বড় খবর

কীভাবে রোখা যাবে সাইবার অপরাধ? কী বলছে আইন? কী করছে পুলিশ?

“এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে হলে পুলিশ-প্রশাসনেরও প্রশিক্ষণ দরকার। এটা তো খুন-ডাকাতির ঘটনা নয়, ফলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দরকার। নিম্ন আদালতের বিচারকদেরও এ নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরী। আইনি পঠনপাঠনে এই দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।”

cyber crime, সাইবার অপরাধ
সাইবার অপরাধ সর্বতোভাবে রোখার জন্য আইন সবরকম ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রতীকী ছবি

লাখ-লাখ টাকা হাপিস! কলকাতার হাজার হাজার এটিএমের সুরক্ষা এই মুহূর্তে বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। এটিএমে টাকা তুলতে গিয়ে কার্ড সোয়াইপ করার আগে গ্রাহক ভাবছেন, ‘স্কিমার লাগানো নেই তো?’ এই বাজারে ভাগ বসিয়েছে সিম সোয়াপ ফ্রড’, যে পদ্ধতিতে আপনার সিম কার্ড প্রথমে ডি-অ্যাক্টিভেট করে আবার অ্যাক্টিভেট করে আপনার সব তথ্য ছিনিয়ে নেবে প্রতারকরা। মোদ্দা কথা, যত দিন যাচ্ছে, প্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন আম আদমি। শুধু এটিএম জালিয়াতি বা ব্যাঙ্ক প্রতারণা তো নয়, নেট দুনিয়ায় ওত পেতে আছে হাজারো অপরাধ। একেকটা অপরাধের চরিত্র একেক রকমের। যা বোঝা সাধারণের সাধ্যের বাইরে।

সাইবার অপরাধের উৎসস্থল একটা নয়। ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের যুগে আপনার ছবি বিকৃত করাই হোক বা ভুয়ো খবর ছড়ানোই হোক, দিন দিন বাড়ছে সাইবার অপরাধের সংখ্যা। কিন্তু মুক্তির উপায় কী? সাইবার অপরাধকে ঠেকাতে আইন কী ভূমিকা নিচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী কৌশিক চট্টোপাধ্যায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলাকে বললেন, “ক্রমবর্ধমান সাইবার ক্রাইমকে ঠেকাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে আইন অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির কিছু ধারা, যেমন প্রতারণা, জালিয়াতির সঙ্গে সাইবার অপরাধকে যুক্ত করা হয়েছে। কম্পিউটার বা বৈদ্যুতিক পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে যখন এ দেশে অপরাধ শুরু হল, তা রোখার জন্য ২০০০ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন করা হয়। এবং ২০০৮ সালে আইটি ‌অ্যাক্টের খোলনলচে বদলে সংশোধন করা হয়।”

atm, এটিএম
কলকাতায় কানাড়া ব্যাঙ্কের এই এটিএমে স্কিমার লাগিয়ে টাকা তোলা হয়েছিল। ফাইল ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

সাইবার অপরাধ ঠেকাতে আইনে কী বলা রয়েছে? কৌশিকবাবু জানালেন, “২০০৮ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সংশোধনীতে ১১নং পরিচ্ছেদে বলা রয়েছে, অপরাধ কী কী ভাবে হতে পারে। কেউ যদি কোনও কোড লঙ্ঘন করে তথ্য হ্যাক করে, সেক্ষেত্রে দোষ প্রমাণ হলে তিন বছর পর্যন্ত সাজার পাশাপাশি ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ওই পরিচ্ছেদে আরও বলা রয়েছে, কম্পিউটার সিস্টেমের মাধ্যমে কারো অশ্লীল ছবি বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত যা জনসমক্ষে আনলে সে ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটবে বা গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হবে, দোষ প্রমাণ হলে ৬৬ এ এবং ৬৭ এ ধারায় পাঁচ বছর পর্যন্ত সাজার পাশাপাশি ৫-১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

“ই-মেল মারফৎ কারও সম্পর্কে ভুল তথ্য জনসমক্ষে আনলেও দোষ প্রমাণ হলে একই সাজা হতে পারে। এসএমএস বা ই-মেলের মাধ্যমে কারো সম্পর্কে যদি কুরুচিকর মন্তব্য করা হয় বা কম্পিউটার সিস্টেমের কোডকে ডিকোড করে যদি দেখা যায় কারো ক্ষতি হচ্ছে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা যোগ করে দোষ প্রমাণ হলে সাত বছর সাজা হতে পারে। হ্যাক করার ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে। ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে কারও অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি অনুমতি ছাড়াই যদি কেউ শেয়ার করে, তবে ৬৭ এ ধারা অনুযায়ী দোষীর পাঁচ বছর সাজা হতে পারে।”

সাইবার অপরাধ সর্বতোভাবে রোখার জন্য আইন সবরকম ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান কৌশিকবাবু। তাঁর কথায়, “এমন অপরাধের ক্ষেত্রে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কাছে অভিযোগ জানাতে হবে, তিনি যদি কোনভাবে গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা রয়েছে আইনে।” জানা জরুরি, সাইবার অপরাধে অভিযোগকারিকেই মামলা করতে হবে, এক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করা যায় না।

আরও পড়ুন, কীভাবে এড়াবেন এটিএম প্রতারণা? উত্তর দিলেন বিশেষজ্ঞরা

আইন তো আছে, তবু অপরাধে লাগাম টানা যাচ্ছে না কেন? উত্তরে কৌশিকবাবু বলেন, “আইন শুধু বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকলে চলবে না, তা ফলপ্রসূ করতে হবে। সবার আগে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। আইনে কী বলা রয়েছে সে সম্পর্কে সবাইকে না জানালে তার বাস্তবতা থাকবে না। প্রয়োজনে আইন নিয়ে জানাতে সেমিনার করতে হবে। কোন কোন অপরাধে কী কী আইন রয়েছে তা জনগণকে জানাতে হবে।”

এ প্রসঙ্গে কৌশিকবাবু আরও বলেন, “চুরি-ডাকাতি, খুনের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিতে মামলা রুজু হয়, সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে তেমন ভাবে হয় না। সাইবার অপরাধের অভিযোগ জানানোর পদ্ধতিরও সরলীকরণ প্রয়োজন। কলকাতা পুলিশের আওতায় কোন অভিযোগ এলে তা লালবাজারে গিয়ে জানাতে হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের আওতায় এমন অভিযোগ থাকলে ভবানী ভবনে সিআইডি-র দফতরে আসতে হবে। ফলে জেলায় এমন অভিযোগ পেলে, অনেকেই দূরত্বের জন্য ভবানী ভবনে আসতে পারেন না।”

atm, এটিএম
দিল্লির সিলমপুরে এটিএম থেকে দুটো পাসওয়ার্ড হ্যাক করে ২৬ লক্ষ টাকা হাতায় দুই দুষ্কৃতী। ফাইল ছবি

সাইবার অপরাধ ঠেকাতে মানুষকে সচেতন করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ও। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ অত্যন্ত বুদ্ধি খাটিয়ে করা হয়। সাধারণের পক্ষে জানা খুব শক্ত যে এটিএমে কোনো যন্ত্র লাগানো রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে হলে পুলিশ-প্রশাসনেরও প্রশিক্ষণ দরকার। এটা তো খুন-ডাকাতির ঘটনা নয়, ফলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দরকার। নিম্ন আদালতের বিচারকদেরও প্রশিক্ষিত হওয়া জরুরী। আইনি পঠনপাঠনে এই দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে সাইবার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ানো হোক।”

সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন সাইবার বিশেষজ্ঞ সন্দীপ সেনগুপ্তও। তিনি বলেন, “অনেকসময় এমন ধরনের অপরাধ হয় যেটা পুলিশই বুঝল না, কিংবা পুলিশ বুঝল তো আইনজীবী বুঝলেন না। ফলে সমাজের সব স্তরে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।” আগামী দিনে সাইবার অপরাধ রুখতে আইন আরও কড়া হওয়া প্রয়োজন বলেও মত সন্দীপবাবুর।

সাইবার অপরাধ ঠেকাতে পুলিশ কী ভূমিকা নিচ্ছে? কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান প্রবীণ ত্রিপাঠী বলেন, “জনসাধারণকে সচেতন করা হচ্ছে, গাইডলাইন্স দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের হেল্পলাইন নম্বর রয়েছে, ই-মেল রয়েছে, যেখানে অভিযোগ জানানো যায়। অভিযোগ পেলেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি। কলকাতায় সাইবার পুলিশ স্টেশন রয়েছে, যেখানে কলকাতার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অভিযোগও আমরা দেখি। এছাড়া আমাদের দুটি ডিভিশন, এসএসডি এবং পোর্টে সাইবার সেল রয়েছে।” সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশ-প্রশাসন আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে বলে মানছেন কৌশিকবাবুও। তাঁর মতে, “১০ বছর আগে যে পরিস্থিতি ছিল, তার নিরিখে আজকের পুলিশি ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। তবে আরও উন্নতি করতে হবে।”

আরও পড়ুন, Sim Swap Fraud: ব্যাঙ্ক প্রতারণা ঠেকাতে এবার ‘সিম সোয়াপ’ থেকে সাবধান!

কী কী ধরনের সাইবার অপরাধ হয়? জবাবে সংক্ষিপ্ত তালিকা দিলেন ওই আইনজীবী।

১. মোবাইলে মেসেজে কারও সম্পর্কে অশালিন বা কুরুচিকর মন্তব্য

২. ই-মেলে কারও সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য

৩. ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে কুরুচিকর ছবি বা মেসেজ পাঠানো

৪. কারো ছবি সুপার-ইমপোজ করে ছড়ানো

৫. কম্পিউটার সিস্টেমের আইপি কোড চুরি বা হ্যাক করা

৬ এটিএমের পিন নম্বর জেনে প্রতারণা

৭. ব্যক্তিগত বা আপত্তিজনক ছবি না জানিয়ে প্রকাশ্যে আনা

৮. সরকারি তথ্য বিক্রি করার চেষ্টা করা

৯. গুজব ছড়ানো, সরকার বা সরকারি পদাধিকারীর বিরুদ্ধে যদি গুজব ছড়ানো

Web Title: How to prevent cyber crime

Next Story
ভারতীয় পরিবারকে হেনস্থার অভিযোগ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিরুদ্ধেairline
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com