/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/11/tripura-mountaineer-aritra-roy-conquers-aconcagua-after-everest-2026-01-11-18-04-28.jpg)
পর্বতারোহী অরিত্র রায়
আফ্রিকার মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো, ইউরোপের মাউন্ট এলব্রুস এবং পর্বতসম্রাট মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের পর এবার দক্ষিণ আমেরিকার মাউন্ট আকোনকাগুয়া জয় করল ত্রিপুরার ছেলে, পর্বতারোহী অরিত্র রায়।
পরিবারে কোন পর্বতারোহীর ইতিহাস নেই, তাবেনপিটা সংযোগ কুমার রায় ফুটবলের কোচ ছিলেন। অতএব, খেলাধুলোর দিকে ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। তাই আর দশজনের মতো আইটি নিয়ে পড়াশোনা করে বেঙ্গালুরুতে ভালো বহুজাতিক সংস্থায় স্থিতিশীল চাকরি করা সত্ত্বেও অরিত্রর ভেতরে এ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের পোকা নাড়া দিত প্রায়ই। তাই চাকরির সাথে শরীরও মনকে তরতাজা রাখতে প্রতিনিয়ত চর্চা করতেন তিনি, বেঙ্গালুরুতে এন্থ-এ্যাডভেঞ্চার বলে একটি এ্যাডভেঞ্চার রেসিং কোম্পানির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি; পাশাপাশি পর্বতারোহণের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন।
ছোটোখাটো কিছু পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে করোনা অতিমারীর পর ২০২৩ সালে সাহস করে বেরিয়ে পড়েন প্রথম বড়ো পর্বত জয় করতে।সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করার লক্ষ্য নিয়ে প্রথম বছরেই আফ্রিকার মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো ও ইউরোপের মাউন্ট এলব্রুস্ জয় করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন অরিত্র। আরও কিছু প্রশিক্ষণ অর্জন করা দরকার, অনুভব করে পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে দার্জিলিংস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে বেসিক এবং এ্যাডভান্সড মাউন্টেনিয়ারিং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন তিনি।
২০২৫ সালের ১৯শে মে পর্বতসম্রাট মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন অরিত্র, তাও প্রথমে আগরতলা থেকে নেপাল পর্যন্ত একটানা ১,৩০০ কিমি সাইকেল চালিয়ে যাওয়া, এভারেস্ট জয় এবং তার পর একটি ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ - সবমিলিয়ে এই ট্রায়াথলনে যোগ দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে এভারেস্ট জয় করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। ২৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫ হিন্দুস্থান এরোনটিক্স এর আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট আকোনকাগুয়া জয় করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন তিনি।
ইডির অভিযান নিয়ে মমতার প্রতিবাদের পরই তড়িঘড়ি বিবৃতি সংস্থার, কী জানালো IPAC?
২২,৮৪১ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পর্বতে পৌঁছতে প্রথম আর্জেন্টিনার মেন্দোজা শহর থেকে পুয়েন্তে দেল ইনকা তে বাসে করে পৌঁছান অরিত্র। পারমিট ইত্যাদি ব্যবস্থা করে প্রথমদিন ৩,৩৪০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত কনফ্লুয়েন্সিয়া পর্যন্ত ৮ কিমি পথ অতিক্রম হল অনেক ধীরে। প্রায় ৩০ কেজি ওজনের রুকস্যাক পিঠে বেঁধে প্রথম দিনের যাত্রা শেষে ৩০শে ডিসেম্বর ছিল এক্লেমেটাইজেশন অথবা পর্বতের হালকা বাতাস ও স্বল্প বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সাথে শরীরকে অভ্যস্ত করাবার দিন।
৭ ঘন্টা ১৮ মিনিট ট্রেকের পর ৩১শে ডিসেম্বর ৪,৩৫০ মিটার উঁচুতে প্লাজা দে মূলাস বেসক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছান অরিত্র ও তাঁর সঙ্গীরা। সারা পৃথিবী যখন নতুন বছরের আনন্দে মাতোয়ারা, ১লা জানুয়ারি, ২০২৬ এ ৫০৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত ক্যাম্প ওয়ানে রোটেশন সাইকেল অথবা লোড ফেরি শুরু হয়ে যায়। উঁচু পাহাড় আরোহণের সময় সাধারণত: একটি ক্যাম্প থেকে তার উঁচু ক্যাম্পে উঠে কিছু অত্যাবশ্যক মালপত্র রেখে আসেন একজন পর্বতারোহী। এর ফলে তাদের শরীর উচ্চতা এবং স্বল্প বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সাথে আরও ভালোভাবে অভ্যস্ত হতে থাকে। মালপত্র রেখে প্রবতারোহী আবার নিচে সকলের কাছে নেমে আসেন। এভাবে সকল অত্যাবশ্যক মালপত্র উঠে গেলে পর্বতারোহীরা নিজেরা ওপর যাত্রা করেন।
১লা জানুয়ারি ২.৫ কিমি দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করে প্রথম রোটেশন সাইকেল সম্পন্ন করেন অরিত্র এবং ২রা জানুয়ারি সকল মালপত্র এবং বাকি সকলের সাথে সম্পূর্ণভাবে ক্যাম্প ওয়ানে উঠে যান তাঁরা।
জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি এবার শুভেন্দুর, মমতার বিরুদ্ধে ফের বিস্ফোরক অভিযোগ বিরোধী দলনেতার
এখন পর্যন্ত কোন বিশেষ সমস্যা হচ্ছিল না তবে এই উচ্চতায় খুব বেশি তুষার না থাকায় বরফ গলিয়ে জল তৈরি করার জন্যে কিছু সমস্যা হচ্ছিল। ৩রা জানুয়ারি একইভাবে ক্যাম্প ওয়ান থেকে ক্যাম্প টু পর্যন্ত যাত্রা হলো। ৫,৬৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই ক্যাম্পে ৪ঠা জানুয়ারি পাকাপাকিভাবে পৌঁছার পর ৫ তারিখ ছিল বিশ্রামের দিন। এদিকে ততক্ষণে ১০০ কিমি প্রতি ঘন্টা বেগে বইছে কনকনে সূঁচ ফোটানো ঠান্ডা হাওয়া। বারবার সকলে আবহাওয়ার খবর দেখার চেষ্টা করছেন, কখন এর ওপরের দিকে নিরাপদে যাত্রা করা যায়। ৭ই জানুয়ারি মোটামুটি ভালো ভাবে আরোহণ করা যাবে, ৮ তারিখে আবার নিরাপদ আবহাওয়ার পূর্বাভাস ক্ষীন দেখা যাচ্ছিল। এমন সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় আর দেরি না করে ক্যাম্প ২ থেকে আর রোটেশন সাইকেল না করে সরাসরি ক্যাম্প ৩ পর্যন্ত যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেন পর্বতারোহীরা।
ক্যাম্প ৩ কিন্তু ৬,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত; ক্যাম্প ২ থেকে প্রায় ৩৫০ মিটার উঁচুতে। স্বাভাবিকভাবেই চূড়ার অনেকরই কাছে অবস্থিত এই ক্যাম্প তবে রোটেশন সাইকেল করে একটি দিন খরচ করার মতো নিরাপত্তা তখন রীতিমত বিলাসিতা; কারণ চারদিকে খতরনাক আবহাওয়ার পূর্বাভাস।
৭ই জানুয়ারি ভোর ৩:৩০ আর্জেন্টিনা টাইমে আকোনকাগুয়া পর্বতের চূড়া পর্যন্ত অবশিষ্ট ১৩০০ মিটারের দূরত্ব অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নিয়ে পর্বতারোহীরা বেরিয়ে পড়লেন। টানা ১০:৩০ ঘণ্টার বিরামহীন ট্রেকিংয়ের পর আর্জেন্টিনা টাইমের দুপুর দুটো তথা ভারতীয় সময় রাত ১৯: ৩০টায় আকোনকাগুয়া পর্বতের চূড়ায় পৌঁছে যান অরিত্র রায় ও তাঁর সঙ্গীরা।
পর্বতারোহণের শেষে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে অরিত্র রায় জানিয়েছেন, "এই সাফল্যের পর আমি অত্যন্ত আনন্দিত। পর্বতারোহণের মতোই ক্ষিপ্রতা, সাবলীলতা, পরিবর্তনশীলতার জন্যে পরিচিত হিন্দুস্থান এরোনটিক্স। পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলা, বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত ইত্যাদি দুয়েরই সহজাত প্রবৃত্তি। আমার লক্ষ্য পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করা। এর মধ্যে চতুর্থ পর্বতশৃঙ্গ জয়ে আমার সাথে হিন্দুস্থান এরোনটিক্স এর সাহায্য আমায় সাহস জুগিয়েছে। আমার ধারণা, সারা দেশের মতো আত্মনির্ভর ভারত গড়ার একটি উদাহরণ আমার এই প্রচেষ্টা - যে পৃথিবীর যেকোন ধরনের পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্যে ভারতীয় এবং ভারতীয় সংস্থা প্রস্তুত"।অরিত্র রায়ের সাফল্যে রাজ্যের ক্রীড়ামোদী মহলে আনন্দের ঢেউ বয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে এ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের সাথে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ার অথবা ভারতীয় সেনা বাহিনীর টেরিটোরিয়াল আর্মির সাথে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে অরিত্রের।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us