New Update
/indian-express-bangla/media/media_files/2025/09/13/postman-story-in-digital-era-kolkata-india-2025-09-13-17-02-08.jpg)
চিঠি মানে অপেক্ষা, চিঠি মানে খবরের প্রত্যাশা (এক্সপ্রেস ফটো-শশী ঘোষ)
রাজেশ খান্নার সেই ‘ডাকিয়া ডাক লায়া’ গান আজও বয়স বাড়তে থাকা মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। সিনেমার পর্দায় খাকি পোশাকে যখন সাইকেলে চেপে পোস্টম্যান চিঠি বিলি করতেন, তখন তার সঙ্গে যেন গোটা দেশের আবেগ জড়িয়ে যেত। শ্যাম বেনেগালের ‘মন্থন’ যেমন গুজরাটের দুধ আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিয়েছিল সমগ্র দেশে, তেমনই পোস্টম্যানের চরিত্রও মানুষকে মনে করিয়ে দিত, চিঠি কেবল কাগজ নয়, চিঠি মানে সম্পর্ক, চিঠি মানে অপেক্ষা, চিঠি মানে খবরের প্রত্যাশা। যেখানে ভালবাসা আবেগ লুকিয়ে আছে।
Advertisment
একটা সময় ছিল যখন মানুষ প্রচুর চিঠি লিখত। বাবার কাকার কাছে আসা পোস্টকার্ড, দূরের আত্মীয়ের খাম, বন্ধুর হাতে লেখা লম্বা চিঠি, সবই ডাকপিয়নের ঝোলায় ভরসা করে চলে আসত বাড়ি। খামগুলোর ভেতরই লুকিয়ে থাকত আবেগ আর স্নেহ। কত ঘরে যে ডাকপিয়নের পায়ের শব্দ মানেই ছিল আনন্দ কিংবা উৎকণ্ঠা, তা আজকের প্রজন্মকে বোঝানো কঠিন। ছোটদের কাছে আবার এই চিঠি ছিল খেলার অঙ্গ। অপ্রয়োজনীয় খাম দিয়ে তৈরি হতো ‘নকল পোস্টম্যান খেলা’। ছুটির বিকেলে গাছের গোড়ায় খাম রেখে আবার সেগুলো নিয়ে ঘরে ফেরা, এমনই ছিল ছোট্ট ছোট্ট আনন্দ।
/indian-express-bangla/media/post_attachments/400f0599-b33.jpg)
এখন সেই সময় আর নেই। ডিজিটাল যুগে চিঠির জায়গা নিয়েছে ই-মেল, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জার। যে উত্তেজনা একসময় চিঠির জন্য অপেক্ষায় থাকত, তা এখন মুহূর্তের নোটিফিকেশন দেখলেই মিটে যায়। ফলে শহরের পোস্টম্যানের ঝোলায় আর নেই প্রেমপত্র বা আত্মীয়ের খবরের খাম। আছে শুধু অফিসিয়াল নথি, কোর্ট-কাচারির সমন, সরকারি কাগজপত্র। আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে বসেছে আনন্দ, দুঃখে, স্নেহে, যত্নে লেখা শব্দের নথিরা।
এমনকি ডাকঘরের অনেক পুরনো পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ডাকবিভাগ জানিয়েছিল, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চালু থাকা রেজিস্টার্ড চিঠির পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাবে। পরে আবার জানানো হয়, পরিষেবাটি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না, বরং স্পিড পোস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুনভাবে চালু থাকবে। ফলে ‘রেজিস্ট্রি পোস্ট’ থাকছে, তবে তার আগের সেই আবেগময় গুরুত্ব আর নেই।
/indian-express-bangla/media/post_attachments/5a5677f9-326.jpg)
তবুও গ্রামের দিকে এখনও টুকটাক চিঠির চল আছে। কিন্তু কলকাতার মতো শহরে ডাকপিয়নের কাজ সীমিত হয়ে গিয়েছে কেবল অফিসিয়াল কাগজ পৌঁছে দেওয়াতেই। আর তাও কতটা কষ্টের! ডাকপিয়নেরা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান অলিগলি, বহুতল বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে ওঠেন একের পর এক তলায়। অনেক জায়গায় তাঁদের লিফটে উঠতে দেওয়া হয় না। তবু সময়মতো চিঠি পৌঁছে দিতেই হয়, নইলে মানুষ সমস্যায় পড়েন।কলকাতার জিপিওতে কর্মরত ভক্ত মন্ডল, রায়গঞ্জ থেকে এসে চার বছর ধরে কলকাতা জিপিওতে পোস্টম্যানের কাজ করছেন, তাঁর কথাতেই ধরা পড়ে এই পেশার বাস্তবতা। তিনি বলছিলেন, “পোস্টম্যানের কাজ বন্ধ হবে না। তবে এখন আর কেউ ব্যক্তিগত চিঠি লেখে না। সবই অফিসিয়াল ডকুমেন্ট। আমাদের ভরসা করতে হয় পায়ের উপরেই। অনেক উঁচু বিল্ডিংয়ে হাঁটতে হাঁটতে চিঠি পৌঁছে দিতে হয়। কাজটা যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা নয়। সময়মতো না পৌঁছালে মানুষের অসুবিধা হয়ে যাবে।”
/indian-express-bangla/media/post_attachments/511311c3-a20.jpg)
হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেল আর নানা ডিজিটাল মাধ্যমের যুগে চিঠি কতটা আসে? কতটা বা চিঠি সংগ্রহ করতে হয়? সংখ্যাটা কমে গিয়েছে ঠিকই, তবে আজও পাসপোর্ট থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাঙ্কের এটিএম কার্ড থেকে চেক বই, সবই পৌঁছে যায় ভারতীয় ডাকব্যবস্থার মাধ্যমেই। আর এই কাজের নেপথ্যে আছেন আমাদের চেনা-অচেনা পোস্টম্যানরা।
তবু প্রশ্ন থাকে! চিঠিই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন কী পোস্টম্যানদের অস্তিত্বেও টান পড়বে না?
/indian-express-bangla/media/post_attachments/b998dd88-200.jpg)
/indian-express-bangla/media/post_attachments/b057e441-225.jpg)
পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বছর পাঁচেক আগে কলকাতার জিপিওতে ট্রান্সফার হয়ে এসেছেন আইনুল আনসারী। তিনি বলছিলেন, “আমাদের কাজ কখনও ফুরাবে না। গ্রামে যখন সাইকেল চালিয়ে চিঠি বিলি করতাম, তখন ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা পিছন পিছন দৌড়ে আসত। বাড়িতে চিঠি এলেই একটা আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত। কলকাতায় এসে ভালো লাগছে, এখানে পায়ে হেঁটে ঘুরতে হয়, অনেক কাজ শিখতে পারছি। তবে বেশিরভাগ চিঠিই অফিসিয়াল। রেজিস্ট্রার্ড পোস্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাই কারও নামে ব্যক্তিগত চিঠি আর আসবে না, এটা খারাপ লাগে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে বুঝি। ছোটবেলায় অনেক চিঠি লিখেছি, কিন্তু এখনকার প্রজন্ম তো আর চিঠি লিখবে না!”
/indian-express-bangla/media/post_attachments/9b45dc94-2cf.jpg)
সত্যিই, ব্যক্তিগত চিঠির যুগ প্রায় শেষ। কিন্তু পোস্টম্যানরা এখনো আছেন—রোদ, বৃষ্টি, ঝড় মাথায় নিয়ে ছুটে চলেন রাস্তা ধরে। পৌঁছে দেন মানুষের দরকারি কাগজ, প্রয়োজনীয় নথি। চিঠি লেখার শব্দরা হয়তো হারিয়ে গিয়েছে, কিন্তু পোস্টম্যানরা হারিয়ে যাননি। সঠিক ঠিকানায় এখনও পৌঁছে দিচ্ছেন আমাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। চিঠির আবেগ ম্লান হয়ে গেলেও দায়িত্বের ভার তাঁদের কাঁধেই থেকে।
/indian-express-bangla/media/post_attachments/4bee634b-0fe.jpg)
আসলে পোস্টম্যান একসময় শুধু চিঠি পৌঁছে দেওয়া মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। কারও কাছে নিয়োগপত্র, কারও কাছে দূর সমুদ্র পাড়ি দেওয়া প্রিয়জনের খবর, কারও কাছে খুশির দাওয়াত, পোস্টম্যানের হাতেই পৌঁছে যেত সবকিছু। চিঠি হাতে পাওয়ার যে আনন্দ, তা বোঝানো যায় না। যাঁরা সেই যুগ দেখেছেন, তাঁরাই জানেন কীভাবে এক টুকরো কাগজ মানুষকে হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, ভরসা দিয়েছে।
/indian-express-bangla/media/post_attachments/1ff27206-33e.jpg)
/indian-express-bangla/media/post_attachments/181dfb5f-945.jpg)
আজ সেই দিন আর নেই। কিন্তু ডাক-পিয়নের প্রয়োজন শেষ হয়নি। এখনও আদালতের সমন, সরকারি নোটিশ, চাকরির নিয়োগপত্র বা ব্যাংকের কাগজপত্র, সবই তাঁদের হাতে ভর করে পৌঁছে যায় ঠিকানায়। প্রেমপত্র আর আসে না, কিন্তু দায়িত্বের বোঝা এখনও সমান। তাই পোস্টম্যান আজও রয়েছেন।
/indian-express-bangla/media/post_attachments/1f265423-21c.jpg)
চিঠির যুগ ফুরিয়েছে, কিন্তু পোস্টম্যানের গল্প মুছে যায়নি। সিনেমার গান, রবীন্দ্রনাথের লেখা, কিংবা আমাদের নিজের স্মৃতির ভেতরেই বেঁচে বর্তে আছেন সেই ডাকপিয়নরা। হয়তো আর কেউ লিখবে না লম্বা হাতের চিঠি, হয়তো আর কেউ ডাকপিয়নের অপেক্ষায় জানলার ধারে বসে থাকবে না, কিন্তু পোস্টম্যানদের হাঁটা আজও থেমে যায়নি। কারণ প্রয়োজনের ভাষা হয়তো বদলে গিয়েছে, কিন্তু দায়িত্বের পথ এখনো তাঁদের কাঁধেই ভরসা করে।


/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us