/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/01/cake-4-2026-01-01-15-01-32.jpg)
Sheikh Bakery Guwahati: গুয়াহাটির শেখ ব্রাদার্স বেকারি।
Second oldest bakery in India: এদেশের চালু বেকারিগুলোর মধ্যে কোনটি প্রাচীনতম? এই প্রশ্নটা গুগলে টাইপ করলেই সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে আসবে “দি রয়্যাল বিস্কুট কোম্পানি” নামক একটি নাম। ১৮৮০ সালে কেরলের থালাসেরি নামক এক অতি ক্ষুদ্র জনপদে মামবল্লি বাবু নামে এক ব্যক্তির খোলা এই প্রতিষ্ঠান এখনও দাপিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে কেরলের নানা শহরে।
এবার যদি প্রশ্ন করা হয় ভারতের চালু বেকারিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় প্রাচীনতম কোনটি? তখন কিন্তু গুগলবাবু মোটেও খুব স্পষ্ট ভাবে এক সেকেন্ডের মধ্যে কোন উত্তর দিতে পারবে না। আর পারবেই বা কি করে? ভারতের চালু দ্বিতীয় প্রাচীনতম বেকারি প্রতিষ্ঠানটি তো এক বাঙালির আর বাঙালি কবে নিজের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সসম্মানে সঠিক জায়গায় সংরক্ষিত করতে পেরেছে?
সুতরাং কপাল খুব ভালো না থাকলে ইন্টারনেট থেকে আপনার “শেখ বেকারী” নামক একটি ১৪০ বছরের পুরানো বাঙালি প্রতিষ্ঠান নিয়ে খুব বেশী তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে কম। অথচ ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং অসম সহ সমগ্র পূর্ব ভারতের প্রথম আধুনিক বেকারি ও কনফেকশানরি হিসেবে এই সংস্থাটির জন্য গর্বে আপনার বুক ফুলে ওঠার কথা।
আরও পড়ুন- Greetings card: নব্বইয়ের দশকের প্রেম আর কার্ড, দুটোই অতীত, হাজারটা অনুভূতির সেই দিন আজ আর নেই...
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/01/cake-2-2026-01-01-15-03-56.jpg)
হুগলী জেলার আরামবাগের কাছে এক ছোট্ট গ্রাম জাসার (পূর্ব বঙ্গের যশোরের সঙ্গে ভ্রান্তি হয়ে যেতে পারে) থেকে উনিশ শতকের শেষের দিকে কলকাতায় হাজির হন যুবক শেখ গুলাম ইব্রাহিম। নিজের চেষ্টায় কলকাতার মির্জাপুর ষ্ট্রিটে খোলেন একটি আধুনিক পাউরুটি ও কেকের কারখানা। বানিজ্যিক সাফল্য এসে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই।
সব কিছু যখন ঠিক মত চলছে সেই সময় অর্থাৎ ১৮৮১ সালে কলকাতায় মহামারী রূপে দেখা দিল প্লেগ এবং এই ধাক্কায় শেখ গুলাম ইব্রাহিমের বেকারী ব্যবসা বিপুল আর্থিক ক্ষতির সামনে পড়ে। কার্যত রাতারাতি কলকাতার ব্যবসা গুটিয়ে শেখ ইব্রাহিমকে জীবিকার প্রয়োজনে রাস্তা নির্মাণের ঠিকাদারী করার কাজ নিয়ে চলে আসতে হয় আসামের গৌহাটি শহরে।
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/01/cake-3-2026-01-01-15-05-00.jpg)
যে সময়টায় শেখ ইব্রাহিম গৌহাটিতে উপস্থিত হন অর্থাৎ ১৮৮১ সালের আশেপাশে সেই সময় সমগ্র অসম জুড়ে চলছে এক বিরাট অর্থনৈতিক - সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। এর কারণে তখনই অসমে চলছে রেলপথের সম্প্রসারন এবং বানিজ্যিক শস্য হিসেবে অসমের চা উৎপাদনে বিপুল ব্রিটিশ পুঁজির বিনিয়োগ। সারা ভারতবর্ষের মানুষ এবং বিরাট সংখ্যায় ইউরোপিয়ানরা তখন হাজির হচ্ছেন অসমে নানা রকম জীবিকার আগ্রহে।
সারা অসম জুড়ে নতুন ভাবে তখন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ক্লাব, গলফ কোর্স, রেলওয়ে ইন্সটিটিউট, হোটেল, সাহেব কলোনী সহ নানা কিছু। মনে রাখতে হবে সেদিনের অসম মানে আজকের সমগ্র অসম, বাংলাদেশের সিলেট জেলা, সমগ্র মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড সহ আরও নানা প্রত্যন্ত অঞ্চল – সেই বিরাট অসমের রাজধানী তখন শিলং শহর যাকে সাহেবরা স্কটল্যান্ডের মত করে সাজাতে শুরু করেছেন তখন।
/filters:format(webp)/indian-express-bangla/media/media_files/2026/01/01/cake-1-2026-01-01-15-06-11.jpg)
প্রবল বুদ্ধিমান শেখ ইব্রাহিমের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে এই নতুন কসমোপলিটন অসমে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসতে বাধ্য। প্রথমে একটা ছোট সোডা ওয়াটার প্ল্যান্ট দিয়ে শুরু করলেও শেখ ইব্রাহিম ১৮৮৫ সালেই গৌহাটি শহরে শুরু করলেন সম্পূর্ণ পশ্চিমী কায়দায় পাউরুটি কারখানা। এর মাত্র কিছুদিন পরেই শুরু করলেন বিস্কুট আর কেকের উৎপাদন। এরই মধ্যে হুগলির গ্রাম থেকে ডেকে নিলেন দুই ছোট ভাই শেখ সাবিরুদ্দিন এবং শেখ কাবিকুদ্দিনকে। ১৮৮৫ সালেই প্রতিষ্ঠিত হল “শেখ বেকারি” – শুরু হল সবার অজান্তে বাঙালির এক গৌরবময় বানিজ্যযাত্রা।
কেক অথবা পাউরুটি, এইসব আজব খাদ্য বস্তুর সঙ্গে অসমের স্থানীয় মানুষের সেই সময় খুব কম পরিচয় ছিল – তার উপর এই অপরিচিত খাবার তৈরি করছে মুসলমান দোকান! সুতরাং প্রথম দিকে স্থানীয় মানুষের থেকে আশাপ্রদ সাড়া পাওয়া গেলো না। কিন্তু “গৌহাটি শহরে পাওয়া যাচ্ছে কলকাতার মতন সুস্বাদু পাউরুটি আর কেক।“ এই খবরটা কানে যাওয়া মাত্র ইওরোপিয়ানরা বিপুল সংখ্যায় ভিড় করল শেখ বেকারির দোকানের সামনে।
তবে খুব বেশীদিন সময় লাগেনি স্বাদ, গন্ধ আর পুষ্টি দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয় জিতে নিতে। কয়েক বছরের মধ্যেই শেখ বেকারীর তাজা, সুগন্ধী ও জিভে জল আনা পাউরুটি, চীজ স্ট্র, কেক আর নানা ধরণের তাজা বিস্কুটের টানে সাহেব ও দেশী খদ্দেরের ভিড়ে জমজমাট হয়ে গেলো শেখ বেকারির দোকান।
১৮৯০ সাল নাগাদ অসমের রাজধানী শিলংয়ের রাজভবন অর্থাৎ ছোটলাটের অফিস থেকে আসতে শুরু করল অর্ডার। ১৯০৫ থেকে প্রতিদিন খুব ভোরে একাধিক ঘোড়ার গাড়িতে বোঝাই হয়ে গৌহাটি – শিলং রোড ধরে শেখ বেকারীর খাবার গৌহাটি থেকে রওনা দিত শিলংয়ের রাজভবনে। কারণ শেখ বেকারীর খাবার ছাড়া ব্রিটিশদের ব্রেকফাস্ট জমত না। এর পরিষ্কার প্রমাণ আছে অসমের গভর্নর জন হেনরী কেরের ডাইরির ২৪শে নভেম্বর ১৯২৩ সালের পাতাটিতে। তখন কোনও কারণে মেরামতির জন্য গৌহাটি শিলং রাস্তা বন্ধ, ফলে শিলংয়ে আসছে না শেখ বেকারির খাবার।
সেদিন তার ডাইরিতে লিখেছেন…. “Local bread is too hard and sticky…. Gohati bread is soft” বলাই বাহুল্য এই “Gohati bread” হল শেখ বেকারির bread। শিলং রাজভবনের নথি প্রমাণ দিচ্ছে সেই সময় গভর্নরের বড়দিনের পার্টির জন্য শেখ ব্রাদার্সের দোকান থেকে আনা হচ্ছে প্রায় ৩৮০ টাকার খাবার এবং বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যাতে সব খাবার পার্টির দিন দুপুর বারোটার মধ্যে রাজভবনে পৌঁছে যায়।
শেখ পরিবারের কাছে এখনও রক্ষিত আছে ২৫ মে ১৯৩৪ সালে শিলং রাজভবন থেকে বিশেষ চিঠি। যেখানে তাদের ৪ঠা জুন থেকে ১২ই জুন প্রতিদিন দুটো অতিরিক্ত রুটির প্যাকেট দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। সেই সময়কার Assam Gazette খুললেই চোখে পড়বে যে অসম সরকার গৌহাটির শেখ ব্রাদার্সকে সরকারি বেকারী সরবরাহকারি সংস্থা বলে উল্লেখ করেছেন। একটি ভারতীয় সংস্থার পক্ষে এটা একটা বিরাট গৌরব। হেনরী কের ছাড়াও অসমের অন্য লাটসাহেবরা যেমন স্যার মাইকেল, রবার্ট নেইল রেইড এরা সবাই শেখ বেকারীর গুনমুগ্ধ ছিলেন।
স্বাধীনতার পরেও প্রায় সব ভারতীয় রাজ্যপাল একই বেকারির স্বাদ ও গন্ধে মাতয়ারা ছিলেন। এই দোকানের নানা খাবারের ভক্ত ছিলেন স্বয়ং জহরলাল নেহেরু। তাঁর অসম সফর শেখ বেকারীর বিস্কুট এবং চিজ স্ট্র না হলে সম্পূর্ণ হতো না যদিও জহরলাল নিজে কোনওদিন শেখ ব্রাদার্সের পান বাজারের দোকানে আসেননি। ১৯২০’র দশকে শেখ বেকারী গৌহাটির পান বাজারের বর্তমান ঠিকানায় একটি কাঠের “অসম হাট” বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। এখন সেখানেই তাদের বিরাট দোকান ও ইমারৎ। এই দোকানে অবশ্য বেশ কয়েকবার এসেছেন ইন্দিরা গান্ধী। শেখ বেকারীর বহু খাবার তিনি প্যাক করে দিল্লী নিয়ে যেতেন বলে জানা যায়।
শেখ ব্রাদার্স তার খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছায় যখন শেখ খুদা হাফেজ, শেখ আলি হুসেন এবং শেখ সুলতান হুসেন এর দায়িত্বে আসেন। এদের সময়ই বহু নতুন পরীক্ষা শুরু হয় এবং পান বাজারের দোকান শুধুমাত্র বেকারি থেকে পরিণত হয় কনফেকশানরী ফুড স্টোরে।
কেন ১৮৮৫’র ছোট্ট দোকান এভাবে পার করতে পারলো ১৪০টি সোনার বছর? সম্ভবত এর উত্তর আছে সংস্থার পুরানো কাগজপত্রে যেখানে দেখা যাচ্ছে সেই সময় ময়দা ও চিজ আনা হতো অস্ট্রেলিয়া থেকে, বেলজিয়াম থেকে আনা হতো ইষ্ট, কাজুবাদাম আনা হতো গোয়া থেকে আর ইরান থেকে আসতো শুকনো ফল। এক সময় চিজ স্ট্র বানানোর জন্য বার্মা থেকে আনা হয়েছিল গুলু মিস্ত্রি থেকে এক কারিগরকে। তাঁর তৈরি “সিক্রেট রেসিপি” তা্ঁর মৃত্যুর পরে আজও “সিক্রেট”।
বর্তমানে ব্যবসার প্রাণ পুরুষ আলতাহ হুসেন ও তার ভাইপো শাহরিয়ার। প্রায় ৬০ জন কর্মচারী সহ জমজমাট শেখ ব্রাদার্সের বেক হাউসে এখনও প্রতিদিন প্রায় ২৫০০ ডিম, ৩০০ কিলো চিনি, ৫০০ কিলো মাখন দিয়ে তৈরি হয় প্রায় ৬০ ধরণের নানা সুস্বাদু খাবার যার মধ্যে শুধু বিস্কুট তৈরি হয় ৭০০ কিলো আর প্রায় ৮০০০ পাউন্ড ওজনের কেক।
“এখনও আমাদের দোকানের কেক ছাড়া মেঘালয়, মিজোরাম বা নাগাল্যান্ডের বহু পরিবারের খৃষ্টমাস পালন অসম্পূর্ণ”। সুদর্শন ঝকঝকে যুবক শাহরিয়ারের দুই চোখে তখন গর্বের ঝিলিক এবং তার সঙ্গেই তিনি বলতে ভোলেন না যে সারা উত্তর পূর্ব ভারতে ১৪০ বছর দাপিয়ে ব্যবসা করার পরেও শেখ পরিবারের দেশের বাড়ি আজও হুগলীর আরামবাগের কাছে সেই ছোট্ট গ্রামটি।
এই বড়দিন ও নববর্ষের সপ্তাহ জুড়ে যখন প্রতিদিন ভোরবেলা থেকে গৌহাটির পান বাজারে খদ্দেরদের বিরাট ভিড় তখনও শাহরিয়ার সময় বের করে চলে এসেছেন তার হুগলীর গ্রামের বাড়ি জাসরে। সেখানেই পরিবারের সবার সঙ্গে হচ্ছে বর্ষশেষের উৎসব।
/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us