/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/13/biplab-2025-11-13-20-39-09.jpg)
Biplab Deb: ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব।
আইন শৃঙ্খলা অবনতি, নারী সুরক্ষায় ব্যর্থতা ও সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের জন্যেই আগামী বছর তৃণমূল কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার গড়তে চলেছে রাজ্যের জনগণ, সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমনই জানিয়েছেন ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং বর্তমান লোকসভা সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব।
এবছর সেপ্টেম্বর মাসেই পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনী প্রচারের জন্যে সহ নির্বাচন প্রভারী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিপ্লব দেব। আর গত দুমাসে কলকাতা, শিলিগুড়ি, ময়নাগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় দলীয় প্রচারে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি।
অবশ্য এর আগে দিল্লি, হরিয়ানা এবং উড়িষ্যায় দলের দায়িত্ব নিয়ে গিয়েছিলেন বিপ্লব। আম আদমি পার্টি, বিজু জনতা দল ইত্যাদি দল হারিয়ে এবং ২০২৪ সালে কংগ্রেস দলের জোর প্রচারের মধ্যে সবগুলি রাজ্যেই পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতা দখল করে।
মোদি জোয়ারে প্রচার কাঁপিয়ে ২০১৫ যখন প্রথম ত্রিপুরায় 'মহাসম্পর্ক অভিযানের' দায়িত্ব নিয়ে গেছিলেন তিনি, তখনও পরিস্থিতি প্রায় একই ছিল। দুই দশকের নিরবিচ্ছিন্ন বামফ্রন্ট সরকার; বিরোধী বলতে মূলত: কংগ্রেস দল এবং পাহাড়ি অঞ্চলে কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক দল। তৃণমূল কংগ্রেস। দলের পক্ষে সাময়িকভাবে কিছু সাড়া পড়লেও কোন নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারেনি তারা; মূলত: হিন্দিভাষী অঞ্চলের দল বলে তখনও রাজ্যের মানুষের কাছে পরিচিত বিজেপি দলের রাজনৈতিক একখানা কাঠামো ও কিছু ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় পরিচিত নেতা ছাড়া ভোটের বাক্সে প্রভাব পড়ে এমন কোন উপস্থিতিই ছিল না ত্রিপুরায়।
সেই রাজ্যে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে বিধানসভায় ৬০ টি আসনের মধ্যে বামপন্থীদের হিসাব ৫১ টি আসন থেকে মাত্র ১৬ টি আসনে নামিয়ে এনেছিলেন তিনি। আজ সেই সংখ্যা দশ, কংগ্রেস দলের হাতে তিনজন বিধায়ক। বাকি ৪৩ জন বিধায়ক বিজেপি নেতৃত্বাধীন শাসক জোটের অংশ। এখন পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে বিপ্লব কুমার দেব।
IE বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি তিনি বলেছেন বাংলায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে, মানুষের সাথে কথা বলে তিনি নিশ্চিত হয়ে গেছেন, ২০২৬ এর ভোটে সরকারের চেহারা বদল হতে চলেছে। "বাংলায় বিজেপি ছাড়া লোকে কাছে কোন বিকল্প নেই। একসময় এই রাজ্যে কমিউনিষ্ট পার্টির কাছে একটি বিশাল ভোট ব্যাংক ছিল; এখন সেটি সম্পূর্ণভাবে মমতা ব্যানার্জির কাছে চলে গেছে। সেটি ফেরত যাবে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আজ বাস্তবে কি পরিস্থিতি রয়েছে? আরজিকর হাসপাতালের ঘটনার পর ২৪ পরগনায় যে মধ্যবিত্ত অংশের মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্যবাদ এসবের জন্যে ভাবেন, তাঁদের মধ্যে এই ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একটি উপলব্ধি এসেছে কলকাতা শহরে তাঁদের কন্যারা নিরাপদ নেই আর,"জানিয়েছেন বিপ্লব।
আরও পড়ুন-Kolkata Metro: এখন থেকে মোবাইলেই টিকিট! কলকাতা মেট্রোর নতুন ডিজিটাল উদ্যোগ রবিবারে শুরু
তিনি বলেছেন, কলকাতার নারীরা সারা দেশে সর্বাধিক প্রগতিশীল। সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র শিল্প বাংলায় সফলভাবে চালু করা হয়েছিল; সমাজকে এই শিল্পে প্রগতির পথে দেখিয়েছিল বাংলা। বিপ্লব দেবের বক্তব্য, কংগ্রেস, কমিউনিষ্টদের ব্যর্থতার কারণে ইন্ডাস্ট্রি কলকাতা থেকে বম্বে, হালের মুম্বাইতে চলে গেছিল। তাই যদিও একসময় সংস্কৃতি মানেই মানুষের কাছে বাংলা ছিল, রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মঘটের রাজনীতির জন্যে চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন শিল্প বাংলায় ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন বিপ্লব।
সেই বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় নারীদের সুরক্ষা দিতে পারছেন না, উল্টো সন্ধ্যে সাতটার পর বাড়ি থেকে বেরোতে মানা করছেন - এটি রাজ্য সরকারের মানসিকতা ও যোগ্যতার ওপর বিরাট ব্যর্থতার প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
"সন্ধ্যা সাতটার পর যদি তিনি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) নিজে বাড়ি থেকে না বেরোতে পারতেন, তিনি কখনও মুখ্যমন্ত্রী হতেন?" প্রশ্ন করেছেন বিপ্লব। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে কটাক্ষ করে তিনি আরও বলেন, "হতে পারে কদিন পর তিনি বলবেন, দিনের বেলা বোরখা পড়ে চলতে হবে"।
তৃণমূল কংগ্রেস এবং তার পরিচালিত রাজ্য সরকারের ওপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বিপ্লব বলেছেন, গায়ের জোর দেখিয়ে সরকার চালাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু জনসমর্থন আর তাদের সাথে নেই এবং তাই আগামী নির্বাচনে সরকার বদলাতে চলেছে মানুষ, বক্তব্য বিপ্লবের।
"তৈমুর খাঁ, সম্রাট বাবর, আওরঙ্গজেব ভারতের সংস্কৃতি বদলাতে পারেনি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিভাবে পারবেন? বাবর রামমন্দির ভেঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরি করেছিল, আজ রামমন্দির ফের নিজস্থানে অবস্থিত। যারা ভারতের সংস্কৃতি বদলাতে আসে, তারাই বদলে যায়। আর যারা বদলাতে চায় না, ভারত তাদের বদলে দেয়," তিনি বলেন।
সম্প্রতি জলপাইগুড়িতে বিজেপি বিধায়ক খগেন মুর্মু, শংকর ঘোষের মতো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা হিংসাত্মক আক্রমণের মুখে পড়েছেন, বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা কর্মীরা এক অপরের দিকে অভিযোগ করেছেন।
এ'প্রসঙ্গে বিপ্লব দেব বলেছেন, বাংলায় মানুষের কাছে বিজেপি কর্মীদের যাবার আগেই দলীয় কর্মীদের কাছে আসছেন সাধারণ মানুষ।হিংসা, সাধারণ আইন শৃংখলার অবনতি এবং "বাংলার নারীরা প্রচণ্ড অসুরক্ষিত বোধ করছেন। বাংলার চরিত্র নষ্ট করে দিচ্ছে এরা। মারামারি, রাজনৈতিক আক্রমণ এসবের বাংলার সাথে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বাংলা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁদের বাংলাকে তুলনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মূর্তি ভাঙচুর, সাংসদ পেটানো এসব দিয়ে বাংলাকে পরিচিত করাবার সমুচিত জবাব ভোটের বাক্সে দেবে মানুষ," বলেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। ভস্মাসুরের সাথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর তুলনা করে তিনি বলেন, নিজের মাথাতেই হাত দিয়ে ফেলেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।
বাংলায় বিভিন্ন জায়গায় দলীয় প্রচার এবং কর্মসূচিতে গিয়ে মানুষের কাছে প্রভূত সমর্থন পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিপ্লব। আজ শিলিগুড়িতে একটি সাংগঠনিক সভায় যোগ দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিআইএম দল থেকে সরে আসা ২৫৪ জন মানুষকে বিজেপি দলে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। গতকালই আলিপুরদুয়ার অঞ্চলে ১০৪ পরিবার তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সরে তার হাত ধরে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দিয়েছেন।
আলিপুরদুয়ার বিধানসভা ক্ষেত্রে অনুষ্ঠিত এক যোগদান সভায় বিপ্লব জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস এবং দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতা থেকে সরালেও তার শাসনকালে বামপন্থীদের রাজনৈতিক মডেলের ফটোকপি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা এবং সংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিকে আঙ্গুল তুলে তিনি আরো বলেন বামপন্থীদের হিংসাত্মক রাজনৈতিক মডেলের সাথে মুখ্যমন্ত্রীর ভ্রাতুষ্পুত্র সংযোজনই মূলত: তৃণমূল কংগ্রেস দলের রাজনৈতিক চরিত্র। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পরিবার তন্ত্রের অভিযোগে এনে বিপ্লব বলেন নির্বাচিত হলে বিজেপি পরিচালিত সরকার রাজ্যের প্রতিটি বেকার ছেলে মেয়ের জন্য রোজগার দেবার ব্যবস্থা করবে।
পশ্চিমবঙ্গের দেড় কোটি ছেলে-মেয়ে রোজগারের খোঁজে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এই মন্তব্য করে বিপ্লব দেব বলেন একটি সময় পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন রাজ্য থেকে উপার্জনের খোঁজে লোকে আসতো। রাজ্যে উন্নয়নের অধ:পতনের অবস্থা এমনই যে বাংলার ছেলে মেয়েরা এখন নিজ রাজ্যে আত্মনির্ভর হবার বদলে অপর রাজ্যে কাজের খোঁজে যেতে বাধ্য হচ্ছে, বলেন তিনি।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন পরিচালিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন এর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তার দিকে শ্লেষাত্মক আক্রমণ করে বিপ্লব বলেন দুর্নীতি পরিবর্তন ধর্ষণ ও অন্যান্য নারীঘটিত অপরাধ ইত্যাদি ধামা চাপা দিতেই এসআইআর এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের মানুষ তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের রাস্তায় ধরে তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি করবে এবং ভোটে বিদায় দিয়ে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us