/indian-express-bangla/media/media_files/2025/12/13/manik-saha-2025-12-13-15-42-52.jpg)
Manik Saha: ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা।
ত্রিপুরার শাসক জোট শরিক বিজেপি ও তিপ্রা মথা দলের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়েই চলেছে। সম্প্রতি দুই শরিকের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন জেলায়। হিংসাত্মক আক্রমণের ঘটনা বন্ধ না হলে আইন কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না, এমনকি ২০২৬ এই দুই দলের জোট শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন কথাও শোনা গিয়েছে রাজ্যের শীর্ষ বিজেপি নেতাদের মুখে।অপরদিকে তিপ্রা মথা সুপ্রিমো তথা সাবেক রাজন্য মানিক্য রাজপরিবারের বর্তমান প্রধান প্রদ্যুৎ কিশোর মানিক্য দেববর্মা ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারে সঙ্গে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক তিপ্রাসা চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসার কথা ভাববে তাঁর দল।
এরই মধ্যে আজ শরিক তিপ্রা মথা দল জোটধর্ম মানছে না বলে সরাসরি আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ব্ল্যাকমেইলিং ও হুমকির রাজনীতি আর বরদাস্ত করবে না বিজেপি।মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা মঙ্গলবার তিপ্রা মথা পার্টির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিজেপিকে ত্রিপুরা জনজাতি এলাকা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদে (টিটিএএডিসি) অনুমতি দেওয়া হবে না বলে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ভারতীয় জনতা পার্টিকে জনজাতি এলাকায় কর্মসূচি পালন ও জনজাতির জন্য কাজ করা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না।রাজ্যের খোয়াই জেলার বাইজলবাড়ি এলাকায় প্রদেশ বিজেপি মহিলা মোর্চার উদ্যোগে উপজাতি মহিলাদের নিয়ে আয়োজিত এক সভায় মঙ্গলবার একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জনজাতি মহিলাদের নিয়ে আয়োজিত আজকের এই কার্যক্রম ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন অনেকেই। "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রমুখরা বিজেপির অভিভাবক। দলীয় কর্মসূচি পালন করার জন্য কেউ আমাদের বাধা দিতে পারবে না। আমরা আলোচনা চাই, অশান্তি চাই না। আমরা শুধু আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা ব্যবহার করবো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায়। বিজেপি কখনোই অসংযমে বিশ্বাস করে না। অন্য দলগুলো ভিন্ন আচরণ করতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে পারে। কিন্তু আমাদের দলের নেতারা কখনোই তা করবেন না," বলেন তিনি। দেশের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের উগ্রপন্থী সংগঠনের বিরুদ্ধে অপারেশন সিন্দুর এর উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করবে বলে দাবি করে ব্ল্যাকমেইল করতো।
শরিক তিপ্রা মথা দলের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে তিনি আজ বলেছেন, "একইভাবে আরেকটি দল সিপিএমে যাবে বলে ব্ল্যাকমেইল করছে। ২০১৮ সালে বিজেপি কীভাবে ক্ষমতায় এসেছিল তা সবাই জানেন। প্রথমে তিপ্রাল্যান্ড, তারপর গ্রেটার টিপ্রাল্যান্ড এবং এখন ওয়ান নর্থইস্ট। যে কেউ এটি করতে পারে, যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, কিন্তু সবটাই একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে হওয়া উচিত"।
প্রসঙ্গত, বিজেপির অপর জোট শরিক আইপিএফটি দল ২০০৯ সালে প্রথম ত্রিপুরার উপজাতি জনগণের জন্যে পৃথক তিপ্রাল্যান্ড রাজ্য তৈরি ডাক দেয়। ২০১৮ সালে বিজেপির সঙ্গে জোট করে ৮ টি বিধায়ক নিয়ে গেরুয়া দলের সাথে জোট সরকার গঠন করেছিল দলটি।
২০২১ সালে রাজ্যের সাবেক রাজপরিবারের বর্তমান প্রধান তথা প্রাক্তন রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি প্রদ্যুৎ কিশোর মানিক্য দেববর্মার নেতৃত্বে তিপ্রা মথা দল গঠন করা হলে ধীরে ধীরে পাহাড়ে এই নতুন দলের প্রাধান্য বাড়তে থাকে। জন্মের পর প্রথম দুবছর বিজেপির বিরোধিতা করে ২০২৩ এর বিধানসভা নির্বাচনে লড়লেও গতবছর উপজাতি জনগণের ভাষা, জমি, অর্থনীতি ও অন্যান্য সমস্যার নিরসনের জন্যে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সাথে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন করে দলটি। তারপরই রাজ্য সরকারে জোট শরিক হিসেবে যোগ দেয় তিপ্রা মথা।
জন্মলগ্ন থেকে গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড বলে একটি পরিবর্ধিত উপজাতি রাজ্য গঠনের ডাক দিয়েছিল দলটি। দাবিতে ছিল পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসাম, মেঘালয়, মিজোরামের ত্রিপুরী উপজাতি বসতির এলাকা সহ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি বসতির অঞ্চল এই নতুন রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ছিল দলটির।
কালক্রমে দাবি পরিবর্তিত হতে হতে ত্রিপুরা উপজাতি স্বশাসিত জেলা পরিষদ অঞ্চল ও আরও ত্রিশটির মতো উপজাতি বসতির গ্রাম নিয়ে গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড গড়ে তোলার দাবি করে দলটি। উপজাতি উন্নয়নে রাজ্যের সাবেক বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, এমনকি বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের আমলে যথেষ্ট কাজ করা হয়নি বলে তিপ্রা মথা দলের পক্ষে অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করার অভিযোগ করা হয়েছে বহুবার। তাই কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সরাসরি এডিসি প্রশাসনকে অর্থ বরাদ্দ করার দাবিও তোলা হয়।উন্নয়নের প্রসঙ্গে আজ মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সবাইকে নারী, যুব, দরিদ্র ও কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাজ্য সরকার একই দিশায় কাজ করছি।
বরিষ্ঠ তিপ্রা মথা নেতা, প্রাক্তন জঙ্গী নেতা তথা রামচন্দ্রঘাট বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, "যে রামচন্দ্রঘাটের বিধায়ক একসময় আমার প্রশংসা করতেন, আর এখন মুখ্যমন্ত্রীকে গালিগালাজ করেন। আমরা নতুন ত্রিপুরা গড়তে আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই, কিন্তু আপনারা জোটের শরিকের নিয়ম মানছেন না। যেখানে আমরা নিয়ম মেনে চলছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও জোট শরিকদের নিয়ে দেশ চালাচ্ছেন এবং আমরা সেখানে এমন আচরণ কখনও দেখিনি"।
দুই দলের মধ্যে সম্পর্ক যে ভালো নেই, এনিয়ে গতকাল কোন রাখঢাক রাখেননি মুখ্যমন্ত্রী।সভায় তাঁর বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে একটি বিবৃতি দিয়ে বলা হলো যে এডিসি-তে বিজেপিকে অনুমতি দেওয়া হবে না।"আমরা এ ধরনের ঘটনা বরদাস্ত করব না। আমরা এখানে মানুষের জন্য কাজ করতে এসেছি এবং আগামী দিনেও কাজ করে যাবো। বিগত বছরগুলিতে রামচন্দ্রঘাট বিধানসভা কেন্দ্রের উন্নয়নের জন্য ১২৬ কোটি টাকা দিয়েছে আমাদের সরকার। মানুষ ধীরে ধীরে তাদের প্রত্যাখ্যান করবে," বলেন তিনি।
সম্প্রতি রাজ্যের উপজাতি অংশের মানুষের ভাষা ককবরক এর লিপি বিতর্ক নিয়ে তিনি বলেছেন, " ককবরক স্ক্রিপ্ট নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। শ্যামাচরণ ত্রিপুরা কমিটি ১৯৯০ সালে গঠিত হয়েছিল, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে রোমান লিপি দেওয়া যেতে পারে। তাহলে কেন রোমান লিপি চালু করা হলো না? পবিত্র সরকার কমিটি ২০০৪ সালে সিপিএম শাসনামলে গঠিত হয়েছিল, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে ককবরকের জন্য কোনও স্ক্রিপ্ট প্রস্তাব করা হয়নি। তখন চুপ করে ছিলেন কেন? তারা হিন্দি নিয়ে কথা বলতে পারে, কিন্তু দেবনাগরী লিপির অনুমতি দেবে না। তারা জোরপূর্বক রোমান লিপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনজাতি সংস্কৃতি ধ্বংস করতে চেষ্টা করছে। তারা উস্কানি দিয়ে দল চালাচ্ছে এবং মানুষকে উস্কানি দিয়ে বিভ্রান্ত করার কারখানা তৈরি করেছে"।
প্রসঙ্গত: ভারতীয় লিপিতে ককবরক ভাষা লেখার পক্ষে মত দিয়েছে বিজেপি দল। ককবরক ভাষাভাষী লোকেদের নিজেদের পৃথক লিপি তৈরির জন্যেও পরামর্শ দিয়েছে বিজেপি, এবং ততদিন অব্দি বাংলা লিপিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র লেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিপ্রা মথা দলের পক্ষে সাফ বলা হয়েছে, রোমান লিপির পক্ষেই রয়েছেন তাঁরা এবং এই অবস্থান বদলাবে না। রাজনৈতিক হিংসার প্রসঙ্গ তুলে আজ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট এর শাসনকালে বহু বিরোধী দলের নেতাকে খুন করা হয়েছে।"আমরা নিউ ত্রিপুরায় খুন, ধর্ষণ ও সহিংসতা চাই না। সিপিএম তাদের আমলে রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছিল। আমরা এখন ত্রিপুরায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমরা সবাইকে শান্তির বার্তা দিতে চাই। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্প অন্তিম ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছি। জনজাতি অংশের মানুষের উন্নয়ন আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার," বলেছেন তিনি।
আরও পড়ুন- 'আর কতদিন এভাবে হিন্দুদের পুড়ে মরতে হবে'? ইউনূসের বিরুদ্ধে সরাসরি হুঙ্কার লেখিকা তসলিমা নাসরিনের
আরও পড়ুন-ওসমান হাদি খুনে এবার ইউনূসের বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙ্গুল ভাই ওমরের, তুলকালাম বাংলাদেশে
আরও পড়ুন- হিন্দু যুবক পুড়িয়ে মারার ঘটনায় ঘরে বাইরে প্রবল চাপে ইউনূস, ড্যামেজ কন্ট্রোলে এবার বড় পদক্ষেপ
আরও পড়ুন-'যদি সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ হতেন', প্রার্থীপদ বাতিল হতেই হুমায়ুনকে তুলধোনা নিশার
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us