/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/28/ajit-pawar-plane-crash-2026-01-28-13-20-02.jpg)
কীভাবে মহারাষ্ট্র রাজনীতির 'মাসিহা' হয়ে উঠেছিলেন অজিত পাওয়ার?
বারামতী বিমান দুর্ঘটনা আচমকাই মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক চিত্রটাই পাল্টে দিয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার জেরে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) অন্দরেই উত্তরাধিকার ও নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এমন এক সময়ে এই দুর্ঘটনা ঘটল, যখন অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বে এনসিপির ক্রমশ সংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছিল।
আরও পড়ুন-Singur: শিল্পের স্বপ্ন থেকে রাজনীতির ঘুঁটি: সিঙ্গুর কি তবে শুধুই নির্বাচনী ডিভিডেন্ডের কারখানা?
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অজিত পাওয়ার এনসিপির এক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মহারাষ্ট্রের পৌর নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবিরের সাফল্য যেখানে, দলটি প্রায় ৭৬০টি আসনে জয় পেয়েছিল এবং রাজ্য বিধানসভায় ৪১ জন এনসিপি বিধায়কের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ সংগঠনের ভিত আরও মজবুত করেছিল। এনডিএ-র সঙ্গে জোট গঠন এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রীর পদ গ্রহণের পর তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে দলের কর্মী থেকে শুরু করে দ্বিতীয় সারির নেতাদের একাংশ অজিত পাওয়ারকেই শরদ পাওয়ারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের স্বাভাবিক দাবিদার হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
রাজনৈতিক দিক থেকে এই ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। সাম্প্রতিক অতীতে এনসিপির বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সম্ভাব্য পুনর্মিলন নিয়ে একাধিকবার জল্পনা তৈরি হয়েছিল। দলীয় স্তরে বৈঠক হয়েছে, এমনকি নেপথ্যে আলোচনা চলার কথাও শোনা গিয়েছিল। যদিও এসবের মাঝেও অজিত পাওয়ারের শিবিরে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব কার্যত প্রশ্নাতীত ছিল।
অজিত পাওয়ারের মৃত্যুর পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি কার হাতে থাকবে? রাজনৈতিক মহলে একাধিক নাম ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম সুপ্রিয়া সুলে, যিনি এনসিপির সিনিয়র নেত্রী এবং শরদ পাওয়ারের কন্যা। উল্লেখযোগ্যভাবে, পৌর নির্বাচনের সময় অজিত পাওয়ার ও সুপ্রিয়া সুলেকে একসঙ্গে মঞ্চ ভাগ করতেও দেখা গিয়েছিল।
এছাড়াও পাওয়ার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরেও জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অজিত পাওয়ারের ছেলে পার্থ পাওয়ার ও জয় পাওয়ারের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে এনসিপির সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হল সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। দলাদলি রোধ করা, বিধায়কদের একজোট রাখা এবং ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে নিজেদের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখাই এখন দলের প্রধান লক্ষ্য। আগামী দিনে নেতৃত্ব সংক্রান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।
কাকা শরদ পাওয়ারের হাত ধরেই রাজনীতির পাঠ নেন অজিত পাওয়ার। সেই শিক্ষার উপর ভর করেই চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে কাঁপিয়ে বেড়ান সেই সঙ্গে নিজেকে এক প্রভাবশালী ও অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
শরদ পাওয়ারের রাজনৈতিক তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা অজিত পাওয়ার দীর্ঘদিন ধরে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি রাজ্যের অষ্টম উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন।
যদিও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ২০২২ সালে তিনি কাকার বিপরীত পথে হাঁটেন এবং এনসিপি ভেঙে দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়, তবুও ব্যক্তিগত স্তরে শরদ পাওয়ারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কখনও পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। রাজনৈতিক বিভাজনের পরও দু’জনের মধ্যে নিয়মিত সাক্ষাৎ ও সৌজন্য বজায় ছিল। সাম্প্রতিক পৌর সংস্থা নির্বাচনে পুনে পৌর কর্পোরেশনে কাকা-ভাইপোকে একই রাজনৈতিক কৌশলে কাজ করতেও দেখা গিয়েছিল।
লোকসভা থেকে বিধানসভা রাজনীতির দীর্ঘ যাত্রা
সমর্থকদের কাছে ‘দাদা’ নামে পরিচিত অজিত পাওয়ার ১৯৮০-এর দশকে শরদ পাওয়ারের হাত ধরেই সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯১ সালে তিনি বারামতী লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে প্রথম বড় নির্বাচনী সাফল্য পান। তবে কাকার জন্য জায়গা করে দিতে তিনি দ্রুতই সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরে শরদ পাওয়ার উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে পি ভি নরসিমহা রাও সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। একই বছর অজিত পাওয়ার বারামতী বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন এবং সেখান থেকেই তাঁর দীর্ঘ বিধানসভা যাত্রা শুরু হয়।
বারামতী ছিল অজিত পাওয়ারের রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটি। ১৯৯১ থেকে টানা আটবার ১৯৯৫, ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৯, ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে জয়ী হন। ২০১৯ সালে তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল ১.৬৫ লক্ষেরও বেশি ভোট, আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে ব্যবধান ছাড়িয়ে যায় এক লক্ষের গণ্ডি।
১৯৯১ সালেই প্রথমবার মন্ত্রিসভায় প্রবেশ
১৯৯১-৯২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সুধাকররাও নাইকের মন্ত্রিসভায় কৃষি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অজিত পাওয়ারের প্রশাসনিক যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৯২ সালে শরদ পাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী হলে তিনি ভূমি সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ ও পরিকল্পনা দপ্তরের দায়িত্ব পান।
১৯৯৯ সালে কংগ্রেস-এনসিপি জোট সরকার গঠিত হলে অজিত পাওয়ার সেচমন্ত্রী হন। ২০০৩ সালে সুশীলকুমার শিন্ডের মন্ত্রিসভায় তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। ২০০৪ সালে জোট সরকার ফের ক্ষমতায় এলে বিলাসরাও দেশমুখ এবং পরে অশোক চৌহানের মন্ত্রিসভায় দীর্ঘদিন জলসম্পদ দপ্তরের দায়িত্ব সামলান তিনি।
ছয়বার উপ-মুখ্যমন্ত্রী
২০১০ সালে প্রথমবার মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হন অজিত পাওয়ার। তিনি রাজ্যের অষ্টম উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং মোট ছয়বার এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পৃথ্বীরাজ চৌহান ও দেবেন্দ্র ফড়নবিশ সরকারের আমলে দু’বার করে এবং উদ্ধব ঠাকরে ও একনাথ শিন্ডের সরকারেও তিনি উপ-মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় আট বছর ধরে এই পদে থাকা অজিত পাওয়ার রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা কাঠামোর অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।
আরও পড়ুন- নিথর পাহাড়ের বুকে চূর্ণ অজিত পওয়ারের বিমান! মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রীসহ ৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু


/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us