/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/27/barma-2026-01-27-13-58-40.jpg)
Padma Shri Award: পদ্ম সম্মান প্রাপ্ত সাহিত্যিক নরেশচন্দ্র দেববর্মা।
থাঙ্গা ডারলং, বেনীচন্দ্র জমাতিয়া, সত্যরাম রিয়াং, স্মৃতিরেখা চাকমা, চিত্ত মহারাজ, অধ্যাপক অরুণোদয় সাহা, বিক্রম বাহাদুর জমাতিয়া, প্রয়াত নরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা, প্রয়াত ড. রথীন দত্ত সহ রাজ্যের ১২জন প্রখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক, সমাজকর্মীদের পর এবার ত্রিপুরা থেকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী পাচ্ছেন রাজ্যের উপজাতি জনগোষ্ঠীর অন্যতম ভাষা ককবরক এর সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, বৈয়াকরণ ও ভাষাবিদ নরেশ চন্দ্র দেববর্মা।
রাজধানী শহর আগরতলায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে ২৭ কিমি দূরে সিপাহিজলা জেলার চড়িলাম এলাকার লেম্বুথল গ্রামে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর বিশালগড় উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ এবং উচ্চশিক্ষার জন্যে আগরতলায় প্রত্যাবর্তন; এখানে রাজ্য সরকার পরিচালিত মহারাজা বীর বিক্রম মহাবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করেন তিনি।
পাঁচজনের পরিবারে দারিদ্র্যের প্রকোপ নিতান্ত কম ছিল না। আঠেরো বছর বয়সেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে পরিবারের জন্যে উপার্জনের তাগিদে কৃষি ফটোর জুনিয়র কম্পিউটার এসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দেন তিনি। পরে অবশ্য ১৯৭৩ সালে রাজ্য বিধানসভায় ইউডি এসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দিয়ে ২০০২ সালে অবসরে যাওয়া অব্দি সেখানেই সম্পূর্ণ কর্মজীবন কাটিয়েছেন নরেশ চন্দ্র দেববর্মা।
নিজে ককবরক ভাষাভাষী হওয়ায় এবং নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি গভীর আত্মিক টান থেকেই নরেশ চন্দ্র রাজ্যের এই ভাষাটি নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন সেই ১৯৭২-৭৩ থেকে। তখনও ত্রিপুরায় ককবরক ভাষা নিয়ে সরকারি স্বীকৃতি আসেনি, ককবরক সাহিত্য প্রায় নেই বললেই চলে। রাজ্য সরকারের ট্রাইব্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট কিছু কাজ করছিল ঠিকই, কিন্তু রাজ্যের প্রায় ১৯টি উপজাতি সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট ভাষা, সঙ্গীত, উপাসনা, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে উল্লেখ্য তথ্য স্বল্পতা নিয়ে চিন্তিত নরেশ চন্দ্র দেববর্মা নিজেই এই কাজের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন।
আরও পড়ুন- রাজীবের পর এবার কে? পরবর্তী ডিজি নিয়োগে নয়া জট, ক্যাটের নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে আদালতে UPSC
পাঁচ দশকের বেশি সময়কাল ধরে ককবরক ভাষা, সংস্কৃতি, ব্যাকরণ, ব্যবহারবিধি ইত্যাদি নিয়ে প্রায় ৩৪ টি বই লিখেছেন তিনি; সঙ্গে রচনা করেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ, সাহিত্য ইত্যাদি। ককবরক ভাষা নিয়ে তাঁর লেখা আটটি বই রাজ্যের বিভিন্ন মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক এবং রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভাষার বিকাশ, প্রচার এবং প্রসারের জন্যে বাংলা, ককবরক ও ইংরেজি - তিন ভাষাতেই এতো বছর ধরে লেখালেখি করেছেন তিনি। ককবরক ভাষা বিকাশে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্যে ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার দ্বারা ২০২৪ সালে ত্রিপুরা ভূষণ শিরোপায় সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি।এবার পদ্মশ্রী খেতাবের জন্যে মনোনীত হওয়ায় তিনি ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন। তবে একইসঙ্গে এও বলেছেন, পুরস্কৃত হওয়া ছাড়াও ককবরক ভাষার উন্নয়নে জন্যে আজীবন কাজ করতে তিনি বদ্ধপরিকর।
ককবরক ভাষা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ, প্রসঙ্গ ককবরক মান্য ভাষা, ককবরক ভাষা পরিকল্পনা, ককবরক লিখনপদ্ধতি ও ব্যাকরণ ইত্যাদি বিভিন্ন ককবরক ভাষা নিয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে; নাম 'জরানি মাখাঙ্' অথবা সময়ের চেহারা। হাচুকনি খরাং নামে স্থানীয় একটি প্রকাশনা সংস্থা জরানি মাখাঙ্ প্রবন্ধ সংগ্রহটিতে রাজ্যের উপজাতি সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদি নিয়ে গবেষণামূলক লেখায় তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা সূত্রপাত করে। আরও অনেক ককবরক গ্রন্থ প্রকাশনার পর ২০১০ সালে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা 'ককবরক ভাষার ক্রমবিকাশ '।
কালক্রমে ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য ককবরক ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ট্রান্সলেশন ' নামে ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর ককবরক ভাষার বই এবং রাজ্যের উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত জুম চাষের ওপর লেখা বইও প্রকাশিত হয়েছে। তিনটি ভাষায় লিখতে সমান পারদর্শী নরেশ চন্দ্র দেববর্মা কি অবশ্য বলেছেন, তাঁর পদ্মশ্রী পুরস্কার যদিও উৎসাহব্যঞ্জক, তবে তরুণতর প্রজন্মের হাতে ককবরক ভাষা উন্নয়নের ব্যাটন তুলে দিতেই বেশি উৎসাহী নরেশচন্দ্র দেববর্মা।
আরও পড়ুন-Akhilesh Yadav: “ইডি পারেনি, বিজেপিও পারবে না! বাংলায় ফের দিদিই ফিরছেন”, ভবিষ্যদ্বাণী অখিলেশের
তিনি বলেন, "ককবরক এখন মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত গেছে। এটি খুব ভালো কথা। এটি রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষা। বাংলা এবং ককবরক ভাষা সম্মানের দিক থেকে এক হলেও সাহিত্য সম্ভারের দিক থেকে ককবরক অনেক পিছিয়ে রয়েছে। যদি সত্যিকার অর্থে এই ভাষার উন্নয়ন করতে হয়, তাহলে অনেক কিছু করার রয়েছে। যারা এই ভাষার জন্যে বিভিন্ন স্তরে আন্দোলন করছেন, কাজ করছেন, তাঁদের সবার উদ্দেশ্যে বলব, ভাষার উন্নয়নই আসল উদ্দেশ্য। এর জন্যে যত সম্ভব ককবরক ভাষার উপর প্রকাশনা করা, গবেষণা করা উচিত বলে মনে করি। অনেক কিছুই লেখালেখি হচ্ছে, কিন্তু যদি ক্ষেত্রবিশেষে দেখি, তাহলে মূলত গল্প, কবিতা ইত্যাদি লেখা হচ্ছে। এবছরই প্রায় ১৬-১৭ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো অবশ্যই দরকার। কিন্তু শুধুমাত্র কবিতা, গল্প দিয়ে তো সবকিছু সম্ভব নয়। যত বেশি সম্ভব গবেষণা, শব্দকোষ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করা উচিত,"।
রাজ্যে গত বেশ কয়েক বছর ধরে ককবরক ভাষার জন্য বাংলা না রোমান না দেবনাগুড়ি লিপি ব্যবহৃত হবে এ নিয়ে শাসক দল বিজেপি এবং শাসক জোট শরিক তিপ্রা মথা দলের মধ্যে বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে গেছে। একদিকে যখন তিপ্রা মথা দল ককবরক ভাষার লিপিকে নিজেদের পছন্দের বিষয় বলে ' বহিরাগতদের ' এবিষয়ে থেকে দূরে থাকতে উপদেশ দিয়েছেন তেমনি বিজেপি দলের বেশ কিছু শীর্ষ রাজ্য নেতা বারবার রোমান লিপির দাবিকে বিদেশী চক্রান্ত বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন।
এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, ককবরক ভাষাবিদ নরেশ চন্দ্র দেববর্মা বলেন, "আমি এবিষয়ে খুব বেশি বক্তব্য রাখতে চাই না। লিপি বিতর্ক আগেও ছিল। বাংলা ও রোমান লিপি নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য আগেও ছিল কিন্তু এত আগ্রাসী পার্থক্য ছিলনা। গত দুতিন বছরে রোমান লিপির দাবি জোরদার হয়েছে। আমি তো ব্যক্তিগত গোড়া থেকেই বাংলা লিপি ব্যবহার করে আসছি। আমার মনে হয় রোমান লিপির দাবিটি অনেকটাই আবেগনির্ভর, খুব বেশি যুক্তিসঙ্গত বলে আমি মনে করিনা। লিপি কজ বিশেষ ব্যাপার নয়। লিপি একটি প্রতীকমাত্র, একটি চিহ্ন মাত্র; যেকোন ভাষাকে প্রকাশ করার জন্যে যেকোন লিপি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু তাকে ওই ভাষার মতো করে তৈরি করেন নিতে হয়। ককবরক ভাষার জন্যে বাংলা লিপি ব্যবহার করে নেওয়া যায়, কিন্তু ককবরক ভাষার উচ্চারণ প্রকাশ করার জন্যে বাংলা লিপিকে প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করে নিয়ে হবে। উচ্চারণ তো আমার (ককবরক ভাষাভাষী) অনুযায়ী হবে, সেই লিপির বাংলা ভাষায় কি উচ্চারণ রয়েছে, সেটি আমার দেখার বিষয় নয়। যেমন ককবরক ভাষায় চারটি স-জাত উচ্চারণ রয়েছে কিন্তু আমি সেখানে একটিমাত্র স ব্যবহার করেছি, তেমনি দ - সম্পর্কিত উচ্চারণ বাংলা ভাষায় চারটি আছে কিন্তু আমি আমার মত করে ব্যবহার করেছেন এটিই ভাষাতত্ব"।
আরও পড়ুন- চিনের ঘুম হারাম! ইউরোপের সঙ্গে হাত মেলাল ভারত, নয়া চুক্তিতে এমন কী আছে যা বিশ্বকে তাক লাগাচ্ছে?
যারা রোমান লিপি নিয়ে আন্দোলন করছে, তাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, তাঁর নিজের লেখা আটটি গ্রন্থ মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পাঠ্যপুস্তক অথবা রেফারেন্স বই হিসেবে রয়েছে। সেসবগুলি বাংলা লিপিতে লিখিত রয়েছে, পঠিত হচ্ছে ফি বছর কিন্তু লেখার সময় রোমান লিপির প্রয়োজন কি করে তৈরি হয়, এনিয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না।
তিনি বলেছেন, "তাঁদের আন্দোলন নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। এটি তাঁদের গনতান্ত্রিক অধিকার। ভবিষ্যত এবিষয়ে যা বলার, বলবে। তরুণ প্রজন্ম রোমান লিপি ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু তারা অনেক ক্ষেত্রেই যা লিখছে, আমরা দেখি। অনেক ক্ষেত্রেই হযবরল হয়ে যায়। আমার নিজের লেখা আটটি গ্রন্থ মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে রেফারেন্স বই হিসেবে রয়েছে। আমি তো সব বাংলা লিপিতেই লিখেছি। তাঁরা আবার রোমান লিপি ব্যবহার করে কি করতে চাইছে, আমি জানি না। তবে তাঁদের যেকোন লিপির দাবিতে আন্দোলন করার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে।"
তাঁর অবদান এবং পদ্মশ্রী পুরস্কারের স্বীকৃতির খবর আসার পর মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে লিখেছেন, "রাজ্যের সাহিত্য ক্ষেত্রে স্বনাম ধন্য ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধেয় শ্রী নরেশ চন্দ্র দেববর্মাকে ভারত সরকার কর্তৃক 'পদ্মশ্রী' সম্মানের জন্য মনোনীত করায় আমি তাঁকে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। ককবরক ভাষা সাহিত্যে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। ২০২৪ সালে রাজ্য সরকার ককবরক ভাষার সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে ত্রিপুরাভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। জাতীয় স্তরে তাঁর এই সম্মাননা নিশ্চিতভাবেই আমাদের রাজ্যের গৌরবকে আরও উজ্জ্বল করেছে। তাঁর এই কৃতিত্ব বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে এক বিশেষ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে"।
রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্স এ লিখেছেন, "শিক্ষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পদ্মশ্রীর জন্য মনোনীত হওয়ার জন্য নরেশ চন্দ্র দেববর্মাকে আন্তরিক অভিনন্দন। এই সম্মান সকল ত্রিপুরাবাসীর জন্য গর্বের ও আনন্দের মুহূর্ত"।


/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us