন্তত প্রথম দলটার জন্য, কিন্তু লাভ হয়নি। এখানে আমাদের ইউথ টিমেরও ভিডিও অ্যানালিস্ট আছে, ফিজিও আছে। পুরো ব্যাপারটাই পেশাদারভাবে চলে।"
সঞ্জয়বাবুর মতে, দুই ক্লাবের একত্র হওয়াটা সবার পক্ষেই লাভের। "আইএসএল পেল বাগানের ঐতিহ্য। বাগান পাবে আইএসএল এবং এটিকে-র পেশাদারিত্ব। বলতেই হবে, নিজের ব্র্যান্ড থাকা সত্ত্বেও বাগানের দায়িত্ব নিলেন মিঃ গোয়েঙ্কা, কারণ উনি কলকাতার ফুটবল ভালবাসেন। ওঁর পরিবারের দীর্ঘ যোগ রয়েছে মোহনবাগানের সঙ্গে। উনি জানেন এই ক্লাবের ঐতিহ্য।"
কিন্তু এই একত্রিকরণের ফলে অনেক খেলোয়াড়ই সাময়িকভাবে বেকার হয়ে পড়বেন। বর্তমান মোহনবাগান টিমের খুব অল্পসংখ্যক সদস্যই আইএসএল পর্যন্ত পৌঁছবেন। বাকিদের কী হবে? "আইএসএল-এ অনেক প্লেয়ার আই-লীগ থেকে এসেছে। ট্যালেন্ট থাকলে কেউ বসে থাকবে না," বলছেন সঞ্জয়বাবু।
আইএসএল-এ খেললে সুযোগ মেলে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার কিছু তারকা কোচের কাছে শিক্ষা নেওয়ার। যে দেশে সিনিয়র স্তরে পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত ফুটবলের ফরমেশন সম্পর্কে কোনও ধারণা তৈরি হয় না, সে দেশে এই কোচিং নিঃসন্দেহে বড় ব্যাপার। ২০১৬-র টুর্নামেন্ট জেতার সময় এটিকে-র কোচ ছিলেন হোসে মোলিনা, যিনি বর্তমানে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের স্পোর্টিং ডিরেক্টর, যাঁর কাছে রিপোর্ট করেন লুইস এনরিকে।
মোহনবাগানের কিংবদন্তী সুব্রত ভট্টাচার্যের অবশ্য চিরপরিচিত ভঙ্গিতে নস্যাৎ করে দেন এই বিদেশি কোচের থিওরি। "শেষমেশ ফল তো হবে ওই বিগ জিরো। চায়না, জাপান, কোরিয়াকে হারাতে পারবে না ভারত। এমনকি মায়ানমারকেও না। সবকিছুর পর আমরা কাদের সঙ্গে জিতব? শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আর সিঙ্গাপুর। তাহলে এইসব 'টপ' ফরেন কোচরা কী করলেন? ভারত কিন্তু রহিম সাহেবের মতো ভারতীয় কোচের জমানাতেই এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়।" ময়দানের 'বাবলুদার' আরও বক্তব্য, মোহনবাগানের সদস্যদের উচিত ছিল চাঁদা তুলে ক্লাবকে দেওয়া, যাতে খরচ চলে।
তাঁর কথায়, "স্রেফ বাৎসরিক চাঁদা দিলেই তো হলো না। প্রত্যেক মেম্বার যদি এগিয়ে এসে পাঁচ হাজার টাকা করেও দিতেন, এই টাকার ক্রাইসিসটা হয়তো এড়ানো যেত। এক্ষুনি হয়তো একত্র হওয়ার বিরাট কোনও প্রয়োজন হতো না। খুব গভীর সঙ্কটেই তো অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাগান কর্তাদের কাছে হয়তো আর কোনও উপায় ছিল না।"
ইউবি গ্রুপ বিদায় নেওয়ার পর, অর্থাৎ ২০১৪ থেকে ক্লাবের ফুটবল দল কার্যত একা হাতে তাঁর কোম্পানির মাধ্যমে চালিয়েছেন স্বপন সাধন (টুটু) বোস। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে ক্লাবের টিকে থাকা হয়তো কঠিন হতো। সুব্রত দত্ত যেমন বললেন, "কঠিন কথাটা ব্যবহার করলে মিথ্যাচার করা হবে। টুটুদা না থাকলে অসম্ভব হতো।" বাগান কর্তৃপক্ষ আইএসএল-এ যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দরকার হয়ে পড়ে অর্থবল। আইএসএল অথবা অন্যান্য টুর্নামেন্টে খেলার বাৎসরিক খরচ আন্দাজ ১৫ কোটি টাকা। বর্তমানের প্রায় তিনগুণ এই টাকা তুলতে প্রয়োজন হয় বিনিয়োগের।
তাদের বিশাল ফ্যান বেসের দৌলতে আইএসএল-এ আগামী সিজন থেকে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারে মোহনবাগান। কিন্তু ওই লীগে তাদের চিরশত্রুরা যে না থাকলেই নয়। ইস্টবেঙ্গল ছাড়া বাগান অসম্পূর্ণ। বাগান-এটিকে একত্রিকরণে বড় ভূমিকা ছিল এফএসডিএল-এর। এবার ইস্টবেঙ্গলকে দলে আনতে হাঁটতে হবে আরও কয়েক পা।