বড় খবর

জগদ্ধাত্রীর শোভাযাত্রায় না! চরম আর্থিক সংকটে চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা

চন্দননগরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরতে পরতে মিশে রয়েছে এই আলোকসজ্জার ঔজ্জ্বল্য। কিন্তু করোনা আবহে এবার সেই ঐতিহ্যের পরম্পরায় ছেদ।

চন্দননগরের আলোকসজ্জা। নিজস্ব চিত্র

জগদ্ধাত্রী মানেই চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা। আর আলোকসজ্জা মানেই চন্দননগর। ফি বছর জগদ্ধাত্রী পুজো’র আলোকসজ্জা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে প্রাণের শহর, আলোর শহর চন্দননগরে। সারারাত ধরেই চলে আলোকসজ্জার নানান বৈচিত্র্যময় প্রদর্শন। তা চাক্ষুষ করতে কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় জমান শহরে। করোনা আবহে গতবছর থেকেই সেই শোভাযাত্রা বন্ধ। আশা ছিল এবছর করোনা মহামারীকে অতিক্রম করে আবার সেই চেনা ছবিতেই দেখা যাবে আলোর শহর চন্দননগরকে। কিন্তু দুর্গাপুজো পরবর্তী বাড়তে থাকা করোনা গ্রাফ তাতে বাদ সাধল।

গত বছরের মতো এবারের জগদ্ধাত্রী পুজোতেও থাকছে করোনা বিধিনিষেধ। হবে না শোভাযাত্রাও। চন্দননগরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরতে পরতে মিশে রয়েছে এই আলোকসজ্জার ঔজ্জ্বল্য। কিন্তু করোনা আবহে এবার সেই ঐতিহ্যের পরম্পরায় ছেদ। পুজো হলেও হচ্ছে না শোভাযাত্রা আর যার ফলস্বরূপ শোভাযাত্রার আলোকসজ্জা উপভোগের আনন্দ এবারের মতো অধরাই থেকে যাবে মানুষের। শুধু তাই নয়, এর ফলে বিপুল ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে আলোকশিল্পীদের। করোনা আবহে এমনিতেই উপার্জন তলানিতে তার উপর শোভাযাত্রায় বারণ, হতাশ চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা। 

এপ্রসঙ্গে চন্দননগর কেন্দ্রীয় জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভজিৎ সাউ জানাচ্ছেন, “চন্দননগরবাসী হিসেবে প্রত্যেকের মন খারাপ। রাস্তায় পুজোর ৪ দিন থাকছে পথ আলোকসজ্জার বিপুল আয়োজন। কার্যত এবছর শহরের রাস্তা মুড়ে ফেলা হবে আলোকসজ্জায়। তার মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হবে সেরা পাঁচ আলোকসজ্জা, সম্মানিত করা হবে প্রথম পাঁচ আলোকশিল্পীদের। করোনা কালে শোভাযাত্রা বন্ধের কারণে যে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আলোকশিল্পীদের। এর মধ্য দিয়ে সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে”। মূলত শোভাযাত্রার ওপর ভিত্তি করে সারাবছরের জন্য সেই সমস্ত আলোক শিল্পীদের চাহিদা তৈরি হয়। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়া বা টেলিভিশনের পর্দায় আলোকসজ্জা দেখেও বুকিং করা হয় ওই শিল্পীদের। গতবছরের মতো এবারের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আলোকশিল্পীরা। মন খারাপ তাই আলোকশিল্পীদের।

আলোর শহর চন্দননগরের শিল্পের খ্যাতি জগৎজোড়া। কিন্তু সেই খ্যাতির মধ্যেও একটা না পাওয়ার যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খেত শিল্পীদের। আলোর মধ্যেও ছিল অন্ধকারের হাতছানি। করোনা আবহে সেই অন্ধকার যেন আরও গাঢ়। শিল্পীদের দাবি, আগের মতো আর কাজ নেই। কাজের অভাবে দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে বেছে নিতে হচ্ছে অন্য পেশা। আলোর জন্য বিখ্যাত চন্দননগর। জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় চন্দননগরের আলোকসজ্জার সারা দেশ-বিদেশে সুখ্যাতি রয়েছে। কলকাতার ও অন্যান্য অনেক জায়গার দুর্গাপুজোয় তাঁদের আলোকসজ্জা সকলের মন কাড়ে। এই প্রথা অনেক দিন ধরে চলছে। এদের মধ্যে কয়েক জন আলোকশিল্পী রাজ্যের বাইরেও সুপরিচিত এই কাজের জন্য। কলকাতার নামী মণ্ডপ তো বটেই, রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে চন্দননগরের আলো পাড়ি দেয় বিদেশেও। পুজোর আগে সেজন্য দম ফেলার ফুরসত থাকে না শিল্পীদের। কিন্তু গতবারের মতো এবারেও সেই চূড়ান্ত ব্যস্ততা ধড়া পড়েনি। অনেকেই বাধ্য হয়েছেন অন্য পেশাকে বেছে নিতে। শোভাযাত্রার মাধ্যমেই সারাবছরের বরাত মেলে আলোকশিল্পীদের। গত বছরের মতো এবারেও সেই শোভাযাত্রায় বারণ থাকায় হতাশা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আলোকশিল্পীদের।

আরও পড়ুন বাড়তে থাকা করোনা গ্রাফ, একরাশ উদ্বেগ মাথায় নিয়েই এবারের চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো

একই সুর ধরা পড়ল প্রখ্যাত আলোকশিল্পী বাবু পালের কথায়। ইতিমধ্যেই এবারের দুর্গাপুজোয় কলকাতার ‘বুর্জ খলিফা’র আলোকসজ্জায় তাক লাগিয়েছেন আলোকশিল্পী বাবু পাল। কাতারে কাতারে মানুষ উপভোগ করেছেন তাঁর আলোর চমকপ্রদ নিদর্শন। নিজের শহর চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো ঘিরে তাঁর ব্যস্ততা থাকে সপ্তমে। তিনি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলাকে একান্ত এক সাক্ষাৎকারে জানান, “আশা ছিল এবারের শোভাযাত্রা হবে, আবারও মানুষ উপভোগ করবেন চন্দননগরের ঐতিহাসিক আলোকসজ্জা। কিন্তু এবারও করোনা সব প্ল্যানিংকে নষ্ট করে দিল করোনা ভাইরাস”।

চন্দননগরবাসী হিসাবে মন খারাপ শিল্পী বাবু পালের। তাঁর কথায়, ‘পুজোর এই চারদিনের ব্যবসার আশায় মুখিয়ে থাকেন ছোট থেকে বড় সকল আলোকশিল্পীরা। শোভাযাত্রা না হওয়ায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সকল শিল্পীরাই। এছাড়াও কর্মী সংকটের দিকটিও তুলে ধরেন বাবু পাল। তিনি বলেন, “দীর্ঘ লকডাউনের ফলে আলোকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মীই সবজি বিক্রি, ফল বিক্রি বা মাছ বিক্রির মতো পেশাকে বেছে নিয়েছেন। তাঁরা এখন আর পুরনো শিল্পে ফিরতে চাইছেন না। এরকম চলতে থাকলে কর্মী-সংকটের কারণে একসময় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে জগদ্বিখ্যাত চন্দননগরের আলোকশিল্প।”

প্রসঙ্গত এবারের প্রাণের জগদ্ধাত্রী পুজোর ষষ্ঠী ১০ নভেম্বর, বুধবার। দশমী ১৪ নভেম্বর, রবিবার। ১৪ এবং ১৫ নভেম্বর ১৮টি ঘাটে মোট ১৭১ টি প্রতিমা নিরঞ্জন করা হবে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এবারের জগদ্ধাত্রী পুজোর নির্ঘন্ট-

এই বছরের জগদ্ধাত্রী পুজোর তারিখ ও সময়

সপ্তমী- ১১ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার

অষ্টমী- ১২ নভেম্বর, শুক্রবার

নবমী-১৩ নভেম্বর,শনিবার

দশমী- ১৪ নভেম্বর, রবিবার

উল্লেখ্য, প্রায় আড়াইশো বছর আগে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো দেখে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্রনারায়ণ চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টির নিচুপাটিতে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন। লক্ষ্মীগঞ্জ প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরেই এই পুজোর সূচনা। এই পুজো চন্দননগরে আদি পূজা নামে পরিচিত। এরপর থেকেই জগদ্ধাত্রী পুজোর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশ থেকে দেশান্তরে। দুর-দূরান্ত থেকে কাতারে কাতারে মানুষ পুজো উপলক্ষে ভিড় জমান আলোর শহর চন্দননগরে।  

 ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা এখন টেলিগ্রামে, পড়তে থাকুন

Get the latest Bengali news and Westbengal news here. You can also read all the Westbengal news by following us on Twitter, Facebook and Telegram.

Web Title: Chandannagore jagatdhatri procession stopped due to covid 19 light artists are in deep financial crisis

Next Story
করোনা নিয়ন্ত্রণে বড়সড় পদক্ষেপ, বাড়ি-বাড়ি ঘুরে টিকা দেবে রাজ্যWest Bengal govt decides to gives corona vaccine at home
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com