scorecardresearch

বড় খবর

অনাবৃত ৩৯: ‘মার্ডার ইন দ্য ড্রিম’

সব খাবারই সামনে ছিল। কীভাবে বিষ মেশানো হবে?‌ শুধু সুনন্দ আর মেহুলের খাবারে বিষ মেশানো‌ কী করে সম্ভব?‌

অনাবৃত ৩৯: ‘মার্ডার ইন দ্য ড্রিম’
গ্রাফিক্স- অরিত্র দে

ফাইলের  নাম ‘মার্ডার ইন দ্য ড্রিম’। স্বপ্নের ভিতর হত্যা। সুনন্দ আর মেহুল হত্যার ফাইল।

আজ সকাল সকাল অফিসে এসেছেন বসন্ত সাহা। এসেই ‘মার্ডার ইন দ্য ড্রিম’ ফাইল নিয়ে পড়েছেন। সাগ্নিক গেস্টদের মধ্যে ফোনে কার সঙ্গে কার যোগাযোগ ছিল এবং এখনও রয়েছে সে ব্যাপারে একটা নোট তৈরি করেছে। যাদের একাধিক সিম কার্ড আছে অথচ সেই কার্ডের খবর দেয়নি, তাদের নামও পাওয়া গিয়েছে। সেই সংখ্যা মাত্র দু’জন। গেস্টদের ফেসবুক ঘেঁটেও অনেকটা প্রোফাইল মিলেছে। এই নোট সকালেই বসন্ত সাহাকে মেলে পাঠিয়ে দিয়েছে সাগ্নিক। আগের কাগজপত্র এবং এই নোট মিলিয়ে গতকাল রাতের থেকেও ‌সাসপেক্ট লিস্ট ছোটো করেছেন বসন্ত সাহা। গোড়া থেকে মনে হচ্ছিল এখনও মনে হচ্ছে, কে খুনি, কেন খুন তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কী ভাবে খুনটা হয়েছে। সেটা জানতে পারলে বাকি সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। দোষীকে ধরতে পারলেই জানা যাবে। খানিকটা সে নিজে বলবে, বাকিটা তদন্ত করলে জানা যাবে। আর সেটা জানতে হলে জানতে হবে, বিষ না ছুরি? হত্যাকাণ্ডের অস্ত্র কী?

বসন্ত সাহা তাঁর তৈরি করা লিস্টের দিকে তাকালেন। নামের পাশে টিক এবং কাটা দিয়ে রেখেছেন-

প্রতীক—সহজ লোক। ব্যবসা বাড়াতে চায়। সকলের কাছ থেকে টাকা চায় ঠিকই, তবে সেটা নিজের জন্য নয়, বিজনেসের জন্য। সে বিজনেস বড় করতে চাইছে। বিজনেসের গুড উইল নষ্ট হতে দেয় না। ওর কেটারিং–এর কাজে পার্টিরা খুশি। সুনন্দও অফিসে কাজ দিত। তরুণ বয়েসে পালিয়ে বিয়ে। মদ্যপান, মহিলার কোনও দোষ নেই। সে আরও অজস্র লোকের মতো সুনন্দর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে। কললিস্ট তাই বলেছে। টাকা না পাবার রাগে খুন করতে হলে, এই লোককে অনেককে খুন করতে হবে। খাবারে, জলে বিষ মেশানো এই লোকের পক্ষে সবথেকে সুবিধেজনক হলেও সে এই ধরনের কাজ করবার লোক নয়।

আরও পড়ুন, বিশ্লেষণ: বাংলা পক্ষ – জনপ্রিয়তা, প্রাসঙ্গিকতা ও সমালোচনা

মন্দার—প্রতীকের স্ত্রী। খরুচে। স্বামী কঞ্জুস। এই নিয়ে নিত্য ঝামেলা। স্বামীর ওপর মাঝেমধ্যে এমন রেগে থাকে যে তার সম্পর্কে মুখে যা আসে বলে দেয়। মেয়েটি বোকাসোকা। তবে মন্দ নয়। সন্দেহের তালিকা থেকে অনায়াসে বাদ দেওয়া যেতে পারে। মন্দারের ফোনকলে এই পার্টিতে আসা কোনও গেস্টদের নম্বর নেই।

কঙ্কণা— মুকুর সুনন্দর প্রাক্তন প্রতিবেশী। সন্দেহবাতিক। চরিত্রে গোলমালের খবর নেই। যদি কষ্টকল্পনায় খুনের কথা ধরতেই হয়, তাহলে এই মহিলা সুনন্দকে খুন না করে মুকুরকে খুন করত। কঙ্কণার সঙ্গে মুকুরের ফোনে কথা হত। এখনও একবার হয়েছে। একে সন্দেহ করা অর্থহীন।

হৈমন্তী—কম বয়সে বিয়ে। স্বামী সিনেমায় নামনোর লোভ দেখিয়ে মেয়েদের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করত। মেয়েরাও সুযোগের লোভে রাজি হয়ে যেত। শুধু চরিত্র খারাপ নয়, সিনেমার নাম করে স্ত্রীর কাছ থেকে টাকাও নিতে থাকে। বিয়ে ভেঙে যায়। এরপরে আবার প্রেম। সেটা বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়েছিল কিনা জানা যায়নি। তবে সম্পর্ক টেঁকেনি। মেয়েটি পড়াশোনায় অতিরিক্ত ভাল। বিদেশি কোম্পানিতে বড় চাকরি করে। পুনেতে ফ্ল্যাট কিনে একা থাকে। কাজে যোগ্য। যে কোনওদিন দেশের বাইরে চলে যাবে। পার্সোনালিটি অতিরিক্ত বেশি। একবার নাকি তার পুরোনো অফিসের বস ইন্‌ডিসেন্ট প্রোপোসাল দিলে সেই লোককে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিল। রূপবতী এবং গুণবতী এই মেয়ে পুরুষের কাছ থেকে বারবার ধাক্কা খেয়েছে। তারপরেও আজ তার অনেক বয়ফ্রেন্ড। চেনাদের মধ্যে রয়েছে সুনন্দ, কিশোর, তন্ময়। এছাড়া পুনেতে রয়েছে সুশান্ত, রোহিত। এসব ইনফরমেশন হৈমন্তীর ফোনের কললিস্ট আর পুনের পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া। সাগ্নিক যোগাযোগ করেছিল। হৈমন্তী কলকাতায় এসে সত্যি অফিসের কাজ করেছে। একে সন্দেহের তালিকায় রাখার কারণ তার উপহারের তালিকায় ছিল ছুরি এবং ছুরি দিয়ে ডাঁসা পেয়ারা কাটা নিয়ে মিথ্যে বলেছে। পলাশের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের কোম্পানির রেজিস্ট্রি হওয়া যে নম্বরটির প্রায়ই কথা হত, সেই কোম্পানির নাম ‘বন উইদা’। এই কোম্পানিতে কেমিস্ট হিসেবে কাজ করে হৈমন্তী। তার কাজ কেমিকালস্‌ নিয়ে। কোম্পানির নাম এবং তার কাজ সম্পর্কে ইনফরমেশন হৈমন্তী নিজেই পুলিশকে দিয়েছে। এই মেয়েকে সন্দেহের তালিকায় রেখে পাশে একটা স্টার দিয়েছেন বসন্ত সাহা।

তন্ময়—মেহুলের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে। তারপরেও দেদার নারীসঙ্গ। গেস্টহাউসে, হোটেলে যাতায়াত। মেহুলের সঙ্গে তো বটেই, এই পার্টিতে গেস্ট ছিল এমন আরও একটি মেয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। সেই মেয়ে দিশা। কললিস্টে দিশার নম্বর পাওয়া গিয়েছে। দিশার দুটো নম্বর। যে নম্বর সে পুলিশকে দিয়েছে সেখানে যেমন তন্ময়ের নম্বর পাওয়া গেছে, যে নম্বর দেয়নি, সেখানেও পাওয়া গেছে। এই লোক অবশ্যই সন্দেহের মধ্যে থাকছে।

আরও পড়ুন, দেবেশ রায়ের ধারাবাহিক স্মৃতিচারণ মনে পড়ে কী পড়ে না

পলাশ—সহজ ছেলে। মুকুরকে পছন্দ করত। সেটা শুধু ‘পছন্দ’ই‌, অন্য কিছু নয়। ফোনকল বলছে দুজনের ন’মাসে, ছ’মাসে যোগাযোগ ছিল। পলাশ পুলিশকে প্রথমদিনই জানায় তার দুটো ফোন নম্বর। দুটোই সে দিয়েছে। একসময়ে মুকুরকে নিয়ে বউয়ের সঙ্গে অল্পস্বল্প মনোমানিল্য হত। এখন সেসব অতীত। সমস্যা দুটো। পলাশ বিজনেসের কাজে মুম্বাই–পুনেতে নিত্য যাতায়াত করে এবং তার দু্টো নয়, তিনটে ফোন নম্বর। তিন নম্বর সিমকার্ডটি তার কোম্পানির নামে করা। এই নম্বর থেকে এমন একটি ফোন নম্বরে মাঝেমধ্যেই কথা হয়েছে যেটি মহারাষ্ট্রে রেজিস্টার করা। নম্বরে ফোন করে যাকে পাওয়া গিয়েছে ট্রু কলার তার নাম দেখায়নি। দেখিয়েছে একট বিদেশির কোম্পানির নাম।

পলাশের নামের পাশে দুটো ‘স্টার’ চিহ্ন দিয়েছেন বসন্ত সাহা।

উজ্জ্বল- খুব ছোটোবেলায় মুকুরের প্রতি ক্রাশ। স্কুলজীবন। এখনও কথা  হলে মজা করে। অতীত এবং বর্তমান বলছে ছেলেটি মোটের ওপর ‘গুডবয়’  ছবি আঁকতে পারত, পরে  ছেড়েছুড়ে দেয়। এমনকী র‍্যনোয়ার নামও জানে না। ফোনকলে সেদিনের গেস্টদের কারও নাম নেই। একে লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

নয়নিকা—একটু হিংসুটে প্রকৃতির সহজ মেয়ে। দুটো মোবাইল নম্বর পুলিশকে দিয়েছে। একটায় শুধু ফেসবুকের জন্য ব্যবহার হয়। সন্দেহের লিস্ট থেকে বাদ।

দিশা—দুটো ফোন, দুটো নম্বরই পুলিশকে দিয়েছে। তন্ময়ের সঙ্গে ছাড়াও তার ফোনে কথা হয় পলাশের সঙ্গে। সুনন্দ মেহুলের মৃত্যুর পরও কথা হয়েছে। এই মেয়েকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।

আরও একজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। সে খুন করেনি, কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে জড়িত কিনা দেখতে হবে। সুনন্দকে কেন সন্দেহ?‌

সুনন্দ—তার সঙ্গে বিভিন্ন পুরুষ এবং মহিলার সম্পর্ক ছিল যারা মুকুরের পার্টিতে সেদিন এসেছিল। এই ছেলের অতীতেও বেশ বড় দাগ। আগে একটা বিয়ে করেছিল। সেই মেয়েটি সুইসাইড করে। সুইসাইড নোটে লিখে যায়, তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। মেয়েটির বাড়ির লোকেরা অভিযোগ করে, এই নোট জাল। প্রমাণ করা যায়নি। পুলিশের রেকর্ড বলছে, সন্দেহ থাকলেও কিছু করা যায়নি। মুকুরের সঙ্গে সুন্দর আলাপ হয়েছিল এই ঘটনার তিনবছর পর। এক অনাথ আশ্রমের অনুষ্ঠানে। মুকুরের স্কুল ছিল উদ্যোক্তা। একজন স্পনসর ছিল সুনন্দ। আলাপ গভীর হয় এবং বিয়েও হয়। মুকুর পুলিশকে জানিয়েছে, তার স্বামী  অতীত গোপন করেনি। বলেছিল, তার স্ত্রীর আত্মহত্যার কারণ নাকি পুরোনো প্রণয়। এই কেলেঙ্কারি চাপা দিতেই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তার ঘাড়ে দোষ চাপায়। মুকুর এও জানিয়েছে, তার স্বামী তার প্রতি ছিল অত্যন্ত কেয়ারিং। বাচ্চাকাচ্চা না থাকায় যত্ন যেন বেশি করত। শুধু মুখে নয়, যাবতীয় বিমা, গাড়ি বাড়ি সবই মুকুরের নামে লিখে দিয়েছিল। অনেকে বলেছে, মুকুরই নাকি এই কাজ জোর করে করেছে, কথাটা ঠিক নয়।

বসন্ত সাহা চেয়ারে হেলান দিলেন। লিস্ট যতই ছোটো হোক, সন্দেহভাজনের সংখ্যা একেবারে কম নয়। পলাশ, দিশা, হৈমন্তী, তন্ময়। এদের সঙ্গে তালিকায় রয়েছে সুনন্দ নিজেও। মুকুর এবং মেহুলকে গোড়ায় সন্দেহ করলেও, এখন তারা বাদ পড়েছে।   একজন বা দুজন মিলে খুন করেছে। দুজন যদি হয় তাহলে কম্বিনেশনগুলো নানা রকম হতে পারে। ছেলেতে মেয়েতে যেমন হতে পারে, তেমন ছেলেতে ছেলেতে বা মেয়েতে মেয়েতে হতে পারে। সুনন্দ যেভাবে নারীসঙ্গ করেছে, তাতে দু’‌জন মিলে এককাট্টা হয়ে খুন করাটা অসম্ভব নয়। আবার হতে পারে, সু্নন্দর আগের স্ত্রীর মৃত্যুর প্রতিশোধ। পুলিশ, আইন পারেনি, তাই অপরাধীর শাস্তির দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া হয়েছে। সিনেমার ঢঙে। বসন্ত সাহা সোজা হয়ে বসে সামনের কাগজে লিখলেন—

১)‌ কেন খুন?‌

উত্তর—মুকুরকে পাওয়ার লোভ?‌ না, তাহলে মেহুলকে মরতে হত না। প্রতিশোধ? সুনন্দর আগের স্ত্রীর মৃত্যুর প্রতিশোধ?‌ হতে পারে। তবে সম্ভাবনা ক্ষীণ।‌ আগেই হতো। বিশ্বাসঘাতকতা?‌ সুনন্দর অন্য সম্পর্ক কারও ক্রোধের কারণ?‌ এমন কেউ যে মুকুর–‌সুনন্দ ফটো রাগে ছিঁড়ে ফেলে। মেহুল?‌ তবে কি সাগ্নিকের কথাই ঠিক?‌ সুনন্দকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করেছে?‌ এটাও খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়। সেক্ষেত্রে আত্মহত্যা কেন?‌ কেনই বা পার্টিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো। মেহুল তো সুনন্দকে অনেকে জায়গাতেই পেত। তার কাছে বিষের প্রমাণও মেলেনি। তবে কি খুনের পিছনে অর্থের লোভ। সুনন্দ মারা গেলে তার টাকা কে পাবে? তবে কি মুকুরকে আবার সন্দেহের তালিকায় পাঠাতে হবে?‌ মুকুরের নিজেরে নামেই তো সম্পত্তির বেশিটা। তারওপর সে মা হতে চলেছে। এই সময়ে সে এই ভয়ংকর অপরাধ করবে কেন?‌

২)‌ খুন পার্টিতে কেন?‌

উত্তর—সবার সামনে ঘটলে ‘‌খুন’‌ বলে বোঝা যাবে না। মনে হবে ‘‌ফুড পয়জন’‌। তারওপর একসময় সুনন্দর হার্টের সমস্যাও হয়েছিল। সবথেকে বড় কথা, পার্টিতে একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার থাকায় সন্দেহ হওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠত না। উঠলেও দায় বর্তাবে যারা খাবার দিয়েছে তাদের ওপর। কেটারিং সার্ভিসকে ধরা হবে।

৩)‌ গেস্টদের লিস্ট কে পেল?‌

উত্তর—এই কাজে এক নম্বর সন্দেহভাজন মুকুর, দু’‌নম্বর সুনন্দ। মুকুরের বাড়িতে কাদের যাতায়াত ছিল এটা দেখলে হবে না।  সে তো মহুলও ছবি চুরি করেছে। দেখতে হবে, লিস্ট তৈরির পর কে গিয়েছিল?‌

৪)‌ কেমন ভাবে খুন?‌

উত্তর—কেটারারের দেওয়া পকৌড়া, চিকেন ড্রামস্টিকে বিষ ছিল না। সবাই খেয়েছে। আর কী খাবার ছিল?‌ কেক। কেকও সবাই খেয়েছে। বড় কেক কেটে খাওয়া হয়েছে। সব খাবারই সামনে ছিল। কীভাবে বিষ মেশানো হবে?‌ শুধু সুনন্দ আর মেহুলের খাবারে বিষ মেশানো‌ কী করে সম্ভব?‌

‌‌সাগ্নিক ঘরে এসে ঢুকল। সে উত্তেজিত।
‘‌স্যার, জরুরি কথা ছিল।’‌
—————

এই উপন্যাসের সব পর্ব একত্রে পড়তে পারবেন এই লিংকে

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Literature news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Pracheta gupta detective novel anabrito part 39