বড় খবর

২০২০ সালে কেন প্রাসঙ্গিক ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা

ইন্দিরা জরুরি অবস্থা লাগু করেছিলেন দেশের মাথায় হাতুড়ি মেরে। কিন্তু একনায়কতন্ত্র কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াও প্রবেশ করতে পারে, চুপিসাড়ে, নীরবে, অলক্ষ্যে।

indira gandhi emergency
১৯৭৫ সালের অগাস্ট, দূরদর্শনের স্টুডিও থেকে দেশের উদ্দেশে বার্তা ইন্দিরা গান্ধীর। ছবি: এক্সপ্রেস আর্কাইভ

আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ২৬ জুন জারি করা ২১ মাসের জরুরি অবস্থাকে অধিকাংশ মানুষই মনে রেখেছেন এক দুঃস্বপ্নের মতো, যখন বেলাইন হয়ে পড়ে গণতন্ত্র। বাস্তবে জরুরি অবস্থা জারি হয় ২৫ জুন, রাত ১১.৪৫ মিনিটে, যে সময় ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ, যদিও তাঁর আপ্তসহায়ক তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে তাঁর এই পদক্ষেপ অসাংবিধানিক। একমাত্র মন্ত্রীগোষ্ঠীর পরামর্শ মতোই কাজ করবেন রাষ্ট্রপতি, এমনটাই রীতি। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীগোষ্ঠী ঘোষণার পরের দিন সকাল ছ’টায় বৈঠকে বসে, স্রেফ নিয়মরক্ষার খাতিরে।

রাষ্ট্রপতি আহমেদ শুধু নন, চাপের মুখে নতিস্বীকার করে যান আমাদের গণতন্ত্রের একাধিক সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিসর্জন দেওয়া হয় পেশাদারী সততা এবং পদের প্রতি দায়বদ্ধতা। জরুরি অবস্থার জন্য ইন্দিরা গান্ধী, সঞ্জয় গান্ধী এবং সঞ্জয়ের চেলাচামুণ্ডাদের দায়ী করতে গিয়ে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই তাঁদের দায়ী করার কথা, যাঁদের ওপর একটু জোর খাটাতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েন তাঁরা। টুঁ শব্দটি না করে শ্রীমতী গান্ধীর অনুগামী হন তাঁর মন্ত্রীরা। সংসদে দুই বহিষ্কৃত বিদ্রোহী বাদে সুড়সুড় করে স্রেফ জরুরি অবস্থার ঘোষণাই নয়, একাধিক অবৈধ আইন প্রণয়ন করে সমগ্র কংগ্রেস পার্টি।

‘কোয়েশ্চন আওয়ার’ বা প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং ‘কলিং অ্যাটেনশন মোশন’ বাতিল করে দিয়ে সংসদের প্রতি তাঁর অবজ্ঞা স্পষ্টতই বুঝিয়ে দেন ইন্দিরা, এবং ফরমান জারি করেন যে এবার থেকে শুধুমাত্র জরুরি সরকারি কাজই পরিচালিত হবে সংসদে।

কিছুটা হলেও মুখরক্ষা করে দেশের বিচার ব্যবস্থা, যা যে কোনও গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। কঠোরভাবে দমনমূলক আইন মিসা (MISA, অর্থাৎ Maintenance of Internal Security Act)-কে সংবিধানের নিয়ম বিরুদ্ধ আখ্যা দিয়ে বাতিল করার সাহস দেখায় ন’টি হাইকোর্ট। জরুরি অবস্থা চলাকালীন এই আইনের আওতায় আটক হন হাজার হাজার মানুষ। ওই ন’টি হাইকোর্টের বিচারপতিদের অধিকাংশকেই পরবর্তীতে শাস্তি পেতে হয়। তবে হেবিয়াস কর্পাস-এর আবেদন যখন সুপ্রিম কোর্টে এলো (এডিএম জব্বলপুর বনাম এস শুক্লা), দেশের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখলেন না দেশের উচ্চতম বিচারপতিরা।

আরও পড়ুন: বদলে যাওয়া সময়ে মিডিয়া, আজকের সমাজের আয়না

পাঁচ-সদস্যের বেঞ্চের চারজনই অ্যাটর্নি-জেনারেলের মতে সায় দিয়ে জানালেন, জরুরি অবস্থা লাগু হলে নাগরিকদের আইনি অধিকার বলে কিছু থাকে না, আদালতে হাজির হওয়ার অথবা আটক হওয়ার কারণ জানার অধিকারটুকু পর্যন্ত না। এই চার বিচারপতির মধ্যে দুজন এমনও ছিলেন, যাঁরা নিজেদের মানবাধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার ধ্বজাধারী হিসেবে প্রচার করতেন। এঁদের সঙ্গে একমত হন নি পঞ্চম বিচারপতি এইচ আর খান্না, যার ফলে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি হওয়ার সুযোগ জলাঞ্জলি দিতে হয় তাঁকে।

সেসময় ভারতের সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে লালকৃষ্ণ আডবাণীর বিখ্যাত উক্তি, “ঝুঁকতে বলা হয়েছিল, ওরা হামা দিতে শুরু করল,” একেবারে মিথ্যে নয়। হ্যাঁ, সেনশরশিপ আইন জারি হয়েছিল, কিন্তু ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। সেসময় প্রায়শই সেন্সরদের বিরোধিতা করে সাহসিকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বিশেষত ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচনের ঘোষণার পর। এক্সপ্রেস-এর প্রতিষ্ঠাতা রামনাথ গোয়েঙ্কা জানতেন, শ্রীমতী গান্ধী ক্ষমতায় ফিরলে তাঁকে তাঁর সংবাদপত্র বন্ধ করে দিতে হবে, তবু এতটুকুও ঝোঁকেন নি তিনি।

ইন্দিরা জরুরি অবস্থা লাগু করেছিলেন দেশের মাথায় হাতুড়ি মেরে। কিন্তু একনায়কতন্ত্র কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াও প্রবেশ করতে পারে, চুপিসাড়ে, নীরবে, অলক্ষ্যে। ইতিহাস আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে শাসক একা দায়ী নয়। সেই শাসকের কাছে মাথা নত করে যারা, তারাও সমান দোষী। ভারতে ফের একবার জরুরি অবস্থা লাগু হতে পারে কিনা, বারবার উঠে আসা এই প্রশ্ন আজ ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিপজ্জনক এক অতিমারীর ধাক্কায় আজ বিপন্ন দেশের সংবিধান রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলি। তাছাড়াও COVID সঙ্কটের ফলে বাস্তব পরিস্থিতি থেকে জনগণের নজর ঘুরিয়ে দেওয়া সহজতর হয়ে উঠেছে, যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের আরও বেশি ক্ষমতাশালী করে তুলতে পারে শাসকগোষ্ঠী।

আরও পড়ুন: মুখে গণতন্ত্র, মনে বৈষম্য – পৃথিবী সেই তিমিরেই

অতিমারীর প্রভাবে কিছু আবশ্যিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে হয় ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়েছে, অথবা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে বিচার প্রক্রিয়া। এর প্রকৃষ্ট নিদর্শন হলো আদালতের কাছে ৮২ বছরের কাশ্মীরী নেতা সইফুদ্দিন সোজ়-এর স্ত্রীর হেবিয়াস কর্পাস আবেদন। জুলাই পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। গত বছরের অগাস্ট মাসে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ হওয়ার পর আরও অনেকের সঙ্গে আটক হন সোজ়। তাঁর হাজতবাসের কারণ এখনও তাঁকে জানানো হয় নি।

একদিকে আদালতের প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে অতিমারী, অন্যদিকে লকডাউনের আবহে অতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে দিল্লি পুলিশ, বিশেষ করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন-বিরোধী আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে। তথাকথিত উত্তেজনা সৃষ্টিকারীদের অধিকাংশই হয় ছাত্রছাত্রী, নাহয় মুসলমান। এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে উত্তরপূর্ব দিল্লির দাঙ্গায় “বেআইনি কার্যকলাপের” অভিযোগ দায়ের হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। স্পষ্টতই একপেশে এই সমস্ত গ্রেফতারি। যাঁদের উস্কানিমূলক ভাষণ এবং কার্যকলাপ রীতিমতো নথিভুক্ত রয়েছে, যেমন বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ দায়ের হয় নি। গ্রেফতার হওয়া এক ছাত্র দিল্লির নিম্নতর আদালতে আবেদন জানালে তাকে বলা হয়, অতিমারীর কারণে সমস্ত প্রক্রিয়া আইন মেনে হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হয়ে যায় সাংবাদিক গৌতম নওলাখা এবং অধ্যাপক আনন্দ টেলটুম্বড়ের আগাম জামিনের আবেদন। দুজনেই সম্মানীয় নাগরিক অধিকার কর্মী, ২০১৮ সালে ভীমা-কোরেগাঁও কাণ্ডে অভিযুক্ত। দুজনকেই আটক করা হয়েছে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে সংশোধিত ইউএপিএ (Unlawful Activities [Prevention] Act)-র আওতায়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো সন্ত্রাসবাদীরা যাতে সহজে জামিন না পায়, তা নিশ্চিত করা। কাকে সন্ত্রাসবাদী বলা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার, ঠিক যেমন জরুরি অবস্থার সময় মিসা (MISA)।

আরও পড়ুন: কত সেনা চলেছে সমরে, আমজনতার জানার দরকার কী?

অতিমারীর ফলে বিলম্বিত হয়েছে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন, সুতরাং কবে কীভাবে লোকসভা সমবেত হবে, তার কোনও ঠিকানা নেই। চিনের অনুপ্রবেশ অথবা করোনা অতিমারীর মতো বিষয়ে অর্থবহ আলোচনা কি আদৌ সম্ভব হবে? নাকি স্রেফ সরকারের সিদ্ধান্তে সীলমোহর দেওয়ার জন্যই বসবে অধিবেশন, যেখানে ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং’ হয়ে দাঁড়াবে অধিবেশন সংক্ষিপ্ত করার অজুহাত মাত্র?

COVID-এর আরও এক শিকারে পরিণত হয়েছে মিডিয়া। খবরের কাগজ ভাইরাসের বাহক হতে পারে, এই ভিত্তিহীন আশঙ্কার ফলে দ্রুত গতিতে কমেছে সংবাদপত্রের বিতরণ। অজস্র আবাসন এবং অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেশি করে ছড়িয়েছে এই অজ্ঞতা। এর আর্থিক প্রভাবে কার্যত বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে বিশেষভাবে প্রিন্ট মিডিয়া। যে যুগে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্রোতের মতো বয়ে যায় ‘ফেক নিউজ’ এবং প্রোপাগান্ডা, সেখানে প্রিন্ট মিডিয়াই ছিল নির্ভরযোগ্য খবরের অবশিষ্ট সূত্রগুলির একটি। ঝাঁপ ফেলেছে দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধেয় আঞ্চলিক ভাষার একাধিক প্রকাশনা, এবং ছোটখাটো এডিশন এবং তাদের কর্মীদের নির্মমভাবে ছেঁটে ফেলেছে বহু প্রকাশনা গোষ্ঠী।

অতিমারী-পরবর্তী সময়ে টিকে থাকার মরিয়া লড়াই করতে হবে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত মিডিয়াকে। সম্প্রতি পরিলক্ষিত হয়েছে আরও একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা – কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অসুবিধাজনক প্রশ্ন তুললে তুচ্ছ কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হচ্ছে এফআইআর। অত্যুৎসাহী কিছু বিজেপি-ভক্ত, যারা পুলিশকে এই ধরনের মামলা দায়ের করতে প্ররোচিত করে, আমাদের মনে করিয়ে দেয় জরুরি অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধীর গুণ্ডা বাহিনীর কথা। মনে রাখবেন, স্বাধীন মিডিয়া হলো গণতন্ত্রের পরশ পাথর।

(লেখিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সম্পাদকীয় উপদেষ্টা, এবং ‘দি ইমারজেন্সি: আ পার্সোনাল হিস্টরি’ গ্রন্থের রচয়িতা)

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা এখন টেলিগ্রামে, পড়তে থাকুন

Web Title: Indira gandhi 1975 emergency lesson for 2020

Next Story
বদলে যাওয়া সময়ে মিডিয়া, আজকের সমাজের আয়নাmedia in changing times
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com