scorecardresearch

আবাস দুর্নীতির পর্দাফাঁস (দ্বিতীয় পর্ব): তৃণমূল কর্মী ও পরিবারের ৭ জনের পাকাবাড়ি, তা-ও তালিকায় নাম

বিরাট দুর্নীতির হদিশ আগেই ছিল, কিন্তু জেনেও ব্য়বস্থা নেয়নি প্রশাসন।

আবাস দুর্নীতির পর্দাফাঁস (দ্বিতীয় পর্ব): তৃণমূল কর্মী ও পরিবারের ৭ জনের পাকাবাড়ি, তা-ও তালিকায় নাম
তৃণমূল কর্মী জাহাঙ্গির শেখের শ্যালকের এমন বাড়ি। তা-ও তাঁর নাম তালিকায়। এক্সপ্রেস ফটো- পার্থ পাল

যাঁরা অযোগ্য তাঁরা পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা। গোটা বাংলায় এই বিরাট দুর্নীতির পর্দাফাঁস সোমবারই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অন্তর্তদন্তে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু যাঁদের এটা দেখার কথা ছিল তাঁদের জন্য আশ্চর্যজনক কিছু নয় এই দুর্নীতি।

আজ থেকে ঠিক মাস দুয়েক আগে, কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের সচিব নগেন্দ্রনাথ সিনহা যিনি আবার এই আবাস যোজনার নোডাল অফিসার, রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের সচিব পি উলগানাথনকে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে কিছু কথা লেখা ছিল। তার আগে অবশ্য আট মাস বন্ধ রাখার পর ফের এই প্রকল্প বাংলায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্র। চিঠিতে কেন্দ্রীয় সচিব এই প্রকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের উল্লেখ করেন। তিনি রাজ্যকে এই বলেন, যেন প্রত্যেক জেলায় কোনওরকম দুর্নীতি, ঘুষের অভিযোগে ইঞ্জিনিয়ার-সহ বিশেষ অফিসারদের টিম খোঁজখবর নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয় সেটা রাজ্য নিশ্চিত করুক।

এই ধরনের দুর্নীতি ঠেকানো যেত যদি বিষয়টি নজরে রাখা হত। যেমন বারুইপুরের মদরাট গ্রাম পঞ্চায়েতের মসজিদপাড়া গ্রামে জাহাঙ্গির শেখ ও তাঁর পরিবারের সাতজনের নাম এই প্রাপক তালিকায় ছিল। তিনি একজন তৃণমূল কর্মী এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত অফিসে ঠিকাকর্মী। থাকেন পাকাবাড়িতে। পরিবারের বাকিরাও একই পাড়ায় থাকেন। যাঁরা প্রকৃতই গরিব, কাঁচা ঘরে থাকেন তাঁদেরই জন্য এই প্রকল্পের টাকা। যাঁদের আগে থেকে পাকা বাড়ি আছে তাঁদের জন্য নয়। কিন্তু জাহাঙ্গির ও তাঁর পরিজনরা সেই প্রক্রিয়া থেকে ছাড় পেয়ে যান।

জাহাঙ্গিরের দাবি, “আমি প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় পাঁচ বছর আগে আবেদন করি। তখন আমার কাঁচাঘর ছিল। আমার টাকাপয়সাও ছিল না।” কিন্তু সে না হয় বোঝা গেল, আত্মীয়রা কী ভাবে পেলেন? উত্তরে জাহাঙ্গিরের দাবি, “আত্মীয়দের কী আছে তা তো আমার দোষ নয়। গ্রামে যদি আমার অনেক আত্মীয় থাকে আমি কী করব! ওঁরা যদি যোগ্য় না হয়, তাহলে তাঁদের নাম বাদ যাবে। কিন্তু ওঁদের প্রয়োজন আছে।”

তবে বাস্তবে জাহাঙ্গির বা তাঁর পরিজনদের ঘর দেখে তা বোঝার উপায় নেই। জাহাঙ্গিরের ভাই রোশনের দোতলা কংক্রিটের বাড়ি। জাহাঙ্গিরের বাড়ি থেকে হাঁটাপথে দুমিনিট। রোশনের বউ রোশেনারা বিবি বলেছেন, “আমরা সেখানে থাকি না। আমাদের ছোট জমি আছে, গ্রামে ছোট ঘর আছে। আমরা আবাস যোজনার টাকা পেলে আমরা পাকা ঘর করব।”

জাহাঙ্গিরের দুই তুতোভাই ফিরোজ ও সিরাজ শেখ। তাঁদের দোতলা পাকাবাড়ি, আবার সামনে বড় অনেকটা বাড়ানো। ঠিক রোশনের বাড়ির সামনেই। গোয়াল ঘর আছে সামনে। ফিরোজের বোন মুর্শিদা খাতুন বলেছেন, “আমাদের বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু বৃষ্টি পড়লে ছাদ চুইয়ে জল পড়ে।”

ইয়াসিন শেখ, জাহাঙ্গিরের ভাই: ফিরোজ ও সিরাজের বাড়ির পাশে কংক্রিটের দেওয়াল এবং একটি টালির ছাদ-সহ ইয়াসিন শেখের বাড়ি। মাঝখানে একটি উঠোন দ্বারা পৃথক করা ডানদিকে সারি সারি ঘর এবং বাম দিকে বাথরুম আছে।

“আমি ২০১৮ সালে স্কিমের জন্য আবেদন করেছিলাম। গত বছরের ডিসেম্বরে, তাঁরা (স্থানীয় কর্মকর্তারা) আমার বাড়ি জরিপ করেছিল। আমার ঠিকঠাক ঘর নেই। এই বাড়িটা অন্য ভাইয়ের সঙ্গে ভাগ করে থাকি। কেন আমাকে আবাস যোজনার টাকা দেওয়া হবে না?” বলেন ইয়াসিন।

আরও পড়ুন আবাস দুর্নীতির পর্দাফাঁস (প্রথম পর্ব): গরিবের ঘরের টাকা গিয়েছে অট্টালিকার মালিকের কাছে

সুপিয়া বিবি, জাহাঙ্গিরের বোন: তাঁর বাড়িতে কংক্রিটের দেওয়াল এবং দুটি ঘর সহ একটি টালির ছাদ এবং একটি আলাদা আচ্ছাদিত রান্নাঘরের জায়গা ছিল। “আমি একজন বিধবা. অনেক দিন ধরেই বাড়ি পাওয়ার চেষ্টা করছি। আমার চার ছেলে কম বেতনের চাকরিতে রয়েছে, আমার নিজের কোনও আয় নেই। আমার কাছে মাত্র কয়েকটি গরু আছে,” বলেন তিনি।

সলমন বাজিগর, জাহাঙ্গিরের বোন সুপিয়ার শ্যালক: সলমন সারি সারি ঘর, কংক্রিটের দেওয়াল এবং একটি টালির ছাদ-সহ একটি পাকা বাড়িতে থাকেন। “আমি আমার ভাইদের সঙ্গে আমার মায়ের বাড়িতে থাকি এবং একটি পোশাকের দোকানে কাজ করি। আমি যদি আবাস যোজনার টাকা পাই, আমি আমার নিজের একটি আলাদা বাড়ি করতে পারব,” সলমন বলেছিলেন।

আলতাফ আনসারি, জাহাঙ্গিরের শ্যালক: আলতাফ থাকেন জাহাঙ্গিরের বাড়ির কাছে একটি কংক্রিটের ছাদ-সহ একটি দোতলা পাকাবাড়িতে। সামনে বাড়তি জমি আছে, চারদিকে কংক্রিটের দেওয়াল। আলতাফ জানান, তাঁর শ্বশুর তাঁকে জমির প্লট দিয়েছেন। আলতাফ বলেন, “আমি এখানে ভাড়ায় থাকি। আমার কোনও বাড়ি নেই”।

এই কেসগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, বারুইপুরের ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার (বিডিও) সৌরভ মাজি বলেছেন: “জরিপটি আশা এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দ্বারা করা হয়েছিল… যোগ্যদের নাম গ্রামসভা দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল৷ পরে, আমরা জনসাধারণের জন্য একটি অভিযোগ ড্রপ বক্স রাখি। আমরা অভিযোগ পেয়েছি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। কিছু ছিল বৈধ, কিছু ছিল মিথ্যা অভিযোগ। এই ব্লকের নির্বাচিত ব্যক্তিদের তালিকা থেকে প্রায় ১,২৬৪টি নাম বাতিল করা হয়েছে। বাতিলের প্রক্রিয়া এখনও চলছে। পাকা ঘর আছে এমন কাউকে সুবিধাভোগী হতে দেওয়া হবে না।”

স্পষ্টতই, তালিকাগুলির কাজ চলছে এবং বাস্তবায়নে আরও বিলম্ব হবে। প্রকল্পের নাম নিয়ে সংঘাতের কারণে গত আর্থিক বছরে অগ্রগতি থমকে গিয়েছিল — রাজ্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পটিকে “বাংলার আবাস যোজনা” বা “বাংলার বাড়ি” হিসাবেও নাম দিয়েছিল।

রাজ্যের কাছে তার চিঠিতে, কেন্দ্র জোর দিয়েছিল যে ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজ্যে এই প্রকল্পের অধীনে ১১,৩৬,৪৮৮টি বাড়ি তৈরির জন্য ৮,২০০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে৷ কিন্তু রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন যে, “আমরা এখনও একটাও পয়সা পাইনি” এবং অচলাবস্থাকে “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া কিছুই নয়” বলে অভিহিত করেছেন।

এখনও, ডিসেম্বরে কেন্দ্রের চিঠির কয়েক সপ্তাহ পরে, রাজ্য এই প্রকল্পের জন্য পরিদর্শন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। এমনকি উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ এবং মালদহের মতো বেশ কয়েকটি জেলায় অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম সুবিধাভোগীদেক তালিকায় খুঁজে পাওয়ায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।

উদাহরণস্বরূপ, মুর্শিদাবাদে তুমুল বিক্ষোভের জেরে তৃণমূলের ১৭ জন পঞ্চায়েত সদস্য পদত্যাগ করেন। দলকে ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য চাপ দিতে এই গণইস্তফা দেওয়া হয়। যাতে দল সেগুলি প্রত্যাখ্যানও করে।

৫ জানুয়ারি, গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের দুটি দল পূর্ব মেদিনীপুর এবং মালদা জেলা পরিদর্শন করে। যা নয়া রাজনৈতিক সংঘাতের সূচনা করে।। উলগানাথন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রশ্নের কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি।

এই প্রসঙ্গে তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেছেন, রাজ্য সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস যে নির্দিষ্ট কেসগুলি তদন্ত করেছিল সে সম্পর্কে বলা হলে, ঘোষ বলেছিলেন: “যদি কোনও অযোগ্য ব্যক্তির নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সমীক্ষার পর তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হবে। তবে এটি লক্ষ্য করা উচিত যে অনেকেই চার বা পাঁচ বছর আগে আবাস যোজনার জন্য আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা হয়তো টাকা রোজগার করে বাড়ি তৈরি করেছেন। এটা কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতি নয়।

বিজেপি এবং সিপিএম নেতারা অবশ্য শাসকদলের বিরুদ্ধে টাকা লুঠের অভিযোগ করেছেন।

“যারা সত্যিকার অর্থে দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে বসবাস করছেন তাঁদের নাম কাটা হয়েছে। হয় আপনাকে তৃণমূল হতে হবে অথবা ২০-২৫ হাজার টাকা দিতে হবে। আমার এলাকার একটি গ্রামে, তালিকা থেকে ৪৫০ নাম কাটা হয়েছে। সেই তালিকা আমরা দিল্লিতে পাঠিয়েছি। তদন্ত শুরু হয়েছে,” বলেছেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ।

সিপিএম-এর সুশান্ত ঘোষ বলেছেন: “একটি ভাল পদ পেতে, একজন তৃণমূল নেতাকে টাকা দিতে হয়। তাই পদ কেনার পর সেই টাকা আদায়ের জন্য তাঁদের দুর্নীতিতে লিপ্ত হতে হবে।”

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Westbengal news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Express investigation part 2 suspect pm awaas lists in west bengal alarm bells rang early went unheard