/indian-express-bangla/media/media_files/2025/03/05/LsKQrcvzIUe62gX5k5l7.jpg)
Mamata Banerjee: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
দেশের বিচারবিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এই প্রথম কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজে সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে সওয়াল করলেন। বুধবার রাজ্যের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা ‘স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন’ (SIR)-কে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলায় প্রধান বিচারপতির এজলাসে নিজের বক্তব্য পেশ করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, সংশোধনের নামে আসলে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে এবং নির্বাচন কমিশন কার্যত ‘হোয়াটসঅ্যাপ কমিশনে’ পরিণত হয়েছে।
‘বিচার যখন দরজার আড়ালে কাঁদছে...’
এদিন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল পঞ্চোলির বেঞ্চে শুনানি চলাকালীন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মমতা। মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে প্রবীণ আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান আইনি যুক্তি পেশ করলেও, মমতা নিজে আদালতের কাছে কিছু বলার অনুমতি চান। তিনি বলেন, “সমস্যা হলো, আমাদের আইনজীবীরা লড়ছেন, আমরা শুরু থেকেই লড়ছি। কিন্তু সব শেষ হওয়ার পরও যখন আমরা বিচার পাচ্ছি না, যখন বিচার দরজার আড়ালে কাঁদছে, তখন বাধ্য হয়েই আমাকে আসতে হলো। আমি সাধারণ পরিবারের মেয়ে, আমি আমার দলের জন্য লড়ছি না, লড়ছি সাধারণ মানুষের জন্য।”
আরও পড়ুন- West Bengal News Live: 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেলে পাঠান', মোদী মন্ত্রীর মন্তব্যে তোলপাড়
মহিলা ও সাধারণ মানুষকে হেনস্থার অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াটি অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য নয়, বরং নাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে (Deletion, not inclusion)। তিনি আদালতে জানান, মহিলারা বিয়ের পর পদবী পরিবর্তন করে শ্বশুরবাড়ি গেলে ‘তথ্য অমিল’-এর অজুহাতে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “২৪ বছর পর হঠাৎ কী এমন তাড়া পড়ল যে দু’মাসের মধ্যে এই কাজ শেষ করতে হবে? উৎসবের মরসুম এবং ধান কাটার সময়ে সাধারণ মানুষকে নোটিস পাঠিয়ে হেনস্থা করা হচ্ছে। ১০০-র বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন, বিএলও-রা (BLO) মারা যাচ্ছেন।”
‘বিজেপির মাইক্রো-অবজারভার’ ও কমিশনের ভূমিকা
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোপ দেগে মমতা বলেন, “ওরা বাংলাকে টার্গেট করছে। অসম বা উত্তর-পূর্ব ভারতে কেন এটা হচ্ছে না? বিএলও-দের ক্ষমতা খর্ব করে ৮০০০ ‘মাইক্রো-অবজারভার’ নিয়োগ করা হয়েছে, যারা আসলে বিজেপির লোক। ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করা হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, কমিশন এখন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছে।
বিরোধীদের তোপ
এদিকে সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সওয়ালকে তীব্র কটাক্ষ করেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেন, "দিল্লিতে ড্রামা করলেন মমতা ব্যানার্জি। প্রথমে বঙ্গভবনের সামনে ড্রামা করলেন তারপর তার নাটক চলল নির্বাচন কমিশনে ও একেবারে শেষে সুপ্রিম কোর্টে। মমতা ব্যানার্জি সুপ্রিম কোর্টের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নির্বাচন কমিশনকে হোয়াটসঅ্যাপ কমিশন বলে দিলেন। বিচারপতির অনুমতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে রাজনৈতিক ভাষণ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে বলেছিল আপনার আইনজীবী অত্যন্ত দক্ষ আমরা তাঁদের কথাই শুনবো। এর থেকে খারাপ শব্দে সুপ্রিম কোর্ট একজন মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে পারেন না যে আপনি চুপ থাকুন, আপনার কথা আমরা শুনতে চাইছি না।"
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনায় সরব হয়েছে কংগ্রেসও। কংগ্রেস নেতা সৌম্য আইচ বলেন, "এটা রাজনৈতিক অসদতা। আরজি কর মামলার সময় তো আপনাকে দেখা যায়নি সওয়াল করতে। নির্বাচন কমিশন রাজ্যের পাঠানো আইএএস ও আইপিএস-এর তালিকা বাতিল করে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন অন্য তালিকা পাঠিয়েছিল। সেই তালিকাই মানতে হবে।"
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ
মুখ্যমন্ত্রীর আবেগঘন সওয়ালের মাঝেই প্রধান বিচারপতি জানান, আদালত ইতিমধ্যেই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা তথ্যের গরমিল নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী পালটা যুক্তি দেন যে, রাজ্য সরকার ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজের জন্য পর্যাপ্ত ‘গ্রুপ-বি’ অফিসার দিচ্ছে না বলেই কমিশনকে মাইক্রো-অবজারভার নিয়োগ করতে হয়েছে।
আরও পড়ুন-Humayun Kabir: মাটিতে পা পড়বে না নেতার! ভোটের প্রচারে শুধুই হেলিকপ্টারে উড়বেন হুমায়ুন কবীর
উভয় পক্ষের সওয়াল শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নোটিস জারি করেছে এবং আগামী সোমবারের মধ্যে জবাব চেয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, ১. রাজ্য সরকার যদি পর্যাপ্ত অফিসার দিতে পারে, তবে মাইক্রো-অবজারভারদের সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। ২. বানানের সামান্য ভুলের জন্য যেন ভোটারদের শুনানির নোটিস না পাঠানো হয়, সে বিষয়ে কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে। ৩. প্রধান বিচারপতি মৌখিকভাবে বলেন, “অফিসারদের সংবেদনশীল হতে বলুন।”
অন্যদিকে সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা অভিযোগ করেন, রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
মমতার মূল দাবি
মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মূলত ২০২৫-এর ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই আগামী ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন করার আর্জি জানিয়েছেন। এছাড়াও আধার কার্ডকে প্রমাণ হিসেবে মান্যতা দেওয়া এবং ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র অজুহাতে নাম বাদ দেওয়া বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী সোমবার।


/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us