/indian-express-bangla/media/media_files/2026/02/04/tragic-story-dr-sourav-ghosh-south-kolkata-doctor-mental-illness-2026-02-04-14-51-36.jpg)
ডা সৌরভ ঘোষ
একসময় যিনি ছিলেন মেধাবী চিকিৎসক, আজ তিনিই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রাস্তার এক ভবঘুরে। মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে এখনও তিনি প্রেসক্রিপশন লেখেন। নাকতলা, বাঘাযতীনের সরু গলিতে প্রায়ই দেখা যায় এমনই এক ব্যক্তিকে। অগোছালো চুল, লম্বা দাড়ি, নোংরা পোশাক ও গন্ধে মানুষজনও তাঁকে এড়িয়ে চলেন। এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দার কাছে তিনি কেবলই একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি। কিন্তু হাতে যদি একটি ডায়েরি বা খাতা আর কলম তুলে দেওয়া হয়, মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্য। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে তিনি লিখে চলেন ওষুধের নাম, ইনজেকশনের তালিকা। যে কোনও রোগের কথা জিজ্ঞেস করলে একের পর এক ওষুধের নাম লিখে দেন, আর পাতার শেষে ভুল করেন না নিজের ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করতে।
আরও পড়ুন-Banglar Bari: ভাড়া বাড়ির দিন শেষ! মাত্র ২৫ হাজার টাকা খরচ করলেই শহরে মিলবে নিজের পাকা ছাদ
এই মানুষটির নাম ডা. সৌরভ ঘোষ। প্রায় দুই দশক আগে তিনি ছিলেন কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (এনআরএস)-এর একজন মেধাবী ছাত্র। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের আশেপাশে তিনি সেখান থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। শৈশব থেকেই সৌরভ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও ভদ্র স্বভাবের। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া সৌরভের বাবা রেলে কর্মরত ছিলেন এবং পাশাপাশি গৃহশিক্ষকতাও করতেন। পরিবারে ছিলেন এক দিদি ও এক ভাই। তাঁরাও পড়াশোনায় কৃতী ছিলেন।
তবে পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যেই অল্পবয়স থেকেই মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায় বলে জানান প্রতিবেশীরা। সৌরভের দিদি সাথী ঘোষও চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরে মানসিক অসুস্থতায় ভুগে কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। ছোট ভাই গৌরব ঘোষ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হলেও মানসিক অসুস্থতার জেরে তাঁরও অকালমৃত্যু হয়। এর আগেই সৌরভের বাবা-মা প্রয়াত হন।
আরও পড়ুন-৩০ হাজার ৩০০ টাকা দাম কমার পর আজ কলকাতায় সোনার দর জানলে চমকে যাবেন! রূপা সস্তা নাকি দামি?
টাইমস নাওকে শৈশবের বন্ধু পৃথ্বীশ চক্রবর্তী জানান, ১৯৯৭ সালে নাকতলা হাই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ভালো র্যাঙ্ক করে সৌরভ এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। প্রতিবেশীদের দাবি, পড়াশোনা শেষ করে তিনি একজন সফল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর মধ্যে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তিনি চিকিৎক থেকে হয়ে ওঠেন রাস্তার ভবঘুরে।
বর্তমানে সৌরভ থাকেন নিজের বাড়ির প্রথম তলার এক কোণে, একটি নোংরা ঘরে। ঘরের দেওয়ালজুড়ে দেখা যায় অগণিত লেখা। বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নাম, কোথাও তাঁর নিজের নাম, ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর। প্রতিবেশীরা জানান, হাতে কলম পেলেই তিনি এসব লিখতে থাকেন। দেওয়ালে কোথাও লেখা ‘NRS Medical College’, কোথাও ‘CMC Vellore’, আবার কোথাও ‘KPC Medical College’। কেন এত কলেজ ও হাসপাতালের নাম তিনি লিখে রাখেন, তা কেউই জানেন না।
এলাকার কয়েকজন প্রতিবেশী সৌরভের তিন বেলার খাবারের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, অতীতে বহুবার চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তাতে কোনও স্থায়ী ফল মেলেনি। তিনবার বাড়ি থেকে নিখোঁজও হয়েছিলেন তিনি। স্থানীয় মুদি দোকানি শঙ্কর বলেন, “আজ তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হলেও ওষুধের নাম জানতে চাইলে দু’সেকেন্ডও সময় নেন না। কারও রোগের কথা শুনলেই খাতা-কলম বের করে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন।” প্রতিবারই তিনি নিজের রেজিস্ট্রেশন নম্বর WBMC 60314, ডিগ্রি ও কলেজের নাম উল্লেখ করতে ভোলেন না।
এক সবজি বিক্রেতা জানান, একবার নিজের অসুস্থতার কথা সৌরভকে বললে তিনি যে ওষুধ লিখে দেন, তা খেয়ে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। আরেক প্রতিবেশী বাপি সমাদ্দার জানান, কয়েক মাস আগে বাঘাযতীনে এক ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সৌরভ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কিছু ওষুধ ও ইনজেকশনের নাম লিখে দেন, ওই ব্যক্তি সুস্থও হয়ে ওঠেন।
একসময়ের মেধাবী ছাত্র ও সফল চিকিৎসকের এই করুণ পরিণতি দেখে উদ্বিগ্ন এলাকার মানুষ। পরিবারের কেউ আর বেঁচে না থাকায় ভবিষ্যতে সৌরভের দেখভাল কে করবে এই প্রশ্নই এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাঁর প্রতিবেশীদের।
আরও পড়ুন- ৩২ বছর পর ফের আদালতে সওয়াল মমতার, সাদা শাড়ি, গলায় কালো চাদর, SIR নিয়ে মমতার সুপ্রিম গর্জন


/indian-express-bangla/media/agency_attachments/2024-07-23t122310686z-short.webp)
Follow Us