/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-13-37.jpg)
তাও দৃষ্টিহীনতা জয় করে জুডো চ্যাম্পিয়ন বুদ্ধদেব জানা। লড়াই, জেদ আর অনুপ্রেরণার এক অসাধারণ গল্প।
Blind Judo Champion: দিব্যাং', অথবা 'ভিন্নভাবে সক্ষম' কিংবা 'বিশেষভাবে সক্ষম' এই শব্দগুলো আমরা প্রায়শই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহার করি। কিন্তু এই শব্দবন্ধগুলো ব্যবহার করার আগে একবারও ভেবে দেখেছি আসল প্রতিবন্ধী কারা? প্রশ্ন কঠিন তবে উত্তর কিন্তু সহজ। সমাজে আমরা প্রায়ই ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটিকে অনেকেই দুর্বলতার প্রতীক বলে মনে করি কিন্তু প্রতিদিন যারা অগণিত বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন সেই মানুষগুলোই এই পৃথিবী সবচেয়ে শক্তিমান। কেউ হয়তো চোখে দেখতে পান না। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কেউবা অন্যভাবে পঙ্গু। ঈশ্বর তাঁদের জীবনের সঙ্গে বিমাতা সুলভ আচরণ করেছে বটে। তবে তাঁদের জেদ আর অধ্যাবসায়ের কাছে প্রতিবন্ধকতাকেও মাথা নোয়াতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: Blind Football India: মেসির আলোয় ঝলমলে কলকাতা ফুটবল, অন্ধকারেই দৃষ্টিহীন সঙ্গীতারা
যেমনটা হয়েছে বুদ্ধদেবের সঙ্গে। পুরো নাম বুদ্ধদেব জানা। পূর্ব মেদিনীপুরের ছেলে। পঁচিশ বছরের বুদ্ধদেব যেন বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়। শেখায় অন্ধকারেও দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখতে। ছোটবেলা থেকে একই সঙ্গে দুটো প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে তাকে লড়াই করতে হয়েছে। হয়েছে বললে ভুল করা হবে এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সে। জীবনের ময়দানে বুক চিতিয়ে লড়ছে। প্রতিদিন। প্রতিমুহূর্তে। বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রয়েছে দারিদ্রতা আর দৃষ্টিহীনতা।
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-21-57.jpg)
জন্মের পর থেকে বুদ্ধদেব দৃষ্টিহীন। দু চোখে প্রায় কিছুই দেখতে পায় না। চোখের দৃষ্টিশক্তি কম হলেও মনের জোরে খামতি নেই। ইতিমধ্যে সে তার নিজের পরিচিতি নিজেই তৈরি করে নিয়েছে। বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছে। উজ্জ্বল করেছে দেশের নাম। দৃষ্টিহীনদের জুডো প্রতিযোগিতায় বুদ্ধ জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। এতেই থেমে নেই সাউথ এশিয়ান গেমসেও সে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০১৯ সালে বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত দৃষ্টিহীনদের কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জও জিতেছিল। ২০২০সালে খেল সম্মান। এরপর প্যারা অলিম্পিকে কোয়ালিফাইং রাউন্ডে সুযোগও পেয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় কোভিডের কারণে সবকিছুই ভণ্ডুল হয়ে যায়। প্যারা অলিম্পিকের সফর শুরুর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন: পোস্টম্যান: চিঠির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অমলিন স্মৃতির আখ্যান
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-23-22.jpg)
২৫ বছরের এই যুবক ১৫ মিটারের বেশি কোন দূরের জিনিস কে চোখে দেখতে পায় না। কিন্তু জুডোর প্যাঁচে কঠিন থেকে কঠিন প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। এরপর! বাংলার কত জন মানুষ তাকে চেনেন? প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের কদর এমনিতেই কম এই রাজ্যে। বুদ্ধদেবের ঝুলিতে অসংখ্য পুরস্কার মেডেল থাকা সত্ত্বেও ভাগ্যে জোটেনি কানাকড়িও।
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-24-36.jpg)
পূর্ব মেদিনীপুর নয়াচরের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে বুদ্ধ। বাবা লক্ষ্মীকান্ত জানা। জন্মের সময় থেকে কিছুই চোখে দেখতে পেত না। অনেক চিকিৎসা, কাঠখড় পুড়িয়ে চোখের সামান্য দৃষ্টিশক্তি ফিরেছিল। তাও সামান্য। এই নিয়ে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল। তারপর গ্রাম থেকে কলকাতায়। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্লাইন্ড বয়েজ অ্যাকাডেমিতে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়। পড়াশোনায় বরাবরই মেধাবী বুদ্ধদেব। মাধ্যমিকে স্টার পেয়ে দারুণ ফল করেছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে গ্রাজুয়েশন, এরপর আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এমএ। বর্তমানে বিএড এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২০ সালের পর থেকে ক্রীড়া দপ্তরে খেলা নিয়ে চাকরির জন্য অনেক আবেদন করেছিল। কোন সদুত্তর মেলেনি, এখনো পর্যন্ত। সরকারি অফিসগুলোতে খেলার সার্টিফিকেট নিয়ে অনেক দরখাস্ত জমা দিয়েছে। লাভ কিছুই হয়নি।
আরও পড়ুন: Curse of the sea: ঘোড়ামারা: যে দ্বীপের মৃত্যু ঘণ্টা বাজছে প্রতিদিন, একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে নদী!
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-27-25.jpg)
বুদ্ধদেব বলছিলেন, “ছোটবেলা থেকে আর্থিক অনটনের মধ্যে বড় হয়েছি। কখনো হারতে শিখিনি। খেলার ময়দানে এখনো টিকে রয়েছি। নিজের লক্ষ্যে পৌঁছবো বলে। ছোট থেকে আমার পাশে যে মানুষগুলো রয়েছে সে হল আমার মা, বাবা। আর আমার যাবতীয় চিকিৎসার খরচ জোগাতে যে সব থেকে বেশি সাহায্য করেছে তিনি আমার ছোট কাকা। এদের ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ। একটা চাকরি যদি পেতাম তাহলে অনেক সাহায্য হত। এখনো পর্যন্ত বাবার কাঁধে বসে রয়েছি। দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছি বিদেশের মাটিতে। হারতে শিখিনি! লড়াই চালিয়ে যাব। খেলাটা সাময়িকভাবে বন্ধ আছে চাকরির জন্য লড়াই করছি। আমার মতন প্রতিবন্ধী যারা আছে তারা এই সমাজের কোন বোঝা নয়।”
জুডো এবং পড়াশোনার পাশাপাশি সেতার বাজানো ও দাবা খেলাতেও পারদর্শী। বুদ্ধদেব একজন চ্যাম্পিয়ন সাঁতারুও। প্রতিবন্ধী সাঁতারুদের জন্য জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় বুদ্ধদেবের আছে ৬টি স্বর্ণ পদক। জুডোতে প্যারা-অলিম্পিকের জাতীয় স্তরে স্বর্ণপদক জিতেছিল। বর্তমানে চাকরির জন্য ঘুরছে। বাংলার সাধারণ অন্য খেলোয়াড় হলে হয়তো এতদিনে চাকরি জুটে যেত। প্রতিবন্ধী খাতায় নাম আছে বলে সব সময় আলাদা করে দেখা হয় বুদ্ধদেবের মতন খেলোয়াড়দের।
আরও পড়ুন: Fishermen Hilsa Journey: বঙ্গোপসাগরের জেলেদের জীবন জীবিকা! আপনারা জানেন সাগরে ইলিশ মাছ ধরার নেপথ্যের গল্প?
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-29-05.jpg)
ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে বাইরে তা সত্ত্বেও মেলেনি কোন সুযোগ সুবিধা। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের কিছু সুযোগ-সুবিধা মিললেও অভিযোগ বাংলার প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়রা প্র্যাকটিস করার জায়গাটুকু পর্যন্ত পায়না। খাবারদাবার তো দূরেই থাক।
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-30-44.jpg)
“আমরা যারা প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় রয়েছি বিভিন্ন খেলার সঙ্গে যুক্ত তারা প্র্যাকটিস করার জন্য সঠিক জায়গা পায় না। এই যেমন ধরুন আমি সাঁতার এবং জুডো খেলার সঙ্গে যুক্ত। সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য কোন পুল পায়না জুডো প্র্যাকটিস করার জন্য কোন ভালো ম্যাট নেই। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে যতদিন ছিলাম ততদিন কোন অসুবিধা হয়নি। স্কুল ছেড়ে যখন বেরোলাম তখন থেকে এই আসল লড়াই শুরু। আমাদের মতন প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়রা প্রতিদিন লড়াই চলছে বেঁচে থাকার। সুইমিং প্র্যাকটিস করার জন্য পুকুরে যায়। অনেক সময় সেখানেও লোকজন আপত্তি করে। জুডো প্র্যাকটিসের জন্য বাড়ির ছাদ শক্ত কংক্রিট। আমাদের শরীরে ব্যথা অনুভব হয় না আমরা নিজেদেরকে এভাবেই তৈরি করে নিয়েছি। আমরা প্রতিবন্ধী বলে অজুহাত খুজিনি, বরং সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছে।”, এই কথাগুলো ( Bengali News Today) আত্মবিশ্বাসের সুরে এক ভাবে বলে যাচ্ছিল বুদ্ধদেব জানা।
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/24/blind-judo-champion-2025-12-24-09-35-21.jpg)
প্রতিবন্ধী যেসব মানুষদেরকে আমরা তোয়াক্কা করি না। কিংবা করুণার দৃষ্টিতে দেখি তারাই ইতিহাস তৈরি করে। জয়ের গল্প লেখে। অনুপ্রাণিত করে বেঁচে থাকার। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কেউবা কথা বলতে পারে না, কারো চোখের দৃষ্টি শক্তি কম। তা সত্ত্বেও ওরা দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখে ভরসা যোগায়। সমাজকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় বুদ্ধদেবের মতন মানুষেরা। প্রতিবন্ধকতা আসলে শারীরিক নয়, হয় মনের।
চলবে…
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us