/indian-express-bangla/media/media_files/2025/11/19/sheikh-hasina-news-2025-11-19-10-35-50.jpg)
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, দ্রুত ফেরানোর আর্জি বাংলাদেশের
Bangladesh Demands Sheikh Hasina: বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পর ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে ভারতের কাছে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্রদের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে হাসিনা দিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। আদালত এই রায় ঘোষণার পর ঢাকার তরফে ভারতের কাছে হাসিনাকে অবিলম্বে হস্তান্তরের আহ্বান জানানো হয়। তবে ভারতের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রত্যর্পণের এই দাবি মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
কী অভিযোগ হাসিনার বিরুদ্ধে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী পাঁচটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে। অভিযোগ, তিনি প্ররোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমন করতে হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। আদালত তাঁর বিরুদ্ধে ৬ জন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে। এ কারণে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম মন্তব্য করেন, অভ্যুত্থান-পর্বে সংঘটিত “সব অপরাধের 'মাস্টারমাইন্ড' ছিলেন” শেখ হাসিনা।
হাসিনা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি এবং তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন এবং যথা সম্ভব ক্ষতি কমাতে চেয়েছিলেন। তাঁর দাবি, আদালতের এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট। আওয়ামী লীগ রায়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে শাটডাউনের ডাক দিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতের “অবশ্যই” হাসিনাকে হস্তান্তর করা উচিত, এবং তাঁকে আশ্রয় দেওয়া “অবন্ধুসুলভ” আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরও পড়ুন-Nadia News: দিল্লি বিস্ফোরণে নাম জুড়েছে নদিয়ার, জঙ্গি যোগের নতুন সূত্রে তোলপাড়!
ভারতের প্রতিক্রিয়া
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা রায়ের বিষয়টি “নজরে রেখেছে” এবং বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যোগাযোগ রাখবে। তবে হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারত স্পষ্ট মন্তব্য করেনি। ভারত বলেছে, তারা “বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে” প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভারত কি ফিরিয়ে দিতে পারে হাসিনাকে? চুক্তি কী বলছে
২০১৩ সালে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০১৬ সালে সংশোধন করা হয়। যদিও চুক্তি অনুযায়ী দু’দেশ অপরাধীদের হস্তান্তর করতে পারে, তবুও এখানে ‘ডুয়াল ক্রিমিনালিটি’ বা উভয় দেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার নীতি কার্যকর। হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো এই নীতি পূরণ করলেও চুক্তিতে ভারতের জন্য একাধিক ব্যতিক্রমী সুযোগ রয়েছে।
চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি প্রত্যর্পণকে “অন্যায় বা অত্যাচারমূলক” বলে মনে হয়, তবে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যেতেই পারে। পাশাপাশি ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অপরাধে প্রত্যর্পণ নাকচ করা যেতে পারে। যদিও খুন, সন্ত্রাস বা আন্তর্জাতিক অপরাধগুলিকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে ধরা যাবে না— ফলে এই ধারায় ভারতের সুবিধা সীমিত। এছাড়া ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ভারত চাইলে নিজ দেশে বিচার পরিচালনার যুক্তিতে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
আরও পড়ুন-TMC: বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিনেই কলকাতায় মেগা ইভেন্ট! 'সংহতি দিবস' পালন করবে তৃণমূল
আইন কী বলে
ভারতের এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট, ১৯৬২–ও সরকারকে উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতা দিয়েছে। আইনের ২৯ নম্বর ধারায় বলা আছে, যদি প্রত্যর্পণকে তুচ্ছ, অন্যায়, বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়, কিংবা ন্যায়বিচারের স্বার্থে ক্ষতিকর বলে মনে হয় তবে ভারত প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এছাড়াও ভারত সরকার যে কোনও সময় প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। সব মিলিয়ে আইনি কাঠামো ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, দিল্লি যে হাসিনাকে ঢাকায় ফেরত পাঠাবে— তার সম্ভাবনা খুবই কম বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
ভারত যদি হাসিনাকে ফেরত না পাঠায়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আরও বাড়বে। বাংলাদেশ ভারতের সিদ্ধান্তকে “অবন্ধুসুলভ” আখ্যা দেবে, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সহযোগিতা কমে যাবে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন সরকার আরও ভারতবিরোধী অবস্থান নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হবে। ৪,০৯৬ কিমি দীর্ঘ সীমান্তে চোরাচালান, অনুপ্রবেশ ও হিংসা বেড়ে যেতে পারে। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে অনুপ্রবেশ বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বছরে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্থ হলে বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হতে পারে, এবং ভারতও কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়বে। চতুর্থত, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ও চিনের সান্নিধ্যে এসেছে। যাকে কাজে লাগিয়ে ভারতকে কোনঠাসা করার চেষ্টা করতে পারে বাংলাদেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মানবাধিকার ইস্যুতে ভারতকে চাপ দিতে পারে, যদিও ভারত সম্ভবত বিচার প্রক্রিয়াকে প্রতিশোধমূলক রাজনীতি হিসেবে দেখবে। সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন এক জটিল অধ্যায় তৈরি করেছে, যার বহুমাত্রিক প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us