বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে তিপ্রা মথার তীব্র আক্রমণ, বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ আখ্যা প্রদ্যুৎ কিশোরের

আগরতলায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিপ্রা মথা দলের সুপ্রিমো তথা রাজ্যের প্রাক্তন রাজপরিবারের উত্তরসূরি প্রদ্যুৎ কিশোর মানিক্য দেববর্মা বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বলে অভিহিত করেন

আগরতলায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিপ্রা মথা দলের সুপ্রিমো তথা রাজ্যের প্রাক্তন রাজপরিবারের উত্তরসূরি প্রদ্যুৎ কিশোর মানিক্য দেববর্মা বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বলে অভিহিত করেন

author-image
Debraj Deb
New Update
Tipra Motha, Pradyot Kishore Manikya Debbarma, Bangladesh minority attack, Bangladesh mini Pakistan remark, Tripura political news, North East security issue, Hindu Buddhist minority Bangladesh, Tiprasa Accord implementation, Kokborok Roman script, Tripura government alliance tension

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে তিপ্রা মথার তীব্র আক্রমণ, বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ আখ্যা প্রদ্যুৎ কিশোরের

সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু বৌদ্ধ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপর যে সমস্ত আক্রমণের ঘটনার সামনে আসছে, তার বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ জানিয়ে আজ ত্রিপুরার শাসক জোট শরিক তিপ্রা মথা দল বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তান বলে অভিহিত করেছে এবং বলেছে, উত্তর পূর্বের নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতি অবলম্বন করা উচিত কেন্দ্রীয় সরকারের।আগরতলায় রাজ্যের সাবেক রাজপরিবার মানিক্য বংশের বাসস্থান উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের অন্দরমহল অথবা 'রাজ অন্দরে ' এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিপ্রা মথা দলের সুপ্রিমো তথা সাবেক মানিক্য রাজবংশের বর্তমান প্রধান প্রদ্যুৎ কিশোর মানিক্য দেববর্মা বলেছেন, "সমস্ত দেশের কাছেই বিরাট দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে হিন্দু সখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধী সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ভারতীয় দূতাবাসের ওপর আক্রমণ হচ্ছে, উত্তর পূর্বাঞ্চলের ওপর আক্রমণ করে দখল করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। আমাদের কিছু লোক বলছে শেখ হাসিনাকে বাংলদেশে বর্তমান প্রশাসনের হাতে তুলে দেবার কথা বলছে। তিপ্রা মথা দলকে গুণ্ডা বলে অনেক নেতারা, কিন্তু আমরাই একমাত্র হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্যে কথা বলছে, অথচ অনেক দলই চুপচাপ রয়েছে। ৯.২০ কোটি টাকা দিয়ে আইপিএল এ বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়কে নিলামে বেছে নেওয়া হয়, অথচ, উত্তর পূর্বাঞ্চলের গৌরব মণিশঙ্কর মুড়াসিং কে সুযোগ দেওয়া হয় না"।
Advertisment
তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান যখন উল্টোপাল্টা কিছু করে, তখন ভারত তাদের খেলোয়াড়দের ব্যান করে। পাকিস্তান তবু ইদানিং লুকোচুরি আক্রমণ করে, কিন্তু বাংলাদেশের নেতারা আমাদের বিরুদ্ধে খুল্লা হুমকি দিচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ভারতের পক্ষ থেকে সম্মান দেওয়া হচ্ছে, আর নিজেদের দেশের সংখ্যালঘুদের দেশদ্রোহী বলছি।
".... এই দুনম্বরী কথাবার্তা চলবে না। আমরা চাই, নতুন বছরে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর লোকেদের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে করা অবস্থান নিতে হবে দেশের সরকারকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা সম্প্রতি ভারতবর্ষের ভেতর অস্থিরতা সৃষ্টি করার জন্য এদেশের অগ্রগতি দলগুলোকে সেখানে আশ্রয় দেবে বলেও হুমকি দিয়েছে। অতএব উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায় গুলোর ভাষাগত সাংবিধানিক অধিকার এর বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে সদর্থক ভূমিকা নিয়ে ভেবে দেখতে হবে," বলেছেন প্রদ্যুৎ।
বাংলাদেশকে 'মিনি পাকিস্তান' বলে অভিহিত করে তিনি আজ বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন উপজাতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যুবক যুবতীদের যদি ভাষা জমি এবং অন্যান্য সাংবিধানিক অধিকার না দেওয়া হয় তবে পরোক্ষে তাদের হতাশ করে পাকিস্তান কিংবা নয়া মিনি পাকিস্তান বাংলাদেশের উগ্রবাদী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির দিকে ঠেলে দেওয়ারই নামান্তর।"পাকিস্তান, আইএসআই এবং বাংলাদেশ - যাকে আমি মিনি পাকিস্তান বলবো .... আমাদের হতাশ যুবা অংশের ছেলেমেয়েদের আমরা তাদের কাছে যাবার জন্যে ঠেলে দিচ্ছি। অতএব, আমি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন করছি, উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর যুবা নাগরিকদের ভবিষ্যত, ভবিষ্যত নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং উত্তরপূর্ব অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যে আপনারা নির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করুন," বলেছেন প্রদ্যুৎ।তিনি আরো বলেন, তাঁর দল ও বিভিন্ন সংগঠন থেকে ইদানিং হোমচাঙ্গ মিছিল, বাংলাদেশ সহকারী হাই কমিশনের সামনে প্রতিবাদ সংগঠিত করাসহ আমাদের বিভিন্ন আন্দোলন সংগঠিত করা হয়েছে।
ককবরক ভাষার লিপি বিতর্ক নিয়ে তিনি বলেন তাঁর দল রোমান লিপির পক্ষে রয়েছেন এবং এই অবস্থান পরিবর্তন হবে না।
"মুখ্যমন্ত্রী নিজস্ব লিপি তৈরি করার জন্যে পরামর্শ দিয়েছেন কিন্তু যতদিন নিজস্ব লিপি তৈরি না হবে, ততদিন কি লিপিতে উপজাতি ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় উত্তর লিখবে? ককবরক এবং ককব্রু (রিয়াং উপজাতিদের ভাষা) ভাষা একমাত্র রোমান লিপিতেই লেখার পক্ষে রয়েছে তিপ্রা মথা দল এবং এই অবস্থান থেকে কোন নড়চড় হবে না। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার থেকে বিভিন্ন লিপি, নিজস্ব লিপি তৈরি করাসহ অনেক সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেসমস্ত পরামর্শগুলো সসম্মানে বিচার করে দেখা হয়েছে এবং উপজাতি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেই রোমান লিপির পক্ষে মতামত নির্দিষ্ট করা হয়েছে," বলেছেন তিনি।প্রসঙ্গত সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা একই অনুষ্ঠানে ককবরক ভাষার জন্য রোমান লিপির বিরুদ্ধে মন্তব্য করে বলেন চাকমা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীরা যদি নিজেদের ভাষার জন্য পৃথক লিপি তৈরি করতে পারেন তাহলে ককবরক ভাষাভাষীরা কেন পারবেন না? এর আগে রাজ্য বিধানসভায় একবার মুখ্যমন্ত্রী ককবরক ভাষার জন্য যে কোন ভারতীয় লিপির সমর্থন করে বলেছিলেন বিদেশি লিপির বিরুদ্ধে রয়েছেন তিনি।
২০২৬ সাল থেকে রাজ্য সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আর অপেক্ষা না করে রাজ্যের উপজাতির স্বশাসিত জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ককবরক এবং ককব্রু ভাষায় রোমান লিপি ব্যবহার করে পাঠ্যপুস্তক ছাপানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রদ্যুৎ কিশোর।এদিকে রাজ্য সরকারে তিপ্রা মথা জোট সঠিক হিসেবে যোগ দিয়েছে তারপরে দু বছর হতে চলল। গত বছরের প্রথম দিকে ত্রিপাক্ষিক তিপ্রাসা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং তিপ্রা মথা দলের মধ্যে। রাজ্যের উপজাতি সম্প্রদায়ের ভাষা জমি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে সমাধান খোঁজার জন্যেই মূলত এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ৬ মাসের মধ্যেই চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়িত হতে শুরু করবে বলে দাবি করা হলেও প্রায় ২ বছর কেটে যাবার পরও এখনো অব্দি চুক্তি বাস্তবায়ন অধরা রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তিপ্রাসা চুক্তি বাস্তবায়িত হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিশেষ উপদেষ্টা এবং আমাদের চুক্তির মধ্যস্থতাকারী একে মিশ্র যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত হলে তো ভালো। আমরা তার জন্যই অপেক্ষা করছি। তবে যদি সেই যুক্তি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে। সরকারে বসে তো আর আমরা আমাদের নিজস্ব লোকেদের ধোঁকা দিতে পারি না"।
তারই মন্তব্যে রাজনৈতিক মহলে বিশেষ আলোচনা শুরু হয়েছে। বেশ কিছু মাস ধরেই শাসক দল বিজেপি এবং শাসক জোট শরিক তিপ্রা মথার মধ্যে সংঘর্ষ, তিক্ততা, পরস্পর দোষারোপের ঘটনা বেড়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন কি বাত অনুষ্ঠান চলাকালীন তাঁর বার্তা শুনতে জড়ো হওয়া বিজেপি সমর্থকদের ওপর আক্রমণের ঘটনা থেকে শুরু করে ত্রিপুরা রাজ্য স্বশাসিত জেলা পরিষদে বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ঘটনার মাঝে দুদলের মধ্যেই উত্তেজনার চাপানউতোর বেড়েছে।
এ'প্রসঙ্গে প্রদ্যুৎ কিশোর আজ খোলসা করেই বলেন, ত্রিপাক্ষিক তিপ্রাসা চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে সরকারের থাকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে তাঁর দল।শাসক জোট থেকে বেরিয়ে গেলে আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য এডিসি ভোটের চেহারা কি হবে, এনিয়ে বিস্তর মন্তব্য রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তবে ইদানিং তিপ্রা মথা, মেঘালয়ের এনপিপি এবং উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিভিন্ন দল মিলে যে 'ওয়ান নর্থইস্ট' নামে রাজনৈতিক দল চালু করা হয়েছে, তার তারা তো প্রকাশের পরই কিন্তু সাফ করে দেয়া হয়েছিল, যে সমস্ত নির্বাচনে একাই লড়বে এই দলের প্রার্থীরা। ধীরে ধীরে তিপ্রা মথাসহ অন্যান্য দলগুলি এই নতুন দলের মধ্যে পৃথক সত্তা ছেড়ে বিলীন হয়ে যাবে এবং তখন অন্য কোন জাতীয় দলের সাথে ভোটের আগে জোটে না গিয়ে একাই যে যার জায়গায় লড়বে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনে ভোট পরবর্তী সময় জোট করার কথা ভেবে দেখা হবে বলেও জানানো হয়েছিল তখন।
tripura