কোচের সঙ্গে কি অলিম্পিকে ছবি তুলতে গিয়েছেন প্রণতি! বিতর্কে বিদ্ধ বাংলার মেয়ে

অলিম্পিকে নেমে একদমই ব্যর্থ প্রণতি নায়েক। আর ব্যর্থ হওয়ার পরই উঠে আসছে একগাদা অস্বস্তিকর প্রশ্ন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে।

অলিম্পিকে যাওয়ার আগে বিমানবন্দরেই ফটো সেশন চালু হয়েছিল। সমবয়সী কোচ এবং জিমন্যাস্ট মাস্কের আড়ালে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়েছিলেন। আর টোকিওতে পৌঁছনোর পর তো ঘন্টায় ঘন্টায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোডের হিড়িক চলছিল। এই ফটো সেশন, আদ্যোপান্ত সিরিয়াস না হতে পারাই কি অলিম্পিকের হাইওয়েতে পৌঁছনোর পর সপাটে ছিটকে দিল বাংলার প্রণতি নায়েককে। রবিবার ভারতীয় জিমন্যাস্ট মহলের সমবেত প্রশ্ন এখন কার্যত এটাই।

অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জন করার পর থেকেই নাটক শুরু হয়েছিল। প্রণতিকে ১৭ বছর ধরে যিনি নিজের হাতে গড়ে তুললেন, সেই মিনারা বেগমকে অলিম্পিকের আগে বিনা শব্দে জানিয়ে দেওয়া হল, আপনি অলিম্পিকে স্বাগত নন! সেখানেই বোধহয় প্রণতির অলিম্পিক ব্যর্থতা লিখে দেওয়া হয়ে যায়! পিংলার মেয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় সাই-য়ের ২৭ বছরের অনভিজ্ঞ কোচ লখন মনোহর শর্মাকে। কানা ঘুষোয় শোনা গিয়েছিল, লখন নাকি জেলা স্তরের জিমন্যাস্টও ছিলেন না! প্রভাব খাটিয়ে লখন সাই-য়ের কোচ হওয়ার পরই সরিয়ে দেওয়া হয় অভিজ্ঞ মিনারাকে।

আরো পড়ুন: অলিম্পিকে বঞ্চিত বাংলা! কোচ মিনারা থাকছেন না কৃতী প্রণতির পাশে, ক্ষোভ তুঙ্গে

যে রাজনীতির শিকার ভারতীয় জিমন্যাস্ট তার-ই বার্তা দিয়ে গেল যেন টোকিওর রোববারের সকাল। অল রাউন্ড আর্টিস্টিক জিমন্যাস্ট কম্পিটিশনে মূলপর্বেই উঠতে ব্যর্থ হলেন বাংলার প্রণতি। এরিয়াকে জিমন্যাস্টিক সেন্টারে ফ্লোর এক্সারসাইজ, ভল্ট, আনইভেন বারস, ব্যালান্স বিম বিভাগে টোটাল স্কোর করলেন ৪২.৫৬৫। সেরা আট তো বটেই প্রণতি ফিনিশ করলেন ২৯ নম্বরে।

তারপরেই জিমন্যাস্ট মহলে কানাঘুষো শুরু হয়ে যায়, সঠিক প্রস্তুতি তো বটেই মানসিকভাবে গাইডেন্স না পেয়েই কি অলিম্পিকে পদকের রাস্তা হারিয়ে ফেললেন তিনি!

সেদিকেই ইঙ্গিত দিয়ে জাতীয় স্তরের প্রাক্তন আন্তর্জাতিক এক জিমন্যাস্ট জানিয়েছেন, “প্রণতির ব্যর্থতা প্রত্যাশিতই ছিল। ওঁকে দেখে কখনোই মনে হয়নি ও অলিম্পিকে পদক আনার লক্ষ্য নিয়ে গিয়েছে। কোচের সঙ্গে হাসি মুখে ছবি তুলছে। টোকিওয় গেমস ভিলেজের ছবি পোস্ট করছে। খেলার প্রতি নূন্যতম সিরিয়াসনেসও ছিল না ওঁর।”

অলিম্পিকের উড়ানের আগেই প্রণতি স্বীকার করে নিয়েছিলেন পর্যাপ্ত অনুশীলনের সময় পাননি তিনি। হারার আগেই কি হার মেনে নিয়েছিলেন পিংলার জিমন্যাস্ট? প্রিয় ছাত্রী হারতেই টিভির সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ব্রাত্য হয়ে যাওয়া কোচ মিনারা বেগম। শেষ দিকে যতই দূরে সরিয়ে দেওয়া হোক, ছাত্রী তো তাঁর-ই। কান্না ভেজা গলাতেই অভিমানের বাষ্প চেপে মিনারা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা-কে বলছিলেন, “একজন অ্যাথলিটকে মোটিভেট করাও কোচের কাজ। অনেক সময় বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার আগে বহু এথলিট আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে। সেই সময়ে একজন কোচই তাঁকে মানসিকভাবে শক্তি জোগাতে পারেন। জানি না প্রণতিকে লখন কতটা মোটিভেট করেছে।”

অবাক হয়ে গিয়েছেন, দুটো ভল্টও সম্পন্ন না করায়। বিস্মিত হয়ে মিনারা জানিয়েছেন, “গত দুমাসে আমি চলে আসার পরে ওর যে প্রস্তুতি কিছুই হয়নি। তা একদম পরিষ্কার এদিনের পর। আমার কোচিংয়ে ও যথেষ্ট সিরিয়াস হয়েই ম্যাটে নামত। তবে অলিম্পিকের মত মঞ্চে ভুল টার্ন নেওয়ার পরেও হাসছে। আমি অবাক হয়ে গিয়েছি। ও কী তাহলে অলিম্পিকের জন্য যথেষ্ট সিরিয়াস ছিল না।”

এত ছবি তোলার বহরের প্রসঙ্গ আসতেই সাইয়ের দীর্ঘদিনের কোচ মিনারা দীপা কর্মকারকে টেনে এনে বলছেন, “দীপার কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী আমার মতই। শৃঙ্খলার সঙ্গে আপস করেন না। টুর্নামেন্টে গিয়ে দীপা কোনওদিন ফোন ব্যবহার করেছে আমরা আজ পর্যন্ত দেখিনি। এই শৃঙ্খলাই পছন্দ হচ্ছিল না প্রণতির। নাহলে এতটা ক্যাজুয়াল অলিম্পিকে মঞ্চে কীভাবে হতে পারে ও!”

২৭ বছরের কোচ লখন আর ২৬ বছরের ছাত্রী প্রণতি। অনভিজ্ঞতা, রাজনীতির গোলকধাঁধাতেই হয়ত হারিয়ে গেল ভারতের এক সম্ভাব্য পদক।

যাঁর কাঁধে গোটা দেশের পদক-প্রত্যাশার চাপ কোচের সঙ্গে তাঁর ছবি কীভাবে ঘন্টায় ঘন্টায় ছবি সোশ্যাল উঠে আসে, আড়ালে-নিভৃতে যে অনুশীলনের সাধনায় যাঁর মগ্ন থাকার কথা সে কীভাবে ভুল করেও বারবার হালকা ছলে হাসতে পারেন অলিম্পিকের মত মঞ্চে, সেই অঙ্কই মেলাতে পারছেন না কেউ।

আরও পড়ুন: Minara Begum gutted after being axed as coach of Tokyo-bound gymnast Pranati Nayak

প্রশ্ন ওঠে গিয়েছে, জেলা স্তরেও যে লখন মনোহর শর্মার নাম কেউ শোনেনি, তাঁকে কীভাবে অলিম্পিকের মত মেগা ইভেন্টে পাঠানো হল। জাতীয় স্তরের এক আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্ট ব্যঙ্গ করেই বলে দিলেন, “প্রণতি-লখনের ভালোই হল। সাত তাড়াতাড়ি বিদায় নেওয়ায় অলিম্পিকে এবার ঘুরে বেড়াতে পারবে একদম ফ্রি মাইন্ডে! মূলপর্বে কোয়ালফাই করলেই তো ফের একবার নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হত। এই ভাল। দুজনে একসঙ্গে ঘুরে নিক, মন খুলে!”

বিদ্রুপের সঙ্গেই মিশে পদক হারানোর দুঃখও। রিও-র ব্যর্থতাকে সাফল্যের সিঁড়ি বানিয়ে টোকিওতেই পদক জয়- এমন উদাহরণ একদম টাটকা। ২৪ ঘন্টা আগেই স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে দেশকে রুপো দিয়েছেন মীরাবাই চানু। সেভাবে কি ফিনিক্স পাখির মত ফিরে আসতে পারবেন প্রণতি? বয়স এখনই ২৬! চার বছর পর বয়স দাঁড়াবে ৩০-এ। সম্ভব? কোচ মিনারা বলছেন, “আমাকে সাহায্যের জন্য ডাকলে এখনো অসম্ভব এই চ্যালেঞ্জ নিতে পারব। তবে অন্য কেউ কোচ থাকলে …”

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা এখন টেলিগ্রামে, পড়তে থাকুন

Get the latest Bengali news and Sports news here. You can also read all the Sports news by following us on Twitter, Facebook and Telegram.

Web Title: Tokyo olympics 2020 paranti nayeks failure raises questions about her tournament preparations with coach lakhan manohar sharma

Next Story
এই না হলে কোচ! লঙ্কান নেতা শানাকাও হাজির দ্রাবিড়ের ক্লাসে, ধন্য ধন্য শ্রীলঙ্কায়
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com