“বিদেশি লিপি কেন? নিজেদের লিপি তৈরি করুন”—ককবরক বিতর্কে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে তুঙ্গে বিতর্ক; পাল্টা কি বার্তা প্রদ্যুৎ কিশোরের?

"বিদেশী লিপি কেন? নিজেদের লিপি তৈরি করুন চাকমারা পারলে আপনারা কেন পারবেন না": ককবরক ভাষাভাষী উপজাতিদের বললেন মুখ্যমন্ত্রী; "আমাদের লিপি আমাদের ঘরের বিষয় বাইরের লোকের কথা এখানে চলবে না; রাজ্যে শান্তি চাইলে উপজাতিদের জ্ঞান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন": প্রদ্যুৎ কিশোর

"বিদেশী লিপি কেন? নিজেদের লিপি তৈরি করুন চাকমারা পারলে আপনারা কেন পারবেন না": ককবরক ভাষাভাষী উপজাতিদের বললেন মুখ্যমন্ত্রী; "আমাদের লিপি আমাদের ঘরের বিষয় বাইরের লোকের কথা এখানে চলবে না; রাজ্যে শান্তি চাইলে উপজাতিদের জ্ঞান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন": প্রদ্যুৎ কিশোর

author-image
Debraj Deb
New Update
cats

“বিদেশি লিপি কেন? নিজেদের লিপি তৈরি করুন”—ককবরক বিতর্কে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে তুঙ্গে উত্তাপ

শনিবার আগরতলায় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির একটি যোগদান সভায় মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহার ককবরক ভাষার লিপি সম্পর্কিত একটি মন্তব্য নিয়ে রাজ্যের উপজাতির রাজনীতিতে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। 
Advertisment
আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন চত্বরে ভারতীয় জনতা পার্টি আয়োজিত এক যোগদান সভায় গতকাল মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে ১,৭০৬ পরিবারের মোট ৫,০৫০ জন ভোটারের বিজেপিতে যোগদান করেন।
যোগদান সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন সুদীর্ঘ ৩৫ বছরের শাসনে জনজাতিদের ভোটের বাক্স বানিয়ে রেখেছিল কমিউনিস্টরা। ২০১৮র পর একের পর এক নির্বাচনে কমিউনিস্টদের অবস্থা কেবল খারাপ হচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায় 'ব্যান্ড বেজে গেছে', ভারতীয় জনতা পার্টি মানুষের জন্য কাজ করার একমাত্র পার্টি হিসেবে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
"বাম আমলে বিধানসভা নির্বাচনে কমিউনিস্টরা ২০ থেকে গণনা করতো। ওরা জানতো যে ২০টি আসন তাদের নিশ্চিত। কারণ জনজাতিদের তারা ভোটের বাক্স বানিয়ে রেখেছিল তারা। তাই ২০ থেকে গণনা শুরু করতো ওরা। কিন্তু এখন কমিউনিস্টদের ব্যান্ড বেজে গেছে। আমরা ওদের থেকে শিখেছি। এখন থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার যখনই হবে আমরাও ২০ থেকে গণনা শুরু করবো। আগামী বিধানসভা থেকেই সেটা শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির জাতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডার আশীর্বাদ রয়েছে আমাদের উপর। আমরা সবাই শান্তি চাই। বন্দুকের নল থেকে শক্তি বের হয় ওদের। এই রাজনীতি আমরা দেখেছি। এতদিন ধরে জনজাতি ভাই বোনেরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন," বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত:, ত্রিপুরার ষাট সদস্য বিধানসভায় কুড়িটি আসন তফসিলী উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য সংরক্ষিত। 
কারও নাম না করে গতকাল বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, "আমরা অনেক দল (ছোট ছোট) দেখেছি। মুখ্যমন্ত্রী যখন কোন জায়গায় সভা করতে যান তখন তাকে আটকাতে বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়, দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, হুমকি দেওয়া হয়, গালিগালাজ করা হয়। একই অবস্থা প্রদেশ সভাপতির ক্ষেত্রেও। কিন্তু এভাবে চলবে না। আমি বারবার বলছি যেখানে আক্রমণ বা যত বেশি আক্রমণ করা হবে তত বেশি শক্তিশালী হবে ভারতীয় জনতা পার্টি। কেউ রুখতে পারবে না। আমরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সবসময় স্মরণ করি। তিনি যেভাবে বলেন, যেভাবে মার্গ দর্শন করান সেভাবেই আমরা কাজ করি"।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত মুখ্যমন্ত্রী শাসক জোট শরিক দল তিপ্রা মথার কথা উল্লেখ করেছিলেন কারণ সম্প্রতি একাধিক জায়গায় বিজেপি ও তিপ্রা মথার কর্মীদের মধ্যে হিংসাত্মক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ত্রিপুরা স্বশাসিত জেলা পরিষদ অঞ্চলের ২৮টি আসনের মধ্যে ১৮ টি আসন নিয়ে ২০২১ জেলা পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছিল তিপ্রা মথা দল। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন আগামী বছর জেলা পরিষদ নির্বাচনে ২৮ টি মধ্যে ২৮ টি আসনেই জয়ী হবে একা বিজেপি। তিপ্রা মথা দলের রাজনৈতিক স্লোগান থানসা অথবা ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি আরো বলেছিলেন, "অপারেশন সিঁদুরের সময়ে নিউ ইন্ডিয়ার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী, সেভাবে আমরাও আগামীদিনে নিউ ত্রিপুরা গড়ে তুলবো। থানসা, থানসা, থানসা। থানসার অর্থ হচ্ছে জাতি, জনজাতি, মণিপুরী, সংখ্যালঘু। আর এই থানসার মাধ্যমে আমরা একটা নতুন ত্রিপুরা গড়ে তুলতে চাই"। তিপ্রা মথার দিকে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত করে মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেছিলেন, উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করচে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার।
"আমরা সম্মান দিতে জানি। এই ত্রিপুরা রাজ্যের জন্য রাজন্য পরিবার থেকে যারা কাজ করে গেছেন তাদের সম্মান দিয়েছি আমরা। ভারতীয় জনতা পার্টি গুন্ডার পার্টি নয়। ভারতীয় জনতা পার্টি মানুষের জন্য কাজ করার একটা পার্টি। আমরা দেখেছি এরআগে সিপিএম যে কায়দায় গায়ের জোরে কাজ করেছে এখন অনেক পার্টি সেটা অনুকরণ করছে। তার আগেও অনেক পার্টি ছিল। এভাবে ৫ বছর অন্তর অন্তর নতুন নতুন পার্টি হয়। কিন্তু আসলে কেউ জনজাতিদের কথা চিন্তা করে না। জনজাতিদের উন্নয়নে যা যা করার সেটা করবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ডাবল ইঞ্জিন সরকার। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জনজাতিদের জন্য একের পর এক কাজ করে যাচ্ছেন," তিনি বলেছিলেন।
গতকালের যোগদান সভায় ১,৭০৬ পরিবারের মোট ৫,০৫০ জন ভোটার ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেন। তাদের দলে স্বাগত জানান মুখ্যমন্ত্রী, প্রদেশ সভাপতি সহ অন্যান্য শীর্ষ নেতৃত্ব।রাজ্যের উপযোগী সম্প্রদায়ের লোকেদের ভাষা ককবরক এর লিপি বিতর্ক নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী গতকাল বলেছিলেন, উপযোগী সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে অনেক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন এবং তারা যদি ভাষার লিপি হিসেবে দেব নাগরীকে পছন্দ না করেন তাহলে নিজেদের লিপি তৈরি করতে চেষ্টা করতে পারেন। চাকমা ভাষাভাষীরা যদি নিজস্ব লিপি তৈরি করতে পারেন তাহলে কবরে ভাষার জন্য কেন এমনটা করা হবে না এই নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে তিপ্রা মথা সুপ্রিমো আজ বলেছেন ককবরক ভাষার লিপি একান্তই উপজাতিদের ঘরের বিষয় এবং এ বিষয়ে বাইরের কোনো লোকেদের কথা বরদাস্ত করবেন না উপজাতিরা।
বেঙ্গালুরুতে ত্রিপুরী নতুন বছর অথবা ৩ইং উৎসবে যোগ দিতে আজ বিকেলে কর্নাটকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন তিপ্রা মথা সুপ্রিমো ও ত্রিপুরা সাবেক রাজপরিবারের প্রধান প্রদ্যোৎ কিশোর মানিক্য দেববর্মা। প্রতিবছর ২২শে ডিসেম্বর ত্রিপুরার রূপজাতি অংশের লোকেরা উৎসব পালন করে থাকে। ৫৯০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে মহারাজ যূযারুফার শাসন কাল থেকে শুরু করে আজ অব্দি এই সময়ই পালিত হয় ত্রিপুরী নতুন বছর। সেই হিসেবে এবার পালিত হতে চলেছে ১৪৩৬ ট্রিপুরাব্দ।
যাবার আগে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, "এটি পুরনো ত্রিপুরী অথবা তিপ্রাসা নয়। এখন বুকে নিজের অস্তিত্বের
আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলে তিপ্রাসা, সঙ্গে দুনিয়াকেও দেখায়"।
বিজেপির যোগদান সভা প্রসঙ্গে তিনি রীতিমতো ফোড়ন কেটে বলেছেন, "গতকালকের সভা আমি দেখেছি। আমি সবাইকে বলতে চাই, আমাদের ব্লক সভায় তাদের রাজ্য স্তরের সবার চাইতে বেশি লোক স্বত:প্রণোদিত হয়ে আসে। এই সভা দেখে তারা যদি খুব খুশি হয়ে থাকেন তাহলে তাদের আমি আমার যে কোন ব্লক সভায় নিমন্ত্রণ করবো - এর চাইতে পাঁচগুণ বেশি লোক সেখানে জড়ো হয়। সবাই জানে বাস্তবটা কি"।

আরও পড়ুন-  কল্যাণপুর গণহত্যা মামলার পুনরায় শুনানির জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করবে সরকার: মুখ্যমন্ত্রী

ককবরক লিপি বিতর্ক নিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর বিদেশি লিপি বিরোধী মন্তব্যের প্রসঙ্গে বলেন, "আমি রাজ্যের সবচাইতে বড় নেতাকে প্রশ্ন করতে শুনেছি যে কেন একটি বিদেশী লিপি যার মূল ভাষাভাষীরা (ইংরেজরা) বহু বছর ভারতে শাসন করেছে, সেই লিপি আমরা কেন গ্রহণ করব। মূলত: রোমান লিপির এর বিষয় তিনি কথা বলছিলেন। প্রথম কথা হচ্ছে তিপ্রাসা জনগণ কি চায় আর কি চায় না, এটি আপনি বলতে পারেন না। আপনাদের উপদেশ থাকতেই পারে; আমরা আপনাদের উপদেশ শুনেছি। আমরা এটি গ্রহণ করছি না। দ্বিতীয়ত: ইংরেজি ভাষার সঙ্গে এতই সমস্যা থাকলে নিজেদের নেতা-মন্ত্রীদের ছেলে মেয়েদের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করতে বলুন। আপনাদের নেতা মন্ত্রীদের ছেলে মেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করবে আর ত্রিপুরী উপজাতি লোকেরা নিজেদের ছেলেমেয়েদের বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ে পড়াবে, এটি তো হতে পারে না"।

আরও পড়ুন-২ লাখ ছাড়ালো রূপার দাম, আজ ৫ কেজি রূপা কিনলে ২০৩০-এ কত রিটার্ন? পরিমাণ শুনলে চমকে যাবেন

ককবরক লিপি বিতর্ককে ত্রিপুরি উপজাতি মানুষের ঘরের কথা বলে চিহ্নিত করে প্রদ্যোৎ কিশোর বলেছেন উপজাতি সম্প্রদায়ের বাইরের লোকেরা এ বিষয়ে কথা বলার অধিকার রাখে না।"আমরা তামিল, তেলুগু, রোমান - যেকোন লিপিতে লিখবো, বাইরের লোক বলতে পারেন না। যিনি বলেছেন, তাঁর সম্মান করি কিন্তু তাঁর সমাধান বাস্তবসম্মত নয়। যতদিন নিজেদের লিপি তৈরি হচ্ছে না, ততদিন কি লিপি ব্যবহার করে আমাদের ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় বসবে? আমরা বাংলা লিপিতে লিখবো? দশ বছর লাগলে ততদিন এভাবেই চলবে? পার্শ্ববর্তী আসামেও তো বিজেপি সরকার রয়েছে; সেখানে কারবি সম্প্রদায়ের লোকেরা রোমান লিপি ব্যবহার করছে কিভাবে?আসামে স্বশাসিত জেলা পরিষদে যদি রোমান লিপিতে লিখতে পারে, আমরা কেন অন্য কারো কাছ থেকে অন্যরকম জ্ঞান শুনবো?"
মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতৃত্বদের বিরুদ্ধে রীতিমত ক্ষোভ উগরে দিয়ে আজ প্রদ্যোত কিশোর আরও বলেছেন, "আমরা বাংলা লিপির বিরুদ্ধে নই। কিন্তু আমাদের ৯৯ শতাংশ লোক ককবরক ভাষার জন্য বাংলা লিপির বিরোধী। আমরা স্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছি আমরা কি চাই। এটি আমাদের ঘরের ব্যাপার। অন্য কেউ কেন আমাদের নিজেদের লিপি তৈরি না হওয়া অব্দি বাংলা লিপি লিপি চাপিয়ে দেবে? স্পষ্ট কথা - এবার (বোর্ড) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ইংরেজিতে হতে হবে এবং আমাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজিতে লেখার অধিকার থাকতে হবে"।সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের উদাহরণ দিয়ে তিনি আজ বলেছেন পাকিস্তান সরকার যখন বাঙ্গালীদের ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন সেই দেশটি ভাষাগত বিরোধের মধ্যে থেকে উঠে আসা বিদ্রোহের মাধ্যমে দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছিল। "আজ আপনি আমাদের ছেলে-মেয়েদের বলছেন নিজেদের পছন্দের লিপিতে উত্তর লিখতে পারবে না। তাহলে আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত আর আপনাদের রাজনীতির মধ্যে কি তফাৎ রইলো?" প্রশ্ন করেন তিনি।
প্রদ্যোত সাফ জানিয়ে দেন যেহেতু রাজ্যের উপজাতি অংশের লোকেরা অনুপজাতিরা তাদের ভাষা কোন লিপিতে লিখবে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে না অতএব অপর পক্ষেরও তা করা উচিত না। রাজ্যে শান্তি চাইলে উপজাতিদের জ্ঞান দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বিজেপির নেতৃত্বদের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। স্বশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে সকল আসনে বিজেপির একা জয়ী হবার চ্যালেঞ্জের মুখে প্রদ্যুৎ কিশোর আজ বলেছেন সময়ই সব কথা বলবে। এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন যে বিজেপির রাজ্যস্থলী ও যোগদান সভার চাইতে তার নিজের দলের ব্লক সভাতে পাঁচ গুণ বেশি লোক জড়ো হয়।
tripura