একদিকে আধুনিকতম প্রযুক্তি, অন্যদিকে নাগা সাধু, জমে উঠেছে সাগর মেলা

এক লাফে এবছর রাজ্য সরকার অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে সাগর মেলার বাজেট। কুম্ভের মত পরিষেবা দিতে বিভিন্ন খাতে বাড়ানো হয়েছে অর্থ বরাদ্দ।

By: Firoz Ahamed Kolkata  Updated: Jan 14, 2019, 10:23:56 AM

হাড় হিম করা ঠাণ্ডাকে তুড়িতে উড়িয়ে জমে উঠেছে সাগর মেলা। সাধু, সন্ন্যাসী, পুণ্যার্থীদের ভিড়ে জমজমাট মন্দির চত্বর। পুণ্যস্নানের আশায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় জমেছে সাগরে। মকর সংক্রান্তির পুণ্যস্নান আজ ও কাল, ১৫ জানুয়ারি। কিন্তু ভিড় এড়াতে গতকাল থেকেই প্রায় তিন লক্ষ মানুষ স্নান সেরে ফিরে গিয়েছেন।

আকাশে চক্কর কাটছে ড্রোন, কপ্টার। মুড়িগঙ্গা নদীর নাব্যতা মাপা চলছে (এসিডিএল) যন্ত্রের মাধ্যমে। পর্যাপ্ত জলস্তর বাড়লে তবেই ছাড়া হচ্ছে
ভেসেল। বাবুঘাট থেকে সাগরস্নান ঘাট পর্যন্ত ৮০০ টি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো। মেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ওয়াকিটকির মাধ্যমে প্রশাসনিক কর্তারা পরিস্থিতির খোঁজ নিয়ে নিচ্ছেন। মেলা মাঠে বসেছে জায়ান্ট স্ক্রিন। যেখানে মুড়িগঙ্গা নদীর ভেসেলের চলাচলের খবর ফুটে উঠছে। মেলার আবহাওয়ার পূর্বাভাসও মাঝেমাঝে ভেসে উঠছে। কপিল মুনির মন্দির, মাঠে রঙিন আলো, লেজার লাইট। এক কথায় বলা যেতে পারে, প্রযুক্তির চরম ব্যবহার এবার সাগর মেলায়।

এবছর ১২ লক্ষ পুণ্যার্থী রয়েছেন সাগরে। ছবি: ফিরোজ আহমেদ

উল্টোদিকে, নাগা সাধুরা কপিল মুনির মন্দিরের পাশের ডেরাতে জমিয়ে বসে ভক্তদের দর্শন
দিচ্ছেন। ভেসে আসছে গাঁজা, ধূপ, ধুনোর পরিচিত সেই গন্ধ। সাধারণ পুণ্যার্থীরা কপিল মুনির মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর নাগাদের আখড়ায় প্রণাম ঠুকে যাচ্ছেন। আগামী কয়েক দিন এই নাগাদের ডেরা হয়ে উঠবে পুণ্যার্থীদের অন্যতম গন্তব্য। বাবুঘাট থেকে আমতলা, ডায়মন্ড হারবার হয়ে হারউড পয়েন্ট পর্যন্ত গঙ্গাসাগর লেখা বাসগুলিতে চোখ পড়লেই দেখা মিলবে সেই পুণ্যার্থীদের। গ্রামীণ ভারতের কোনও সুদূর প্রান্ত থেকে কয়েকদিনের ধকল সহ্য করে আসছেন কপিল মুনির মন্দিরে। শুধুমাত্র পুণ্য অর্জনে। এ এক সুপ্রাচীন পরম্পরা।

এক লাফে এবছর রাজ্য সরকার অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে সাগর মেলার বাজেট। কুম্ভের মত পরিষেবা দিতে বিভিন্ন খাতে বাড়ানো হয়েছে অর্থ বরাদ্দ। পরিকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে গঙ্গাসাগর মেলাকে ঘিরে। এবার বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় একশো কোটি। বাড়ানো হয়েছে হয়েছে ড্রেজিং বা নদী থেকে পলিমাটি সরানোর টাকা। কুয়াশার কারণে যাতে কোনোরকম দুর্ঘটনা না ঘটে, সে সম্পর্কে যথেষ্ট সজাগ পুলিশ ও প্রশাসন। রাতে অথবা কম আলোয় ভেসেলের ন্যাভিগেশন লাইট ও কুয়াশার সময় ফগ লাইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সমস্ত ফেরি ঘাটে অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে প্রশাসনের তরফে বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে ড্রপ গেট। প্রতিটি ড্রপ গেটের দায়িত্বে রাখা হয়েছে অফিসার পর্যায়ের কর্মীদের। একটি ড্রপ গেট তীর্থযাত্রী-শূন্য না হওয়া পর্যন্ত অন্য গেট থেকে ছাড়া হচ্ছে না তীর্থযাত্রীদের। কোনো জেটির গ্যাংওয়ে অথবা পন্টুনের উপর দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না যাত্রীদের। ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের অফিসারদের রাখা হয়েছে প্রতিটি জেটিঘাটে। একটি ঘাটের সঙ্গে অন্য ঘাটের যোগাযোগ রাখার জন্য অফিসারদের দেওয়া হয়েছে স্যাটেলাইট ফোন। যা থেকে প্রতিনিয়ত বার্তা যাচ্ছে মেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

মেলায় মোতায়েন বহু সংখ্যক পুলিশকর্মী। ছবি: ফিরোজ আহমেদ

নিরাপত্তার জন্য এবার সাগর মেলায় মোতায়েন করা হয়েছে ব্যাপক সংখ্যায় পুলিশ। আটটি বিশেষ বাহিনীকে তৈরী রাখা হয়েছে। সাগর, কচুবেড়িয়া, কাকদ্বীপ ও নামখানাতে মোতায়েন করা হয়েছে সেই বাহিনীকে। রাতদিন পাহারায় থাকছে ড্রোন ও হেলিকপ্টার। আছে ৮০০ সিসি টিভি ক্যামেরার নজরদারী। এবার অতিরিক্ত নজরদারির জন্য রাখা হয়েছে হিলিয়াম বেলুন। ড্রোন হিলিয়াম ও সিসি টিভি ক্যামেরার তোলা ছবি মুহুর্মুহু পৌঁছে যাচ্ছে মেগা কন্ট্রোল রুমে।

কথায় আছে ‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গা সাগর একবার’। এই প্রবাদকে ভুল প্রমাণিত করে প্রতি বছরই এই মকর সংক্রান্তিতে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয় কপিল মুনির পদধূলিখ্যাত সাগরের বেলাভূমিতে। তবে এবার মকর সংক্রান্তিতে এলাহাবাদের প্রয়াগরাজে শুরু হয়েছে অর্থ কুম্ভমেলা। তাই ভিড় কিছুটা কম হচ্ছে বলে দাবি করেছেন নাগা সন্ন্যাসীরা।

প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইতিমধ্যে প্রায় তিন লক্ষ পুণ্যার্থী ফিরে গিয়েছেন পুণ্যস্নান ও কপিল মুনির মন্দিরে পূজা সেরে। আগামী কয়েকদিন তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়বে বলে মনে করছে প্রশাসন। রবিবার সাংবাদিক সম্মেলন করে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় জানান, “সন্ধ্যা পাঁচটা পর্যন্ত পুণ্যার্থীর সংখ্যা ১২ লক্ষ ছাড়িয়েছে।” তিনি আরো বলেন, “একটা ছোট কুম্ভ থাকা সত্ত্বেও মেলার শুরুতে এত মানুষ চলে আসায় আমরা কিছুটা চিন্তিত, কারন এবছর দু’দিন ধরে পুণ্যস্নান চলবে, সেসময় প্রচুর মানুষ আসবেন, তাই ডিএম-কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।”

ইতিমধ্যে সাগরে নজর রাখতে পৌঁছে গিয়েছেন কয়েকজন মন্ত্রী। কাকদ্বীপ লট নং ৮ এ তদারকি করছেন সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরা, কচুবেড়িয়াতে আছেন সংখ্যালঘু দপ্তরের মন্ত্রী
গিয়াসউদ্দিন মোল্লা। সাগরে আছেন জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের মন্ত্রী মলয় ঘটক, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, যুব কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, বিদ্যুৎ দফতরের মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, জেলা পরিষদের সভাধিপতি শামিমা শেখ এবং জেলাশাসক ওয়াই রত্নাকর রাও।

Get all the Latest Bengali News and West Bengal News at Indian Express Bangla. You can also catch all the West-bengal News in Bangla by following us on Twitter and Facebook


Title: Gangasagar Mela: একদিকে আধুনিকতম প্রযুক্তি, অন্যদিকে নাগা সাধু, জমে উঠেছে সাগর মেলা

Advertisement